কর্নেল ব্রাগাঞ্জা – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Colonel Braganza – Sachin Bhowmick

কর্নেল ব্রাগাঞ্জা – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Colonel Braganza – Sachin Bhowmick

হঠাৎ দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই দেখি সামনে কর্নেল ব্রাগাঞ্জা দাঁড়িয়ে। চুল উষ্কখুষ্ক চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, হাতে একটা কাগজে মোড়া বোতল।
আপনি?—আমি প্রশ্ন করলাম।

আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকলেন উনি। তারপর কাগজের মোড়ক খুলে ঠক করে বোতলটা রাখলেন টেবিলেন ওপর।
বোম্বেতে টেবিলের ওপর বোতল দেখলে কেমন ভয়ে গা শিরশির করে। বোতল তো নয় যেন টেবিলের ওপর কেউ একটা লোডেড পিস্তল ফেলে রেখেছে।
–তোমার চাকরটাকে পাঠাও কয়েকটা সোডা নিয়ে আসতে,
–ব্রাগাঞ্জা পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে বললেন একথা।

চাকরটাকে ডেকে নির্দেশ দিয়ে আমি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসলাম। তারপর প্রশ্নিল চোখে তাকালাম কর্নেল সাহেবের দিকে।
কর্নেল সাহেব পকেট থেকে চাবির স্ক্র বার করে দুম করে বোতলের ছিপিটা খুলে ফেললেন। তারপর আমার গোল গোল চোখের সামনে ঢক্ ঢক্ করে বেশ খানিকটা নির্জলা গলায় ঢাললেন।
–সোডা তো আসছে,– আমি আঁতকে উঠে বললাম।
জামার আস্তিন দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে বললেন, উনি,–আসুক। গলাটা সামান্য না ভেজালে চলছিল না।

–কিন্তু,–এইবার প্রশ্নটা করেই ফেললাম,–কি হয়েছে কর্নেল এমন করছেন কেন? আপনাকে কি বিশ্রী দেখাচ্ছে। কোন দুর্ঘটনা— কর্নেল ব্রাগাঞ্জা হাসলেন। মড়ার মতো ফ্যাকাসে বিবর্ণ হাসি।কর্নেল ব্রাগাঞ্জা - শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Colonel Braganza - Sachin Bhowmick
তারপর বললেন,–সোডাটা আসুক, বলছি। আপনারা সিনেমার লোক, কিন্তু এমন টেরিফিক ড্রামা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না।
–ড্রামা?—

চাকরটা সোডা নামিয়ে দিয়ে গ্লাস আনতে গেল। কর্নেল নিজেই একটা সোডা ভাঙলেন,তারপর গ্লাস আনতেই হুইস্কি ঢেলে মেশাতে লাগলেন। একমনে। ধীরে সুস্থে তারপর চুমুক দিয়ে দেখলেন স্বাদ। কি ভেবে আরো খানিকটা হুইস্কি মেশালেন তার সঙ্গে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে উপন্যাসের শেষ লাইনের সুরে বললেন,–এইমাত্র আমার ছ’বছরের মেয়ে নরীন মারা গেল। মোটর এক্সিডেন্টে।

–আপনার ছ’বছরের মেয়ে?—আমার কৌতুহল আকাশ উঁচু। ব্রাগাঞ্জা সাহেবের সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের বয়স এখন সতেরো-আঠারো, আর সে ছেলে, আর তার নাম রবার্টস। ছ’বছরের মেয়ে নরীন—না, নিশ্চয়ই নেশার ঘোরে বাজে বকছেন কর্নেল।

