Breaking News :

রাগের মৌলিক বিষয় (আরোহ-অবরোহ, বাদী-সমবাদী, চলন, পাকাড়)

এখানে যত শাস্ত্র-তন্ত্র-মন্ত্র কপচাচ্ছি, এই সবকিছুর আউটপুট হচ্ছে – রাগ। রাগই আমাদের হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তি এবং মুল শোভা। রাগ মানে – নির্দিষ্ট কিছু স্বরকে নিয়ে, নির্দিষ্ট নিয়ম কানুনের মধ্যে থেকে, বুননের মাধ্যমে গড়ে তোলা, একটি সুরের ভাণ্ডার। নিয়মকানুন ঠিক রেখে সেটা যত খুশি ইমপ্রোভাইজ করা যায়, মানে আরও মিহি করে বোনানো যায়।

রাগের স্বর এবং নিয়মকানুন নির্দিষ্ট হবার কারণে, ওই রাগ যখনই গাওয়া/বাজানো হয়, তখন এক ধরনের নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং ভাবের সৃষ্টি হয়। এখানেই হিন্দুস্থানি ক্লাসিকাল মিউজিকের জাদু। যদি আপনি মেঘ মালহার রাগ শুনতে অভ্যস্ত হন, যেকোনো ঋতুতে আপনি কোন বদ্ধ যায়গায়, চোখ বন্ধ করে, ১৫/২০ মিনিট সময় গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলে বৃষ্টি অনুভব করবেন। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারলে আপনি বৃষ্টির শব্দ শুনবেন, এমনকি শরীরে অনুভব করবেন।

পণ্ডিত রবি শঙ্কর ব্যাখ্যা করছেন রাগ:

রাগের স্বর নির্দিষ্ট, স্বরগুলোর ব্যাবহারের নিয়মকানুনও নির্দিষ্ট। তাই রাগকে ঠিকমতো বোঝার জন্য, রাগটি গঠনের কারিগরি বিষয়গুলো বোঝা দরকার। আমি শ্রোতা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাগের কারিগরি বিষয়ে একটি প্রাথমিক ধারনা দেবার চেষ্টা করলাম।

এ পর্যায়ে সবার মনেই প্রশ্ন আসতে পারে -স্বরগুলো নির্দিষ্ট হওয়া কেন দরকার? বা স্বরগুলো ব্যাবহারের নিয়মকানুনই বা কেন নির্দিষ্ট হতে হবে?

সপ্তকের ১২ টি স্বরের প্রতিটির কিন্তু নিজস্ব চরিত্র আছে। মানুষের দেহ-মনে প্রতিটি স্বরের স্বতন্ত্র প্রভাব আছে। তাই নির্দিষ্ট কোন ভাব তৈরি করার জন্য, স্বর নির্দিষ্ট হবার দরকার।

নিলাদ্রী কুমার শঙ্কর ব্যাখ্যা করছেন রাগ:

আবার একটি স্বর থেকে অন্য স্বরে গিয়ে দাঁড়ালে, তনুমনে যে ভাব তৈরি হয়, অন্য একটি স্বর থেকে ওই স্বরে এসে দাঁড়ালে প্রভাব ভিন্ন হবে। যেমন – কোমল রিশব ছুঁয়ে গন্ধারের উপর দাঁড়ালে, গান্ধার যে আবেশ তৈরি করবে, শুদ্ধ রিশব ছুঁয়ে গেলে আবেশটা ভিন্ন হবে। একটি স্বরকে ছুঁয়ে গেলে আবেশ হবে এক রকম, উপরে সোজা দাড়িয়ে থাকলে হবে একরম, দাড়িয়ে ঝুলনের মতো ঝুলতে থাকলে রেশ হবে ভিন্ন। এসব কারণেই স্বর ব্যাবহার নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। এবার চলুন দেখি, রাগ কিভাবে তৈরি হয়।

মোটা/ নিচু স্বর থেকে চড়া/চিকন সুরে যাওয়াকে বলে “আরোহ“। চড়া থেকে মোটা স্বরের দিকে আসাকে বলে “অবরোহ“। ১২ টি স্বরে আরোহ-অবরোহ করলে সর্বমোট স্বর হয় ২৪ টি। সব ধরনের সঙ্গীত ওই ২৪ টি স্বরের মধ্যেই রচিত হয়। কিন্তু এই ১২ টি স্বর ধরে পরপর সোজা উঠে গেলে এবং সোজা নেমে আসলে (Chromatic scale) কোন শ্রুতিমধুর সঙ্গীত হবে না। সুমধুর সুরের জন্য কিছু স্বরকে বাদ দিতে হয়।

