যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

যুক্তফ্রন্ট ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান) প্রাদেশিক পরিষদের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে গঠিত একটি বিরোধী দলসমূহের সমন্বিত নির্বাচনি জোট। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষ ভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল। মুসলিম লীগের অপশাসন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বাঙালির ন্যায্য অধিকার উপেক্ষার বিরুদ্ধে যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তারই সংগঠিত রাজনৈতিক রূপ ছিল এই যুক্তফ্রন্ট।

১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ৪ ডিসেম্বর ১৯৫৩ তারিখে এটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই জোটে একত্রিত হয় তৎকালীন পূর্ব বাংলার কয়েকটি প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল—আওয়ামী মুসলিম লীগ (মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী), কৃষক শ্রমিক পার্টি (শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক), নেজামে ইসলাম পার্টি (মওলানা আতাহার আলী), বামপন্থী গণতন্ত্রী পার্টি (হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও মাহমুদ আলী সিলেটি) এবং পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল। এই দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটানো।

যুক্তফ্রন্টের প্রধান তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁদের নেতৃত্বে জোটটি একটি ঐতিহাসিক ২১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে, যা পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকারের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হয়।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা [ Jukto front 21 Points ]

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিরোধী জোটের ঘোষিত একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনি ইশতেহার। এটি কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির তালিকা ছিল না; বরং ভাষা, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, প্রশাসনিক সংস্কার, গণতন্ত্র এবং পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা ছিল। পূর্ব বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনমতের শক্তিশালী প্রকাশ এই ২১ দফায় প্রতিফলিত হয়।

এর শুরুতেই একটি নীতিগত ঘোষণা ছিল— কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতির পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না এবং ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নাগরিকদের জীবনধারণের ব্যবস্থা করা হবে। সেসময় বাংলার লোকের অধিকারের বিরুদ্ধে আলাদা করে কথা বললে ইসলাম বিরোধী, পাকিস্তান বিরোধী এমনকি ভারতের দালাল বলে ট্যাগ দেবার সুযোগ ছিল। সেটাকে এড়াতে এই নীতিগত অবস্থান তৎকালীন সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবি গুলো কি কি:

১. বাংলা রাষ্ট্রভাষা:বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হইবে।

২. বিনা ক্ষতিপুরণে জমিদারী ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করিয়া ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ করা হইবে এবং উচ্চ হারের খাজনা ন্যায়সঙ্গতভাবে হ্রাস করা হইবে এবং সার্টিফিকেটযোগে খাজনা আদায়ের প্রথা রহিত করা হইবে।

৩. পাট ব্যবসাকে জাতীয়করণ করার উদ্দেশ্যে তাকে পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে আনয়ন করিয়া পাটচাষীদের পাটের মূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হইবে এবং লীগ মন্ত্রিসভার আমলের পাট কেলেংকারি তদন্ত করিয়া সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তির ব্যবস্থা ও তাহাদের অসদুপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

৪. কৃষি উন্নতির জন্য সমবায় কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হইবে ও সরকারী সাহায্যে সকল প্রকার কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নতি সাধন করা হইবে।

৫. পূর্ববঙ্গকে লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করিবার জন্য সমুদ্র উপকুলে কুটির-শিল্পের ও বৃহৎ শিল্পের লবন তৈয়ারির কারখানা স্থাপন করা হইবে এবং মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার আমলের লবণের কেলেংকারী সম্পর্কে তদন্ত করিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হইবে ও তাহাদের অসদুপায়ে অর্জিত যাবতীয় অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

৬. শিল্প ও কারিগরি শ্রেণীর গরীব মোহাজেরদের কাজের আশু ব্যবস্থা করিয়া তাহাদের পুনর্বসতির ব্যবস্থা করা হইবে।

৭. খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করিয়া দেশকে বন্যা এবং দুর্ভিক্ষের কবল হইতে রক্ষা করিবার ব্যবস্থা করা হইবে।

৮. পূর্ববঙ্গকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শিল্পায়িত করিয়া ও কৃষিকে আধুনিক যুগোপযোগী করিয়া শিল্প ও খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা হইবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমসংঘের মূলনীতি অনুসারে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং সকল প্রকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হইবে।

৯. দেশের সর্বত্র একযোগে প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা হইবে এবং শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।

১০. শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করিয়া শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকরী করিয়া কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হইবে এবং সরকারী ও বেসরকারী বিদ্যালয়সমূহের বর্তমান ভেদাভেদ উঠাইয়া দিয়া একই পর্যায়ভুক্ত করিয়া সকল বিদ্যালয়সমূহকে সরকারী সাহায্যপুষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হইবে এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে।

১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল কানুন বাতিল ও রহিত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিয়া উচ্চশিক্ষাকে সস্তা ও সুবিধাজনক বন্দোবস্ত করা হইবে।

১২. শাসন ব্যয় সর্বাত্মকভাবে হ্রাস করা হইবে এবং তদুদ্দেশ্যে উচ্চ বেতনভোগীদের বেতন কমাইয়া ও নিম্ন বেতনভোগীদের বেতন বাড়াইয়া তাহাদের আয়ের একটি সুসংগত সামঞ্জস্য বিধান করা হইবে। যুক্তফ্রন্টের কোনো মন্ত্রী এক হাজারের বেশী টাকা বেতন গ্রহণ করিবেন না।

১৩. দুর্ণীতি ও স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-রিশওয়াত বন্ধ করার কার্যকরী ব্যবস্থা করা হইবে এবং এতদুদ্দেশ্যে সমস্ত সরকারী ও বেসরকারী পদাধিকারী ব্যবসায়ীর ১৯৪০ সাল হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত সময়ের হিসাব-নিকাশ লওয়া হইবে এবং সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ দিতে না পারিলে তাহাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।

১৪. জন নিরাপত্তা আইন ও অর্ডিন্যান্স প্রভৃতি কালাকানুন রদ ও রহিত করত বিনা বিচারে আটক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হইবে ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার করা হইবে এবং সংবাদপত্র ও সভা-সমিতি করিবার অধিকার অবাধ ও নিরঙ্কুশ করা হইবে।

১৫. বিচার-বিভাগকে শাসন-বিভাগ হইতে পৃথক করা হইবে।

১৬. যুক্তফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম বিলাসের বাড়িতে বাসস্থান নিদিষ্ট করিবেন এবং বর্ধমান হাউসকে আপাতত ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা হইবে।

১৭. বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবীতে যাহারা মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার গুলিতে শহীদ হইয়াছেন, তাহাদের পবিত্র স্মৃতিচি‎‎হ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হইবে এবং তাহাদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইবে।

১৮. ২১ শে ফেব্রুয়ারীকে শহীদ দিবস ঘোষণা করিয়া উহাকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করা হইবে।

১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও সার্বভৌমিক করা হইবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসমূহ পূর্ববঙ্গ সরকারের হাতে আনয়ন করা হইবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থল-বাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তান ও নৌবাহিনীর হেড-কোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণ করত: পূর্ব পাকিস্থানকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হইবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হইবে।

২০. যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা কোন অজুহাতেই আইন পরিষদের আয়ু বাড়াইবে না। আইন পরিষদের আয়ু শেষ হওয়ার ছয় মাস পূর্বেই মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করিয়া নির্বাচন কমিশনের মারফত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করিবেন।

২১. যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভার আমলে যখন যে আসন শূন্য হইবে, তিন মাসের মধ্যে তাহা পূরণের জন্য উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হইবে এবং পর পর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী পরাজিত হইলে মন্ত্রিসভা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিবেন।

সূত্রঃ যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা [ Jukto front 21 Points ], যুক্তফ্রন্টের প্রচার দফতর। জানুয়ারি ১৯৫৪। ৫৬, সিমপসন রোড, ঢাকা।

 

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে গঠিত পূর্ববঙ্গ মন্ত্রীসভা

 

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার “প্রধান চারটি” দফা:

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার “প্রধান চারটি” দফা ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল। এগুলোই পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রেও এই দাবিগুলোকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।

১) বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এই দাবিটি পূর্ব বাংলার মানুষের আবেগ, আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক অধিকারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই দফা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে দেয়।

২) জমিদারি প্রথা বিলোপ ও কৃষকের জমির অধিকার

এটি পূর্ব বাংলার কৃষকসমাজকে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে একত্রিত করতে বড় ভূমিকা রাখে। গ্রামীণ ভোটব্যাংকে এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

৩) ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার

এই দফা যুক্তফ্রন্টকে ছাত্রসমাজ, মধ্যবিত্ত ও শহুরে জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

৪) পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন

অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা থাকবে; বাকি সব ক্ষমতা পূর্ব বাংলার হাতে থাকবে। এই দাবিকেই পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার বীজরূপ বলা হয়।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ভাষা-সংক্রান্ত মোট ২টি গুরুত্বপূর্ণ দফা ছিল (রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি ও শহীদ দিবস ঘোষণা, সরকারি ছুটি, শহীদ মিনার নির্মাণ)। এই দুটি দফার মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট মূলত ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে জনগণের আবেগ ও দাবিকে নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির রচয়িতা:

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির মুখ্য রচয়িতা ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ। তিনি এই কর্মসূচির মূল কাঠামো ও অধিকাংশ দফা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তবে এটি কোনো একক ব্যক্তির সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রচনা ছিল না। ২১ দফা কর্মসূচির বিভিন্ন দাবি পূর্ব বাংলার দীর্ঘদিনের গণআন্দোলন ও জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এসব দাবির ওপর আলোচনা, পরামর্শ ও সংশোধনী প্রদান করেন।

বিশেষ করে শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সম্মিলিত নেতৃত্ব এই কর্মসূচি চূড়ান্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ফলাফল:

একুশ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করে। এই নির্বাচনে পূর্ববাংলা আইন পরিষদের মোট ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। অনেক জনপ্রিয় বাংলা উৎসে ২২৮টি মুসলিম আসন বলা হলেও, অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক রেকর্ডে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে মুসলিম আসনের সংখ্যা ছিল ২৩৭ এবং এর মধ্যে যুক্তফ্রন্ট জেতে ২২৩টি আসন

এই বিপুল বিজয় ছিল মূলত ২১ দফা ইশতেহারের জনমুখী আবেদন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা, মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবির সরাসরি প্রতিফলন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি, জমিদারি উচ্ছেদ, কৃষকের ন্যায্য অধিকার, শিক্ষা সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মতো দাবিগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলে। ফলে গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র যুক্তফ্রন্টের পক্ষে এক গণজোয়ার তৈরি হয়।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়। ক্ষমতাসীন দলটি মাত্র ৯টি মুসলিম আসন পায় এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন নিজ আসনেও পরাজিত হন। এই ফলাফল কার্যত পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ফলাফল শুধু একটি নির্বাচনি বিজয় ছিল না; এটি ছিল বাঙালির ভাষা, স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে এক ঐতিহাসিক গণরায়। পরবর্তীকালে এই বিজয়ই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে এবং ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে সুগম করে।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা । ১৯৫৫ সালের ৫ জুন । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

বঙ্গবন্ধু ও চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা:

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাত বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। যে মুসলিম লীগ পাকিস্তান আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রেখে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই দলই এই নির্বাচনে কার্যত জনসমর্থন হারিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। এর বিপরীতে কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব গণসমর্থন লাভ করে। সমকালীন রাজনীতিতে এই জোটকে অনেকেই হক–ভাসানী–সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট বলেও অভিহিত করতেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ আমলে একাধিকবার অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন; অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালে একই পদে নির্বাচিত হন। এরও আগে তিনি শেরেবাংলার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই দুই প্রবীণ নেতার সঙ্গে পরবর্তীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-র যোগে পূর্ব বাংলার বিরোধী রাজনীতি নতুন শক্তি লাভ করে।

এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান-এর সম্পর্কও ছিল শৈশব থেকেই। ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে গেলে ১৮ বছর বয়সী মুজিবের সংগঠকসুলভ ব্যক্তিত্বে তারা মুগ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে এই তরুণই পূর্ব বাংলার জনরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর প্রথম সভাপতি হন মওলানা ভাসানী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হলেও মুসলিম লীগ সরকার নানা কূটকৌশলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল করে। এরপর তিনি আর কখনও সংসদীয় নির্বাচনে অংশ না নিলেও জনমত গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। তাঁর বক্তৃতা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করতে অসাধারণ ভূমিকা রাখত।

যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা প্রত্যেকেই চাইতেন—ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর মতো জনপ্রিয় নেতারা যেন তাদের এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণায় যান। একই সঙ্গে সে সময় মাত্র ৩৪ বছর বয়সী শেখ মুজিবও ছিলেন এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় বক্তা ও সংগঠক; জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে তাঁর সভা-সমাবেশ ছিল বিপুল জনসমাগমের কেন্দ্র। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর মুসলিম লীগের পায়ের নিচে মাটি ক্রমেই সরে যেতে থাকে। ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত একুশে ফেব্রুয়ারির পর দলটি জনধিক্কৃত শক্তিতে পরিণত হয়। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগ দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে, আর তরুণ শেখ মুজিব জেলা থেকে জেলা, মহকুমা থেকে মহকুমায় সভা করে দলকে তৃণমূলভিত্তিক সংগঠনে রূপ দেন।

তিনি শুধু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিস্তারেই মনোযোগ দেননি; পাশাপাশি ছাত্রলীগকে শক্তিশালী করতেও বিশেষ গুরুত্ব দেন। ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্রসমাজের প্রতি জনগণের আস্থা ও মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। ফলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে ছাত্রসমাজের প্রচারাভিযান একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়। মুসলিম লীগের অপশাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, প্রশাসনিক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় বাঙালির স্বল্প প্রতিনিধিত্ব—সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এই ক্ষোভের রাজনৈতিক রূপই ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট গঠনের ভিত্তি নির্মাণ করে।

এ কে ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে ছিল চারটি প্রধান দল—আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতান্ত্রিক দল। জোটের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৫৪ সালের ৮–১২ মার্চ অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তোলা। নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্তফ্রন্ট যে ঐতিহাসিক ২১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে, তা ছিল মূলত পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। এতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, জমিদারি প্রথা বিলোপ, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, সমবায়ভিত্তিক কৃষি, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষির আধুনিকায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সব কালাকানুন রহিতকরণ, দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ভাষাশহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মতো যুগান্তকারী দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই ২১ দফা শুধু একটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল না; এটি ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে একটি জনমুক্তির রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান—সকলেই এই দাবিগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন। বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের সহায়তায় যুক্তফ্রন্টের নেতারা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত গিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে সক্ষম হন। বিশেষত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, এবং বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর ধরপাকড়—এসব বিষয় জনমনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রবল বিরূপতা সৃষ্টি করে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো—শেখ মুজিব প্রথমদিকে যুক্তফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে সংশয়ী ছিলেন। তাঁর মূল্যায়ন ছিল, আওয়ামী লীগ এককভাবেই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জয়ের মতো শক্তি অর্জন করেছে। তিনি মনে করতেন, যুক্তফ্রন্ট গঠন করলে কিছু দুর্বল বা নামসর্বস্ব দল অযথা রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে এবং ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতারা মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—“দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই; যুক্তফ্রন্ট করা মানে কিছু মরা লোককে বাঁচিয়ে রাখা”—এই রাজনৈতিক আশঙ্কারই বহিঃপ্রকাশ। তবু দলের সিনিয়র নেতাদের মতামতকে সম্মান জানিয়ে তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। এখানেই তাঁর দলীয় শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নেতৃত্বের পরিপক্বতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাস্তবেও তাঁর আশঙ্কার কিছুটা সত্যতা দেখা যায়। যেখানে আওয়ামী লীগ এককভাবে জিততে পারত, সেখানে শরিক দলগুলো নানা আসনে মনোনয়ন দাবি করে। অনেক ত্যাগী আওয়ামী লীগ কর্মী মনোনয়ন না পেলেও এমন লোকও প্রার্থী হন, যারা কয়েক মাস আগেও মুসলিম লীগে ছিলেন। এতে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তবু বৃহত্তর গণঐক্যের স্বার্থে শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে বিজয় ছিনিয়ে আনেন।

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল ফজলুল হককে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে শুরুতেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রস্তাব করা হলেও ফজলুল হক শেখ মুজিবকে মন্ত্রিসভায় নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন যে, হক সাহেব স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—তিনি শেখ মুজিবকে তাঁর মন্ত্রিসভায় নেবেন না। তখন সোহরাওয়ার্দী যুক্তি দেন, আওয়ামী লীগের কাকে মন্ত্রী করা হবে, তা আওয়ামী লীগের নেতারাই নির্ধারণ করবেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও শেখ মুজিব ক্ষমতার প্রতি অনাসক্ত থেকে বলেন—“আমাকে নিয়ে গোলমাল করার প্রয়োজন নেই। আমি মন্ত্রী হতে চাই না।” এই উক্তি তাঁর ক্ষমতাবিমুখতা, দলীয় ঐক্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাজনীতিকে দেখার বিরল দৃষ্টান্ত।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা খুব দ্রুতই সত্য প্রমাণিত হয়। মাত্র তিন মাসের মধ্যে, ১৯৫৪ সালের ৩০ মে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর শাসন জারি করেন। ফলে বোঝা যায়, যুক্তফ্রন্টের ভেতরে মতপার্থক্য ও বহুদলীয় সমন্বয়ের জটিলতা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা পায়নি। শেখ মুজিব যে শুরু থেকেই জোটের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তা অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

তবু এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে আরও পরিণত করে। ২১ দফায় যে ভাষার মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবি ছিল, তারই দীর্ঘ রাজনৈতিক বিবর্তিত রূপ আমরা পরবর্তীকালে তাঁর ছয় দফা-য় দেখি। অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা ছিল ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর, যার পূর্ণাঙ্গ রূপ স্বাধীনতার সংগ্রামে বিকশিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষের মুক্তি, বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তাঁর নিজের ভাষায়, “একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।” এই মানবিক ও জাতীয় চেতনার আলোতেই ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টে তাঁর অংশগ্রহণকে বুঝতে হবে। তিনি হয়তো শুরুতে জোট নিয়ে সংশয়ী ছিলেন, কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে জনগণের বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন—এটাই তাঁর রাজনৈতিক মহত্ত্বের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।

Leave a Comment