–ভাবছো নেশার ঘোরে আবোল তাবোল বকছি। না?—ব্রাগাঞ্জা হাসলেন,-না হে, কাল টাইমস্-এ দেখতে পাবে ছাপার অক্ষরে। ‘কর্নেল ব্রাগাঞ্জার ছ’বছরের মেয়ের শোচনীয় মৃত্যু’। সঙ্গে সঙ্গে তোমার মতোই বিষম খাবে সারা ভরতবর্ষে আমার পরিচিত লোকেরা। তারপর জানতে পারবে সব। সবাই জানতে পারবে এতবড় পজিশন, প্রতিপত্তি সম্মান যে লোকের তার সম্পর্কে কি মর্মান্তিক স্ক্যাণ্ডাল রয়েছে। এমন মুখরোচক স্ক্যাণ্ডাল চায়ের পেয়ালার সাথে স্ন্যাকস্-এর কাজ করবে সোসাইটির। কাল লোকে চিনতে পারবে আরেক কর্নেল ব্রাগাঞ্জাকে। যে, যে—ঢক্ ঢক্ করে বাকি গ্লাসটা খালি করে ফেললেন উনি।

আমি দু’টো কাঠি নষ্ট করে একটা গোল্ড ফ্লেক ধরলাম।
–“আট বছর আগের কথা।
–তখন আমি সদ্য সদ্য কর্নেল হয়েছি। থাকতাম পুণায়।
–আফ্রিকার যুদ্ধে আমার বীরত্বের জন্য দেশময় নামডাক। স্বভাবতই পুণার মতো ছোট জায়গায় আমার পদবীর দাপট প্রচুর।

–সবচেয়ে নাম বেশী আমার সুষ্ঠু পরিবারের। এমন ডিভোশনাল হাজব্যাণ্ড হয় না, সোসাইটির মেয়েদের বক্তব্য এই। এমন রেশপনসিবল ফাদার হয় না, স্কুল কলেজের শিক্ষকদের এই ধারণা। এমন যে চরিত্রবান বীরপুরুষ তাকেও টনক নড়িয়ে দিলে একজন। তার নাম কুমকুম।–”
বলেই কর্নেল সাহেব আবার গ্লাস ফেনায় ভর্তি করেলেন।

–কুমকুম?—আমি কৌতুহলের রাশ ছেড়ে দিলাম,–কোন কুমকুম? আমাদের ফিল্ম আর্টিস্ট বিখ্যাত নর্তকী গায়িকা কুমকুম ওরফে মালিকা বেগম?

–“ঠিক ধরেছেন।–ব্রাগাঞ্জা সাহেব টাই-এর ফাঁস আলগা করতে করতে বললেন,–সেই কুমকুম। যে এক একটা রাতে রাজামহারাজাদের কাছ থেকে আদায় করত বিশ-চল্লিশ হাজার টাকা। কত উদ্ভট সব গল্প শুনেছি। কোন এক মহারাজা নাকি ওকে একশ’টাকার নোট জোড়া লাগিয়ে এগারো হাত শাড়ি করে দিয়েছিল। মহারাজা কতগুলো নোট দিয়ে ছিল সে খবর আমি জানি না। হয়তো মহারাজা নিজেই গুণতে পারে নি, গোনে নি। ভাবুন এগারো হাত শাড়ি, যার প্রস্ত আটচল্লিশ ইঞ্চি, পুরোটা শুধু একশ’ টাকার নোট।

–এই কুমকুমের সঙ্গে দেখা হল আমার এইটা ছবির মহরৎ করতে গিয়ে। মনে আছে ডেকান স্টুডিওয় মহরৎ হয়েছিল। আমি, কর্নেল ফিলিপ ব্রাগাঞ্জা হয়েছিলাম সে মহরৎ অনুষ্ঠানের সভাপতি।

–সেখানে আলাপ হল কুমকুমের সঙ্গে। মহরৎ ওর ওপর ছিল। কি কুক্ষণেই না আমি গিয়েছিলাম সভাপতি হয়ে। নইলে, হয়তো—” গ্লাসটা খালি করে ফেললেন এবার।

