মজরুহ সুলতানপুরীর আমি মুগ্ধ ভক্ত। “দর্স এ নিজামী” শেষ করা আলেম, প্রশিক্ষিত হেকিম, জীবনের জন্য বেছে নিলেন কবিতা। কবি হিসেবে তিনি একজন সিরিয়াস কবি। আবার গীতিকার হিসেবে লিখেছেন “চুরা লিয়া”, “প্যাহলা নাশা’ বা “পাপা ক্যাহতেহের” মতো গান। কমিউনিস্ট পার্টির প্রগ্রেসিভ রাইটার্স মুভমেন্ট থেকে যারা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন, ফিল্ম মাধ্যম কে ব্যবহার করেতে চেষ্টা করেছিলেন তাদের আদর্শকে ছড়াতে, মজরুহ তাদের মধ্যে উজ্জ্বল একজন। তিনিও লেখার কারণে জেল খেটেছেন।
মৃত শব্দ থাকে শব্দকোষে। আমরা তাদের বেশিরভাগের কথা ভূলে যাই। দুএকবার টেনে আনলেও প্রাণ দিতে পারি না। সেটাকে শিল্পীরা শিল্পকর্মে এনে জীবন্ত করেন। আর মহান শিল্পরা কোন শব্দ ব্যবহার করার বিশেষ আর্ট, কায়দা বা আন্দাজ দেখিয়ে দেন। সেই কায়দা তেল-কালি দিয়ে সাঁজিয়ে-গুছিয়ে শব্দটাকে “অপরূপ” করে দেয়।
এরকম একজন মহান শিল্পী ছিলেন “মজরুহ সুলতানপুরী”। তিনি গীতিকার হিসেবে হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে এরকম বহু নতুন শব্দ ব্যবহারের আন্দাজ শিখিয়েছিলেন। “সনম”, “জনম” টাইপ বহু শব্দ ফিল্মের গানের ব্যবহারে এনেছিলেন তিনি।
হিন্দি ফিল্মের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম ছিল, পরিচালকের কাছ থেকে সিচুচেয়শন শুনে, সঙ্গীত পরিচালক আগে সুর বানাবেন। এরপর একজন গীতিকার সেই সিচুয়েশন বুঝে, সুর-তাল ফলো করে গানের কথা লিখবেন। গীতিকারকে লিখতে হবে সুরকারের সুর করা নির্দিষ্ট মিটারে। অর্থাৎ নিজের পছন্দমতো মিটারে লেখার কোন স্বাধীনতা ছিল না। কেউ কেউ এই বিষয়টিকে মজা করে বলতেন – আগে কবর খুঁড়ে, এরপর সেই কবরের আকারে মুর্দা খোঁজ করা। সব গীতিকার সেটা মেনেই কাজ করতেন। তাদের সাহিত্যের বিচরণ, সুরকারের বেঁধে দেয়া সুর আর তালের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতেন।
তবে সেসময় একজন একটু আলাদা ছিলেন। তিনিও সবার মতো সুরকে জড়িয়ে ধরে, তার রূপ-রসে মিশে গিয়ে, তার সেরা শব্দ দিয়ে প্রথমে গানটা সাজাতেন। এরপর খুঁজতেন, সুরের মাঝে কোথায় একটু আধটু জায়গা ফাঁকা আছে। সেখানে তিনি ফুলের মতো, বিভিন্ন শব্দ গুজে দিয়ে গানকে সাজাতেন। আবার সে শব্দ, খুব সাধারণ আর দশ জনের প্রতিদিনের ব্যবহার করা শব্দ নয়। বরং কেউ কোনদিন ফিল্মর গানে ব্যবহার করেন নি, এমন সব শব্দ খুঁজে এনে, গুজে দিতেন নিঃশব্দে। গানটা বের হবার পরেই শুধু বোঝা যেত, কি পারমানবিক বোমা তিনি বানিয়ে রেখেছিলেন। তিনি মজরুহ সুলতানপুরী বা আসরার উল হাসান খান। তাকে আমি যেমন দেখি, যেমন অনুভব করি তা নিয়ে আমার মজরুহ সুলতানপুরী।
আমার মজরুহ সুলতানপুরী
মজরুহ সুলতানপুরীর নিচের গান দুটি শুনুন। আর ভাবুন তার সেসব নিয়ে। ফিরছি খুব দ্রুত ..
