শুনে মুসলমান ভাই ও বোনদের বলছি, আমি আপনাদের শত্রু না

প্রিয় শুনে মুসলমান ভাই ও বোনেরা,
আমি আপনাদের শত্রু না। আমার প্রতি এত হিংস্র হবার কিছু নাই।
বরং আমি আপনাদের প্রায় অন্ধ চোখের শেষ আলোটুকু।
এখান থেকে চিকিৎসা করে করে চোখটা ভালো করে নিতে পারেন। আবার খুঁচিয়ে শেষ আলোটুকু নষ্ট করে চিরদিনের জন্য অন্ধত্ব বরণ করতে পারেন।

আমার নিজের গল্পটা আমি আজ একবার বলবো। আপনারা হয়ত বুঝবেন আমি যা বলি তা কেন বলি।

আমি বহু যন্ত্রণার পথ পার করে এখানে এসেছি।
অনেকেই হয়ত জানেন আমি শিশুকাল থেকে সর্বক্ষণ জোব্বা-টুপি পরা মুসলিম ছিলাম। মাদ্রাসায় পড়েছি। মহফিলে ঘুরে বেড়িয়েছি। মসজিদে আজান দিতাম। ইমামতিও করেছি। সেরকম জায়গা থেকে তরুণ বয়সে একসময় ইসলাম ছেড়ে দিয়েছিলাম। অবিশ্বাসেই সমাধান মনে হয়েছিলো। তারপর বহু পথ ঘুরে আবার ইসলামে ফিরে এসেছিলাম।

ইসলাম ছেড়ে দিয়েছিলাম ইসলাম খারাপ বলে নয়। বরং ছেড়েছিলাম আলেম নামের ভণ্ডদের মোনাফেকি ও অমিতাচার দেখে।
তখন তরুণ মন বিদ্রোহী, সত্য অনুসন্ধানী, তৎক্ষণাৎ সমাধান প্রত্যাশী।
হুজুরদের প্রশ্ন করি, জবাব পাই না। জানে না, নাকি উত্তর দিতে চায় না, তাও পরিষ্কার করে বলে না। এরা যা বলে এবং যা করে, দুটোর কোন মিল নেই। মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে, প্রতিবেশী হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে ইসলামের যেসব আদর্শ, তার ধারে কাছেও তারা যায় না।
বরং যারা সত্যিকারের ধর্ম পালন করে, ধর্ম বিষয়ে লেখাপড়া করতে উৎসাহ দেয়, অন্ধভাবে ভজে যাবার বিপক্ষে, হুজুররা তাদেরকে ঘৃণা করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির সব সুবিধা নেয় কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষাকে ঘৃণা করে। সব সমস্যা নিজেদের তৈরি করা কিন্তু সারাদিন অকারণে অন্য ধর্মের লোকের গালাগালি করে। সমস্যার কথা বলে কিন্তু সমাধানের পরিষ্কার রাস্তা দেখায় না। বহু শান্তির কথা থাকতেও বেছে বেছে অশান্তি আর উত্তেজনার কথা বলে।
তখন একটি প্রশ্ন সর্বক্ষণ কুরে কুরে খেত। আল্লাহ যদি থাকেন, তবে আলেমদের এসব অধর্ম করার পরে শাস্তি হয়না কেন? এরা এত মানুষকে গোমরাহ করার পাপে হঠাৎ একদিন ল্যাংড়া, লোলা, বোবা হয়ে যায়না কেন। যেসব ক্ষোভ থেকে রাগ, রাগ থেকে ঘৃণা। সেইরকম আলেমদের প্রতি ঘৃণা থেকে ইসলামের প্রতি ঘৃণা।

তবে ইসলাম ছেড়ে দিলেও ইসলামের প্রতি অনুসন্ধান ছেড়ে দেইনি। প্রতিনিয়ত যতটা সম্ভব পড়েছি, জানতে চেষ্টা করেছি। আরেকটু বয়স হবার পরে ক্রমশ বুঝতে শিখলাম হুজুরের উপর ঘৃণায় ইসলাম ছাড়ার কিছু নেই। ইসলাম হুজুরের বাবার সম্পত্তি নয়। বরং আমি তার উপরে রাগে আমার অধিকার ছেড়ে দিয়েছি। বরং ধর্মের উপরে তার অথরিটি আমি মেনে নিয়েছি। এরপরে অনুসন্ধান বাড়ালাম। এরপর বিভিন্ন আলেমের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যে মোটামুটি একটা আন্দাজ হয়ে গেল। দুচারটে কথা বললেই বুঝতাম আলেম কি রকমের।

সেসময় কয়েকজন সত্যিকারে আলেম কে পেয়েছি, যারা পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিয়েছেন, ভাবতে উৎসাহ দিয়েছেন। নিজেদেরকে তারা “আলেম এ দ্বীন” বলার বদলে “তালেব এ ইলম” বলতেই বেশি পছন্দ করতেন। তাদের উৎসাহে নিয়মিত পড়তে শুরু করলাম। তাদাব্বুর, তাফাক্কুর শুরু করলাম। বিজ্ঞান ও স্রষ্টাকে বিপরীতে আমার দাড় করানোর শিক্ষা থেকে বের হলাম। মহান আল্লাহকে ভয়ের, দুরের বদলে একান্ত ভাবার শিক্ষা নিতে শুরু করলাম। সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি মুসলিমের ইতিহাস, যেটাকে আমরা ইসলামের ইতিহাস বলি। পরিচিত হয়েছি ইতিহাসের বিখ্যাত ও কুখ্যাত মুসলিমদের সাথে। জানার সুযোগ হয়েছে তাদের কর্মকাণ্ড। পৃথিবীর ইতিহাসের সাথে মুসলিমের ইতিহাস পাশাপাশি মিলিয়ে বাইরের থেকে দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছি। Text এবং Context রিলেট করার সুযোগ পেয়েছি। ইসলামের নামে ইসলামের পিঠে ক্রমশ চাপিয়ে দেয়া বৈধ ও অবৈধ বোঝার ধারণা পেয়েছি। মানুষের নৈতিকতার উন্নয়নে ইসলামের ব্যবহার দেখেছি। মানুষকে Disciplined করতে ইসলামের ব্যবহার দেখেছি। মানুষকে শিক্ষিত করতে, উন্নত করতে ইসলামের ব্যবহার দেখেছি। আবার মানুষকে গোমরাহ করতে, ঠকাতে, যুদ্ধ বিগ্রহ লাগাতে ইসলামের ব্যবহার দেখেছি।

একদিকে সত্যিকারের আলেমদের রক্তাক্ত হতে দেখেছি। তাদের রক্ত দেখেছি আরেকদল আলেম নামধারীদেরই হাতে।
কিছু আলেম প্রগতি, সত্য ও ন্যায্যতার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে দেখেছি। আবার নিজেদের স্বার্থে কিছু আলেমকে অন্যদের প্রাণ নিতে দেখেছি। কিছু আলেম যেমন মুসলিমদের এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আজীবন কাজ করেছেন। তেমন ভাবেই কিছু আলেম মুসলিমদের অগ্রগতিতে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবে দুঃখজনক হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলিমরা তাদের জীবদ্দশায় তাদেরকে সঠিকভাবে চিনতে পারেনি।

আমি সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আপনাদের বলি।
যেসব মতবাদ, আলেম আপনাদের গোমরাহ করে, তাদের থেকে আপনাদের সরাতে চাই।
যেসব জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব আপনাদের আলো দেয় তাদের কাছে নিতে চাই।
আমি চাই আপনারা যুগোপোযেগী মুসলিম হবেন। আপনারা ইসলামের আদর্শকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়া শিখবেন। মুসলিমরা কিভাবে সবকিছুতে সেরা হতে পারে সেই দিকে মনোযোগ দেবেন। একদল অশিক্ষিত-গরীব-তীব্র আবেগী ও অন্ধ কউম থেকে, শিক্ষিত-সচ্ছল-বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কউম হবেন।
আপনারা লৌকিকতা থেকে আদর্শের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেবেন।
ধর্মের নামে যেকোনো বিষয় বিশ্বাস করার আগে পূর্ণ খোঁজ খবর ও বিবেচনা করবেন।
আপনারা শুনে নয়, ধর্ম কোরআন পড়ে শিখবেন, যেমনটি মহান আল্লাহর নির্দেশ।
আপনারা দিনের পর দিন যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করবেন, যেটা শেষ পর্যন্ত হয়ত সমবাদে গিয়ে শেষ হবে। কুতর্ক করে আহত হওয়া নয়।
আপনারা মানুষ হিসেবে আলো ছড়াবেন, সুগন্ধ ছড়াবেন। মানুষ আপনাদের ভয়, ভীতি নয়, ব্যক্তিত্বের সুগন্ধে, চরিত্রের আলোতে ইসলামের দিকে ঝুঁকবে।

এজন্য আমি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঘটনা, ইতিহাস, দলিল আপনাদের সামনে তুলে ধরি, যেন আপনাদের অন্ত-চক্ষু আলোকিত হয়।

আমি কাউকে বলিনি আমার কথা বিশ্বাস করেন। বা আমাকে কৃতজ্ঞতা জানান।
আমি বংর বলি আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নাই, সময় নিয়ে দলিল দেখেন।
বরং বলি কারও কথা বিশ্বাস করেন না। সব দলিল দেখেন। মহান আল্লাহর দেয়া সেরা জিনিস “মস্তিষ্ক” ব্যবহার করেন। সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। এরপর সিদ্ধান্ত নেন।
আমি সব জানি না। আমিও সন্ধানে আছি। আমি ভুল জেনে থাকলে আমাকে ধরিয়ে দিন।
আমি এই কাজটি ইসলামিক দায়িত্ব হিসেবে করি।

হ্যাঁ আমি রাজনীতি করি। ধর্ম সেই পথে এসে যায়ই। তবে আমি ইসলামকে কখনো রাজনীতিতে ব্যবহার করি না। রাজনৈতিক স্বার্থে কখনো ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দেই না (কখনো হয়তো কুতর্কের খাতিরে তাদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যার রেফারেন্স দেই। তবে সেটা ভ্রান্ত বলেই দেই, সঠিক বলে না)।

নিশ্চয় আল্লাহ আমার মনে কি আছে সবচেয়ে ভালো জানেন।
আমি যদি প্রতারণা করে থাকি তবে তিনি আমাকে সর্বচ্চ শাস্তি দেবেন।

MyIslam #MySharia

Read Previous

হেফাজতের মুজাহিদদের ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মানবাধিকার ????

Read Next

আমার মওলানা আবুল কালাম আজাদ