–এখন হুইস্কি থাক, আপনি আর খাবেন না প্লিজ,–আমি অনুনয় জানালাম।

–বেশ খাব না আর,–বোতলটা দূরে সরিয়ে রাখলেন কর্নেল।

“সত্যি রূপ বটে কুমকুমের। গায়ের রঙ যেন রেশম। তেমনি সোনালী, তেমনি নরম, তেমনি মসৃণ। হাতের তেলো যেন এক একটি পদ্মফুল। সামান্য হ্রাণ্ডসেকের চাপে রক্তজমাট যেন টকটকে হয়ে উঠেছিল। আর গলা কি স্বচ্ছ, দুধ খেলে স্পষ্ট দেখা যেতো দুধের সাদা সাদা রেখা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে স্বর্ণকোমল কণ্ঠের নিচে। হাসছেন হয়তো মনে মনে, ভাবছেন, কুমকুম আপনার দেখা মেয়ে তার সম্পর্কে অরসিক এক কর্নেলের কাব্য করা শোভা পায় না। কিন্তু বিশ্বাস করুন রূপের আবেদনে স্টাচুও কুমারসম্ভব লিখতে পারে। আমি তো সামান্য একটু বিশেষণদের লজ্জা দিলাম।

–কুমকুম আমাকে প্রথম তীরেই ঘায়েল করেছিল।
ও বলেছিল,–মিলিটারীর লোকদের সম্পর্কে আমার বড্ড কৌতূহল। ইংরেজী যুদ্ধের ছবি দেখতে আমার কি যে থ্রিল হয় কি বলব।

–আপনার সঙ্গে আলাপে ভারি খুশি হলাম। যুদ্ধের গল্প শোনাবেন আমায়? বড্ড শুনতে ইচ্ছা করে।

–যুদ্ধের গল্প?

–বারে, যুদ্ধ করেন নি আপনি?

–করি নি মানে? আফ্রিকায় আমার যুদ্ধের সাহসিকতার জন্যেই তো কর্নেল হয়েছি।

–আ-ফ্রি-কা-য়? সিংহ দেখেছেন? উঃ আফ্রিকায় খুব গরম না? ভারী মজা লাগছিল কুমকুমের ছেলেমানুষী কৌতুহল দেখে। ও বললে,–আসুন না একদিন চায়ে আমার বাসায়। গল্প শোনাবেন আফ্রিকার। দেবেন পদধুলি? দেবেন?

–হয়তো রূপের জন্যে, হয়তো বিনয়ের জন্যে, হয়তো নিজের প্রচারের উৎসাহে, জানি না কেন রাজী হয়ে গেলাম। বললাম,– যাবো একদিন।

–একদিন নয়, রোববারেই আসুন।–কুমকুম সেই চোখে তাকালো যে চোখের চা্উনি নেপোলীয়নেরও ওয়াটার্লু।–বেশ, রোববারেই যাবো।–বললাম।
কর্নেল ব্রাগাঞ্জার কর্মজীবনে সেই প্রথম রোববার এল এক বোতল হুইস্কির মতো। উজ্জ্বল, রক্তিম, নেশালু।

–কি সাজই সেজেছিল সেদিন কুমকুম। সারা শরীরে অজস্র যৌবনের কি সমারোহ। তখন কি ছাই বুঝতে পারছিলাম নিশ্চিন্ত পদক্ষেপে আমি এগিয়ে চলেছি একটি আণবিক বোমার দিকে। প্রতিটি রোমকুপের রোশনাই নয়, ক্যামোফ্লেজ বেয়নেট লুকনো, নিঃশ্বাসে বিষবাষ্প।

–অনেক গল্প করলাম। সিংহের গল্প, যুদ্ধের গল্প। আফ্রিকার বিচিত্র মানুষদের কাহিনী শুনল কুমকুম। পরম আগ্রহে জানতে চাইল যুদ্ধবিজ্ঞান।

–গুছিয়ে যুদ্ধপ্রক্রিয়া যখন শোনাচ্ছিলাম বুঝতেই পারি নি সে প্রক্রিয়া কুমকুম আমার ওপরই প্রয়োগ করে চলেছে।

–ইচ্ছা করে পিছু হটে তারপর কি করে সাঁড়াশী অভিযান করতে হয় যখন বললাম তখন কুমকুমের দুখানা হাত সাঁড়াশীর মতোই গলা জড়িয়ে ধরেছে আমার।

–এইবার সামনের ব্রিগেড নিশ্চিন্ত আক্রমন করলেই শত্রুপক্ষ পরাজিত হবে।

–আমি শেষ করলাম। ততক্ষণে আমার ঠোঁটের ওপর কুমকুম নিশ্চিন্ত আক্রমন করলে। কানের কাছেওর আবেশ জড়ানো কণ্ঠস্বর বাজছিল নিশুতিরাতের হিংস্রপক্ষ বোম্বারের মতো। এতবড় নামজাদা যোদ্ধা আমি, আফ্রিকার যুদ্ধে কর্নেল হয়েছি, কিন্তু হেরে গেলাম ওর কাছে। কুমকুমের কাছে পরাজিত হলাম আমি। আমি কর্নেল ব্রাগাঞ্জা

–সে পরাজয়ের খেসারৎ দেওয়া হল আমার বাকী কাহিনীর পটভুমি। তাই দিয়ে এলাম এখন এইমাত্র।–”
ব্রাগাঞ্জা তাকালেন আমার দিকে,–আরেক সিপ নিই?
আপত্তি করলাম না। ব্রাগাঞ্জা গ্লাস ভরলেন।
“এর অল্প কদিন বাদে আমি বদলি হলাম কোলকাতায়। সেখানে গিয়ে ভুলতে চেষ্টা করলাম কুমকুমের কথা।

–একটি রোববারের বিকেলকে মনে রাখবার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই একটি ভুলকে স্মৃতির আলমারিতে সাজিয়ে রাখবার।

–ভুলেই যেতাম হয়তো, কিন্তু ভুলতে পারলাম না। সেদিনের তারিখটা আজও মনে আছে, ১৮ই জুন। সেদিন, যেদিন চিঠি পেলাম কুমকুমের। চিঠি তো নয়, তরল এসিড নিয়েছি হাতে।

–‘তোমার ওপর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার। তুমি আমার জীবনে প্রথমে এসেছিলে সত্যিকারের পুরুষের মতো। তোমার মতো বীর তোমার মত রূপবান পিতার সন্তান আমার গর্ভে, এরচেয়ে গর্ব আর কিসে হতে পারে বলো। এখন চার মাস চলছে। তোমার প্রেমের জীবন্ত রূপ দেখতে আরো দীর্ঘ ছ’মাস অপেক্ষা করতে হবে আমার। ডাক্তার দেখাচ্ছি। শরীরের বিশেষ যত্ন নিতে বলেছেন। লজ্জার মাথা খেয়ে বলছি, কিছু টাকা পাঠাবে? ভুল বুঝো না। ইতি—তোমার কুমকুম।’

–সত্যি বলছি, একবার মনে হয়েছিল আত্মহত্যা ছাড়া গতি নেই আমার। কিন্তু পারলাম না। পাগলের মতো কয়েকদিন কাটালাম। মেজাজ দেখে অধস্তন উর্ধ্বতন কর্মীরা, ছেলেমেয়ে বৌ সবাই ভয়ে তটস্থ উঠল। পাঁচদিনের দিনে টেলিগ্রাম মনি-অর্ডার করে এক হাজার টাকা পাঠিয়ে দিলাম।

–একবার ইচ্ছে হয়েছিল লিখি অপারেশান করে এই কুৎসিত সম্ভাবনার শেকড়ই উপড়ে ফেলতে। কিন্তু তাও পারলাম না।

–তারপর? তারপর দীর্ঘ আর আতঙ্কিত ছ’বছরের জ্বালাদগ্ধ কাহিনী।

–প্রায়ই লজ্জা্র মাথা খেয়ে টাকা চেয়ে পাঠাতো কুমকুম। আমিও পত্রপাঠ পাঠিয়ে দিতাম।

