আমার নুসরাত ফাতেহ আলী খান : এক অনন্য অনুপ্রেরণা

নুসরাত ফাতেহ আলী খান সাহেবের সঙ্গীতের সাথে, আমার পরিচয় হয় “আলিদা মালাং” ক্যাসেট বের হবার সময়। তখনই তিনি প্রিয় হয়ে যান। সেই থেকেই তার গান শুনে আসছি।

আমার কাছে, এখনো সবচেয়ে প্রিয় প্রেমের গানটি, তার গাওয়া “সাসো কি মালা পে সিমরু ম্যায় পি কা নাম….”
আমার মতো বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের মনের গায়ক, প্রাণের গায়ক খাঁ সাহেব, নুসরাত ফাতেহ আলী খান।

 

তার একটি গল্প আমাকে দারুণ অনুপ্রেরণা দেয়:

এই বিখ্যাত গায়ক নুসরাত ফাতেহ আলি খাঁ সাহেব সম্পর্কে, তার পিতার কি ধারণা ছিল জানেন?

নুসরাতের গলা ছোটবেলায় ছিল ভাঙ্গা আর ফ্যাসফেসে। তার তার পিতা অর্থাৎ ফাতেহ আলি খাঁ সাহেবের ধারণা ছিল নুসরাত কে দিয়ে সঙ্গীত হবে না।

এজন্য তিনি পৈতৃক পেশা বাদ দিয়ে, ছেলেকে ডাক্তার বানাতে চাইতেন।
নুসরাতের লেখাপড়ার বিষয়ে তার শিক্ষিত বন্ধুদের সাথে নিয়মিত কথা বলতেন, বুদ্ধি পরামর্শ চাইতেন, শঙ্কাও প্রকাশ করতেন।

নুসরাত লেখাপড়ায় এভারেজ ছিলেন। একবার একাডেমিক ফল ভালো না হওয়ায়,খাঁ সাহেব খুব হতাশ হন। তার এক বন্ধুর কাছে সেই হতাশার কথা প্রকাশ করে।
তখন সেই বন্ধু বলেছিলেন “তোমরা যাতে সবচেয়ে ভালো, অর্থাৎ সঙ্গীত, সেটা ওকে ঠিকমতো শেখাও না কেন? সঙ্গীত শিখিয়ে ও সেই লাইনে প্রতিষ্ঠিত করাই তো সবচেয়ে সহজ”

বাবা ফাতেহ আলি সাহেব হতাশ গলায় বলেছিলেন –
“আমি নাহয় ওকে সব কিছু শেখালাম, কিন্তু আল্লাহ তো ওকে আওয়াজ দেন নি! অর্থাৎ সুরেলা কণ্ঠ দেন নি!”

৬০০ বছর ধরে কাওয়ালী গেয়ে আসা পরিবারের খলিফা, ফাতেহ আলী খাঁর নিজের প্রিয় সন্তানের বেলায় সিদ্ধান্ত ছিল এরকম!

কিন্তু নিয়তি কি লিখে রেখেছিলো দেখুন !

নুসরাত মেট্রিক পাশ করার পরেই হঠাৎ বাবা মারা যান। নুসরাতের ডাক্তার হবার স্বপ্ন ধোঁয়াশা হয়ে গে।
পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস বন্ধ হয়ে গেল।

তখন ডাক্তার হবার স্বপ্ন ভুলে, তাৎক্ষনিক আয়ের উৎস হিসেবে, নুসরাতকে গানটাকেই আঁকড়ে ধরতে বাধ্য হলেন।
যখন বুঝতে পরলেন, গানই তার নিয়তি, তখন নিয়তিকে আরও শক্ত করে আলিঙ্গন করলেন।

গানের আসরে গাইবার পাশাপাশি গানের চর্চা বাড়িয়ে দিলেন কয়েক গুন। অমানুষিক পরিশ্রম করতে লাগলেন নিজেকে তৈরি করতে।
তিনি জানতেন তার নিজের কণ্ঠ ভালো না, তাই সুকন্ঠি গায়কদের চেয়ে কয়েক গুন বেশি রেয়াজ করতেন।

এর পাশাপাশি কাওয়ালী নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন। খুঁজতে থাকলেন – কিভাবে তার সঙ্গীতকে মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়!

রাগদারীতে রং যোগ করলেন। লয়কারীকে তে একেবারে অনন্য একটি মোকামে নিয়ে গেলেন। দেখতে দেখতে তাদের চিরাচরিত কাওয়ালী এক নতুন রূপ ধারণ করলো। হয়ে উঠলো অনন্য এক গায়কী।

পরের ইতিহাস কি?
নুসরাত ফাতেহ আলি খাঁন শুধু এই উপমহাদেশ জয় করেই ছাড়েন নি। তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র বিশ্ব। এই উপমহাদেশের শিল্পীদের মধ্যে বিশ্ব সভায় সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হয়েছিলেন তিনি। সেই ভাঙ্গা কণ্ঠেই, তিনি ৬ সপ্তকের গাইয়ে হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন, যা বিশ্বে একেবারে হাতে গোনা। জন্মগত ভাবে সুললিত কণ্ঠের বহু শিল্পীর চেয়ে, তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন বহুদূর।

শুনলাম তো গল্পটা! এখন আসি মুল কথায়। এই গল্পের সারমর্ম কি?
যে শিক্ষাটা আমরা পাই, তা হচ্ছে –
আপনাকে দিয়ে এই কাজটি হবে না, আপনি অযোগ্য, এমন সিদ্ধান্ত চট করে নেবেন না। আগে ভালো ভাবে খতিয়ে দেখুন।
আপনার আপাতদৃষ্টিতে অযোগ্যতা, আপনার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হতে পারে।
শুধু ব্যাটে বলে মেলানোর জায়গাটি ভেবে বের করুন।
এরপর নিজেকে নিয়ে পরিশ্রম করুন, নিজেকে তৈরি করতে পরিশ্রম করুন। একদিন সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন, এমনকি আপনার চেয়ে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের চেয়েও, আপাতদৃষ্টিতে যোগ্যদের চেয়েও।

বিশ্ববিখ্যাত কাওয়াল, খান সাহেব, ওস্তাদ নুসরাত ফাতেহ আলী খান জন্মেছিলেন ১৩ অক্টোবর, ১৯৪৮। পাকিস্তানের তৎকালীন লায়ালপুর, বর্তমান ফয়সালাবাদে। ভারতের পাঞ্জাবের জলন্ধরের ৬০০ বছরের পুরনো কাওয়াল পরিবার। পর্টিশানের সময় মাইগ্রেট করে পাকিস্তান গিয়েছিল। বাবার নাম ফাতেহ আলী খান। ফাতেহ আলী, মোবারক আলী এবং সালামত আলী তিন ভাই ছিলেন। ১৯৬৪ সালে ফাতেহ আলীর মৃত্যুর পরে, মোবারক আলী খলিফা হন, অর্থাৎ তার নেতৃত্বে ছিল তাদের কাওয়াল গ্রুপ। ১৯৭১ সালে মোবারক আলী খানের মৃত্যুর পরে নুসরাত ফাতেহ আলী খান ঘরানার খলিফা হন। তার নামেই তখন থেকে কাওয়াল গ্রুপের নাম হয়।

নুসরাত ফাতেহ আলী খানের যেসব গান আমার বিশেষ পছন্দ:

১. সাসো কি মালা

২. তুম আগার ইউহি নাজরে

৩. আগ দামান মেয়

৪. আজ কোই বাত

৫. আপ সে মিলকে

৬. আব কেয়া সোচে

৭. আফরিন

৮. নুসরাত ফাতেহ আলী খান mere rashke qamar

 

১৯৯৭ সালের ১৬ ই আগস্ট বিশ্বব্যাপী ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

আরও জানুন: