খেয়াল পরিবেশন : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন [ Understanding Kheyal Performance]

খেয়াল পরিবেশন : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন [ Understanding Kheyal Performance] : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন নিয়ে অনেকের কনফিউশন থাকে। আশা করি এই আর্টিকেলটি সহায়তা করবে।

খেয়ালের ইতিসাস পরিচিতি এবং বিভিন্ন কারিগরি বিস্তারিত পাওয়া যাবে এই সিরিজের “সঙ্গীতের ধারা (Genre)” বিভাগের “খেয়াল-গান” আর্টিকেলটিতে। এখানো আমরা মুলত আলোচনা করবো খেয়ালের পরিবেশনরীতি নিয়ে।

খেয়াল এখন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রচলিত ধারা। খেয়াল মানেই ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন, যেখানে শাস্ত্রীয় রীতিনীতি বজায় রেখেও শিল্পী পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে ইমপ্রোভাইজ করতে পারেন। এই ইমপ্রোভাইজেশনের কারণেই একই শিল্পীর একই রাগের ভিন্ন ভিন্ন পারফরমেন্সের মধ্যেও অনেক নতুনত্ব পাওয়া যায়। ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন হলেও শিল্পী সচরাচর কয়েকটি ধাপে খেয়াল পরিবেশন করেন এবং ওই ধাপগুলোর মধ্যেই ইমপ্রোভাইজেশনের সুযোগ নেন।

ধ্রুপদের চেয়ে খেয়ালের অংশ বা অঙ্গ বেশি। অঙ্গের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে গোয়ালিয়র ঘরানাকে যেহেতু সকল ঘরানার জননী ধরা হয়, তাই তাদের আট অঙ্গের খেয়াল সর্বজনগ্রাহ্য। তবে আজ যেসব নামী গায়ক আছেন, তাঁদের বেশিরভাগই এই আট অঙ্গ হুবহু অনুসরণ করেন না। কেউ আবার কোনো অংশ গানই না। আবার কেউ বাইরে থেকে একটি অংশ যোগ করে দেন। তবে আমরা যদি অষ্টাঙ্গের ধারণাটা রাখি, তবে অন্য সব খেয়াল বুঝতে বেগ পাবার কথা নয়।

আলাপ-আওচার

গোয়ালিয়রের খেয়ালের শুরুতে আলাপ নেই। সুর লাগিয়েই বন্দিশ গাওয়া শুরু। তবে আগ্রা ঘরানার গায়কেরা শুরুতে ধ্রুপদের মতো আলাপ করতেন। এখন কেউ কেউ সুর লাগিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপ করেন যেটাকে আওচার বলে।

বন্দিশ-এ-নায়েকী :

এরপর মূল খেয়াল শুরু হয় বন্দিশ-এ-নায়েকী দিয়ে। এই অংশে ওই খেয়ালের বন্দিশ বা মূল সাহিত্য ও সুরের যিনি রচয়িতা, তাঁর সেই মূল সুর অপরিবর্তিত রেখে গাওয়া হয়। এখানে কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই ক’লাইনই গাওয়া হবে।

বন্দিশ-এ-গায়কী :

এরপর শিল্পী চলে যাবেন বন্দিশ-এ-গায়কীতে, যেখানে তিনি মূল কম্পোজিশনটি ইমপ্রোভাইজ করার সুযোগ পান। এখানে তিনি নিজের দক্ষতা দেখাবার সুযোগ পাবেন।

বিস্তার বা বড়হত :

এর পরে শিল্পী চলে যাবেন রাগকে আরও বিস্তৃত করতে। এটাকে বিস্তার বা বড়হত বলে। এখানে রাগের স্বরগুলোর বিভিন্ন কম্বিনেশন করে শিল্পী পরিবেশন করবেন। কিছুটা গানের কথা গাইবেন, আবার মাঝে সুরের বিভিন্ন কম্বিনেশনগুলো ঢুকিয়ে দেবেন। সেই সুরগুলো শুধুমাত্র আ-কার বা স্বরের নামগুলো দিয়ে গাইতে পারেন।

বহলাওয়া :

এভাবে শুনতে শুনতে কখন দেখবেন ঢুকে পড়বেন বহলাওয়া নামের একটা মজার রাজ্যে, যেখানে দোলনায় দোলার মতো খেলা হবে। আ-কারে রাগের সুরের ওপর দিয়ে ঘোরাঘুরি করবেন শিল্পী। হালাকা চালে ঘোরাঘুরির মধ্যে খুব আলতো করে সুর ছুঁয়ে যাবেন মীড় নিয়ে। কখনও বা একটু জোরে লাফ দেবার মতো হবে গমক দিয়ে।

বোল-বাঁট বা বোলবন্টন :

এরপরে আসবে বোল-বাঁট বা বোলবন্টন। এখানে বন্দিশের কথাগুলো বিভিন্নভাবে তালের প্যাটার্নের মধ্যে ভাগ করে দেবেন শিল্পী। শিল্পীর তালের ওপরে দখল দেখা যাবে এখানে। তালের ওপরে কখনও দীর্ঘ করে গানের কথা বসাবেন, কখনও সংক্ষিপ্ত করে।

বোলতান, তান সারগাম :

খেয়াল পরিবেশন : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন [ Understanding Kheyal Performance]এ পর্যায়ে এসে গানের চরিত্র কিছুটা বদলে যাবে। এখন শুরু হবে সুর আর গতির খেলা। সুরের বিভিন্ন প্যাটার্নের ওপর দিয়ে দ্রুততার সাথে ওঠা-নামা, চরকিকাটা, দৌড়-ঝাঁপ, যেটাকে আমরা তান বলি। তবে প্রথম শুরু হবে গানের কথা নিয়েই, যেটাকে বলা হয় বোলতান। সুরের ওই সব প্যাটার্নের ওপরে গানের কথা বসিয়ে দ্রুত ওঠানামা করা হবে। এটা খানিকক্ষণ চলার পরে আসবে তান। এখানে আ-কারে বা স্বরের নাম ধরে (সারগাম) দ্রুত ওঠানামা হতে থাকবে। এখানে শিল্পী তাঁর কণ্ঠশৈলী, সুরের ও তালের ওপরে দখল একসাথে দেখাবার সুযোগ পাবেন। মৌলিক স্তরের শ্রোতাদের অন্য অঙ্গগুলো ভালো লাগতে সময় লাগলেও এই অংশটি ভালো লাগবে সহজেই।

লয়কারি :

এরপরে সেই গতির মধ্যে দিয়ে ঢুকে যাবে তার পরের অংশে, যার নাম লয়কারি। লয়কারি মানে বিভিন্ন প্রকারের গতির খেলা। এখানে শিল্পী তাঁর নিজের দখল অনুযায়ী লয় বাড়িয়ে দেখাতে থাকবেন। কে কতো গুণ গেলেন, এটা গণনার বিষয়। তবে খুব তৈরি গলা ছাড়া দ্রুতলয়ের তান বা লয়কারি আনন্দের বদলে কানের পীড়ার কারণ হতে পারে।

এগুলো তো গেলো খেয়ালের অঙ্গের কথা। কান সাফ হতে থাকলে একসময় খেয়ালকে আরও সুন্দর করার জন্য বিশেষায়িত লহক, গমক, ডগর, মীড়, সুঁত, ঘসীট ধরনের জিনিসগুলোর সূক্ষ্ম মজা পাওয়া যাবে।

খেয়াল গাওয়া শেষ করে কোনো কোনো শিল্পী তারানা (বা তেলানা) গাইতে পারেন। তারানা গাওয়া হয় “নোম তানা দের্‌না দের্‌না তাদানি ওদানি দের দানি ইয়া লালি” ধরনের শব্দ ব্যবহার করে।

আজকাল একটি খেয়াল পারফরমেন্স চলে ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা সময় নিয়ে। রেকর্ডিং এ আরও ছোট করে গাওয়া হয়ে থাকে।

[ খেয়াল পরিবেশন : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন [ Understanding Kheyal Performance] ]

আরও দেখুন:

“খেয়াল পরিবেশন : বৈঠকি খেয়াল পরিবেশন [ Understanding Kheyal Performance]”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করা বন্ধ রয়েছে।