সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই

১২ জুন, ১৯৯৬। এ দিন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটা ছিল ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার নির্বাচন। সে বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়া আমাদের একটা অদ্ভুত নির্বাচন উপহার দিয়েছিলেন। তবে এমন নির্বাচন বিএনপির জন্য নতুন ছিলনা। জন্মলগ্ন থেকে দলটা গণভোট থেকে শুরু করে সংসদ নির্বচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে উপনির্বাচনে তেলেসমাতি দেখিয়ে এসেছে। এই সব নির্বাচনের মধ্যে সব চেয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপি। বিএনপি যে নিরপেক্ষ-সুষ্ঠ নির্বাচন দিতে পারে না, সেটা ছিল সেই সময়ের প্রমাণিত সত্য।
সকল বিরোধীদলের আপত্তির পর ও খালেদা জিয়া ও তার দল এই একক নির্বাচন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন বয়কট করে। বিএনপি নিজর জন্য ২৭৮টি আসন রেখে, ১টা দিয়েছিলো ফ্রিডম পার্টিকে। প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বানায় বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল (অব:) ফারুককে।

জনগণের সমর্থন না থাকলে যা হয়- এই সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১৫ দিন! প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে হয় তাদের। চার মাসের মধ্যে আবার নির্বাচন। এ নির্বাচনটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার লড়াইয়ের নির্বাচন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের লড়াই। টানা ২১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় ভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে প্রপাগন্ডা চলেছে তার জবাব দেওয়া যুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদের জন্য কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না এ নির্বাচন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যেমন কারচুপির মাধ্যমে গণরায়কে বিএনপির বক্সে ভরা হয়েছিল; তেমনই সম্ভাবনা ছিল এই নির্বাচনেও। এ ছাড়া ছিল নতুন ভোটারদের ‘নৌকা’র প্রতি আস্তা নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ। কারণ পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া নতুন ভোটাররা রাষ্ট্রীয় ভাবে দেখা এসেছে, শুনে এসেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচার। মিস্টার এন্ড মিসেস জিয়া এবং তাদের মধ্যবর্তী সময়ের শাসকরা যে ভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে তাতে সেই সময় প্রশাসনে এবং রাজনৈতিক ময়দানে আধিপত্য ছিল একাত্তরে পরাজিতদের।

ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয় হয় এ দেশের আমজনতার। বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া দল, এ দেশের গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় বারের মত স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনে জয় লাভ করে। মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৭ দশমিক চার শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। শুরু হয় স্বাধীনতার চেতনায় স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম।

জননেত্রী শেখ হাসিনা নানা উপদলে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে যেমন ঐক্যবদ্ধ করে সফল গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন। তেমনি কারিশমা দেখান সরকার পরিচালনায়। তাঁর সরকারই এ দেশের প্রথম সরকার, যারা পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল: ১৯৯৬ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করা।

এই সাফল্যগুলোর সাথে সাথে আরো দুইটা বিশাল কাজ করে দেশরত্ম শেখ হাসিনার প্রথম সরকার। আজ যে হাতে হাতে মোবাইল ফোন তা কিন্তু এই সরকারের অবদান। খালেদা জিয়ার আমলে (১৯৯১-১৯৯৬) দেশে প্রথম মোবাইল চালু হলেও; তিনি একটি মাত্র মোবাইল ফোন অপারেটরের লাইসেন্স দিয়েছিলেন তার দলের এক নেতাকে। মনোপলি সেই ব্যবসা ভেঙে দেয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে। তিনটা মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিকে লাইসেন্স দেয়। ফলাফল- পুরো দেশজুড়ে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক কভারেজ; সাধারণ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন।
প্রযুক্তিবান্ধব আওয়ামী লীগের সেই সরকারের দ্বিতীয় সেরা পদক্ষেপ ছিল ইন্টারনেট। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় দুই দুইবার সাবমেরিন কেবল বঙ্গোপসাগর দিয়ে গেলেও ‘তথ্য পাচারের’ খোঁড়া অজুহাতে দিয়ে ফ্রি সাবমেরিন কেবলের অফার ফিরিয়ে দেয়। পরে আওয়ামী লীগ এসে দেশকে সাবমেরিন কেবলের সাথে সংযুক্ত করে। খুলে দেয় তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভবনার দোয়ার।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ না জিতলে কি হত? কি আর হত ভি-স্যাট দিয়ে ইন্টারনেটের লাইন ব্যবহার করতে হত। মাসে মাসে ১/এমবিপিএস-এর লাইনের জন্য আড়াই লক্ষ টাকা দিতে হত। এখন যারা ফ্রিল্যান্সিং করে রেমিটেন্স আনছে তারা বোধহয় জাতির বোঝা হয়ে বেকার বাড়ীতে বসে থাকতো।

আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে দেশকে দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। খুলে দেয়ে সমৃদ্ধির নতুন নতুন দোয়ার। তাই আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে অসাম্প্রদায়িক এই দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে। আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।

Read Previous

আসুন সচেতনতা তৈরি করি পারিবারিক সহিংসতা আইন সম্পর্কে

Read Next

লালন সাঁইজীর সংক্ষিপ্ত জীবনী -সুফি ফারুক