মজরুহ সুলতানপুরীর জন্ম ১ অক্টোবর ১৯৯৯। উত্তর প্রদেশের সুলতানপুর জেলায়। বাবা পুলিশ বিভাগে কাজ করলেও একটু বেশি রক্ষণশীল ছিলেন। ছেলেকে ইংরেজি পড়ার বদলে পাঠিয়েছিলেন মাদ্রাসাতে। মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে ইউনানি ডাক্তারিতে ভর্তি হন। ছেলেবেলাই থেকেই কাব্য চর্চার চেষ্টা চলছিল। তবে হেকিমি প্র্যাকটিস শুরু করার পরে, হঠাৎ করে এক মুশায়রাতে তিনি তার নিজের একটি গজল পড়েন। প্রচুর প্রশংসা হয়। তারপর মুশায়রাতে যাতায়াত নিয়মিত শুরু হয়। ক্রমশ হেকিমি থেকে মন উঠে যেতে থাকে। মন গিয়ে পড়ে শের/শায়েরিতে। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে কবি হবেন। সেসময় কবি হয়ে ওঠবার জন্য গুরু জরুরী ছিল। মজরুহ তখনকার বিখ্যাত কবি জিগার মুরাদাবদীর শিষ্যত্ব নিয়ে নেন।
এরমধ্যে প্রেম হয় ওই এলাকার তহশিলদারের মেয়ের সাথে। তহশিলদার জামাই হিসেবে এরকম আধা হাকিম-কবিকে মেনে নেবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। ফলে সুলতানপুর তাকে ছাড়তে হয়। এরপর নিয়তি তাকে বম্বে নিয়ে আসে। বম্বেতে একদিন এক মুশায়রাতে সে সময়কার নামী চলচ্চিত্র প্রযোজক, “এ আর কারদার” তার কবিতা শোনেন। শুনেই তার মনে ধরে যায়। এরপর জিগার মুরাদাবাদীর কাছে, কারদার প্রস্তাব রাখেন যে, তার ছাত্র মজরুহ যেন, কারদার এর ফিল্ম এর জন্য গান লেখেন। মজরুহ রাজী ছিলেন না। কারণ সেসময় ফিল্মে কাজ করা খুব একটা সম্মানের ছিল না।
![আমার মজরুহ সুলতানপুরী ১ অক্টোবর ১৯১৯ – ২৪ মে ২০০০ আমার মজরুহ সুলতানপুরী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 2 আমার মজরুহ সুলতানপুরী [ ১ অক্টোবর ১৯১৯ – ২৪ মে ২০০০ ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2018/10/আমার-মজরুহ-সুলতানপুরী-১-অক্টোবর-১৯১৯-–-২৪-মে-২০০০--300x157.jpg)
পাশাপাশি তার চোখে ফিল্মের গান বলতে তার চোখে ছাইপাঁশ ছিল। জিগার মুরাদাবাদী তাকে বোঝান যে, শুধু কবিতা লিখলেই তো হবে না, জীবন ধারণের জন্য একটা কিছু করতে হবে। তাই সে ফিল্মের জন্য গান লিখুক এবং চেষ্টা করুক ফিল্মের গানকে ভালো করতে। পাশাপাশি তার কবিতার চর্চা চলতে থাক। মজরুরহ রাজি হন। সেই রাজি হওয়াই এক ঐতিহাসিক যাত্রার শুরু। সে যাত্রার কথা মজরুহ তার নিজের ভাষায় বলেছেন :
আমি তো একাই চলেছিলাম গন্তব্যের দিকে,
লোকজন যোগ দিতে থাকে, একসময় কাফেলা হয়ে যায়!
Main akela hee chala tha janibe manzil magar,
log saath aate gaye aur carvan banta gaya!