–বলা বাহুল্য এই সমস্ত চিঠিপত্র আমার অফিসের ঠিকানায় আসত। টাকা পাঠাতাম আমি নিজে পোস্ট অফিসে গিয়ে।
একেই বলে বোধ হয় পাপের প্রায়শ্চিত্ত।
একদিন চিঠি পেলাম আমার মেয়ে হয়েছে। কুমকুমের ফিল্মে কাজ ততদিনে বন্ধ। বয়েসও হয়েছে ওর। সুতরাং বলতে গেলে মা মেয়ের পুরো দায়িত্বই আমার ঘাড়ে এসে গেল।

–মেয়ে সম্পর্কে সবিস্তার বর্ণনা করে চিঠি দিতে শুরু করলও। হুবহু আমার মুখ বসানো নাকি। হাসিটা বাপের মতো। চুল পেয়েছে মায়ের। নামরেখেছি নরীন। জান কাল বলছিল পাপ্পা। তোমার মেয়ে তো । মা’র আগে বাপের নামই মনে পড়ে। সেদিন উপুড় হয়ে শুয়েছে। গড়িয়ে গড়িয়ে একদিন তো পড়েই যাচ্ছিল। কি দস্যি হয়েছে।
বড় হয়ে তোমার চেয়ে বড় জেনারেল হবে ও। ভারতবর্ষের প্রথম মেয়ে জেনারেল।–ইত্যাদি ইত্যাদি।

–প্রথম হিংস্র একটা রাগ হতো, ঘৃণা হতো। কিন্তু কুমকুমের চিঠির ভাষায় মেয়েটার ওপর কেমন করুণা জন্মাল আমার। যাই হোক আমারই মেয়ে ও। আমার রক্তের সম্পর্ক ওর সঙ্গে।

–তখনও বুঝতে পারি নি কুমকুম আমার চেয়ে যুদ্ধবিদ্যায় কত বেশী পারদর্শিনী।

–সেটা বুঝেছি আজ। এই খানিক আগে।

–কুমকুম মেয়ে নিয়ে মহাবালেশ্বরে থাকে। বোম্বে বা পুণায় ওর কাজ নেই আর সন্তান সম্পর্কে নতুন স্ক্যাণ্ডাল এড়ানোও দরকার তাই নরীন জন্মাবার আগে থেকেই ও মহাবালেশ্বর চলে গেল। বাচ্চা হয়েছে খবরটা জানতে সবাই ঠিকই পেরেছিল। কিন্তু বাপের নাম জানবার কৌতুহল হয় নি কারুর। কুমকুমের মতো মেয়ের পক্ষে এই ধরনের পিতৃহীন সন্তান জন্ম দেওয়া অস্বাভাবিক নয় কিছু। বরঞ্চ এ সত্যে সন্দেহ করাটাই অস্বাভাবিক। যাক এসব। গত বছর আমি বোম্বে এলাম ফের।

–কুমকুম দেখা করল বাচ্চা নিয়ে হোটেলে। মেয়েটি ভারী সুন্দর দেখতে হয়েছে সত্যি। মায়া না হয়ে যায় না। কিন্তু দেখতেই বুকটা ধক করে উঠল। ফুলের মতো এই শিশুটা জানে না ওআমার কত বড় পাপের চিহ্ন।

–তারপর আপনি জানেন গত সপ্তাহে আমার একটা হার্ট এটাক হয়েছে। ব্লাড প্রেসারে ভুগছি অনেক কাল, হার্টও দুর্বল হয়ে গেছে।

–সে হার্ট এটাকের খবর কাগজে বেরিয়েছে। শুনে কাল মহাবলেশ্বর থেকে মেয়ে নিয়ে ছুটে এসেছে কুমকুম।

–অ্যাম্বাসেডার হোটেলে মীট করেছি ওকে। কুমকুম আমার সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেই চলে এল মূল বক্তব্যে। বলল,–ভগবান না করুন কিছু হয়, কিন্তু তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে বলছি, তুমি লেখাপড়া করে দাও।

–লেখাপড়া করে দেব? কি লেখাপড়া করে দেবো?

–তোমার পুণার নতুন বাড়ি। পুণার নতুন বাড়িটা আর অন্ততঃ পঞ্চাশ হাজার টাকা তুমি নরীনের নামে লিখে দাও। মা হয়ে আমি ওর ভবিষ্যৎ না ভেবে পারি না। বাপের দায়িত্বও আছে। তোমার মেয়ের সিকিউরিটি—

–কিন্তু কুমকুম, কি বলছ পাগলের মতো। আমার ছেলেমেয়ে স্ত্রী তাঁদের জন্যে বাড়ি করেছি আমি, তাদের প্রতি কর্তব্য নেই আমার? জমানো টাকা তাদের সিকিউরিটির জন্য—
বাধা দিল কুমকুম,–তুমি রাজী কি রাজী নও সোজা ভাষায় বলো।–ওর গলার স্বর কঠিন।

–এ কিছুতেই হতে পারে না।–আমি দৃঢ় কণ্ঠে জানালাম,–কিছুতেই না।

–সেটা তোমার পক্ষে কি ভালো হবে? তোমার স্ত্রী শুনছি ভালো মানুষ। তার কাছে যদি যাই আমার আবেদন নিয়ে।

–কুমকুম।–স্থানকাল ভুলে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি,–একি বলছ তুমি?

–উত্তেজিত হয়ো না, ঠিকই বলছি। প্রয়োজন হলে মেয়ের স্বার্থে আমাকে যেতেই হবে তাঁর কাছে। স্বামীর এ পরিচয়ে তিনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন।

–সব পরিষ্কার হয়ে গেল জলের মতো। সন্তানের টোপ ফেলে আমার সর্বস্ব গ্রাস করতে চাইছে কুমকুম। আমার এতদিনের উপার্জিত অর্থ চরিত্র দুয়েরই মারণাস্ত্র ওর কাছে। দু’চোখে অন্ধকার নেমে এল আমার। দু’হাতে মুখ ঢেকে বললাম,–তুমি এত নীচ কুমকুম, তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে চাইছ।

–জবাব দিল না।ও হাসল। জয়ের হাসি আর ঠিক সেই সময়ে বাইরে প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষার আওয়াজ এলো আর সঙ্গে সঙ্গে শিশুকণ্ঠের মর্মান্তিক আর্তনাদ। লাফিয়ে উঠলাম দুজনই, নরীন, নরীন কোথায়? এই খানিক আগে এখানে বসে ছিল। ঝড়ের মতো ছুটে গেলাম। নরীনের রক্তাক্ত দেহ ঘিরে ততক্ষণে ভিড় জেম গেছে।

–কে, ই, এম হাসপাতালে পৌঁছুতে লাগল পনেরো মিনিট। পনেরো মিনিট তো নয়, পনেরো যুগ। ডাক্তার নিয়ে গেল এমার্জিন্সী বেড-এ।

–বাইরে চুপচাপ বসে রইলাম আমরা দু’জন। আমি আর কুমকুম। নিঃশব্দে। খানিকবাদে ডাক্তার এসে বললেন,–এখনো কিছু বলা মুশকিল। তবে রক্ত চাই। আপনার নিজেদের ব্লাড টাইপ জানেন?
আমি বললাম জানি,–এ’পজিটিভ।
ডাক্তার মাথা নাড়লেন,–মেয়েটির ব্লাড ও, আর, এইচ, নেগেটিভ, মায়ের রক্তই ট্রাই করতে হবে, আপনার চলবে না।

–ডাক্তার আমার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন কুমকুমকে নিয়ে।

–এ দৃষ্টির অর্থ আমি বুঝলাম। মেঘের আড়াল কেটে গেল, সূর্য দেখতে পেলাম। এ যে কতবড় আবিষ্কার আপনাকে বোঝাতে পারবো না।

–বুঝলাম, নরীন আমার মেয়েই নয়। আমার রক্তের সঙ্গে ওর কোন সম্পর্ক নেই।

–সমস্ত শরীর রাগে জ্বলতে লাগল বারুদের মতো। কি কুৎসিত কি জঘন্য মেয়েমানুষ কুমকুম। অসহ্য। বিদ্যুতের মতো বেরিয়ে চলে এলাম।
অ্যাম্বেসেডার হোটেলের কামরায় অপেক্ষা করতে লাগলাম। কুমকুম এলো। চোরের মতো। এসেই তাড়াতাড়ি সুটকেশ গুছোতে শুরু করলোও। বুঝলাম পালাতে চায়। পিঠের ওপর রিভালবার রেখে বললাম,–তুমি জানতে এ আমার মেয়ে নয়?

–একটু হকচকিয়েই স্থির হয়ে গেল ও। বরফকন্ঠে জবাব দিল,–জানতাম। তুমি আসবার আগেই আমি গর্ভবতী ছিলাম। মার হীরের নেকলেস চুরি করে আমার কাছে রাত কাটাতে এসেছিল একটা আঠারো বছরের কলেজের ছোকরা। নরীনের বাপ সে। তার নাম আমি জানিনে।

–তবে কেন, কেন জেনেশুনে তুমি আমাকে নিদারুণ যন্ত্রণা দিয়ে চলেছিলে, কেন?

–টাকার জন্য। কিন্তু এতবড় আয়োজন সব ভেঙে গেল। জিতে গেলে শেষ পর্যন্ত। দেরি করছ কেন, মারো মারো গুলি। তুমি না মস্ত কর্নেল, শত্রুকে হাতে পেয়ে দেরি করছ কেন?

–আমি অসহায় জীবকে গুলি করব না। আমার হাতে মরবার মতো পুণ্যবতী নও তুমি। এক সেকেণ্ড দাঁড়ালও, তারপর দৌড়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে।

–বসে বসে এক বোতল জিন খেলাম। তারপর কে, ই, এম, এ ফোন করলাম। ওরা ডেকে পাঠালো,–এক্ষুনি আসুন।

–ডেড। নরীনের মৃতদেহ। ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটা চোখ বুজে শুয়ে আছে। মায়ের রক্ত বাঁচাতে পারে নি ওকে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ জলে ভরে এল। কেন এত জল, কে বলবে।

–মনস্থির করে ফেললাম। কিছুতেই না।

–এরকম অপূর্ব সুন্দর, নিষ্পাপ শিশু মৃত্যুর পরও কোন পরিচয় নিয়ে যাবে না, এ অসম্ভব। এ অবিচার। জীবনে যে স্বীকৃতি পেল না, মরণের পরও পাবে না? পিতৃহীন জারজ সন্তানের কলঙ্ক থাকবে ওরে মৃত্যুকে জড়িয়ে। কিছুতেই না।

–যা এড়াবার জন্য দীর্ঘ ছ’বছর আমর দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না, আমি নিজের হাতে তাই লিখে দিয়ে এলাম। লিখে দিলাম মৃতা শিশুটির নাম—নরীন ব্রাগাঞ্জা, বাবার নাম—ফিলিপ ব্রাগাঞ্জা।”
কর্নেল এবার গ্লাসে ঢাললেন না। বোতলটি তুলেই উপুড় করে ধরলেন মুখের ওপর। কষ বেয়ে হুইস্কির ফেনা গড়াতে লাগল। মনে হচ্ছিল হুইস্কি নয়,কষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে যে রক্তের সঙ্গে নরীনের রক্তের কোন সম্পর্ক নেই।

[ কর্নেল ব্রাগাঞ্জা – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Colonel Braganza – Sachin Bhowmick ]

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন