বাংলাদেশের মানচিত্রে কুষ্টিয়া জেলা মানেই সংস্কৃতির রাজধানী, মরমী সাধকদের চারণভূমি আর ইতিহাসের এক অক্ষয় ভাণ্ডার। শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথ, ছেঁউড়িয়ার লালন কিংবা লাহিনীপাড়ার মীর মশাররফ হোসেন—এঁদের নাম শুনলেই আমাদের মানসপটে এক সমৃদ্ধ জনপদ ভেসে ওঠে। কিন্তু এই প্রথিতযশা নামগুলোর আড়ালে কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নে নিভৃতে শুয়ে আছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত বিস্ময়, যা ‘খয়ের বাগান’ নামে পরিচিত। অনাদর আর অবহেলায় পড়ে থাকা এই জনপদটি এখন পর্যটকদের জন্য এক লুকানো স্বর্গে পরিণত হয়েছে।

প্রকৃতির আপন খেয়ালে গড়া বাগান
নন্দলালপুর ইউনিয়নের চর-চাপড়া গ্রামে গড়াই নদীর বিশাল বক্ষজুড়ে জেগে ওঠা পলিপড়া চরে এই বাগানের অবস্থান। সাধারণত আমরা জানি, বাগান মানেই সেখানে মানুষের হাতের ছোঁয়া থাকবে, থাকবে মালির নিবিড় যত্ন। কিন্তু এই খয়ের বাগান সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানকার প্রতিটি বৃক্ষ বেড়ে উঠেছে প্রকৃতির নিজ তত্ত্বাবধানে। গড়াইয়ের পলিমাখা মাটি যেন এই বিশেষ প্রজাতির বৃক্ষের জন্য এক স্বর্গভূমি।
বিস্ময়কর এই বাগানের বৃক্ষরাজি যেন কোনো দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের নিখুঁত পরিকল্পনা। চারিদিকে খয়েরী রঙের এক মায়াবী আভা। এখানকার শিশু গাছগুলো যখন জন্ম নেয়, তখন তার পাতায় থাকে সবুজ আর লালের মিশ্রণ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই রং বদলে হয়ে যায় গাঢ় খয়েরী। খড়বৃক্ষ বা এই খয়ের গাছগুলো আকারে খুব বেশি বড় হয় না, কিন্তু এদের ডালপালা অত্যন্ত বিস্তৃত ও প্রশস্ত। এই ঝোপঝালো আকৃতির কারণেই বাগানটির ভেতর তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় সুরঙ্গ সদৃশ পরিবেশ।
খয়ের বৃক্ষের অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য
এই বাগানটি কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়, বরং এর রয়েছে বিশেষ উপযোগিতা। পান খাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘খয়ের’ মূলত এই গাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়। অনেকটা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের মতো করেই এর বক্ষ চিরে রস বের করা হয় এবং পরবর্তীতে তা জ্বাল দিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে জমাটবদ্ধ খয়ের তৈরি করা হয়। সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের বুকে প্রকৃতিগতভাবে বেড়ে ওঠা সর্ববৃহৎ খয়ের জঙ্গল। মানুষের কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রকৃতি এখানে এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে রেখেছে। অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই অমূল্য সম্পদটি আজ অবহেলার শিকার।
রবীন্দ্রদর্শন ও আমাদের বিজাতীয় প্রেম
বাঙালি হিসেবে আমাদের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শনের কথা বলি, তাঁর কুঠিবাড়িতে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য খুঁজি। কিন্তু সেই কুঠিবাড়ির মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই যে প্রকৃতির এমন এক অনন্য সৃজন পড়ে আছে, তা আমাদের দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে না। রবীন্দ্রদর্শন আমাদের শিখিয়েছে মাটির কাছাকাছি থাকতে, অথচ আমরা সময় পেলেই হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার কৃত্রিম সৌন্দর্যের পেছনে ছুটি। আমাদের ঘরের কাছেই যে খয়ের বাগানটি এক অভিমানী প্রেমিকার মতো সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছে, তার সেই ‘প্রাকুশ প্রেম’ আমরা অনুভব করি না।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর শিলাইদহ অবস্থানে এই খয়ের গাছ বা খড়গাছ লাগিয়ে বাগান করার চেষ্টা করেছিলেন বলে শোনা যায়, কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি। অথচ সেই অসাধ্য সাধন করেছে প্রকৃতি স্বয়ং, কুমারখালীর এই চর-চাপড়া গ্রামে।
গোধূলির মায়াজাল ও অনন্য এক ভূস্বর্গ
যাঁরা প্রকৃতির প্রকৃত রূপ দেখতে চান, তাঁদের জন্য খয়ের বাগানের সন্ধ্যাবেলা এক পরম পাওয়া। পশ্চিমাকাশে যখন সূর্য হেলে পড়ে এবং তার শেষ রক্তিম আভা খয়েরী পাতায় এসে পড়ে, তখন এক অদ্ভুত আধিভৌতিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। গড়াই নদীর শুকনো বুক চিরে আসা হাওয়া যখন এই বাগানকে ছুঁয়ে যায়, তখন মনে হয় প্রতিটি গাছ যেন এক একটি জীবন্ত কবিতা। বাগানের ধুলোমাখা গ্রামীণ মেঠো পথে ছোট ছোট খরগোশ ছানার পায়ের ছাপ দেখা যায়, যা প্রমাণ করে এখানকার পরিবেশ কতটা প্রাণবান্ধব। নদীর স্রোত কমে গেলেও তার নিঃসম্বল সৌন্দর্য এক অদ্ভুত রসসিঞ্চন করে পর্যটকদের হৃদয়ে।
পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে উজ্জ্বল সম্ভাবনা
এই খয়ের বাগান হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম একটি ইকোপার্ক বা পর্যটন কেন্দ্র। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নন্দন পার্ক, নতুন দম্পতিদের জন্য নির্জন অবকাশ যাপন কিংবা শখের আলোকচিত্রীদের জন্য এটি হতে পারে এক স্বর্গরাজ্য। কোনো বড় ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াই পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব। বর্তমানে কুষ্টিয়া শহর কিংবা কুমারখালী থেকে মানুষ মাঝেমধ্যে এখানে ঘুরতে আসলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে এটি পর্যটন মানচিত্রে এখনো পিছিয়ে আছে।
আশপাশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু
এই বাগানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। কুষ্টিয়া ও কুমারখালীর প্রধান প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে এর অবস্থান। পর্যটকরা একই দিনে একই পথে ঘুরে আসতে পারেন:
- দক্ষিণ দিকে ৫ কি.মি. দূরে বিশ্বকবির শিলাইদহ কুঠিবাড়ি।
- দক্ষিণ-পশ্চিমে ৫ কি.মি. দূরে বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার।
- দক্ষিণ-পূর্বে ৫ কি.মি. দূরে অমর কথাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা।
- উত্তর-পূর্ব দিকে ৫ কি.মি. দূরে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বসতভিটা ও ঐতিহাসিক এম.এন প্রেস।
অর্থাৎ, ইতিহাসের মহানায়কদের সান্নিধ্য পাওয়ার পর ক্লান্ত মনে প্রশান্তি জোগাতে খয়ের বাগানের ছায়াঘন পরিবেশ হতে পারে শ্রেষ্ঠ ঠিকানা।
কীভাবে পৌঁছাবেন এই মায়াপুরীতে?
কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়ক ধরে ৫ কি.মি. এগিয়ে গেলেই পড়বে ‘আলাউদ্দিন নগর’। সেখান থেকে বাম দিকে সোন্দাহ যাওয়ার রাস্তা ধরে ১ কি.মি. গেলেই নন্দলালপুর বাজার। বাজার থেকে মাত্র আধাকিলোমিটার ভেতরে গেলেই সেই সুনিবিড় খয়ের বাগানের দেখা মিলবে। কুষ্টিয়া শহর থেকেও খুব সহজে অটো বা ভ্যানে করে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটে এখানে পৌঁছানো সম্ভব।
আমাদের করণীয়
প্রকৃতির এই অকৃপণ দানকে রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। নদী পাড়ের এই হাজার হাজার খয়ের গাছ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে, অন্যদিকে আমাদের ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছে। সরকারি উদ্যোগে বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর যদি এই বাগানের সীমানা নির্ধারণ এবং পর্যটকদের জন্য সাধারণ সুযোগ-সুবিধা (যেমন: বসার স্থান বা নিরাপত্তা) নিশ্চিত করে, তবে এটি দেশের অন্যতম আয়ের উৎস হতে পারে।
আসুন, আমাদের হাতের কাছে ছড়িয়ে থাকা এই ‘সবুজ সোনা’ এবং খয়েরী আভার বাগানকে রক্ষা করি। প্রকৃতির এই অনন্য নিদর্শন কেবল দেখার জন্য নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নেওয়ার জন্য। এই দুর্লভ সম্পদের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে আগামী ছুটির দিনে আপনার গন্তব্য হোক কুমারখালীর চর-চাপড়ার এই বিস্ময়কর ‘খয়ের বাগান’।
