উর্দু শায়েরির আধুনিক যুগে—বিশেষ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে—প্রেম, বিরহ এবং প্রতিবাদের এক অনন্য সিংহাসন তৈরি করেছিলেন আহমদ ফারাজ। আসল নাম সৈয়দ আহমেদ শাহ হলেও দুনিয়া তাঁকে চেনে তাঁর ছদ্মনাম ‘ফারাজ’ দিয়ে। তাঁর শায়েরি একপাশে ছিল মাখনের মতো নরম, নিখাদ প্রেম ও বিরহের গল্প; আর অন্যপাশে ছিল রাষ্ট্র ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক দৃঢ়, আপসহীন ও উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ। আহমদ ফারাজের কবিতা যেন একই সাথে প্রেমিকার চোখের পানি এবং শোষকের বুকে বিঁধে যাওয়া ধারালো তির।
আজ ১৪ জানুয়ারি, এই ক্ষণজন্মা শব্দের জাদুকরের জন্মদিন। ১৯৩১ সালের আজকের এই দিনে পাকিস্তানের কোহাটে এক সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ফারাজের সৃষ্টির সঙ্গে উপমহাদেশের বহু মানুষের মতো আমারও প্রথম পরিচয় ঘটেছিল শাহেনশাহ-এ-গজল মেহেদি হাসানের গাওয়া কালজয়ী সুরের হাত ধরে। গজল সম্রাট যখন তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে গেয়ে উঠতেন ফারাজের লাইনগুলো, তখন মনে হতো এই বেদনা যেন কোনো নির্দিষ্ট মানুষের নয়, এ যেন পুরো মানবজাতির চিরন্তন হাহাকার। তারপর ধীরে ধীরে মেহেদি হাসানের সুরের মায়া পেরিয়ে সরাসরি ফারাজের দীউয়ানে প্রবেশের সুযোগ হয়েছিল। আজ তাঁর জন্মদিনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁকে এবং তাঁর অনন্য সৃষ্টিকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

আহমাদ ফারাজ কেবল কাগজের পাতায় সুন্দর সুন্দর রোমান্টিক কথা লিখতেন না—তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা নিজের জীবনে অক্ষরে অক্ষরে ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি রাজদরবারের লোভনীয় হাতছানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বারবার কারাবরণ বেছে নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনামল যখন এক অন্ধকার অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল, যখন গণমাধ্যমের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল, ঠিক তখন এক বিশাল ‘মুশায়রা’ বা কবি সম্মেলনে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফারাজ মঞ্চে দাঁড়ান। জলদগম্ভীর কণ্ঠে তিনি সামরিক জান্তার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজের বিপ্লবী কবিতা পাঠ করেন।
এর ফল যা হওয়ার ছিল, তাই হলো। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সামরিক সরকার তাঁকে সাথে সাথে গ্রেপ্তার করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে। কিন্তু ফারাজ ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া, লোহার শিকল দিয়ে তাঁর কলমকে স্তব্ধ করা যায়নি। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তিনি স্বৈরশাসকের সামনে মাথা নোয়াননি। নিজের আত্মসম্মান আর বাকস্বাধীনতার তাগিদে তিনি স্বেচ্ছায় জন্মভূমি ছেড়ে নির্বাসনে চলে যান। জীবনের দীর্ঘ ছয়টি বছর তিনি কাটান কানাডা, ইউরোপ ও লন্ডনের অচেনা পরিমণ্ডলে। কিন্তু এই নির্বাসন তাঁর ভেতরের কবিকে আরও ধারালো করে তুলেছিল।

আহমাদ ফারাজের এই আপসহীন লড়াকু জীবন এবং তাঁর জাদুকরী শায়েরি তাঁকে মানুষের কাছে এতটাই জনপ্রিয় করে তুলেছিল যে, তাঁর ভক্তদের তালিকায় সমাজের অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অপরাধ জগতের মানুষও শামিল ছিল। এর এক অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য প্রমাণ মেলে করাচিতে তাঁর নিজের জীবনেরই একটি সত্য ঘটনার মধ্য দিয়ে।
তখন তিনি করাচিতে নিজের বাড়িতে থাকতেন। এক রাতে এক চোর তাঁর বাড়িতে হানা দেয়। চোরটি ঘর থেকে বেশ কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র, গয়না ও টাকা-পয়সা গুছিয়ে নেয়। এসবের মধ্যে ফারাজের ব্যক্তিগত কবিতার খাতা এবং ডায়েরিগুলোও ছিল। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফারাজ যখন চুরির কথা জানতে পারেন, তখন দামি জিনিসপত্র হারানোর চেয়ে নিজের কবিতার খাতাগুলোর দুশ্চিস্তায় তিনি পেরেশান হলেন।

কিন্তু তারপরে এক মজার ঘটনা ঘটলো। দুপুরের দিকে ফারাজ তাঁর বাগানের ঘাসের ওপর একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন। কৌতূহল নিয়ে ব্যাগটি খুলতেই তাঁর চোখ আনন্দে চকচক করে ওঠে। ব্যাগে কোনো দামি জিনিস বা টাকা ছিল না, কিন্তু ফারাজের সেই অমূল্য কবিতার খাতা ও ডায়েরিগুলো একেবারে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেওয়া হয়েছিল। খাতাগুলোর সাথে ভাঁজ করা একটি চিরকুট ছিল, যেখানে ভাঙা ভাঙা অক্ষরে লেখা ছিল:
“ফারাজ সাহেব, আপনার শায়েরি আমি খুব পছন্দ করি। ভুল করে আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনার কবিতার খাতা নিজের কাছে রেখে আমি পাপের ভাগী হতে চাইনি। আপনার কলম সচল থাকুক। পারলে আমায় মাফ করবেন!”
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, ফারাজের কবিতা শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি ছিল না, তা চোর-ডাকাতদের বুকেও এক চিলতে মানবিকতার আলো জ্বালতে পারত।
পাকিস্তানের পাশাপাশি আহমদ ফারাজ ভারতেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশের বৈরিতা ভুলে মানুষ তাঁর গজলের প্রেমে মগ্ন হতো। একবার ভারতের মাটিতে এক জমকালো লাইভ অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি গায়ক মেহেদি হাসান ফারাজের লেখা সেই অমর গজল “রঞ্জিশ হি সহি, দিল হি দুখানে কে লিয়ে আ (কষ্ট দিতে হলেও এসো, কেবল মনটা ভাঙার জন্যই না হয় এসো)” পরিবেশন করছিলেন। হলভর্তি দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। গাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ এক অদ্ভুত রসবোধ থেকে মেহেদি হাসান দর্শকদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন:
“এই গজলটি সুর করে গাওয়ার পর মানুষ আসল কবিকে প্রায় ভুলেই গেছে! এখন সবাই আমাকেই এর মালিক বানিয়ে দিয়েছে!”
দর্শকদের সারির একেবারে সামনেই বসেছিলেন আহমদ ফারাজ। বন্ধু মেহেদি হাসানের এই রসিকতা শুনে তিনি সাথে সাথে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং লাজুক হেসে এক যুগান্তকারী উত্তর দিলেন:
“খাঁটি সোনা যখন কোনো দক্ষ কারিগরের হাতে পড়ে, তখন মানুষ কারিগরেরই কাজ আর প্রশংসায় মেতে ওঠে, সোনার খনির কথা কজনই বা মনে রাখে!”
এই একটিমাত্র সংলাপের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল দুই মহারথীর পারস্পরিক অসীম সম্মান, রসিকতা এবং শিল্পের প্রতি এক চরম আত্মনিবেদন। একজন কবি ও একজন গায়কের মধ্যকার এমন অহংকারহীন রসায়ন আজ ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়। ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট তিনি এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে সুরলোকে যাত্রা করেন।

চলুন তার কিছু সৃষ্টি দেখি:
১.
اردو: رنجش ہی سہی دل ہی دکھانے کے لیے آ آ پھر سے مجھے چھوڑ کے جانے کے لیے آ
Roman: Ranjish hi sahi dil hi dukhaane ke liye aa / Aa phir se mujhe chhod ke jaane ke liye aa
বাংলা অর্থ: যদি মনের ভেতর ক্ষোভ বা অভিমানও থাকে, তবে কেবল আমার মন ভাঙতেই অন্তত এসো! / এসো, এসে আরও একবার আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার বাহানা করতেই না হয় এসো! (মেহেদি হাসানের কণ্ঠে অমর হওয়া ফারাজের সবচেয়ে বিখ্যাত গজল)
২.
اردو: تم تکلف کو بھی اخلاص سمجھتے ہو فرازؔ دوست ہوتا نہیں ہر ہاتھ ملانے والا
Roman: Tum takalluf ko bhi ikhlaas samajhte ho Faraz / Dost hota nahin har haath milaane waala
বাংলা অর্থ: তুমি লোকদেখানো আনুষ্ঠানিক ভদ্রতাকেও খাঁটি আন্তরিকতা মনে করো হে ফারাজ! / সামনে এসে হাত মেলালেই তো আর দুনিয়ার সবাই সত্যিকারের বন্ধু হয়ে যায় না।
৩.
اردو: اب کے ہم بچھڑے تو شاید کبھی خوابوں میں ملیں جس طرح سوکھے ہوئے پھول کتابوں میں ملیں
Roman: Ab ke hum bichhde to shaayad kabhi khwaabon mein milein / Jis tarah sookhe hue phool kitaabon mein milein
বাংলা অর্থ: এবার যদি আমরা আলাদা হয়ে যাই, তবে হয়তো কোনোদিন কেবল স্বপ্নেই দেখা হবে! / ঠিক যেভাবে বহু বছর পর পুরোনো বইয়ের পাতায় শুকনো ফুল খুঁজে পাওয়া যায়।
৪.
اردو: دل کو تیری ہی تمنا ہے فرازؔ ورنہ ایسے ملنے کو تو ملتے ہیں ہزاروں تجھ سے
Roman: Dil کو تیری ہی تمنا ہے فرازؔ ورنہ / ایسے ملنے کو تو ملتے ہیں ہزاروں تجھ سے
বাংলা অর্থ: এই অবুঝ হৃদয়ের তো কেবল তোমারই পরম চাওয়া হে ফারাজ! নয়তো / স্রেফ দেখা করার জন্য তো হাজার হাজার মানুষই প্রতিদিন তোমার পথে এসে দাঁড়ায়।
৫.
اردو: کس کس کو بتائیں گے جدائی کا سبب ہم تو مجھ سے خفا ہے تو زمانے کے لیے آ
Roman: Kis kis ko bataayenge judaai ka sabab hum / Tu mujh se khafa hai to zamaane ke liye aa
বাংলা অর্থ: আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার বেদনাদায়ক কারণ আমি দুনিয়ার আর কাকে কাকে বোঝাব! / তুমি যদি আমার ওপর মনে মনে রেগেই থাকো, তবুও অন্তত বাইরের মানুষের মুখ বন্ধ করতে লোকদেখানো হলেও এসো! (১ নম্বর গজলেরই অংশ)
৬.
اردو: چلو کہ اب ہوش میں آئیں فرازؔ ہم دونوں کہ خواب دیکھنے والے تو ڈوب جاتے ہیں
Roman: Chalo ke ab hosh mein aaein Faraz hum donon / Ke khwaab dekhne waale to doob jaate hain
বাংলা অর্থ: চলো ফারাজ! এবার অন্তত আমরা দুজনেই একটু কঠিন বাস্তবে ফিরি, হুঁশ কাটাই / কারণ যারা চোখ বুজে কেবল অলীক স্বপ্নই দেখে চলে, তারা তো একদিন অতল গভীরে তলিয়ে যায়!
৭.
اردو: سنتے ہیں کہ بولے تو باتوں سے پھول جھڑتے ہیں اگر یہ بات ہے تو چلو بات کر کے دیکھتے ہیں
Roman: Sunte hain ke bole to baaton se phool jhadte hain / Agar yeh baat hai to chalo baat کر کے دیکھتے ہیں
বাংলা অর্থ: মানুষের মুখে শুনি, তিনি নাকি কথা বললে তাঁর কথার ছলে মুখ থেকে ফুল ঝরে! / যদি সত্যিই তাই হয়, তবে চলো না কোনো বাহানায় তাঁর সাথে একটু কথা বলেই দেখি! (ফারাজের রোমান্টিক গজলের এক অনন্য শাহকার)
৮.
اردو: اب کیا شکوہ کریں اپنی قسمت کا فرازؔ جب وہ ہی نہیں رہے جو زندگی ہوا کرتے تھے
Roman: Ab kya shikwa karein apni qismat ka Faraz / Jab woh hi nahin rahe jo zindagi ہوا کرتے تھے
বাংলা অর্থ: নিজের ভাঙা ভাগ্যের বিরুদ্ধে আর কী অভিযোগ করব হে ফারাজ! / যখন তিনিই আর পাশে রইলেন না, যিনি একসময় আমার আস্ত জীবনটা জুড়ে বেঁচে ছিলেন।
৯.
اردو: دوست بن کر بھی نہیں ساتھ نبھانے والا وہ ہی درپے ہے اب مٹانے والا
Roman: Dost ban kar bhi nahin saath nibhaane waala /固定 Woh hi dar-pai hai ab mitaane waala
বাংলা অর্থ: বন্ধু সেজেও যে কখনো বিপদে পাশে থাকার মানুষ ছিল না / আজ আফসোস, সেই মানুষটিই আমার অস্তিত্ব পুরোপুরি মিটিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে!
১০.
اردو: زندگی سے یہی گلہ ہے مجھے تو بہت دیر سے ملا ہے مجھے
Roman: Zindagi se yehi gila hai mujhe / Tu bahut der se mila hai mujhe
বাংলা অর্থ: এই যান্ত্রিক জীবনের কাছে আমার একটাই শুধু চিরন্তন ক্ষোভ / তুমি বড্ড দেরিতে, জীবনের শেষবেলায় এসে আমার সাথে দেখা করলে!
১১.
اردو: ستم تو یہ ہے کہ وہ بھی نہ ہو سکے اپنے رہے نہ ہم بھی جو اپنے، رہے تو کیا غم ہے
Roman: Sitam to yeh ہے کہ وہ بھی نہ ہو سکے اپنے / رہے نہ ہم भी جو اپنے، رہے تو کیا غم ہے
বাংলা অর্থ: নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডি তো এটাই যে তিনিও শেষ পর্যন্ত আমার হতে পারলেন না! / আর তাঁর বিরহে আমি নিজেও যদি নিজের না রইলাম, তবে নতুন করে আর হারিয়ে ফেলার দুঃখ কিসের!
১২.
اردو: زباں پہ لاؤں تو احوالِ دل بیاں نہ بنے چھپاؤں درد تو چہرے سے داستاں نہ بنے
Roman: Zabaan pe laaoon to ahwaal-e-dil bayaan na bane / Chhupaoon dard تو چہرے سے داستاں نہ بنے
বাংলা অর্থ: যদি মুখে আনি, তবে হৃদয়ের এই জটিল অবস্থা ঠিকঠাক বোঝানো যায় না / আবার যদি লোকলজ্জায় এই তীব্র ব্যথা লুকিয়ে রাখি, তবে আমার বিবর্ণ মুখ দেখেই তো মানুষ পুরো গল্পটা বুঝে ফেলে!
প্রিয় গজল:
- আব কে হাম বিছড়ে
- রন্জিস হি সাহি
- শোলা থা জ্বাল বুঝা …
আরও দেখুন:
