ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ -হুমায়ুন আজাদ

পবিত্র শাশ্বত জিনিস যে তাকে চিরকাল রাখতে হবে অপরিবর্তিত রূপে। যাক জীবন বদলে। ঘটনাটি ঘটে, এটিই আমার জীবনের একমাত্র ঘটনা, যা ঘটে ঘটনা হিসেবে, বিশুদ্ধ ঘটনা হিসেবে, অন্য কিছু হিসেবে নয়।

যে- বেসরকারি ইউনিভার্সিটিটিতে পড়াই আমি, তার ছদ্মমার্কিন জ্ঞানচর্চায় ছলাকলার শেষ নেই, জ্ঞানের থেকে ছলাকলাই বেশি, তার অনন্ত ছলাকলার একটি হচ্ছে বছরে একবার দলে দলে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ঢাকার বাইরে- সিলেট বগুড়া রাঙ্গামাটি নেত্রকোণা দিনাজপুর বাংলাবান্ধা কুষ্টিয়া যশোর ঝিনাইদহ- যেতে হয়, সারতে হয় প্রবল এক পল্লীসংযোগপ্রকল্প, প্রশান্ত মহাসাগরের সুদূর দ্বীপপুঞ্জের মতো ছড়ানো পল্লীজীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় বছরে সাড়ে চার লাখ টাকার সোনামণি হীরেমণি রাজপুত্রকন্যাদের, যারা মিনারেল ওয়াটার ছাড়া পুকুরের পানি দেখে নি ব’লে বিশ্বাস করে, পুকুরের পানিতে মাছ কীভাবে সাঁতার কাটে সেটা ভেবে চমকে ওঠে। এই সোনামণীদের আমি ভালোবাসি, ওদের এককটিকে আমার আকাশ থেকে খ’সে পড়া তারার ধুলোকণা ব’লে মনে হয়। পল্লীসংযোগে সবারই উৎসাহ প্রবল, জানুয়ারি ভ’রে উৎসব লেগে থাকে আমার বেসরকারিতে, হৈহৈচৈচৈ দলে দলে পাজেরো ভ’রে দিকে দিকে ছোটে আর ফিরে আসো, একশেষ করো ক্যামেরা ভিডিও ল্যাপটপের, শিক্ষকরা, যারা এক সময় খাটতাম কোনো- না- কোনো এনজিওতে, তার আগে ডিশ মাজতাম নরওয়ে সুইডেন জার্মানি হল্যান্ডে, যাওয়ার জন্যে পাগল হয়ে থাকে, সাত দিন থলথলে ঢলঢলে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বাইরে থাকার জন্যে মোটা টাকা ঢোকে পকেটে- টাকার কোনো অভাব নেই, প্রজেক্ট করো আর টাকা নাও, আর ধনী ঘুষেল ব্ল্যাকেল রাঙা বাবাগুলোর রাজপুত্র রাজকন্যাগুলো এর জন্যে আরো উত্তেজিত হয়ে থাকে, তারা উত্তেজিত থাকে শারীরিকভাবেই, অঙ্গে অঙ্গে প্রত্যঙ্গে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বাইরে গিয়ে অনেকগুলো ড্যুরেক্স প্যান্থার রাজা কামসূত্র সেনসেশন সফলভাবে সংযোগ ক’রে ফিরে আসতে পারবে ব’লে। বনানী বারিধারায় কালো কাচে ঢাকা পাজেরো টয়োটার ভেতরে সংযোগে তারা পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে না।

আমার বেসরকারিটি একটি এনজিওই, ঝজঝকে চকচকে লেকচার সেমিস্টার ক্রেডিটের এনজিও, এটাকে আমি আমার দেহের প্রতিটি খণ্ডের থেকেও ভালোবাসি, এটি মাস যেতে না যেতে না আমাকে এতো টাকা দেয় যে এটাকে কায়মনোবাক্যে ভালোবাসা ছাড়া উপায় নেই, এটা আমার দেহটি চাইলেও আমি অবলীলায় দান করতে পারি; আর এর কতো কর্মকান্ড, উৎসব, কতো পার্টি। এটি প্রতিবছর আরেকটি এনজিওর সাথে মিলেমিশে যাপন করে এই পল্লিসংযোগপ্রকল্প, পল্লী পল্লী পল্লী গান তারা গাইতে পছন্দ করে, যেহেতু ডোনাররা এটা খুব পছন্দ করে, পল্লীর সাথে পরিচয় না থাকলে বিশ্বের নাগরিক হওয়া সম্ভব নয়, সম্ভব নয় বিশ্বায়নও; এবং এ- বছর আমি ওই রাজপুত্র রাজকণ্যাদের নিয়ে উঠি সিলেটের কমলগঞ্জের পাহাড়ের পর পাহাড়ের ওপর ছড়ানো একটি এনজিওর রেস্টহাউজে। আমার ভালো লাগে।

