রমনার রমা দি- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Romnar Roma Di -Sachin Bhowmick

রমনার রমা দি- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Romnar Roma Di -Sachin Bhowmick :

বাড়িটার চেহারা দেখেই আহত হয়েছিলাম। রাস্তার নামটাও এমন কিছু কুলীন নয়, শংকর ভটচাজ লেন। যদিও রাস্তাটা যতটা হরিজন ততটা আমরা আশা করিনি। ভেবেছিলাম, লেন হলেও ব্লাইণ্ড লেন নয় নিশ্চয়ই, ইলেকট্রিক না থাক, গ্যাস-আলোর কাঁচ-গুলো অন্তত অটুট আছে। কিন্তু হতাশ হতে হলো। ভাবতে রীতি-মতো খারাপই লাগল যে এ রকম একটা কানাগলির এমন একটা বোবা রোগা ফ্ল্যাট-বাড়িতেই থাকেন নাম-করা গাইয়ে কনাদ চৌধুরী। নীরদই প্রথম গেটের কাছে নম্বরটা আবিষ্কার করে। কড়া নাড়তেই একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন।

–কাকে চাই?

–কনাদবাবু এ বাড়িতে—

–হ্যাঁ, দোতলায় উঠে যান।– ভদ্রলোক তক্ষুনি অদৃশ্য হলেন।

রমনার রমা দি- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Romnar Roma Di -Sachin Bhowmick
ফর এডাল্টস্ ওনলি – শচিন ভৌমিক | For Adults Only – by Sachin Bhowmik
আমরা তিন বন্ধু একটুক্ষণ ইতস্তত করলাম। সিঁড়িটা দিনের বেলায়ই এত অন্ধকার আর রেলিংটা এমন দুর্বল যে দোতলাটা যেন এ বাড়ির পক্ষে একটা বিদ্রূপ। সিঁড়ির পরিখা পার হয়ে তবে সে উচ্চাবাসে আরোহণ করতে হবে। বৈতরণী পার হওয়ার প্রথম অভিযাত্রী হল সৌরেন। তারপর নীরদ, সবশেষে আমি। পা টিপে টিপে অনুসরণ করি, সতর্ক সন্ত্রস্ততায়। কয়েক ধাপ সবে উঠেছি, চোখটা অন্ধকারকে পরাভূত করে একটু বুঝি শক্তি সঞ্চয়ও করে নিয়েছিল, অমনি পেছনে একটা মেয়েলী গলা বেজে উঠল,–এই সনৎ।

চমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চেনা গলা। পুরনো, কিন্তু ঘষা পয়সার আওয়াজের মতো অচল হয় নি এখানো। বেশ খানিকটা্ উঁচু থেকে শোনা গেল নীরদের হাঁক,–কই সনৎ, উঠেছিল? চলে আয়। ডানদিক বাঁচিয়ে, একটা ভাঙা পেরাম্বুলেটার রয়েছে, হোঁচট খাস নি যেন।

কিন্তু হোঁচট খেলাম। শারীরিক নয়, মানসিক। মুখ ফিরিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি—রমাদি না?

শেষ ধাপের ম্লান আলোকে বিষণ্ণ একটা প্রদীপের মতো রমাদি দাঁড়িয়ে। আলোছায়ায়, শাড়িতে ঘোমটায়, হলুদে সিঁদূরে সলজ্জ সংকোচে আর খুশিতে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো মনে হল রমাদি-কে।
–যাক, চিনতে পেরেছো সনৎ, ভাবলাম—এখানেই টুপ করে জলে ঢিল ফেলে দেওয়ার মতো চুপ করে যায় রমাদি। শুধু ক্রমবিস্তারী জলচক্রের গতিতে পুরনো-দিনের স্মৃতি আমার মনে বিস্তৃততর হয়ে স্পন্দিত হতে থাকে একটু একটু।

–ওপরে,কনাদবাবুর কাছে যাচ্ছো বুঝি? কোন ফাংশান, না—
–ঠিক ধরেছো। কলেজ সোশ্যালে ওঁকে আমরা নেবার জন্যে এসেছি। রি-ইউনিয়ন হচ্ছে কিনা। কিন্তু তুমি, মানে—
–আচ্ছা, ওপর থেকে কাজ সেরে এসো। আমার এখানে চা খেয়ে তবে যাবে, আমি কিন্তু জল চড়াচ্ছি। ওই ঘর আমাদের, ওই দরজা।–ধীর পায়ে চলে গেলেন রমাদি। আমাদের এক-কালের দলনেত্রী, রমনার রমাদি।

অন্যমনস্কতার জন্যে স্বভাবতই হাঁটুতে লাগল। পেরাম্বুলেটারের গেরিলা-আক্রমণ সম্পর্কে তৈরি ছিলাম না। ভাবছিলাম এই রমাদির কথা, আমাদের চিরপরিচিত রমনার রমাদি। উঃ সে- সব কী দিন গেছে আমাদের, সেই বর্ণোজ্জ্বল জ্বালাদিগ্ব কৈশোর।
–তোমার বন্ধুরা কোথায় ? ব’সো ওই মোড়াটা টেনে, রান্নাঘরে এসেই ব’সো তা’হলে—আপ্যায়নে মুখর হন রমাদি।

— ওরা চলে গেল।
–কেন ? কি আশ্চর্য, আমি তিনজনেরই জল চড়িয়েছিলাম যে।– ক্ষুদ্ধকণ্ঠে বলে ওঠেন, রমাদি, যদিও মনে মনে আমার ঐকিক সান্নিধ্যেই খুশি হন বেশি।

–ওদের এক্ষুনি আবার যেতে হবে অন্য জায়গায়, একেবারে সময় নেই। আর, তিন কাপ চায়ের জন্যে ভেবো না, আমি ক্রমান্বয়ে দশ কাপ চাপ খাওয়ার রেকর্ড রেখেছি।– সহজভাবে হাসতে চেষ্টা করি।
–হুঁ, কলকাতায় এসে অনেক গুণ হয়েছে। তা এখন বড় হয়েছো, দশ কাপ চা খাবে, দশ প্যাকেট সিগারেট খাবে, নস্যি নেবে, মদও খাওয়া চলে, তাই না?—শাসনশোভন কপট গাম্ভীর্যের রাংতা জড়ানো রমাদি।

পরমুহূর্তে হেসে শুধোন—তা খবর-টবর কি সব বলো, এতদিন বাদে দেখা, প্রণামটা করতে না হয় ভুলেছো, আজকালকার ছেলে, ও’সব ঝামেলা হয়তো ভালো লাগে না, তা বলে ভালোমন্দ আলাপ করতেও ভুলে গেছো? পুরনো দিনের মতোই মুখর হয়ে ওঠেন রমাদি, কটাক্ষে স্নেহ ছিটিয়ে লঘুকণ্ঠে বলে চলেন,– তুমি যে একজন মস্ত সাহিত্যিক হয়েছো, কবি হয়েছো, ডাক্তারি পড়ছ, এসব খবর আমার জানা আছে। তুমি আমাদের খবর না রাখলে কি হবে, আমি তোমাদের একটু আধটু খবর রাখি, বুঝেচো? তা মাসিমা কেমন আছেন? নন্দার কটি ছেলেমেয়ে হলো? সুজিতের এখন কোন ক্লাস? নাকি, কলেজ? মাসিমার কি এখনো ফিট হয়?
প্রথম কাপ চায়ে আমার নিজের বলার ভাগ ফুরোল।

দ্বিতীয় কাপে জানা গেল রমাদির কাহিনী। বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক। অবিশ্যি স্বামীর সঙ্গে আলাদা বাসা হয়েছে এই বছর খানেক। স্বামী পরিতোষ চট্টোপাধ্যায়, পার্কার কোম্পানীল জুনিয়র ক্লার্ক। সামান্য আয়, তার থেকেও আবার যাদবপুরে দিতে হয়, শাশুড়ী আর দুই ননদ ও এক ঠাকুরপো থাকেন ওখানে, রেফ্যুজী কলোনীতে। টায়ে-টোয়ে চলে। হ্যাঁ, এই একখানাই মাত্র ঘর। আর এইটুকু রান্নাঘর। ভাড়া বত্রিশ টাকা। না, বাথরুমের বড় অসুবিধে, তিন ভাড়াটের ওই একটাই কল-পায়খানা, লাইট সুদ্ধ। বেশি ভাড়া। তা কম ভাড়ায় আর কোথায় পাচ্ছি বলো, এ খুঁজে পেতেই দু’বছর। না, আজকাল থিয়েটার-ফিয়েটার সব ভুলে গেছি। রমনার সে-সব দিন আর নেই ভাই, উনুন ঠেলবো না প্লে করব, বলো?…

তৃতীয় কাপে সলজ্জকণ্ঠে অনুরোধটা জানালেন রমাদি।

কি? না, ছেলেমেয়ে হবে রমাদির। তা বলে কি করতে হবে আমায়? না, নাম ঠিক করে দিতে হবে।

–মামা হতে যাচ্ছো সনৎ ফাঁকি নয়। সাহিত্যিক মামা, ভাগ্নের জন্যে এবারে নাম ঠিক করো। বানিয়ে বানিয়ে তো তোমরা কেমন সুন্দর গল্প কবিতা লেখ, দু’টো সুন্দর নাম ঠিক করে দাও তো, দেখি মামা হওয়ার কতদূর উপযুক্ত তুমি।– লজ্জারক্ত গালে মিটিমিটি হাসির কুচি সারা মুখে ঝিকমিক করে ওঠে রমাদির।

–বেশ তো, কতো নাম চাই বলো না। এক্ষুনি নাম বলে দিচ্ছি আমি। ছেলে হলে নাম রেখো—কৌস্ত্তভ, মেয়ে হলে—কস্ত্তরী। নয়তো, সৌরভ আর সুরভীও রাখতে পারো। যেটা খুশি।

–না না, অত ব্যস্ত হতে হবে না। খুব ভালো করে ভেবে আমাকে জানাবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই তেমন।– কণ্ঠস্বরে বোঝা গেল ভাবী সন্তানের নামকরণে এতটা লঘুত্ব দেওয়ায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন রমাদি। নামকরণের মতো গুরুতর ব্যাপারে কতো প্রস্ত্ততি থাকবে, আয়োজন থাকবে, গভীর দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তাধারা থাকবে, তা না, খট্ করে যেন পোষা কুকুরের নাম রাখার মতো দায়সারা গোছের ব্যাপার। এতে তাঁর ভাবী সন্তানের রীতিমতো অমর্যাদাই করেছি যেন আমি। রমাদির সারা মুখে এমনি একটা আহত লজ্জার রক্তিমা।

সংকুচিত হয়ে বললাম—বেশ। কয়েকদিন বাদে তোমাকে আমি নামের জাহাজ দিয়ে যাবো। দেখবে নামকরণ কাকে বলে।
–না না, বেশি নাম এনো না। বেশি আনলেই গণ্ডগোল। তুমি গুটিকয় নাম ঠিক করবে। তার মধ্যে দু’টি সিলেক্ট করা হবে। বেশী আনলে খালি খুঁতখুঁত করবে মন। কোনটা রাখি কোনটা ফেলি সে এক দুশ্চিন্তার ব্যাপার হবে। তা কবে আসছ বলো?

লুচির প্লেটের পরিত্যক্ত চিনিগুলোর ওপর নকশা কাটতে কাটতে বললাম,– শীগ গিরই। ধরো, রোববার।

হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালো , রোববারই এসো। আজ তো ওঁর সঙ্গে দেখা হল না, সেদিন ছুটির দিন, দু’জনের পরিচয় করিয়ে দেবো। এসো কিন্তু।

কিন্তু তখনো উঠতে পারি নি, আরও প্রায় আধঘন্টা পর উঠতে পারলাম। রমাদির কথা কি ফুরোবার। পুরনো দিনের জমাট কথাগুলো যেন আজকের চকিত-সাক্ষাতের ঝরনামুখে উদ্বেল হয়ে উঠেছে।
গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন রমাদি।

–রোববার সকালেই আসবে, দুপুরে এখানেই খাবে, বিকেলে যাবে, মনে থাকে যেন। এ গলি পার হয়েই যেন রমাদিকে ভুলে যেও না। আর শোন—তোমার লেখা কয়েকটা বই-ও নিয়ে এসো, কেমন?
হেসে বললাম,– আমার বই। কি যে বলো রমাদি, এদিক ওদিক আজেবাজে মাসিক পত্রিকায় গল্প কবিতা লিখেছি দু’চারটে, আমার আবার বই কি।

–বেশ, তবে সে পত্রিকা এনো কয়েকটা।
কথা দিলাম আসব, পত্রিকা আনব, আর ভেবে আসব গুটিকয় সুন্দর নাম।
কিন্তু—না, মঙ্গলবারই চিঠি পেলাম ডিগবয় থেকে। দিদিমার বড় বাড়াবাড়ি অসুখ, মামা লিখেছেন, পত্রপাঠ যেন ছোট মাসিমাকে নিয়ে ডিগবয় রওনা হই।

শুক্রবার কোলকাতা ছাড়লাম। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে দেখা করি নি রমাদির সঙ্গে। শুধু একখানা পোস্টকার্ডে জানালাম—ফিরে এসে দেখা করব আমি। নাম, পত্রিকা, কোনটার কথাই ভুলিনি। নাম যা ভেবে আসব—না, সে আর আগে ফাঁস করছি না। সে নামকরণের জোরেই ছেলে হলে প্রধানমন্ত্রী, আর মেয়ে হলে মাডাম কুরী না হয়!—ইতি।

দিদিমা মারা গেলেন তিন সপ্তাহ বাদে আর আমার ফিরতে লাগল আরও দু’সপ্তাহ। সবদিক গুছিয়ে বসতেই প্রথম মনে পড়ল রমাদির কথা।

পুরনো এক বোঝা আনন্দ বাজারের ‘আনন্দমেলা’র পৃষ্ঠা, যুগান্তরের ‘পাততাড়ি’ আর ‘মৌচাকে’র ধাঁধার উত্তর ঘেঁটে ছ’টি ছ’টি নাম ঠিক করলাম প্রথমেই। একটা কাগজে লিখে নিলাম। ব্রততী, নুপুর, পুরবী, সাহানা, বিশাখা, অদিতি আর সৈকত, সন্দীপ, অর্ণব, সুদীপ্ত, অম্লান, পূজন।

ব্যস, এইবার রমাদিকে আমি খুশী করতে পারবো। নাম পেয়ে উচ্ছ্বসিত না হয়ে পারবেন না রমাদি। সন্ধ্যার ধুপছায়া আলো তখন সবে স্লেট আকাশে মুছে আসছে। নাম-লেখা চিরকুটটা পকেটে পুরে আর খান-দুই কবিতা-ছাপা পত্রিকা নিয়ে আমি রওনা হলাম শংকর ভট্টচার্জের গলির দিকে। কালীঘাটে ঘিঞ্জি বসতির মধ্যে গলিটা খুঁজে পাবো তো!

ঠিক পেয়ে গেলাম। কাঁচভাঙা ক্ষীণায়ু গ্যাসবাতি, খোয়া-ওঠা কঙ্কাল রাস্তা আর বোবা-বিধবা এলোমেলো বাড়ির সারি। দরজা নাড়তে হল না, আধ-ভেজানোই ছিল। ঢুকে স্বল্প ধোঁয়ায় ধূসর করিডরটুকু পার হয়ে রমাদির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ঢুকতে যাবো, পেছনে গলার আওয়াজ হল,–
কে, সনৎ? এসো, রান্নাঘরেই চলো বসবে।

ঘরের ভেতর থেকে গেল একটা পুরুষকণ্ঠে—আলোটা জ্বেলে দিয়ে যাও রমা।
–কে পরিতোষদা বুঝি ? দাঁড়াও আলাপ করে নি।– দরজা দিয়ে ঢুকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বাধা দিলেন রমাদি।
–না, যেও না। তুমি রান্নাঘরে গিয়ে ব’সো, আমি আসছি।

আশ্চর্য তো! সব কিছুই কেমন রহস্যময় মনে হচ্ছে আমার। বিমূঢ়ের মতো ধীর পায়ে রান্নাঘরে এসে ঢুকলাম। একটা পিঁড়ি পেতে নিজেই বসলাম চুপ করে।
খানিক বাদে ঘরে ঢুকলেন রমাদি। ম্লান মুখ, সারা শরীরে করুন ক্লান্তির স্বাক্ষর। বিষাদের ছায়াশরীর বুঝি। ঠোঁটে অনাবশ্যক হাসির কঙ্কাল দুলিয়ে বললেন রমাদি—কি ব্যাপার এতদিন বাদে যে।
–বুড়ি মরল কিনা তাই ফিরতে দেরি হল আমার। — সহজকণ্ঠে হাল্কা হতে চেষ্টা করি।
–ছি ছি,ওকি কথা? ও-ভাবে বুঝি বলতে হয় গুরুজনদের মৃত্যু সংবাদ।– একটুক্ষণ চুপ করে থাকেন রমাদি।

নিস্তব্দতা ভাঙলাম আমিই। এ থমথমে আবহাওয়া অসহ্য নিষ্ঠুর মৌন। বললাম,– আচ্ছা ও ঘরে পরিতোষদা,– ফের বাধা দিলেন রমাদি, হাত বাড়িয়ে পত্রিকা দুটো টেনে নিয়ে বললেন,– যাক, শেষ পর্যন্ত মনে করে এনেছো পত্রিকা। দেখি তোমার লেখা কেমন, কি লিখে অত নাম তোমার। পত্রিকা দুটো্র পাতা উল্টোতে ঝুঁকে পড়ের রমাদি। বুঝলাম, কোথাও কোন কারচুপি আছে, কোন অসঙ্গতি। ইচ্ছে করেই এবার ও-প্রসঙ্গ ছেড়ে দিলাম আমি। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দুষ্টুমি-ভরা গলায় বললাম,– আর যা এনেছি রমাদি, আঃ, একেবারে গুপ্তধনের নকশা। কিন্তু, এক ডজন লুচি আর আধ ডজন-কাপ চা না হলে সে ঐশ্বর্য দেখানো যাবে না।

–কি ভাই?—মুখ তোলেন, রমাদি, বলোই না।
–আশ্চর্য বুঝতে পারছো না ? নামাবলী, বুঝলে নামাবলী! ছ’টি ছ’টি নাম এনেছি। নাম পিছু এক এক কাপ চা হওয়া উচিত, যাক, সেটা না হয় মাপ করে দিলাম। ফিফইট পার্সেন্ট ডিস কাউণ্ট। বসাও চা, নইলে দেখাচ্ছি না কিন্তু।

শুনে মুখটা কেমন পাঁশুটে হয়ে গেল রমাদির। কষ্টের হাসি টেনে বললেন, বেশ বসাচ্ছি চা, দেখি, তোমার নাম দেখি আগে।
যেন কত দামী জিনিস এমনি সযত্নে চিরকুটটা পকেট থেকে বের করে দিলাম।
মাথা নিচু করে নাম ক’টা পড়ে গেলেন রমাদি। আশ্চর্য, পড়তে কত সময় লাগে? মাথাটা যে আর তুলছেন না।
–রমাদি!—ডেকে উঠলাম আমি।

ঝরঝর করে এবার কেঁদে ফেললেন রমাদি। চিরকুটটা ভিজে উঠল সে চোখের জলে। কান্না-বিকৃত কণ্ঠে শুধু একবার বললেন—আমার নামের দরকার নেই সনৎ। তারপরই আঁচল চাপা দিলেন চোখে।
–কি হল,কাঁদছ কেন রমাদি? স্তম্ভিত বিস্ময়ে গলা বুজে আসে আমার।

কিন্তু আঁচল সরিয়ে মুখ তোলেন না রমাদি, কান্নার দমকে শুধু পিঠটা কেঁপে কেঁপে ওঠে।
অনেকক্ষণ বাদে মুখ তুললেন রমাদি। কান্নায় ফুলো ফুলো চোখ তুলে ষড়যন্ত্র-চাপা ফিসফিস অনুনয়ে ভেঙে পড়লেন,– সনৎ, তোমার কাছে কিছু গোপন করব না। তুমি আমার ছোটভাইয়ের কতো, ভাই হয়ে বোনের উপকারটুকু তুমি করবে না? লক্ষ্মী ভাই আমার, তুমি ডাক্তারি পড়ছ, এজন্যে আরো বিশেষ করে বলছি। আমাকে, আমাকে একটা,– গলাটা মরীয়া মাঝির শেষ ভয় কাটানোর মতো কেঁপে উঠল কয়েকবার,– মানে, ঐ ওষুধ। এনে দিতে হবে তোমায়।

ওষুধ! কিসের ওষুধ!—বিস্ফারিত চোখে আমি অনিশ্চয়তার ভেলায় বসে অর্থের ডাঙা খুঁজি।– কি বলছ তুমি রমাদি?
–মানে,–রমাদি দু’বার ঢোক গিললেন,– পেটের বোঝাটা আমি খালাস করে দিতে চাই সনৎ, আমি মুক্তি চাই।–
–রমাদি!—প্রায় আর্তনাদ করে উঠি আমি।– এ তুমি কি বলছ রমাদি।

–ঠিকই বলছি—বরফের উপর দিয়ে ভেসে আসা নিশ্চিন্ত নিষ্ঠুর কণ্ঠস্বর রমাদির,– ভেতরে ভেতরে অনেক আগেই কাজ শুরু করেছিল। নিজে উনি টেরও পেয়েছিলেন, কিন্তু কাউকে জানান নি। না আমাকে, না অফিসে। কিন্তু অফিস ক্রমশ সন্দেহ করতে শুরু করে, ওরাই এক্সরে’র ব্যবস্থা করিয়েছে। টি-বি। তারপরেই ছাঁটাই। এদিকে সংসার অচল হয়ে উঠেছে। উনি একজনই তো শুধু রোজগেরে ছিলেন। আসল খুঁটি ভাঙলে আর তাঁবু টিকবে কি করে বলো। আবার পরশু চিঠি এসেছে ঢাকা থেকে। মা লিখেছেন, পাসপোর্ট হয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানে। তার আগেই ছোট বোনটাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে আসছেন। আমার এখানেই উঠবেন। মেয়ে আর জামাই ছাড়া মা’র যে কেউ নেই। কোনদিকে আমি আর পথ দেখতে পাচ্ছি না ভাই। এ কাজটা তোমাকে—

— না না!—প্রায় চীৎকার করে উঠি আমি, কিন্তু পরিতোষ-দারও কি এই মত?
–উনিই তো প্রথম বলেছেন। এ-রকম দুর্দিনে নিজেদের পেটেই জুটছে না, এমন সময় একটা বাড়তি লোক,–
বসে থাকতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিল। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়ালাম। ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললাম শুধু,– এখন আমি যাই রমাদি।
–চা খেয়ে যাবে না ?

–না।
কিন্তু কাজটা করে দেবে তো ভাই, বেশি দেরি করলে আবার—মাথা নিচু করে থাকি। চোখ তুলে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে আমার। গলাটা যেন কাঠ।

–যদি নিজে না এনে দিতে পারো না দিলে, অন্তত ওষুধের নামটা তুমি লিখে দিয়ে যেও ভাই। আমি কাউকে দিয়ে ঠিক আনিয়ে নিতে পারব। কালই দিয়ে যাও তো ভালো হয়, আসবে কাল? উদ্বিগ্ন উৎকণ্ঠায় অধৈর্য কণ্ঠস্বর রমাদির।

ইচ্চে হচ্ছিল চীৎকার করে বলি,– না না, আমি পারব না, এ অমৃত-সম্ভাবনার ঠোঁটে বিষ তুলে দিতে পারব না আমি, কিছুতেই না।–
কিন্তু না, কিছুই বললাম না। বলতে পারলাম না।
মনে হচ্ছে যেন চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছি আমি। কিন্তু কোথায় পালাবো, এ কানাগলির মুখটা কি আমি খুঁজে পাবো শেষ পর্যন্ত?…

[ রমনার রমা দি- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Romnar Roma Di -Sachin Bhowmick ]

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন