ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববাসীকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত তথ্য জানাতে বিশ্ব সফর করেন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭১ সালের সংঘটিত গণহত্যা ও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল পূর্ব পাকিস্তানের সীমানায় সীমাবদ্ধ কোনো আঞ্চলিক সংঘাত ছিল না; এটি পরিণত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে। তৎকালীন সময়ে আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্যাটেলাইট টেলিভিশন কিংবা তাৎক্ষণিক ডিজিটাল সংবাদ সম্প্রচারের সুবিধা ছিল না। এই তথ্যগত সীমাবদ্ধতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের আন্তর্জাতিক মিত্ররা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক অপপ্রচার চালায়।

তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে ভারতের উস্কানিতে সৃষ্ট “পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষোদগার” বা “গৃহযুদ্ধ” হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে। এই বৈশ্বিক অপপ্রচারের জাল ছিন্ন করতে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক বিশ্ব সফর ছিল মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণী এক মাস্টারস্ট্রোক।

ইন্দিরা গান্ধি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ
ইন্দিরা গান্ধি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ

১. বিশ্ব সফরের প্রেক্ষাপট ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি

১৯৭১ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বাংলাদেশের রণাঙ্গনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করে। ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যার মুখে লাখ লাখ শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

  • শরণার্থী সংকটের ভয়াবহতা: ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ ভারতজুড়ে আশ্রয় নেওয়া বাঙালি শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটিতে (১০ মিলিয়ন) পৌঁছায়। তাদের প্রতিদিনের অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার সংস্থান করতে গিয়ে ভারতের অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়ে। তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, শরণার্থীদের পেছনে প্রতিদিন ভারতের আনুমানিক ২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছিল।
  • মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষ: ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ইসলামাবাদ হয়ে গোপনে বেইজিং সফর করেন। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ-বেইজিং এক ত্রিমুখী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
  • ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (৯ আগস্ট ১৯৭১): এই প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরণ সিং ও সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো দিল্লিতে ২৪ বছর মেয়াদী ‘ভারত-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি নিশ্চিত করে যে, যুদ্ধে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তা প্রতিরোধ করবে।

সামরিক ও কূটনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পর, বিশ্বজনমত গঠনে ইন্দিরা গান্ধী সরাসরি পশ্চিমাদের দ্বারে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন।

 

১৯৭১ সালে ভারতজুড়ে তাঁর জাতীয় সফরের শুরুতে কাশ্মীরে পৌঁছান ইন্দিরা গান্ধি
১৯৭১ সালে ভারতজুড়ে তাঁর জাতীয় সফরের শুরুতে কাশ্মীরে পৌঁছান ইন্দিরা গান্ধি

 

২. সফরসূচি ও প্রধান কূটনৈতিক মিশন

১৯৭১ সালের ২৪ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী ১৯ দিনব্যাপী এই দীর্ঘ সফর শুরু করেন। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল—পশ্চিমের সরকার ও জনগণের কাছে বাংলাদেশের গণহত্যার তথ্য তুলে ধরা, শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনরক্ষা ও নি শর্ত মুক্তির দাবি তোলা এবং ১ কোটি শরণার্থীর সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে চাপ সৃষ্টি করা।

সফরের তারিখদেশতৎকালীন রাষ্ট্র/সরকারপ্রধানকৌশলগত অর্জন
২৪–২৫ অক্টোবরবেলজিয়াম (ব্রাসেলস)প্রধানমন্ত্রী গাসপার ইয়েসকেন্সইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে মানবিক সহায়তার আবেদন।
২৬–২৮ অক্টোবরঅস্ট্রিয়া (ভিয়েনা)চ্যান্সেলর ব্রুনো ক্রাইস্কিনিরপেক্ষ ইউরোপীয় দেশে পাকিস্তানি নৃশংসতার দলিল উপস্থাপন।
২৯–৩১ অক্টোবরযুক্তরাজ্য (লন্ডন)প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথবিবিসি ও ব্রিটিশ গণমাধ্যমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত জাগ্রত করা।
১–৩ নভেম্বরযুক্তরাষ্ট্র (ওয়াশিংটন)প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সননিক্সন-কিসিঞ্জার অক্ষের প্রবল বিরোধিতার মুখে দৃঢ় অবস্থান।
৪–৬ নভেম্বরযুক্তরাষ্ট্র (নিউ ইয়র্ক)আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেস ক্লাবে ঐতিহাসিক ভাষণ।
৭–৮ নভেম্বরফ্রান্স (প্যারিস)প্রেসিডেন্ট জর্জেস পম্পিদুসাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের সমর্থন আদায়।
৯–১১ নভেম্বরপশ্চিম জার্মানি (বন)চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডটশান্তিতে নোবেলজয়ী নেতার কাছ থেকে নৈতিক সমর্থন অর্জন।
ইন্দিরা গান্ধি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ১৯৭১ (1)
ইন্দিরা গান্ধি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ১৯৭১

৩. যুক্তরাষ্ট্র সফর: নিক্সনের সঙ্গে ঐতিহাসিক দ্বৈরথ

ইন্দিরা গান্ধীর এই সফরের সবচেয়ে কঠিন ও সংবেদনশীল অংশ ছিল ৪ ও ৫ নভেম্বর হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক।

ওভাল অফিসের স্নায়ুযুদ্ধ

তৎকালীন হোয়াইট হাউসের টেপ রেকর্ড এবং উন্মুক্ত হওয়া ডি-ক্লাসিফাইড নথি থেকে জানা যায়, নিক্সন ও কিসিঞ্জার ইন্দিরা গান্ধীকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যাতে ভারত সামরিক প্রস্তুতি বন্ধ করে এবং ইয়াহিয়া খানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে আপস করে।

নিক্সন এই সংকটকে ভারতের তৈরি “আঞ্চলিক অস্থিরতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি না দিলে এবং সামরিক বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ না হলে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়া অসম্ভব। আলোচনার এক পর্যায়ে কোনো চুক্তি ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। পরবর্তীতে প্রকাশ হওয়া হোয়াইট হাউস টেপে দেখা যায়, ইন্দিরা গান্ধীর এমন অটল ও অনমনীয় নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে নিক্সন ও কিসিঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন, যা ইন্দিরা গান্ধীর আপসহীন কূটনৈতিক বিজয়েরই প্রমাণ দেয়।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের ভাষণ

৬ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জনাকীর্ণ সভায় ভাষণ দেন ইন্দিরা গান্ধী। বিশ্ববাসীর বিবেক নাড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন:

“২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া গণহত্যা কোনো গৃহযুদ্ধ নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক রায়কে বুলেটের মুখে স্তব্ধ করে দেওয়ার চরম বর্বরতাপূর্ণ চেষ্টা। লক্ষ লক্ষ নিরন্ন মানুষ সীমানা পেরিয়ে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।”

 

ইন্দিরা গান্ধি, কাশ্মীরের শ্রীনগরে জনসমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন, ১৯৭১
ইন্দিরা গান্ধি, কাশ্মীরের শ্রীনগরে জনসমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন, ১৯৭১

 

৪. ইউরোপীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও বুদ্ধিজীবীদের সাড়া

ইউরোপ সফরে ইন্দিরা গান্ধী রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সেখানকার সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করেন।

  • যুক্তরাজ্য (লন্ডন): প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে কিছুটা সতর্ক থাকলেও, ইন্দিরা গান্ধীর বিবিসি সাক্ষাৎকার এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আলোচনার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো জনমত তৈরি হয়।
  • ফ্রান্স (প্যারিস): ৭ নভেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জেস পম্পিদুর সাথে বৈঠকে তিনি ফরাসি সরকারকে পাকিস্তানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করতে রাজি করান। এই সফরের আবহেই বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আন্দ্রে মালরো ঘোষণা দেন যে, প্রয়োজন হলে তিনি নিজেও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামবেন।
  • পশ্চিম জার্মানি (বন): চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডটের সাথে বৈঠকে জার্মানি তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের শরণার্থী শিবিরে বড় ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে সম্মত হয় এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পাকিস্তানের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেয়।

 

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ - ছবি সৌজন্যে রশীদ তালুকদার
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ – ছবি সৌজন্যে রশীদ তালুকদার

 

৫. ইয়াহিয়ার ফাঁদ প্রত্যাখ্যান ও পাকিস্তান সামরিক জান্তার পতন

৭ নভেম্বর সফর চলাকালেই কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পরা পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বা সরাসরি ভারতের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব পাঠান। ইয়াহিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখানো যে এটি ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যা নয়।

ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এই চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন। তিনি স্পষ্ট জানান:

১. এই সংকট ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়; এটি পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতৃত্ব এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মধ্যকার লড়াই।

২. সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা।

 

আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ
আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ

 

৬. বিশ্ব সফরের কৌশলগত প্রভাব ও ফলাফল

১২ নভেম্বর ভারতে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর ১৯ দিনের মিশন শেষ হয়। এই একটি সফর যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে:

[ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্ব সফর (২৪ অক্টোবর - ১২ নভেম্বর)]
                       │
       ┌───────────────┴───────────────┐
       ▼                               ▼
[আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও জনমত পরিবর্তন]  [পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা]
       │                               │
       └───────────────┬───────────────┘
                       ▼
[সোভিয়েত ভেটো শক্তি নিশ্চিত ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের পরাজয় (ডিসেম্বর ১৯৭১)]
                       ▼
    [১৬ ডিসেম্বর: চূড়ান্ত বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ]

১. গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, ল্য মঁদ (Le Monde)-এর মতো বিশ্বখ্যাত পত্রিকাগুলোতে পাকিস্তানের গণহত্যার খবর এবং ১ কোটি শরণার্থীর দুর্দশার চিত্র প্রধান শিরোনাম হতে শুরু করে।

২. নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগের পরিবেশ: এই সফরের মধ্য দিয়ে অর্জিত নৈতিক অবস্থান এবং ভারত-সোভিয়েত চুক্তির ফলে, ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতে বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলে (অপারেশন চেঙ্গিজ খান), জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উত্থাপিত একের পর এক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে নাকচ করে দিতে পেরেছিল।

৩. মুক্তিযুদ্ধের বৈশ্বিক বৈধতা: এই সফরের পর বিশ্বনেতারা বুঝতে পারেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন কেবল সময়ের ব্যাপার এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় যে নৃশংসতা চালাচ্ছে তা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইন্দিরা গান্ধীর এই ঐতিহাসিক সফর প্রমাণ করে যে, সফল যুদ্ধনীতির পেছনে একটি বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক পরিকাঠামো আবশ্যক। তাঁর এই সফরের ফলেই বহির্বিশ্বে পাকিস্তানের মিথ্যা অপপ্রচারের কফিন শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যা ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের পথকে ত্বরান্বিত করে।