বৃদ্ধাশ্রম – চোখের পানি না, বাবা-মা নিরাপত্তা চায় – পিতা মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩।

নচিকেতার – ঠিকানা আমার এখন বৃদ্ধাশ্রম….. গানটা দরুন জনপ্রিয় হয়েছে।
মাঝে মধ্যেই দেখি ফেসবুকে বৃদ্ধ মা-বাবা’র অসহায় ছবি পোস্ট দেয় কিছু পাতা। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ে লাইক দেই, ছি ছি লিখে কমেন্ট বাড়াই।

বৃদ্ধাশ্রম - চোখের পানি না, বাবা-মা নিরাপত্তা চায় - পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩।
বৃদ্ধাশ্রম – চোখের পানি না, বাবা-মা নিরাপত্তা চায় – পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩।

মা-বাবা’র প্রতি অবহেলা করে ঐ সন্তানরা অমানুষিক কাজ করছে। কিন্তু আমরাও শেয়ার দিয়ে, লাইক কমেন্ট দিয়ে, সোশাল স্কোর আয় ছাড়া কি কাজটা করছি?
সন্তানেরা যে দায়িত্ব-হীনতার পরিচয় দিচ্ছে, ঠিক সেই একই দায়িত্ব-হীনতার পরিচয় দিচ্ছে আমাদের ‘দায়িত্বশীল’ গণমাধ্যম। বিশ্ব প্রবীণ দিবস (পহেলা অক্টোবর), মা দিবস (মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার) বাবা দিবস (জুন মাসের তৃতীয় রবিবার) আর বিভিন্ন উৎসবের দিনে বৃদ্ধাশ্রমের দায়সারা সংবাদ আর ফিচার দিয়ে শেষ করে দিচ্ছে তাদের দায়িত্ব।

ভাইসব অসহায় মা বাবার লাইক কমেন্ট দরকার নাই। তাদের আর্থিক-সামাজিক নিরাপত্তা দরকার।
আমরা সবাই জানি কাজটা খারাপ। তার পরেও আমাদের মধ্যের কিছু পশুরা কাজটা করি, বাঁকিরা অসহায় চোখ দিয়ে দেখে সহ্য করে যাই। লাইক শেয়ার দিয়ে নিজেদের দায় মেটাই।

এরকম আবেগে উথলে পড়া দু একজনের সাথে কথা বলে আমি খুব অবাক হয়েছি। তারা দরদ দেখিয়ে দু পশলা কেঁদে দিতে রাজি আছে, কিন্তু আমাদের দেশের প্রচলিত আইনেই যে বৃদ্ধ মা-বাবা তাঁর সাবালক ও কর্মক্ষম সন্তানের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মান ও ভরণ পোষণের জন্য আইনের আশ্রয় চাইতে পারেন, এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে ১০ মিনিট সময় দিতে তারা চান না। এ বিষয়ে আমাদের কারো কেন আগ্রহ নেই। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যস্ত তাদের ‘হিট’ বাড়াতে। আর মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আছে তাদের টিআরপি বাড়ানোর ডেইলি এসাইনমেন্ট নিয়ে। বৃদ্ধ মা-বাবাদের প্রাপ্য সম্মান ও ভরণপোষণের জন্য আইনগত অধিকারের বিষয়টি সমাজের সর্বস্তরের জানানোর জন্য তাঁদের প্রায় কোন উদ্যোগ নেই।

আমি সামাজিক গণমাধ্যমে আওয়ামীলীগের দালাল বলে পরিচিত। তাই আপনাদের পছন্দ না হওয়া স্বত্বেও আর একটা দালালি করে যাই।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নবম জাতীয় সংসদে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কল্যাণে পাশ করে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩।’

এ আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানকে পিতা-মাতার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনও সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। প্রত্যেক সন্তান তার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। পিতা-মাতা সন্তান হতে পৃথকভাবে বসবাস করলে সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে।

কোনও পিতা-মাতা সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, প্রত্যেক সন্তান তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমতো উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে। পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি, নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকবে। এ আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ১ (এক) লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এই আইন অনুযায়ী মা-বাবাকে প্রতিকার চাইতে হলে প্রথম শ্রেণির বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লিখিত আবেদন করতে হবে।

দুঃখের বিষয়, আইনটির কোনও প্রয়োগ নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। সরকার এই আইনটি সম্পর্কে সর্বস্তরের জনগণকে জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করলেও আমার-আপনার অসচেতনতার জন্য আইনটি এখনও কাগুজে আইনে পরিণত হয়ে আছে। আর এই কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার পেজে, বিভিন্ন দিবসে পত্রিকার পাতায়-টেলিভিশনের ফুটেজে ভেসে ওঠে কোনও বৃদ্ধ মা-বাবার করুণ কাহিনী।

আসুন না আমরা সচেতন হই। লাইক-কমেন্ট নয়, বৃদ্ধ মা-বাবার দুর্দশা দেখে চোখের পানি ফেলা নয়। আমাদের পরিচিত সবাইকে জানাই, সন্তানদের কাছে প্রাপ্য সম্মান ও ভরণপোষণের আইনগত অধিকার রয়েছে বৃদ্ধ মা-বাবাদের। এজন্য আপনাকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে পথে নামতে হবে না। যখন আপনার পরিচিতর মধ্যে কোন বৃদ্ধ মা-বাবা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে তখন তাঁদের জানান যে তাঁদের জন্য সরকার আইন করে রেখেছে। অবাধ্য সন্তানদের জানান তারা আইন লঙ্ঘন করছে। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয়দের সচেতন করুন এই আইন সম্পর্কে, যেন তারা এই বিষয়ে আইনগত ভাবে সহায়তা করতে পারেন। তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের (পৌরকাউন্সিলার- ইউপি মেম্বার) সরাসরি প্রশ্ন করুন এই আইন সম্পর্কে কতটুকু জানেন। তাদের উদ্বুদ্ধ করুন আইনগতভাবে অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবাদের সহায়তা করতে।

‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে গিয়ে। (আইনটির শর্টকাট লিঙ্ক http://goo.gl/GQx40g)।

আপনার আমার সচেতনতা এনে দিতে পারে এক অসহায় মা-বাবার প্রাপ্য সম্মান- আইনগত অধিকার।

আসুন দুঃখ বিলাস না করে, এই দুঃখটি নির্মূলের কাজে নামি।

[ বৃদ্ধাশ্রম – চোখের পানি না, বাবা-মা নিরাপত্তা চায় – পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩। ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন