কেন তরুণরা কর্মজীবনের কর্মশালা’য় যোগ দেবেন?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে পেশার ধরন। একদিকে অনেক পুরনো পেশা যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন পেশা। প্রযুক্তিখাতে যেমন অনেক নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি প্রযুক্তির কারণে প্রভাবিত হচ্ছে সব ধরনের পেশা ও কর্মক্ষেত্র। নতুন পেশা সৃষ্টির পাশাপাশি পুরনো পেশাগুলোতেও কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। তাই বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি শিক্ষার শিক্ষাক্রম প্রতি বছর হালনাগাদ না করলে, চার বছরের কোর্স শেষ করতে করতে, শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সর্বশেষ উৎকর্ষ থেকে অন্তত দুই বছর পিছিয়ে পড়ছে। একারণে এখন তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ পেশা নির্বাচনের বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পেশা নির্ধারণের বিষয়টি একদিকে যেমন হতে হবে মূলধারার, অন্যদিকে হতে হবে সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মুখে এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সামাজিক কারণে আমাদের দেশের বেশিরভাগ তরুণ পেশা সম্পর্কে খুবই গতানুগতিক এবং অসম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে বড় হয়। বিষয়টা এমন যে “যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে পড়ে, কিছু একটা চাকরি করলেই হলো”। পেশার অর্থ এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে: যেনতেনভাবে কিছু অর্থ উপার্জন করা। অর্থাৎ সারা জীবনজুড়ে বিস্তৃত “ক্যারিয়ার (Career)” এর সব দিক সম্পর্কে আংশিক বা সামান্যই জানতে পারছে নতুন প্রজন্ম, ক্যারিয়ারের পূর্ণাঙ্গ ধারণা অজানাই থেকে যাচ্ছে তাদের কাছে। ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার সময়টা এবং পারিপার্শ্বিকতা তাদের বর্তমান বা ভবিষ্যতের বিস্তৃত কর্মভূবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছে না। আধুনিক “পেশা” সম্পর্কে ধারণা না থাকায়, সমাজেও এই বিষয়ে কোনো ভাবনা বা আলোচনা হয় না, বিতর্ক হয় না। ফলে আগে থেকে পেশা পরিকল্পনার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না তরুণ প্রজন্ম। ফলে ভবিষ্যতের জন্য নিজের প্রয়োজন, সামর্থ্য, যোগ্যতা, দুর্বলতা, ঝোঁক বা ভালোলাগার বিষয়ে কোনো বিচার বিবেচনার প্রয়োজন বোধ করে না তারা। কোনো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে যেকোনো বিষয়ে লেখাপড়ায় ঢুকে পড়ে তরুণরা। এরপর অনিশ্চয়তা আর অসন্তুষ্টির মধ্য দিয়ে কোনোভাবে শেষ করে গোলেমেলে শিক্ষা-জীবন। অতঃপর সার্টিফিকেটধারী বেকারের তালিকায় আরও একটি সংখ্যা হিসেবে যোগ হয় তাদের নাম। শুরু হয় যেকোনো উপায়ে বেঁচে থাকার জন্য, যেকোনো ধরনের একটা চাকরি জোটানোর স্ট্রাগল। এভাবেই বিনষ্ট হয়ে যায় অনেক অমিত সম্ভাবনা।

বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রচুর ভবিষ্যতমুখী অবকাঠামো এবং পরিকাঠামো নির্মাণ করছেন। তিনি চান, দেশের প্রত্যেক তরুণ এসব সুবিধা ব্যবহার করে তার সম্ভাবনার সর্বোচ্চ বিকশিত করুক। তবে সেটি তখনই সম্ভব হবে, যখন একজন তরুণের সামনে তার উপযুক্ত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে এবং সেই অনুযায়ী সে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এ ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা আছে। তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে, স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গঠনে ২০২১ সালের মধ্যে ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’, একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরিতে ২০২৩ সালের মধ্যে ‘কর্মঠ প্রকল্প’ এবং প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে।