রাগ বোঝার জন্য একটি টিউটোরিয়াল:

বেছে নেওয়া স্বরগুলোর, কার পরে কার উপর দিয়ে উঠতে-নামতে হবে, সেই ক্রমটি ঠিক করতে হবে (আরোহ-আবরোহ ক্রম)। .এই নির্দিষ্ট ক্রমের আরোহ-আবরোহ রাগের মুল স্ট্রাকচার। একটি রাগ তৈরির জন্য, আরোহ বা অবরোহ তে নুন্যতম ৫ টি করে স্বর লাগবে। বাদ দেয়া স্বরগুলোকে “বর্জিত স্বর” বলে।

কিছু রাগে দেখা যায় – গতানুগতিক সোজা আরোহ-আবরোহ না করে, আরোহণের সময় কয়েকটি স্বর ওঠার পরে, আবার কয়েকটি স্বর নেমে এসে, আবার ওঠা শুরু করে আরোহনক্রম শেষ করে। আবরোহনেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। অসংখ্য রাগে এরকম বিচিত্র আরোহ-আবরোহ ক্রম আছে। বিচিত্র হলেও স্বর এবং তাদের ক্রম নির্দিষ্ট। স্বরগুলোর উপরে চলাফেরা নিয়মকেই বলে রাগের “চলন“। অর্থাৎ কেমন করে রাগ চলে। এই নিয়ম ভাঙলে রাগের বিশুদ্ধতা নষ্ট হবে, বা ওই রাগের মধ্যে অন্য রাগের ছায়া দেখা যাবে।

এরপরে বেছে নেওয়া স্বরগুলোর মধ্যে থেকে একটি স্বরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। সেই স্বরটিকে বলে রাগের “বাদী” স্বর। এই স্বরটি রাগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাগের অবয়ব ফুটিয়ে তোলার জন্য এই স্বরটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োগ করা হয়, বারবার প্রয়োগ করা হয়। এই স্বর থেকে কখনও গাওয়া শুরু হতে পারে। আবার অন্য স্বরগুলোর উপরে দিয়ে এসে, এই স্বরে এসে দাঁড়ানো হতে পারে। আর একটি স্বরকে বাদী’র চেয়ে একটু কম, তবে অন্য স্বরদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। সেটার নাম “সমবাদী” স্বর। সমবাদী বাদীর চেয়ে একটি কম, তবে একই ধরনের প্রয়োগ হয়ে থাকে। সমবাদী স্বরের দূরত্ব, সচরাচর বাদী স্বর থেকে ৪র্থ বা ৫ম স্বর হয়ে থাকে। বাদী-সমবাদী ছাড়া রাগে অনুমোদিত সকল স্বরকে বলে “অনুবাদী” স্বর।

শ্রীমতী সারিতা পাঠক আরোহ-আবরোহ ব্যাখ্যা করছেন রাগ:

এরপরে বেছে নেওয়া স্বরগুলোর মধ্য থেকে বাদী-সমবাদী ছাড়াও, কিছু স্বরের উপরে বিশ্রাম নেয়ার জন্য থাকে। সেগুলোকে “ন্যাসস্বর” বরে। অনুমোদিত স্বর ছাড়া অন্য স্বরে বিশ্রাম নিলে, রাগের অবয়ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিছু স্বর আছে সেগুলো রাগের মধ্যে অনুমোদিত হলেও তার ব্যাবহার খুব দুর্বল, বা খুব সামান্য ব্যাবহার হয়। এগুলোকে বলে “দুর্বল স্বর” । শাস্ত্রমতে বলা হয় “অল্পত্ব”। বলা হয় এই রাগে অমুক স্বরের অল্পত্ব আছে। অল্পত্ব থাকা স্বরগুলো খুব সাবধানে এবং বিশেষ কৌশলে প্রয়োগ করা হয়। এই স্বরের পূর্ণ বিকাশ হলে অন্য রাগের চেহারা দেখা দিতে পারে।

এসব নিয়ম মেনে, বেছে নেয়া স্বরগুলো দিয়ে, বিভিন্ন স্বরের কম্বিনেশনে শ্রুতিমধুর “টুকরা” (Phrase) তৈরি করা হয়। স্বর দিয়ে সুর বোনার কাজটাই সবচেয়ে সৃষ্টিশীল কাজ। ওই টুকরাগুলোর একটির সাথে আরেকটিকে জুড়ে দিয়েই তৈরি হয় রাগের মুল অবয়ব। এই টুকরাগুলোর সমষ্টিই রাগের “চলন“।

