তার পরেও স্বপ্ন দেখি পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত হবে পৃথিবী

আজ থেকে ৭০ বছর আগে ১৯৪৫ সালের ৬ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান এনোলা গে থেকে ‘লিটল বয়’ নামের পরমাণু বোমাটি ফেলা হয়েছিল হিরোশিমায়। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন। তিন দিন পরে অগাস্টের ৯ তারিখে পাশের শহর নাগাসাকিতে ফেলা হয় ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের আরেকটি পরমাণু বোমা। এর ছয়দিন পরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণ করে জাপানি বাহিনী। পরমাণু বোমার তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এখনো জাপানের ওই দুটি শহরের বাসিন্দাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

ইতিহাসে লেখা হল একক কোনো বোমায় সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা। বিশ্বমানবতা দেখল পরমাণু বোমার ভয়াবহতা, যুদ্ধবাজরা তুলও তৃপ্তির ঢেকুর আর
জাতীয়তাবাদের যোগ হল নতুন অসুখ।

ইতিহাসের বড় শিক্ষা- ইতিহাস থেকে কেও শিক্ষা নেয় না। এত বড় ভয়াবহ পরিণতি দেখার পরেও বিশ্বজুড়ে চলছে পরমাণু বোমার মালিক হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ না করে বোমা বানানোর বিলাসিতা। যারা এই প্রতিযোগিতায় নেই তারাও খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক চাহিদায় নজর না দিয়ে, বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সামরিক খাতে।

ভারতের মত দেশে যেখানে কৃষকেরা দেনার দায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়, সে দেশ শত-শত কোটি রূপি খরচ করে পরমাণু বোমা বানায়। নিজেদের পরমাণু শক্তিধর দেশ ঘোষণ করে ভারতীয় প্রশাসন সে দেশের জনগণকে শুনিয়ে ছিল এক রূপকথা – ‘আমাদের আর কেও আক্রমণ করবে না!’
ভারতীয়দের এই গল্পের ঘোর টেকে মাত্র কয়েক দিন। ‘পোখরান-২’ টেস্টের ১৭ দিনের মাথায় পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করে ‘চাগাই-১’ সাঙ্কেতিক নামে। আর বছর না ঘুরতেই দুই দেশের মধ্যে সংগঠিত হয় কার্গিল যুদ্ধ। ৫২৭ জন নিহত জাওয়ানের কফিন কাঁধে ভারতীয়দের প্রশ্ন ছিল, পরমাণু অস্ত্র তো আক্রমণ ঠেকাতে পারলো না। দেশটির পরমাণু অস্ত্র থাকার পরেও পাকিস্তানের সীমান্ত অস্থিতিশীল। চীন সীমান্ত অস্বস্তিকর।

‘গুণ্ডা স্টেট’ পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র সারা বিশ্বের মাথা ব্যথার কারণ। যে কোন ইস্যুতেই দেশটির জেনারেল-আমলা-নেতাদের হ্যাডম- ‌’দিল্লি থেকে ইউরোপ পর্যন্ত আমাদের বোমের রেঞ্জ’, কিংবা হুমকি, ‘জঙ্গিদের পরমাণু অস্ত্র দিয়ে দিবো’। এই বোমা ভয় দেখিয়ে ইউএস – ইইউ থেকে চান্দা তুলে চলছে দেশটা।

উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের খায়েশে সারা বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে। ইজরায়েলের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকলেও প্রকাশ্য নিজস্ব স্বীকারোক্তি নেই। ইজরায়েলের আছে বলে ইরানের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন। পারস্য সভ্যতার দেশ ইরান পরমাণু অস্ত্রের মালিক হওয়ার আশায় অর্থনৈতিক ভাবে ধুকছে। এখন ঐতিহাসিক কোম নগরীর নাম ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের জন্য নয়, আসে পরমাণু অস্ত্রের জন্য। ইজরায়েল-ইরানের হলে সৌদি আরবের কেন থাকবে না? এরা তো কম পেট্রোল ডলারের মালিক নয়! সৌদি রাজ সুর তুলছে পাকিস্তান থেকে পারমানবিক অস্ত্র কিনবে! এই ধরণের অস্ত্রের বিষয়ে যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, সেটা সব কিছু সম্পন্ন করে বিশ্ব জানানো হয়। এই হিসাবে সৌদির রাজকীয় অস্ত্রভাণ্ডারেও আছে পারমানবিক অস্ত্র। অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য পরমাণু অস্ত্রের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

৭০ বছর আগের নির্মমতার জন্য বিশ্ব জুড়ে আওয়াজ উঠে ছিল- পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের। কিন্তু থামানো গেছে কি? উগ্র জাতীয়তাবাদের পাগলা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পারমানবিক অস্ত্রের ভাইরাস ছড়াচ্ছে জাতিতে জাতিতে। আর পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্যাম্পেইন এখন পুঁজিবাদের একটা ব্যান্ড প্রোডাক্ট। আর্টিকেল, প্রোগ্রাম, টি-সার্ট এমন কি ফেসবুকের কভার ফটো বিক্রির উৎসব। সাতটা দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পারমানবিক অস্ত্রের হুমকি কমেনি উল্টো বেড়েছে। ভয়ঙ্কর পরিণতি জানার পরেও আগামী প্রজন্মকে আমরা রেখে যাচ্ছি পারমানবিক অস্ত্রের গোডাউনে।

ক্ষমা চাই হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিহত এবং আহতদের কাছে। ক্ষমা চাই আগামী প্রজন্মদের কাছে যাদের আমরা দিয়ে যেতে পারছি না পারমানবিক অস্ত্রে মুক্ত পৃথিবী।

তার পরেও স্বপ্ন দেখি পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত হবে পৃথিবী।

মন্তব্য করুন