বাঙালি সত্তা ও লোকায়ত দর্শনের সমার্থক হয়ে ওঠা যে ক’জন শিল্পী এদেশের সঙ্গীত ভুবনকে ঋদ্ধ করেছেন, ফরিদা পারভীন (১৯৫৪–২০২৫) তাঁদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নয়, লালন সাঁইজির গানের গবেষক, ধারক ও প্রচারক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। লোকসঙ্গীতে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের কারণে তিনি কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমীর কাছে ‘লালনকন্যা’ ও ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। ৩১ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিনে “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের পক্ষ থেকে এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ব্যক্তিগতভাবে ফরিদা পারভীনকে ঘিরে আমার কিছু স্মৃতির সঞ্চয় রয়েছে। আমার বাড়ি কুষ্টিয়ায় এবং আমরা একই শহরের বাসিন্দা হবার কারণে তাঁকে অনেকবার দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে। এমনকি তাঁর এক সন্তান আমার সহপাঠীও ছিলেন। কাছ থেকে এই গুণী শিল্পীকে দেখা এবং তাঁর সুরের আবহে বেড়ে ওঠা আমার সঙ্গীত ভাবনার এক বড় প্রাপ্তি।
শৈশব ও সঙ্গীতের আদিপাঠ
১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের শাঔঁল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তাঁর পিতা দেলোয়ার হোসেন ছিলেন সাধারণ চিকিৎসক এবং মাতা রৌফা বেগম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূত্রে মাগুরা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া—এই তিন জেলাতেই তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কাটে। পরবর্তীতে তিনি কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাগুরা জেলায় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর হাত ধরে। পরবর্তীতে কুষ্টিয়ায় এসে ওস্তাদ রবীন্দ্রনাথ রায়, মোতালেব বিশ্বাস এবং ওসমান গণির কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের (ক্ল্যাসিক্যাল) তালিম নেন। টানা ৬-৭ বছর তানপুরার সাথে ক্ল্যাসিক্যাল চর্চার পর তিনি নজরুল সঙ্গীতে প্রবেশ করেন ওস্তাদ আবদুল কাদের এবং ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলীর সান্নিধ্যে। ১৯৬৪ সালে নাটোর এবং ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
লালন সাঁইজির দর্শনে অবগাহন ও সত্তরের দশকে উত্থান
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, কুষ্টিয়ায় বসবাসকালীন সময়ে লালন দর্শনের সাথে ফরিদা পারভীনের আত্মিক যোগাযোগ ঘটে। তাঁদের পারিবারিক বন্ধু গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ১৯৭৩ সালে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটির মাধ্যমে লালন সঙ্গীতের তালিম শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের মতো গুণী সাধকদের সান্নিধ্যে এসে তিনি লালন সঙ্গীতের গভীরতা আত্মস্থ করেন।
সত্তরের দশকেই ফরিদা পারভীন জাতীয়ভাবে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তাঁর গাওয়া আধুনিক গান ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ এবং লালনগীতি ‘সত্য বল সুপথে চল’ সমগ্র দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বহুমুখী সঙ্গীত জীবন ও কালজয়ী সৃষ্টি
ফরিদা পারভীন কেবল লালনগীতিতেই আবদ্ধ থাকেননি; তিনি আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানেও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর তালিকা দীর্ঘ:
এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা-সুরমা নদীর তটে
তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম
নিন্দার কাঁটা যদি না বিঁধিল গায়ে প্রেমের কী সাধ আছে বলো
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
বাড়ির কাছে আরশিনগর
তাঁর ডিস্কোগ্রাফিও সমৃদ্ধ। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত লংপ্লে রেকর্ড ‘অচিন পাখি’ থেকে শুরু করে ডন কোম্পানির ‘লালনগীতি’, সারগামের ‘লালনের গান’, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এবং ফ্রান্স ও জাপানে হওয়া লাইভ কনসার্টের অ্যালবামগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা লোকগানকে তুলে ধরেছে।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অর্জন
সঙ্গীত সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ফরিদা পারভীন লাভ করেছেন বহু রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা:
- একুশে পদক (১৯৮৭): সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য।
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩): ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে।
- ফুকুওয়াকা এশীয় সাংস্কৃতিক পুরস্কার (২০০৮): আন্তর্জাতিক স্তরে লোকসংস্কৃতির দূত হিসেবে।
- এছাড়াও তিনি সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস এবং অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারে ভূষিত হন।
জীবনের শেষ অধ্যায় ও সুরলোকযাত্রা
ফরিদা পারভীন ব্যক্তিজীবনে প্রখ্যাত গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী আবু জাফরকে বিয়ে করেছিলেন এবং তিনি চার সন্তানের জননী। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
জীবনের শেষভাগে এসে তিনি কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘ চিকিৎসা ও লড়াইয়ের পর, ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
ফরিদা পারভীন কেবল কণ্ঠ দিয়ে লালন সাঁইজির গান গেয়ে যাননি; তিনি লালনের উদার, মরমি ও মানবতাবাদী বাণীকে শহর থেকে গ্রামে, দেশ থেকে বিদেশে সাধারণ মানুষের অন্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। কণ্ঠের মিষ্টতা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তি—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তিনি লালনগীতিকে দিয়েছিলেন এক অনন্য আভিজাত্য। “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজে ফরিদা পারভীনের জন্মদিনে আমার নিবেদন—যুগ যুগ ধরে বাংলার মেঠো পথে, নদীর কূলে আর বাউলের একতারায় বেঁচে থাকবে তাঁর এই সুর ও সাধনা।
বিনম্র শ্রদ্ধা, বাংলার প্রিয় লালনকন্যা!
আর্টিকেলটি ২০২৬ সালে আপডেট করা হলো।