যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সরকারের মানবাধিকার বিষয়ক সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং তার ঠিক পরপরই প্রকাশিত একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে র্যাবের ভূমিকার প্রশংসা—এই দুইয়ের মধ্যে চরম বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী অবস্থান সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মার্কিন প্রতিবেদনের স্ববিরোধিতা ও র্যাবের সাফল্য
মার্কিন প্রতিবেদনের ইতিবাচক পর্যবেক্ষণ:
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নতুন এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে র্যাবের ভূমিকাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, র্যাবের সক্রিয় ভূমিকার কারণে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মজার বিষয় হলো, র্যাব এবং এর সাবেক ও বর্তমান সাত শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাত্র এক সপ্তাহ পরই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে:
‘২০২০ সালে বাংলাদেশে সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত ও গ্রেপ্তার বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কমার ক্ষেত্রে।’
প্রতিবেদনের আরেকটি অংশে র্যাব এবং ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসিইউ)’-এর প্রশংসা করে বলা হয়েছে যে, তারা শুধু গ্রেপ্তার বা দমন নয়, বরং কমিউনিটি পুলিশি কার্যক্রম এবং সন্দেহভাজন বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি উগ্রবাদ মোকাবিলা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
সন্ত্রাস দমনে বিচারিক ও কারিগরি সাফল্য:
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে মাত্র তিনটি সুনির্দিষ্ট সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, যেখানে কারো মৃত্যু হয়নি। এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতারই প্রমাণ। ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হামলার ঘটনায় ২০১৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, সেই আইনি প্রক্রিয়ার সফলতার কথাও মার্কিন নথিতে উঠে এসেছে। এছাড়াও, সীমান্ত সুরক্ষা এবং প্রবেশ মুখগুলোতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে যে আন্তরিক সহযোগিতা করেছে, তারও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এই প্রতিবেদনে। যদিও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে, তবে সেখানেও বাংলাদেশের প্রস্তুতিকে খাটো করে দেখা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত একটি বিস্ফোরক শনাক্তকারী দল ঢাকার বিমানবন্দরে কাজ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) সঙ্গে বাংলাদেশের নিবিড় সহযোগিতার কথা উল্লেখ থাকলেও, প্রতিবেদনে একটি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিষয়ক কোনো সমন্বিত আগাম সতর্ক ব্যবস্থা নেই।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিহীনতা:
এক সপ্তাহ আগেই যেখানে র্যাবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, সেখানে হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞার খড়গ নামিয়ে আনাকে বিশ্লেষকরা দেখছেন এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক চাল হিসেবে। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞা কোনো মানবিক কারণে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি মূলত বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বের পথ থেকে বিচ্যুত করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার একটি ঘৃণ্য প্রচেষ্টা।
নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি ও অযৌক্তিক পরিসংখ্যান:
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পুলিশপ্রধান (আইজিপি) ও র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালকসহ (ডিজি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ করেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তুলে তার প্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা মার্কিন নীতির এক পুরোনো ও বিতর্কিত কৌশল। র্যাব ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অপমানজনক। র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার কোনোটিই শক্তিশালী প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে নয়। গত ১০ বছরে ৬০০ জন নিখোঁজ বা মারা গেছে বলাটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরিণত গণতন্ত্রের দেশ থেকে এ ধরনের অপরিপক্ক ও অপ্রমাণিত অভিযোগ কাম্য নয়। কারণ, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই মানবাধিকারের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ মানুষ নিখোঁজ হয়। যারা নিজেদের দেশে ছয় লাখ মানুষের হদিস দিতে পারে না, তাদের মুখে অন্য দেশের নগণ্য কিছু অমীমাংসিত ঘটনা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা চরম হাস্যকর।
নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও জীবন উৎসর্গ:
কক্সবাজারের টেকনাফে জনৈক একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী সবসময়ই মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার তথ্যানুযায়ী, এই বাহিনীটি মানুষের মানবাধিকার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অতন্ত্র প্রহরী। মাত্র ৯ হাজার সদস্যবিশিষ্ট এই ছোট বাহিনীর এ পর্যন্ত ২৮ জন সদস্য দেশের শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। শুধু তাই নয়, দায়িত্ব পালনকালে এক হাজারেরও বেশি সদস্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং আরও দুই হাজারেরও বেশি সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। যারা অন্যের মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন দেয়, তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তকমা লাগানো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক আইন ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য বিচার নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা।
![]()
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের চিত্র—আয়নায় নিজের মুখ দেখা
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অন্য দেশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিজের দেশের বিশাল ক্ষত আড়াল করে অন্য দেশের ওপর আঙুল তোলা স্রেফ দ্বিচারিতা।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সিনেটর রবার্ট রেইচ কিছুদিন আগে এক টুইট বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের আসল চিত্রটি জনসমক্ষে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কেবল ২০২০ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯৮৪টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্বারা কমপক্ষে ৬ হাজার ৭০০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর গাণিতিক অর্থ দাঁড়ায়, প্রতি বছর গড়ে এক হাজার মানুষ সেখানে বিনাবিচারে মৃত্যুবরণ করছে। এই বিশাল তালিকার মধ্যে ৭ হাজার ৩০৩ জন পুরুষ এবং ২৯৪ জন মহিলা রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩ হাজার ৬০৭ জনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল, ১ হাজার ১১৯ জনের কাছে ছিল ছুরি, আর ২১৬ জন নিহত হয়েছেন গাড়িতে থাকা অবস্থায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলনা পিস্তল থাকার অপরাধে ২৪৪ জনকে গুলি করে মারা হয়েছে এবং ৪২১ জন নিহত হয়েছেন যারা ছিলেন সম্পূর্ণ নিরস্ত্র।
বর্ণবিদ্বেষ ও পদ্ধতিগত বৈষম্য:
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে। দেশটিতে অমানবিক অভিবাসন নীতি এবং প্রচারিত মিথ্যা আখ্যান বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে আরও স্থায়ী করে তুলছে। গণবন্দিত্ব বা ‘মাস ইনকারসারেশন’ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দেশটি প্রায় ব্যর্থ। ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, ২০১৯ সালে মার্কিন পুলিশ ৭৮৩ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই নিহতদের মধ্যে ২০ শতাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ, যদিও মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার সুরক্ষা কেবল বিশেষ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত, যেখানে বর্ণবাদ একটি নিয়মিত অভিশাপ।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মার্কিন আগ্রাসন:
শুধু দেশের ভেতরেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন এবং সোমালিয়ার মতো দেশগুলোতেও সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের নাম করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে চলেছে। এর মধ্যে অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে, যেখানে কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। উইকিলিকসের স্রষ্টা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি আইনের দোহাই দিয়ে যে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকারের ওপর এক বড় আঘাত। সাংবাদিকদের মধ্যে এটি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে যে, সরকার গোপন তথ্য প্রকাশকারী যেকোনো মিডিয়া আউটলেটের বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারে। এমনকি টেক্সাসের এল পাসোতে বর্ণবাদী উন্মাদনায় অনলাইনে একটি পোস্ট করার পর এক ব্যক্তির হাতে ২২ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সহনশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর।

বাংলাদেশের আইনি স্বচ্ছতা ও লবিস্টদের ষড়যন্ত্র
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যপদ্ধতি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে থাকা কুচক্রী মহলের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো প্রায়ই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতাকে তারা উপেক্ষা করে। র্যাবের পক্ষ থেকে বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যখন কোনো অভিযানে দুর্ধর্ষ অপরাধীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, তখনই কেবল আত্মরক্ষার তাগিদে তারা পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়।
আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা:
বাংলাদেশে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবসময়ই তাদের বাহিনীর কোনো সদস্যের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আমাদের দেশে এ ধরনের প্রতিটি ঘটনাই বিচার বিভাগীয় তদন্তসাপেক্ষ। একজন ম্যাজিস্ট্রেট অত্যন্ত নিবিড়ভাবে প্রতিটি বিষয় পরীক্ষা করে দেখেন যে, ঘটনাটি কোনো গাফিলতির কারণে ঘটেছে নাকি স্রেফ একটি দুর্ঘটনা ছিল। যেখানেই গাফিলতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর যেখানে গাফিলতি পাওয়া যায় না, সেখানে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়। সুতরাং, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঢালাও অভিযোগ এখানে ধোপে টেকে না।
লবিস্টদের নীল নকশা ও অপপ্রচার:
অনেকের ধারণা, বাংলাদেশবিরোধী একটি নির্দিষ্ট চক্র, যারা দেশের উন্নয়নকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না, তারাই এই সংকটের মূল কারিগর। এই চক্রটি আন্তর্জাতিক লবিস্টদের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ভুল, মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সরবরাহ করছে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রত করা এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক নষ্ট করা। এই চক্রটি বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র গোপন করে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই এমন একতরফা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
র্যাবের সাহসিকতা ও কৃতিত্ব:
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, উগ্রবাদী জঙ্গি দমন, ভয়াবহ মাদক ব্যবসা নির্মূল এবং মানবপাচার রোধে র্যাবের সাহসী ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শুধুমাত্র র্যাব নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিরুদ্ধেই ভালো-মন্দ অভিযোগ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দেশের একটি বিশেষ বাহিনীকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা কখনোই শুভ লক্ষণ নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলতে চায়। কোনো নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বাংলাদেশের একটি বাহিনীকে এভাবে কলঙ্কিত করা অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য।
![]()
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও আগামীর পথচলা
নিজেদের সুবিধার্থে সকালে এক নীতি এবং বিকেলে আরেক নীতি অবলম্বন করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পুরোনো অভ্যাস। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো দেশ বা নেতা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থি কোনো অবস্থান গ্রহণ করেন, তখনই তারা মানবাধিকার, দুর্নীতি কিংবা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সেই দেশ বা ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে। তাতে কোনো সুফল আসুক আর না আসুক, তারা এই চাপ সৃষ্টির রাজনীতি অব্যাহত রাখে।
নিষেধাজ্ঞার অকার্যকারিতা ও সক্ষমতা:
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে র্যাবের খুব একটা ক্ষতি হবে না। এর আগেও ইউরোপের একটি দেশ র্যাবের জন্য অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, কিন্তু তাতে র্যাবের পেশাদারিত্ব বা অভিযানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধীকে আটক এবং দেশব্যাপী অসংখ্য সফল অভিযানের ক্ষেত্রে র্যাবের রয়েছে অনস্বীকার্য কৃতিত্ব। জঙ্গিবাদ দমন এবং স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে বাংলাদেশ অনেক বেশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের এই ‘নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র’ এখন আর আগের মতো কাজ করছে না। যখন অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয় না, তখনই মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোকে তারা ঢাল হিসেবে বেছে নেয়।
উন্নয়নের পূর্বশর্ত ও বৈশ্বিক বাস্তবতা:
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও, বর্তমানে বাংলাদেশে যে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে, তার প্রধান কারণ এখানকার স্থিতিশীলতা। একারণেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ সবসময়ই আন্তর্জাতিক প্রটোকল, কনভেনশন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

কোনো দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিই শতভাগ নিখুঁত নয়—তা সে বাংলাদেশ হোক কিংবা খোদ যুক্তরাষ্ট্র। র্যাবের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই তোলা হোক না কেন, সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অগ্রহণযোগ্য। কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা বা বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আগে নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা উচিত। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের মতো পথে চলতে চায়। আমরা চাই আত্মমর্যাদার সাথে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে এগিয়ে যেতে।
আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করত। সেই পুরোনো পদ্ধতি এখন আর কাজ করছে না বলেই তারা মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে নতুন ব্যবসা করার প্রয়াস চালাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের সচেতন জনগণ দেশবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিষেধাজ্ঞা সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করবে। আমাদের এখন প্রয়োজন সুসংহত কূটনৈতিক তৎপরতা এবং জাতীয় ঐক্য। সত্য ও ন্যায়বিচারের পথে অবিচল থেকে আমরা আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখব।


![বাসওদার মরিয়ম Maryam of Basoda – Bengali Translation বাসওদার মরিয়ম [ Maryam of Basoda - Bengali Translation ] 7 বাসওদার মরিয়ম [ Maryam of Basoda – Bengali Translation ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2021/04/বাসওদার-মরিয়ম-Maryam-of-Basoda-–-Bengali-Translation-.jpg)

