এই ব্যাক এন্ড ফোর্থ করাটা আমাদের এক আজব অভিশপ্ত চক্র

যেসব অপরাধে ভবিষ্যতে কোপ খেতে পারেন, তার তুলনায় গান-বাজনা অনেক বড় অপরাধ।
কোপ খেতে পারেন:
– মিলাদে অংশ নেবার অপরাধে।
– প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ এবং সেখানে গিয়ে ফাতেহা পড়ার অপরাধে।
– আরবি সব হরকত আপনার লাবস্ এ ঠিকমতো না আসার অপরাধে।

তবে, সেখানেও শরিয়ার শুদ্ধতার শেষ হবে না। কারণ সেই শুদ্ধতার পিনাকল কোথায়, মডার্ন ইতিহাসে আমরা একবারও দেখতে পারিনি।

আমি যেটা দেখি – এটা যেন একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
মুসলিমদের ইতিহাসে বহুবার বহু দেশে এরকম শরীয়াপন্থি সংস্কারবাদের ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়েছে।
বিশেষকরে যখনই মুসলমানরা একটু সুখে শান্তিতে থেকেছে, একটু গুছিয়ে নিয়েছে, সভ্যতার সাথে একটু এলাইন্ড হয়েছে, তখনই এই ভূতের আবির্ভাব হয়েছে।
কিছুদিন কোপাকোপি করে, বহুদিনের পরিশ্রমে তৈরি অবকাঠামো-জ্ঞান ধ্বংস করে, সব কিছু নষ্ট করে, অনেক বছর পিছিয়ে গিয়ে, আবার নতুন করে শুরু করেছে।

৮ থেকে ১০ শতক। মুসলিমদের স্বর্ণ যুগ বলে যাকে (স্বর্ণ যুগ কিন্তু বিদেশ দখল-ডাকাতির জন্য বলে না। বলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য।)
কি দারুণ সময় ভাবতে পারেন?
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা হচ্ছে। বহু অর্থ ব্যয় করে সারা বিশ্বের সকল ধর্মগ্রন্থ, জ্ঞান-বিজ্ঞান সংগ্রহ করা হচ্ছে।
উটের পিঠে সারি ধরে বই আসছে। সব গ্রীক জ্ঞান, বেদ-পুরাণ, কাব্বালা, বাস্তুশাত্র, সুরিয়ে সিদ্ধান্ত, আরও কত কি সব। সেসব বিভিন্ন মতের-পথের-ধরনের জ্ঞান স্কলাররা অনুবাদ করছেন, আলোচনা করছেন, বিতর্ক করছেন। লাইব্রেরীতে সেসব জ্ঞানের সংরক্ষণ হচ্ছে। সেগুলোর কপি করে আবার বিভিন্ন যায়গায় পাঠানো হচ্ছে।
আজ অবাক লাগে, সেই জ্ঞান ভাণ্ডারের (বায়তুল হিকমা) প্রধান কাস্টডিয়ান একজন খ্রিষ্টান (হুনেইন ইবনে ইসহাক)। এ নিয়ে কেউ প্রশ্নও করছে না। বরং তাকে গুরু মেনে, তার কাছ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা নিচ্ছে।

আমি ইতিহাস পড়ে মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে ভাবি। সত্য ইতিহাসও বিশ্বাস হতে চায় না। খলিফা মনসুর এবং সভাসদের সামনে “কনক” নামের একজন ভারতীয় অর্ধ নগ্ন পণ্ডিত “সুরিয়ে সিদ্ধান্ত” পড়ে শোনাচ্ছেন। কেউ আবার শোনাচ্ছেন এরিস্টটল প্লেটোর কাজ। খলিফা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। নোট রাখতে বলছেন, অনুবাদ করতে বলছেন। খলিফা নিজে ওস্তাদ-পণ্ডিতদের খাতির যত্ন করছেন। কি সুন্দর নলেজ সোসাইটি। আহা!

এরপরে এলেন আসারি ছাহেব। তিনি এসে বললেন – কুরান এবং শরিয়া ছাড়া যেকোনো লেখাপড়া সময় নষ্ট। সুতরাং যেসব বিদেশিরা এসব বই চায়, তাদের কপি না দিয়ে, মুল বইই দিয়ে দাও। এসব কাফেরানা উলুম (কাফেরদের জ্ঞান) নিয়ে তারা বরবাদ হয়ে যাক। এসব জ্ঞান আমাদের কোন কাজে লাগবে না। প্রথমে বললেন শরিয়ার বাইরের কোন মত গ্রহণযোগ্য না। এরপর সেটি হয়ে গেল শরিয়ার বাইরে কোন মত প্রকাশযোগ্য না! আমরা আবার ঘুরে পিছন দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

আবার এদিকে দেখুন- ভারতের আকবরের জ্ঞান বিজ্ঞানে ভায়াব্রেন্ট দরবার। বহু কষ্টে-বিনিয়োগে তৈরি জ্ঞান-ভাণ্ডার ও সংস্কৃতি।
যেটা আওরঙ্গজেবের শরিয়ার আগুনে পুড়ে ছারখার। আবার পিছনের দিকে চলা।

এই ব্যাক এন্ড ফোর্থ করাটা আমাদের এক আজব অভিশপ্ত চক্র। দু এক শতকের ব্যবধানেই চক্রটি ঘুরে এসেছে।
অতীত ইতিহাস যা বলে, এই মুহূর্তে আমরা সেরকম একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এটা একসময় পিকে যাবে। অনেক প্রাণ, জ্ঞান, ধন-সম্পদের ক্ষয় হবে। আমাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে হুমকির মুখে পড়বে। এরপর আমরা মরীচিকা ছেড়ে বাস্তবে ফিরবো।

Read Previous

ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ

Read Next

গজল | গান খেকো