সবচেয়ে বিশিষ্ট (Prominent)  চলন/চলনগুলোকে বলে “পাকাড়” বা “পকড়“। পাকাড় ফ্রেইজটি গাইলেই, চটকরে রাগের ছায়া দেখা যায়। রাগ সম্পর্কে একটু জানাশোনা আছে, এরকম সাধারণ শ্রোতাও বুঝতে পারে কোন রাগ গাওয়া হচ্ছে।

সহজ কথায় – রাগের চলনগুলোর সমষ্টিই “রাগ”। .একটি রাগ গাওয়া-বাজানো মানে, সেই রাগের বাদী-সমবাদী এবং চলনের টুকরাগুলো গাওয়া-বাজানো। ওই দুটো স্বর আর বাকি ফ্রেজগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করা।

আরোহ-অবরোহ, বাদী-সমবাদী, চলন, পাকাড় – এগুলোর শুদ্ধ-ভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমেই রাগ পূর্ণতা পায়, একটি থেকে অন্যটি আলাদা হয়।

রাগ কাফিতে আরোহ, আবরোহ, পাকাড়, বান্দিশ ও সারগম:

রাগের স্বতন্ত্রতার জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এগুলো যদিও একটু অগ্রসর শ্রোতাদের জন্য।

তারপরেও প্রাসঙ্গিকতার কারণে, আমার স্বল্প বিদ্যায়, খুব স্বল্প পরিসরে একটু আলোচনার চেষ্টা করবো। এটুকু পড়লে আপনার আগ্রহ চলে যেতে পারে। কিন্তু সত্যি বলছি – আপনার যদি গানবাজনা শোনার অভ্যাস থাকে, তবে আপনার কান এখনই এগুলো বোঝে। মাথাকে বোঝানোর জন্য শ্রোতা হিসেবে, আরও একটু সময় দিতে হবে।

কোন স্বরের উপরে দাঁড়ানোর স্টাইল রাগের চেহারা বদলে দিতে পারে। যেমন আপনি আবরোহক্রমে সোজা/খাড়া কোমল রিশব লাগালে রাগ মারওয়ার ছায়া দেখা যাবে, আবার রিশবের উপরে আন্দোলন করলে (একটু ঢেউ খেলানোর মত) বা রিশবকে ঝোলালে রাগ ভৈরব এর চেহারা দেখা যাবে।

স্বর লাগানোর কৌশলগত ভিন্নতার রাগের চেহারা বদলে দিতে পারে। যেমন কোন বিশেষ স্বরকে একটু বাঁকা করেও লাগানো (পাশের শ্রুতিতে বা মাঝে কোথাও লাগানো)। রাগ মিয়া-মালহার বা দরবারী’র কোমল গান্ধার কিন্তু ঠিক আমাদের হারমোনিয়ামে পাওয়া কোমল গান্ধার নয়। আমাদের হারমোনিয়ামে পাওয়া কোমল গান্ধার কখনও এই রাগের রূপ তৈরি করতে পারবে না। এই গান্ধার লাগাতে হবে হারমোনিয়ামে পাওয়া কোমল গান্ধারেরও পাশে। এমনকি দরবারীর কোমল গান্ধার আরোহ-অবরোহ ক্রমে দু রকম। ওঠার সময়ে রিশবের দিকে ঝোঁকা, নামার টা ঝোঁকা মধ্যমের দিকে।

এরকম অনেক কিছু আছে । যেমন – ভৈরবী রাগে কোমল রিশব আর গান্ধারের উপরে আয়েশ করে সময় নিয়ে ঝোলাঝুলি করলে, বিলাসখানি তোড়ি দেখার সম্ভাবনা থাকবে।

এসব আলোচনার আরও একটু বিস্তার করা হবে প্রতিটি রাগের নোটে

পণ্ডিত ভাতখান্ডের সঙ্গীত শিক্ষা টিউটোরিয়াল (সম্পূর্ণ):

 

সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:

গান খেকো সিরিজ- সূচি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ বা শাস্ত্র সূচি
রাগ শাস্ত্র- সূচি
রাগ চোথা- সূচি
রাগের পরিবার ভিত্তিক বা অঙ্গ ভিত্তিক বিভাগ
ঠাট ভিত্তিক রাগের বিভাগ
সময় ভিত্তিক রাগের বিভাগ
ঋতু ভিত্তিক গান (ঋতুগান) এর সূচি
রস ভিত্তিক রাগের বিভাগ
উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রীতি/ধারা
সঙ্গীতের ঘরানা- সূচি
সুরচিকিৎসা- সূচি
শিল্পী- সূচি
প্রিয় গানের বানী/কালাম/বান্দিশ- সূচি
গানের টুকরো গল্প বিভাগ

Declaimer:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

Read Previous

সপ্তক

Read Next

ঠাট