এসব বিবেচনায় নিয়ে ‘ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং’ কার্যক্রম ‘কর্মজীবনের কর্মশালা’ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। এটি মূলত তরুণদের পেশাদার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং তাদের পেশা-পরিকল্পনার জন্য সহায়তা কার্যক্রম। এর আয়োজন করেছে আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটি। সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। ৩০ জানুয়ারি (২০২১) পর্যন্ত যারা রেজিস্ট্রেশন করবে; তাদের প্রদান করা তথ্য বিশ্লেষণ করে, বিভিন্ন ব্যাচে ভাগ করে ক্রমান্বয়ে প্রশিক্ষণ দেবে আওয়ামী লীগ। তবে এরপরও রেজিস্ট্রেশন চলবে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক গাইডলাইন দেওয়ার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি পরিবারের পাশে থাকার এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এই কর্মসূচিটির লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণকারী তরুণদের ক্যারিয়ার-প্ল্যান করে দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগ চায়: সময়মতো বা আগে থেকে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা (Eearly Career Planning) বিষয়টিকে একটি প্রচলিত প্রবণতা (Trend) হিসেবে তৈরি করতে, যা একসময় সংস্কৃতি বা আচার হয়ে যাবে। তাহলে ভবিষ্যৎ তারুণ্য নিজে থেকেই সময়মতো নিজেদের ক্যারিয়ারের বিষয়ে সচেষ্ট হবে। এমনকি অভিভাবক, শিক্ষক, শুভাকাঙ্খীরা তথা পারিপার্শ্বিকতার প্রত্যেক ব্যক্তি এই বিষয়ের গুরুত্ব বুঝবেন, ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন এবং তরুণদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও করবেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এই কাজটি শুরু করেছে, প্রত্যাশা রয়েছে জনগণ এর সুফল বোঝার পর নিজেই নিজেদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন।

প্রাথমিকভাবে প্রতিটি ব্যাচকে তিন দিনের কর্মশালা করানো হবে। তিন দিনের এই কর্মশালায় রয়েছে নানা ধরনের আয়োজন। প্রথমে তরুণরা তাদের সারা জীবনজুড়ে বিস্তৃত ক্যারিয়ারের সম্পর্কে ধারণা পাবে। জানতে পারবে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবসা সম্পর্কে। বুঝতে পারবে ভবিষ্যতে পেশা ও কারবারের ধরন সম্পর্কে। শিখতে পারবে প্রত্যক মানুষের প্রয়োজন, সামর্থ্য, যোগ্যতা, দুর্বলতা, ঝোঁক বা ভালোলাগার মতো বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ; ক্যারিয়ারের ওপরে যেগুলোর সরাসরি প্রভাব থাকে। সেই প্রভাবকগুলো কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হয় এবং কীভাবে তার আলোকে নিজের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পেশা বেছে নিতে হয় তরুণরা তা শিখতে পারবে। পেশা বেছে নেওয়ার পরে পেশার জন্য পরিকল্পনা বা ক্যারিয়ার প্ল্যান কীভাবে তৈরি করতে হয় সেটাও তারা শিখতে পারবে। অর্থাৎ সব জেনে বুঝে, এই কর্মশালাটির মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের জন্য একটি ভবিষ্যৎ পেশা-পরিকল্পনা তৈরি করে নেবে। যেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা নিজেদের প্রস্তুত করবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের জীবনের যাত্রাপথে বিভিন্নভাবে উৎসাহ উদ্দীপনা ও পরামর্শ দেবে।

প্রশিক্ষণ ছাড়াও তরুণদের বিভিন্ন ধরনের পেশার সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য একটি “ক্যারিয়ার ক্যাটালগ” তৈরি করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ইউটিউবে সংরক্ষিত থাকবে। ক্যারিয়ার ক্যাটালগে বিভিন্ন ধরনের পেশার পরিচয়, সম্ভাবনা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা এবং কীভাবে সেই পেশায় সফল হওয়া যায়; তা নিয়ে আলাদা আলাদা গাইডলাইনের ভিডিও থাকবে। এই ক্যাটাগরিতে নিয়মিত পেশা ও সংশ্লিষ্ট দক্ষতা অর্জনের আইডিয়া প্রকাশিত হতে থাকবে। তরুণ ও তাদের অভিভাবকরা এই ক্যাটাগরি ব্রাউজ করে বিভিন্ন ধরনের ক্যারিয়ারের ধারণা, সুবিধা বা সীমাবদ্ধতা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন, যা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

এই প্রশিক্ষণদানে দেশ-বিদেশ থেকে যুক্ত হবেন বিভিন্ন পেশায় সফল পেশাজীবী, উদ্যোক্তা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক ও প্রশিক্ষকরা। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের প্রশিক্ষণের কিছু ভিডিও নিয়মিত প্রকাশিত হবে। পুরো কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা হবে “career.albd.org” ওয়েবসাইট থেকে। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে, বিভিন্ন নোটিশ দেখতে পারবে, কমন প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবে। মোটকথা, আশা রাখি এই প্রশিক্ষণ একজন অংশগ্রহণকারীর জীবনে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। তাই আর দেরি কেন? তরুণদের আহবান করছি: সবাই রেজিস্ট্রেশন করো, বন্ধুকে রেজিস্ট্রেশন করতে করতে অনুপ্রাণিত করো। নিজের সুন্দর একটি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা তৈরি করো, সেই অনুযায়ী গড়ে তোলো নিজেকে। তৈরি হও, জয় করো। মনে রেখ: পরিকল্পনা থাকলে বিফল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, কিন্তু পরিকল্পনাহীন যাত্রায় বিফলতা নিশ্চিত।