প্রথম দিকে কারদার তাকে নিয়ে যায় আরেকজন কিংবদন্তি সুরকার নওশাদ এর কাছে। কিছু সময়ের মধ্যেই নওশাদ মজরুহ কে দারুণ পছন্দ করে ফেলেন। শুরু হয় শাহজাহান (১৯৪৬) নামের ছবি। দুর্দান্ত হিট হয় ছবি। এই ছবিতে গীতিকার খুমার বারানকাভিরও আত্মপ্রকাশ হয়।

শিল্পীদের সঙ্গে অনেক সুন্দর সুন্দর ঘটনা আছে তার। লতা মঙ্গেশকরকে একবার, খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে, হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। কে বা কারা করেছিলো জানা যায়নি। তবে এই ঘটনার পরে মজরুহ সুলতানপুরী লতাজীর বাড়িতে প্রতিদিন নিয়মিত সন্ধ্যায় যেতেন। অসুস্থ লতাজীর পাশে বসে কবিতা শোনাতেন, গল্প করতেন। এরপর লতাজীর জন্য রান্না করা খাবার, আগে তিনি খেয়ে পরীক্ষা করতেন। তারপর লতাজীকে খাবার অনুমতি দিতেন।
সলিলের “যা রে উড়ে যা রে পাখি”র হিন্দিটা লিখিয়েছিলেন মজরুল সুলতানপুরী কে দিয়ে। ওটাও গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর।
সেই গানে দুটি শব্দের ব্যবহার আমার মনে আলাদা করে গেঁথে আছে।
প্রথমটি “আজব-গাম-কি-আন্ধি”, যার মানে অনেকটা “অদ্ভুত বেদনার কালবৈশাখী”। পরের শব্দটি “আঁসুয়ান”, এর মানে “ক্রন্দসী”।
বাংলাটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, যারা গানের লিরিকে কবিতার মজা নেন, বা যারা শায়েরি পড়েন, তারা বুঝবেন এই আন্দাজটার ওজন কেমন।
চলুন তার কিছু শের দেখে নেই ..
শের
১. اردو: میں اکیلا ہی چلا تھا جانبِ منزل مگر لوگ ساتھ آتے گئے اور کارواں بنتا گیا
Roman: Main akela hi chala tha jaanib-e-manzil magar / Log saath aate gaye aur kaarwaan banta gaya
বাংলা তরজমা: আমি তো একা একাই গন্তব্যের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম! / কিন্তু মানুষ আমার সাথে যোগ দিতে লাগল, আর এক সময় আস্ত এক কাফেলা তৈরি হয়ে গেল।
২. اردو: جلا کے مشعلِ جاں ہم جنوں صفات چلے جو گھر کو آگ لگائے ہمارے ساتھ چلے
Roman: Jala ke mashal-e-jaan hum junoon sifat chale / Jo ghar ko aag lagaaye humare saath chale
বাংলা তরজমা: প্রাণের মশাল জ্বালিয়ে আমি পাগলের মতো ছুটে চলেছি! / নিজের তৈরি সাজানো ঘর যে পোড়াতে পারবে, সে-ই যেন আজ আমার সহযাত্রী হয়।
৩. اردو: یہ بھی کیا کم ہے کہ ہم تجھ سے ملے ہیں دل کے جلنے کا سبب اور کوئی ہو گا
Roman: Yeh bhi kya kam hai ke hum tujh se mile hain / Dil ke jalne ka sabab aur koi ho ga
বাংলা তরজমা: তোমার সাথে যে আমার দেখা হয়েছে, এটাই কি কম প্রাপ্তি! / আমার এই হৃদয় পোড়ার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো গভীর কারণ লুকিয়ে আছে।
৪. اردو: وفا کی راہ میں کانٹے ہی کانٹے تھے مَجروحؔ ہم نے تو ہر قدم پہ اپنے لہو کے دیئے جلائے
Roman: Wafa ki raah mein kaante hi kaante the Majrooh / Hum ne to har qadam pe apne lahu ke diye jalaaye
বাংলা তরজমা: বিশ্বস্ততার এই পথে শুধু কাঁটাই ছড়ানো ছিল হে মজরুহ! / আমরা তো প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের রক্তের প্রদীপ জ্বালিয়ে পথ চলেছি।
আরও দেখুন:
![আমার মজরুহ সুলতানপুরী ১ অক্টোবর ১৯১৯ – ২৪ মে ২০০০ আমার মজরুহ সুলতানপুরী | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 আমার মজরুহ সুলতানপুরী [ ১ অক্টোবর ১৯১৯ – ২৪ মে ২০০০ ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2018/10/আমার-মজরুহ-সুলতানপুরী-১-অক্টোবর-১৯১৯-–-২৪-মে-২০০০-.jpg)