উদ্যোক্তা পরিচালিত ব্যবসা বনাম কর্মী পরিচালিত ব্যবসা (২য় পর্ব)

যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠাতার হাত থেকে ব্যবস্থাপনা টিমের কাছে হস্তান্তর করার কাজটা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে সময়, ব্যক্তি ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দরকার। উদ্যোক্তাকে সময় নিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায় এসব সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে একাধিক ব্যবসা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে, সঠিক টিমের হাতে, সঠিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর সফলতা দেবে। ভুল সিদ্ধান্ত মানে বিরাট সংকট ডেকে আনবে।

ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবার সময় আসার আগেই উদ্যোক্তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবর্তন ঘটাবার জন্য অনেক সময় দরকার। পরিবর্তনের প্রস্তুতির জন্যও উদ্যোক্তাকে অনেক সময় দিতে হয়। তাই উদ্যোক্তা এমন সময় সিদ্ধান্ত নিতে হবে – যখন নিয়মিত কাজের পাশাপাশি পরিবর্তনের কাজেও যথেষ্ট সময় দেয়া সম্ভব।

প্রথমে উদ্যোক্তাকে ঠিক করতে হবে আদৌ তিনি ম্যানেজমেন্টের হাতে ক্ষমতা দিতে চান কি না। একবার কাজটি শুরু করে পিছিয়ে আসলে প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষতি হবে। সিদ্ধান্ত হস্তান্তরের পক্ষে হলে নিচের বিষয়গুলো শুরু করা যায়।

ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে মালিক হিসেবে তার নিজের কাজ:
এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন – হস্তান্তরের পরে মালিক হিসেবে তার কাজ কি হবে?
ম্যানেজমেন্টের কাজ মালিকের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান চালানো। সেটা হচ্ছে কি না, সেটা দেখার দায়িত্ব উদ্যোক্তার নিজের। তাই সেটা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াগুলো তাকেই ঠিক করতে হবে। তিনি ঠিক করে দেবেন –কিভাবে তিনি ম্যানেজমেন্টকে তার প্রত্যাশা জানাবেন, ম্যানেজমেন্ট কিভাবে প্রত্যাশা পূরণের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে, তার অগ্রগতি কি প্রক্রিয়ায় বা কত সময় পর পর মনিটরিং করা হবে, প্রত্যাশা পূরণে অবহেলা করলে পরিণাম কি হবে – ইত্যাদি।

তিনি হয়ত একটা চিঠি বা বোর্ডে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করে ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে দেবেন যে – তিনি নির্দিষ্ট কি কি বিষয়ে অগ্রগতি দেখতে চান, কি দেখতে চান না। প্রত্যাশার বিষয়টি নম্বরে বের করে দেয়াই ভাল। সেক্ষেত্রে মনিটরিং করতে সুবিধা। ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কম থাকবে।

ওই প্রত্যাশার আলোকে ম্যানেজমেন্ট একটি নিয়মমাফিক বিজনেস প্ল্যান চ্যালেঞ্জ এক্সারসাইজের আয়োজন করতে পারে। তার মাধ্যমে ম্যানেজমেন্ট তাদের টার্গেট ঠিক করতে ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে পারবে।

উদ্যোক্তা ঠিক করে দেবেন তিনি কতদিন পরপর অগ্রগতি পরিদর্শন এক্সারসাইজ করতে চান। সেটা কিভাবে হবে। মিটিং এর মাধ্যমে অথবা রিপোর্ট পাঠিয়ে।

এছাড়া ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে দিতে হবে যে তাদের কাজের কি পদ্ধতিতে অডিট হবে। অডিট আপত্তি কতদিনের মধ্যে সমাধানের সুযোগ থাকবে, ইত্যাদি।

কখন, কোন দায়িত্বগুলো ম্যানেজমেন্টের হাতে তুলে দেয়া দরকার :
উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের সকল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের একটি তালিকা করবেন। সকল দায়িত্ব একবারে হস্তান্তর করা যায় না। তাই তিনি দায়িত্ব হস্তান্তরের একটি টাইমলাইন ঠিক করবেন।

দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতা:
প্রতিটি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য কিছু ক্ষমতা দিতে হয়। উদ্যোক্তা ঠিক করবেন কোন দায়িত্ব পালনের জন্য কোন ক্ষমতা দেয়া দরকার।

ক্ষমতা ও ঝুঁকি:
প্রতিটি ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। উদ্যোক্তা সেটা সবচেয়ে ভাল বুঝবেন। তিনিই সেটার তালিকা করে সেই ঝুঁকি প্রশমনের প্রক্রিয়া ঠিক করবেন। যেমন চেকের ঝুঁকি কমানোর জন্য চেকের কাষ্টোডিয়ান ও সিগনেটরি আলাদা করা, একাধিক সিগনেটরি নিয়োগ – ইত্যাদি।

পদ ও কাজ ভাগ:
কিছু সংখ্যক দায়িত্ব দিয়ে একটি করে পদ সৃষ্টি করতে হবে। একই ধরনের সকল কাজ ওই পদের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। উদ্যোক্তাকে ঠিক করতে হবে ওই দায়িত্ব পালনের জন্য কেমন লোক দরকার। এগুলো খুব ভালভাবে ডকুমেন্টেড করতে হবে। প্রয়োজনে কোন জনশক্তি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেয়া যায়।

ম্যানেজমেন্ট টিম তৈরি:
ম্যানেজমেন্ট রান ব্যবসার প্রাণ “ম্যানেজমেন্ট টিম”। উদ্যোক্তার তৈরির সকল পদের লোক এই টিমের সদস্য। এই টিমের কলেবর পরে বাড়তে পারে। তবে প্রথম টিমটি উদ্যোক্তা ঠিক করে দেয়াই ভাল।

একদল যোগ্য ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক দলের সমন্বয়ে এই টিম তৈরি করতে হয়। এই টিমের সদস্যদের পেশাদারি ব্যবসা ব্যবস্থাপক “Business manager” বলা হয়। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ থাকেন। পাশাপাশি ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার সাধারনজ্ঞানসম্পন্ন হতে হয়। উদ্যোক্তা না হয়েও উদ্যোক্তার দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবার মত যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়। বিজয়ের জয়মালা নেবার পাশাপাশি পরাজয়ের পূর্ণ দায়িত্ব নেবার ক্ষমতা থাকতে হয়।

উদ্যোক্তা সময় বুঝে এই টিম তৈরি শুরু করবেন। টিমের সদস্যদের মধ্যে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতের দায়িত্ব ও ক্ষমতা বণ্টন করে দেবেন।

পরিবর্তনে যেগুলো মনে রাখা দরকার:
=====================
ভরসা ব্যক্তিকে না, প্রক্রিয়ায় উপরে: অসৎ হবার রাস্তা খুলে রেখে মানুষের সততার পরীক্ষা নেবার কোন মানে হয় না। প্রতিটি প্রক্রিয়া এমন ভাবে তৈরি করা দরকার যেখানে অসততার সুযোগ কম থাকে। সেগুলোর নিয়মিত অডিট থাকে। অডিট আপত্তিগুলোর যেন সুষ্ঠু নিষ্পত্তি নিশ্চিত হয়। প্রক্রিয়াগুলো নিয়মিত আপডেট করা দরকার।

উদ্যোক্তা ও ম্যানেজমেন্টের মানসিকতা: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় উদ্যোক্তা ও ম্যানেজমেন্ট দুটি পক্ষ হয়ে যায়। এর চেয়ে খারাপ কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য আর হতে পারে না। ম্যানেজমেন্টের কাজে অকারণ হস্তক্ষেপ বা উদ্যোক্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী তথ্য না পৌঁছানো এটার সবচেয়ে বড় কারণ। সম্পর্ক উন্নয়নে দুপক্ষের আন্তরিকতা সমানভাবে দরকার।

মন্তব্য করুন