এর আগে আমি কখনো সিলেটে আসি নি।

আমি সমতলভূমির সমতল মেয়ে, নৃতত্ত্বে হনুলুলুর একটা তিন অক্ষরের ডিগ্রি থাকলেও আমি তো মেয়েই রয়ে গেছি আজো- আপাদমস্তক মেয়ে, বিশ্বটাকে আমি আজো পার্বত্য নয় বাঁকা নয় সমতলই মনে করি, মনের দিক দিয়েও আমি সমতলই; আমার ভেতরে ধানখেতের পর পাটখেত খালের পর নদী আর বিলের ভেতরে পুকুর দিঘি আছে, ধান পাট পুঁটিমাছ ট্যাংরা বোয়াল নলা ইলিশ গজার আছে, কোনো পাহাড়পর্বত টিলা নেই; যখন দু- পাশের পাহাড় পেরিয়ে আমাদের পাজেরোটি একটি পাহাড়ে উঠতে থাকে, আমি শিউরে উঠতে থাকি, পৃথিবীতে যেনো এর আগে কেউ পাহাড়ে ওঠে নি। একটা পাহাড় আমার ভেতরে তার সারা শরীর হাত পা মাথা মুখ জিভ, নিয়ে ঢোকে। এটা পাহাড়, ছোটো হ’লেও পাহাড়, আমার মনে হ’তে থাকে; আমি একটা উল্লাস বোধ করতে থাকি। ঠিক হয়ে আছে আমি থাকবো পাহাড়ের ওপরের রেস্টহাউজে, সোনার টুকরোরা থাকবে এ- পাহাড়টি থেকে নেমে সামনের দুটি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গিয়ে একটি নিচু পাহাড়ের ওপরের আবাসিক গৃহগুলোতে। পাহাড়টিতে যখন ওঠে পাজেরোটি আমার ভেতরটা নিচের দিকে প’ড়ে যেতে চায়, যেমন ছোটোবেলায় দোলনায় ওঠার পর কেউ ধাক্কা দিলে নিচের দিকে প’ড়ে যেতো আমার ভেতরটা; তারপর দু-দিকে অজস্র গাছের অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটা ঢালু দিয়ে নামে আমাদের পাজেরোর পর পাজেরো, তখনও আমার ভতরটা পেছনে প’ড়ে যেতে থাকে। আমার মনে হ’তে থাকে আমি একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর না হয়ে পেছনের বালিকাটি হয়ে গেছি; আমার ভালো লাগে যে আমি চঞ্চল হ’তে পারি, দুলে উঠতে পারি, আমি ম’রে যাই নি।

রাজপুত্র রাজকণ্যাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে আমি আসি আমার রেস্টহউজে। রেস্টহাউজের কেয়ারটেকার কাম কুকটি অত্যন্ত চমৎকার, আমাকে দেখেই বুঝতে পারে যে সারাক্ষণ বাঙলার ভেতর ইংরেজী গুঁজেগুঁজে কথা বলতে হবে, বা সে আমার রাজপুত্র রাজকন্যাদের কথা শুনে, তাদের জিন্স আর বুকের উচ্চতা পাছার প্রসার আর পাজেরোর সাইজ দেখে, বুঝতে পেরেছে ইংরেজী গোঁজা ছাড়া উপায় নেই। বাঙালির মুখে ইংরেজী শুনতে আমার ভালো লাগে, এটা ওদের মায়ের বুলি হ’লেই ভালো হতো; আমি নিজে যখন বলি তখন বারবার আমাকে এ প্লাস প্লাস দিতে ইচ্ছে করে। পাহাড়ের দক্ষীণ- পুব দিকে রেস্টহাউজটি, আমার জন্যে রয়েছে সবচেয়ে পুবের ঘরটি, যেটি থেকে একসাথে দেখা যায় দক্ষিণ, পুব, আর উত্তর; আমি ঘরে ঢুকেই প্রকৃতির তিন দিকের আদরে আক্রমণে বিবশ হয়ে পড়ি, মনে হয় তিনটি পাহাড় তিন দিক থেকে উঠছে আমার ওপরে তিনটি পাহাড় তিন দিক থেকে টানছে আমাকে। এটা কোনো ধানাক্ষেতের সমতলতা নয়, বিলের জলসমষ্টি নয়; দেখতে পাই দক্ষিণে ঢালু হয়ে পাহাড় নিচের দিকে নেমে গেছে, এক কিলোমিটার দূরে বাঁকা হয়ে উঠেছে আরেকটি পাহাড়, পুবে অনেক দূরে আরেকটি পাহাড়, উত্তরে অজস্র গাছের ভেতর দিয়ে উঠেছে আরেকটি পাহাড়, জানালার জালের ভেতর দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাহাড় এসে ঢুকতে থাকে আমার ভেতরে। আমি চুপ ক’রে ব’সে থাকি, নিস্তব্ধতা সবুজ পাহাড় হয়ে আমাকে ঘিরে ধরে। অনেক বছর আমি এমন একলা হই নি, অনেক বছর আমি এমন একলা হওয়ার সুখ পাই নি।
স্তব্ধ হয়ে ব’সে থাকি আমি, নৈঃশব্দ্য আমাকে অবিরল সবুজে ভ’রে দিতে থাকে, আমার মনে হ’তে থাকে আমার শরীর সবুজ হয়ে উঠছে, ভেতরের মাংস সবুজ হয়ে উঠছে, সবুজ হয়ে উঠছে রক্তনালির প্রবাহ।

কেয়ারটেকার- কুক দরোজায় নক করলে পৃথিবীতে ফিরে আসি।
আমি বলি, কে? ভেতরে আসুন।
সে বলে, ম্যাডাম, আপনের হট ওয়াটার লাগবে? আপনে বাথ নিবেন?
আমি বলি, হ্যাঁ, গরম পানি হ’লে তো ভালোই হয়।
সে বলে , আমি টাবে হট ওয়াটার দিতেছি, আপনে বাথ সেরে লন। আমি বলি, হ্যাঁ, দিন।
সে বলে, বাথের পর কি টি খাবেন?
আমি বলি, হ্যাঁ।
সে বলে, টি কি রুমে দিব, না ডাইনিংয়ে খাবেন?
আমি বলি, গোশল করার পর আমি খাওয়ার ঘরে আসবো, তারপর চা বানালেই চলবে।
সে বলে, টির সঙ্গে কী খাবেন?
আমি বলি, এসেই বলবো।

অ্যাটাচ্ড বাথরুম নেই, ঘর থেকে কয়েক পা ফেলেই একটি ছোটো চমৎকার বাথরুম, একটি বিশাল বালতিতে গরম পানি থেকে ধুয়োঁ উঠছে; আমি ভেতরে ঢুকে দরোজা বন্ধ করি, গরম পানিতে ঠাণ্ডা পানি মেশাই, সম্পূর্ণ নগ্ন হই, গোশল করতে থাকি। বাসায় হ’লে আমার অনেক সময় লাগতো, শরীরে মুখে বেশ কিছু প্রাকৃতিক জিনিস মাখতাম, যাকে দেলোয়ার বলে হলুদ –মরিচ লাগানো, কখনো বলে পাঁচফোড়ন দেয়া, রান্ধনবাড়ন; সাবান আমার সহ্য হয় না, একটি বই নিয়ে গিয়ে বসতাম বাথরুমে, ঘন্টাখানেক কেটে যেতো, এখানে অতোটা সময় দেয়া যাবে ব’লে আমার মনে হয় না; তবু ধীরেধীরেই আমি গোশল করি, আমার মনে হ’তে থাকে পৃথিবীতে আর কেউ নেই, ভেজা শরীরে বেবি ওয়েল মাখি, অনেকক্ষণ ব’সে থাকি বাথরুমের মেঝের ওপর।
আমার অদ্ভুত লাগতে থাকে।

চা খেতে ইচ্ছে করে। বাথরুমে এক কাপ চা পেলে বেশ হতো, টাটকা গরম লাল চা; বাসায় হ’লে এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে, এককাপ গরম পানিতে এক চামচ পাতা আর আধ-চামচ চিনি ঢেলে, বসতাম বাথরুমে, বইয়ের পাতা উল্টোতে থাকতাম, কখনো আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতাম নগ্ন নিজেকে, স্তন দুটির লাল বৃত্ত, নাভির গভীরতা, জঘনের কোমল ভাস্কর্য- নিজেকে দেখতে আমার ভালো লাগে, দেখতে দেখতে নিজেকে আমার আপন মনে হয়, নগ্ন শরীর শুকোতে থাকতো, ইচ্ছে হ’লে আরেকটুকু বেবি ওয়েল মাখতাম, চা খেতে থাকতাম, উল্টোতে থাকতাম বইয়ের পাতা, দেলোয়ার হয়তো চিৎকার করতে থাকতো, তোমার রান্ধন হইলো?
এখন কেউ চিৎকার করবে না, তবু আমি বেরিয়ে আসি বাথরুম থেকে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে, চারদিকে কেউ নেই; জানালা দিয়ে দেখি কুয়াশা নামছে পাহাড়ের মতো, অন্য রকম হয়ে গেছে তিন দিকের পাহাড়, কুয়াশাজড়ানো পাহাড় এখন এগিয়ে আসছে আমাকে জড়িয়ে ধরার জন্যে; মনে হ’তে থাকে পাহাড়গুলো যদি তিন দিক থেকে আসে আমাকে জড়িয়ে ধরতো, আমি সুখ পেতাম আমার খুব সুখ পেতে ইচ্ছে করতে থাকে।

ঘরে তালা দিয়ে আমি ডাইনিংরুমের দিকে হাঁটতে থাকি, বারান্দায় শেল্ফে শেল্ফে বই সাজানো, মাতা মেরি ও তার পুত্রের মহিমার বই, ত্রাতার অলৌকিক গল্পের বই, দেখে আমার ওই বালকের জন্যে স্নেহভরা হাসি পায়- ত্রাতা, আহারে বিশ্বাস; যার যা ইচ্ছে বিশ্বাস করুক, এতে এ- মুহূর্তে আমার কিছু যায় আসে না; আমার সুখ লাগছে যে কেউ নেই চারপাশে, কোনো ত্রাতা নেই, শয়তান নেই, দেবদূত নেই, সাপ নেই, একটা পুরো রেস্টহাউজে একা আমি, এমন একলা হওয়ার সুখ আমি কখনো পাই নি, মনে পড়ে না শেষ কবে আমি একলা হয়েছিলাম।

কখনো হয়েছিলাম? মনে পড়ে না, আমার প্রচণ্ড সুখ লাগতে থাকে।
কুক বলে, ম্যাডাম, আমার নাম রামকৃষ্ণ।

আমি তার নাম জিজ্ঞেস করি নি, সে হয়তো আমাকে সাহায্য করার জন্যে তার নামটি আগেই জানিয়ে দেয়, হয়তো নামটা এরপরর আমার নানা কাজে লাগবে। কখনো আমি কারো নাম জিজ্ঞেস করি না, কিন্তু একবার শুনলে কখনো ভুলি না; নাম শোনার পর প্রতিটি মানুষকেই আমার গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, নামই মানুষ। কিন্তু কখনো আমি কারো নাম জিজ্ঞেস করি না কেনো; কাউকেই কি প্রথম আমার গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না? শুধু তারা যখন বুঝিয়ে দেয় তাদের গুরুত্ব, শুধু তখনই বুঝতে পারি? রামকৃষ্ণ নামটা আমার ভেতরে কিছুক্ষণ ধ’রে অর্থহীনভাবে কাঁপে, আমি ওটাকে অর্থপূর্ণ ক’রে তুলতে চাই।

আমি ধীরেধীরে এক টুকরো বাটারটোস্ট খাওয়ার চেষ্টা করি, ওটির ভেতর থেকে একটা পুরোনো গন্ধ বেরিয়ে এসে আমাকে থামিয়ে দেয়; রামকৃষ্ণ খুটখাট ক’রে কী যেনো করতে থাকে, আমি তার দিকে তাকাই না। আমি বুঝতে পারি সে কিছু একটা শুনতে চায়, সে একটা নাম বলেছে, তার বিনিময়ে একটা কিছু শোনার তার অধিকার আছে।

আমি বলি, রামকৃষ্ণ, আপনার নামটা খুব সুন্দর।
রামকৃষ্ণ খুব খুশি হয়, বলে, ম্যাডাম, আপনে আমারে ‘আপনি’ বললেন।
আমি বলি, অন্যরা বলে না?

রামকৃষ্ণ বলে, কেয়ারটেকার শোনার পর আপনি বলে, যখন দেখে আমি কুক, তখন তুমি বলে।
আমি চা খেতে থাকি, মনে হয় রামকৃষ্ণ আরো কথা বলতে চায়; কিন্তু আমি কী বলবো তার সাথে, বা অনেক কিছুই ইচ্ছে করলে আমি বলতে পারি, বলতে ইচ্ছে করছে না। এই রেস্টহাউজের স্তব্ধতা আমাকে ঘিরে ধরেছে, রামকৃষ্ণ এখানে না থাকলেই আমি সম্পূর্ণ স্তব্ধতা পেতে পারতাম; কিন্তু রামকৃষ্ণ মনে হয় স্তব্ধতায় ক্লান্ত, সে চারদিকে কিছু শব্দের কলরব চায়।
আমি কি রামকৃষ্ণের সাথে একটু নৃতত্ত্ব চর্চা করবো? একটু নাড়া দিলেই কি তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে না নৃতাত্ত্বিক সোনার একটি-দুটো খন্ড?
আমি বলি, রামকৃষ্ণ, আপনি কোন কোন দেবতার পূজো করেন?
এভাবে প্রশ্নটা করতে চাই নি, তার নামটা থেকে মনে করতে পারতাম সে হিন্দু, কিন্তু আমার একটু সন্দেহ ছিলো, তাই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিলো সে হিন্দু না খ্রিস্টান, কিন্তু সরাসরি এমন প্রশ্ন করা শোভন হবে না ব’লে মনে হয়, ধর্মানুভূতির প্রবল স্পর্শকাতরতার যুগে এটা বিপজ্জনকও হ’তে পারে, তাই আমি ঘুরিয়ে করি প্রশ্নটা, এতে চমৎকার সাড়া দেয় রামকৃষ্ণ।
সে বলে, আমি কোনো দেবতার পূজা করি না, আমি হিন্দু না, ম্যাডাম, আমি খ্রিস্টান।
আমি খুশি হই, চমৎকার একটি সোনার খণ্ড বেরিয়ে এসেছে; তবে একটি খণ্ডে চলবে না, আমার আরো কিছু সোনার খণ্ড সংগ্রহ করতে ইচ্ছে হয়।
আমি জিজ্ঞেস করি, কে প্রথম খ্রিস্টান হয়েছিলেন, আপনার দাদা?
সে বলে, আমিই প্রথম খ্রিস্টান হয়েছি, ম্যাডাম।
একটু অবাক হই আমি; রামকৃষ্ণের বয়স চল্লিশের মতো হবে, সে খ্রিস্টান হয়ে থাকলে বেশি দিন আগে হয় নি, এবং তাকে একটা বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো, খুব স্পষ্টভাবে সে বদল করেছিলো তার জীবন।
আমি জিজ্ঞেস করি, কেনো খ্রিস্টান হলেন?
সে বলে, আমার মা বাবা দাদা দাদী সবাই ছিলো চা বাগানের লেবার, লেবাররা মানুষ না, ম্যাডাম, তাদের মানুষ থাকতে দেয় না ম্যানেজাররা।
তার কণ্ঠস্বরে ঘৃণা উপচে পড়তে থাকে।
আমি বলি, কেনো মানুষ থাকতে দেয় না?
সে বলে, কয়টা টাকার জন্যে দিনরাইত খাটতে হয় লেবারদের, আর ওই টাকা তারা মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। মদ না খেয়ে উপায় নেই, ভাত না খেলেও চলে, কিন্তু মদ খেতেই হবে। আমার বাবা খালি মদ খেতো, আর আমরা ভাত খেতে পেতাম না। আর লেগে থাকে পূজা আর পূজা, আর ঘরে ঘরে কুষ্ঠ ঘরে ঘরে থাইসিস। এতো দেবতার পূজা করতে হতো, বুঝতে পারতাম না কোনটা কে? আমার বাবা মা ছিলো ছোটলোক, আমি ছিলাম ছোটলোকের ছেলে, আমাদের কোনো দাম ছিলো না, পূজার জন্যে আমরা টাকা দিতাম, কিন্তু মন্দিরে ঢুকতে পারতাম না। তাই ছোটবেলা থেকেই আমার আর ওই ধর্ম ভালো লাগতো না, লেবার হ’তে ইচ্ছে করতো না; মনে হতো পালিয়ে গিয়ে মানুষ হই।
আমি বলি, খুব কষ্ট লাগতো আপনার?
সে বলে, কষ্টের শেষ ছিলো না, ম্যাডাম। বাগানের ভিতর একটা ইস্কুল ছিলো, আমি সেই ইস্কুলে যেতে শুরু করি, আমার মা বাবায় পাঠায় নাই, লেবারদের ছেলেমেয়েদের জন্যে ইস্কুল, বেশি কেউ যায় না, কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে করতো, ইস্কুলে গিয়েই শুধু আমার একটু শান্তি লাগতো।
আমি জিজ্ঞেস করি, ইস্কুলটা খুব ভালো ছিলো?
সে বলে, না, একদম ভালো ছিলো না, খালি ভালো ছিলো এক স্যার, স্যার ছিলো খ্রিস্টান, তারে দেখেই আমার ইচ্ছা হয়।
আমার চা খাওয়া হয়ে গেছে, রামকৃষ্ণের খনি থেকে আর সোনার খণ্ড তুলতে আমার ইচ্ছে হয় না, রামকৃষ্ণ ভালো আছে, চা বাগানে থেকে গেলে সে এমন মানুষ হয়ে উঠতো না; আমার স্তব্ধ হ’তে ইচ্ছে করে, আমি তাকে আর কোনো প্রশ্ন করি না, সেও থেমে যায়। ঘরে ফিরে কুয়াশার মতো পাহাড় আর পাহাড়ের মতো কুয়াশা দেখতে থাকি, আমি যেনো একা থাকার অসীমতা বোধ করি, এবং অনেক বছর পর ঝোঁপের একপাশে একঝাঁক জোনাকি দেখে আমি সম্পূর্ন নিস্তব্ধ হয়ে উঠি। জোনাকি উড়ছে, জোনাকি, এবং কুয়াশা, পাহাড়, আমি।
পরদিন থেকে শুরু হয়ে যায় আমদের পল্লীসংযোগপ্রকল্প।
সংযোগের এলাকা কমলগঞ্জের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের গ্রাম, ঘোড়ামারা; গ্রামটি দেখে শিউরে উঠি আমি, চঞ্চল হই না, স্নিগ্ধ হই, ওটি ওর নামের মতো নয়, বিষ্ণুপ্রিয়ার মতো; শুপুরিগাছের সারির পাশে আমগাছের ডালে যে- ঘুঘুটি ডাকছিলো, নিজেকে আমার মনে হয় সেই ঘুঘুটির ডাকের মতো সুখী ও অনন্ত। কতো বছর পর আমি ঘুঘুর ডাক শুনলাম, আহা, এখানে না এলে হয়তো আমার কখনো ঘুঘুর ডাক শোনা হতো না, মনেও পড়তো না যে ঘুঘু আছে পৃথিবীতে, আর ঘুঘু ডাকে। ওই দিকে মিষ্টি নদী ধলাই। আমার সোনামণি ছাত্রছাত্রীরা মেতে ওঠে গ্রাম দেখে, নদী দেখে; কিছু দেখে কোকাকোলার মতো উপচে পড়া একটু বেশি মেতে ওঠা ওদের স্বভাব, কিন্তু ওদের মুখ দেখে মনে হয় ওরা মেতে উঠেছে ভেতর থেকেই; সাথে সাথে মেতে ওঠে ওদের ল্যাপটপ, ক্যামেরা, ভিডিও। মণিপুরী বলতে এতোকাল আমার চোখের সামনে কেঁপে উঠতো নাচ, ওদের ঘরবাড়িগুলোকেও আমার লাহিংপরা স্থির নর্তকীর মতো মনে হয়, যেনো সূর্যের মুখের দিকে তাকিয়ে নেচে চলছে নিঃশব্দে।বাড়িগুলোর মুখ পুব দিকে, সূর্যের দিকে। আমরা মিশতে থাকি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী নারী ও পুরুষের সাথে, পেতে থাকি টুকরো টুকরো তথ্য, মনে হয় প্রশান্ত মহাসাগরের কোনো দ্বীপে গিয়ে পৌঁচেছি, ভ’রে উঠছি। মিশছি আমরা লাহিং, ব্লাউজ, ইনাফিপরা নারীদের সাথে, পাছাতিপরা পুরুষদের সাথে; বেশ লাগছে; খেয়ে দেখছি পান্তেই, উরুখই,

Read Previous

শুভেচ্ছা – হুমায়ুন আজাদ । কবিতা সংগ্রহ

Read Next

নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় – সৈয়দ শামসুল হক । কবিতা সংগ্রহ