রাগ বাগেশ্রী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বাগেশ্রী রাগের মায়া আমার কানে প্রথম লেগেছিল নজরুলের সেই কালজয়ী গান—“হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে” থেকে। তখন রাগের ব্যাকরণ বুঝতাম না, জানতাম না এর চলন কিংবা স্বরবিন্যাস। সেই যুগের কাব্যশৈলী বর্তমানের নিরিখে কিছুটা অনাধুনিক মনে হলেও, গানের সুরটি আমাকে এক অবর্ণনীয় ঘোরে আচ্ছন্ন করে রাখত। সুরের কিছু বাঁক হৃদয়ের গহীনে এমনভাবে বিঁধে যেত যে, বারবার শুনলেও তৃপ্তি মিটত না।

Table of Contents

রাগ বাগেশ্রী

পরবর্তীতে যখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নেশা রক্তে মিশল, তখন নতুন করে গানটি শুনে বিস্ময়ে থমকে গেলাম। বুঝলাম, সেই শৈশবের মুগ্ধতার কারিগর ছিল মূলত বাগেশ্রীর জাদু। এই রাগের যে ‘সিগনেচার’ চলন, ঠিক সেই অংশগুলোই অজান্তে আমার মনের মণিকোঠায় গেঁথে গিয়েছিল।

রাগের পরিচয় ও প্রকৃতি

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রাচীন রাগ এই বাগেশ্রী। গবেষকদের মতে, আদি যুগে এর নাম ছিল ‘বাগেশ্বরী’। এটি কাফী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ। বাগেশ্রী মূলত মধ্যরাত্রির রাগ। কলকাতা সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমির নিদান অনুযায়ী, রাত ১০টা থেকে ১২টা হলো এই রাগ শোনার শ্রেষ্ঠ সময়।

বাগেশ্রীর মূল রস হলো ‘শৃঙ্গার’। তবে এ মিলনান্তক শৃঙ্গার নয়, বরং বিরহ-বিধুর শৃঙ্গার। প্রেয়সীর জন্য আকুল প্রতীক্ষার যে বেদনা, তা এই রাগের আলাপে মূর্ত হয়ে ওঠে। এর প্রতিটি মীড় আর গমকে মিশে আছে অনুযোগ, অভিমান, এক তৃষ্ণার্ত অপেক্ষা এবং প্রতিদানহীন ভালোবাসার আর্তি। জোছনা প্লাবিত নির্জন রাত আর বাগেশ্রী—এই যেন একে অপরের পরিপূরক।

রূপ ও অবয়ব

বাগেশ্রীর একটি বিশেষ গুণ হলো এর স্পষ্ট অবয়ব। এটি এমন এক রাগ, যা অল্প সময়ের বিস্তারেও নিজের পূর্ণ রূপ শ্রোতার সামনে মেলে ধরতে পারে। তাই এই রাগটি চেনার জন্য খুব উচ্চমার্গের কান না হলেও চলে; সাধারণ শ্রোতাও এর চলন দেখে একে চিনে নিতে পারেন। বাগেশ্রী সাধারণত মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বেশি খেলা করে, যা সুরকে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও গভীরতা দান করে।

সুরচিকিৎসা ও প্রয়োগ

মিউজিক থেরাপি বা সুরচিকিৎসায় বাগেশ্রীর বিশেষ কদর রয়েছে। বলা হয়, যাদের অনিদ্রারোগ বা দুশ্চিন্তার আধিক্য আছে, শোবার আগে বিলম্বিত লয়ে বাগেশ্রীর আলাপ তাদের স্নায়ুকে শান্ত করে। এই রাগের শান্ত ও সমাহিত প্রকৃতি মনের অস্থিরতা কমিয়ে প্রশান্তি বিলিয়ে দেয়।

এই রাগটি বিস্তারের জন্য বিশাল এক ক্যানভাস দেয় শিল্পীকে। ফলে ধ্রুপদ, খেয়াল থেকে শুরু করে গজল—সবখানেই এর বিচরণ অবাধ। শুধু কণ্ঠসঙ্গীত নয়, যন্ত্রসঙ্গীতেও সেতার, সুরবাহার কিংবা বাঁশিতে বাগেশ্রীর অসংখ্য মনোহর কম্পোজিশন যুগ যুগ ধরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আসছে। বলিউডের স্বর্ণযুগের প্লেব্যাক থেকে আধুনিক গান—সবখানেই বাগেশ্রী নিজের রাজকীয় উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

বিবর্তন ও বর্তমান রূপ

বাগেশ্রী একটি অতি প্রাচীন ও গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। সময়ের আবর্তে এবং বিভিন্ন ঘরানার প্রভাবে এই রাগের চলন ও স্বর ব্যবহারে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে মূল কাঠামো ঠিক রেখেও অন্তত তিন-চার রকমের বাগেশ্রীর রূপ প্রচলিত। শাস্ত্রীয় ব্যাকরণের নীরস আলোচনায় যাওয়ার আগে মনটাকে সিক্ত করে নেওয়া যেতে পারে কিছু কালজয়ী সুর দিয়ে—যেখানে বিদ্রোহী ও বিরহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখনীতে এই রাগের এক অনন্য মাধুর্য ফুটে উঠেছে।

পণ্ডিত রামাশ্রেয় ঝাঁ-র বিশ্লেষণ এবং খাজা খুরশিদ আনোয়ারের ‘রাগমালা’-র মতো আকর গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই রাগের আরোহ-অবরোহে ঋষভ (রা) এবং পঞ্চম (পা)-এর প্রয়োগ নিয়েই মূলত প্রধান ভিন্নতাগুলো তৈরি হয়েছে। এই দুটি স্বরের ওপর ভিত্তি করে কেউ একে ঔড়ব, কেউ সাড়ব, আবার কেউ সম্পূর্ণ জাতির রাগ হিসেবে গেয়ে থাকেন।

স্বর বিন্যাস ও জাতির বিশ্লেষণ

  • আদি বাগেশ্রী: প্রাচীন বা শুদ্ধ বাগেশ্রীর কাঠামোতে আরোহণকালে ঋষভ ও পঞ্চম উভয়ই বর্জিত থাকে এবং অবরোহণে কেবল পঞ্চম বর্জিত হয়। সেক্ষেত্রে এর জাতি দাঁড়ায় ঔড়ব-সাড়ব

  • জনপ্রিয় বর্তমান রূপ: বর্তমানে যে বাগেশ্রী সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তাতে আরোহণক্রমে অত্যন্ত দুর্বল এবং বক্রগতিতে পঞ্চম (পা) ব্যবহার করা হয়। এর ফলে রাগের জাতি বদলে হয় ‘সাড়ব-সম্পূর্ণ’। এই পঞ্চমের ব্যবহার অত্যন্ত নিপুণ; সাধারণত অবরোহণকালে সরাসরি পঞ্চম স্পর্শ না করে ধৈবত (ধা) থেকে মধ্যমে (মা) নেমে এসে পুনরায় পঞ্চমকে ছুঁয়ে ধৈবতে স্থিতি নেওয়া হয়। ডাগর ঘরানার ধ্রুপদ গায়কীতে এই পঞ্চমের অতি সূক্ষ্ম ও নান্দনিক প্রয়োগের সার্থক উদাহরণ পাওয়া যায়।

  • সম্পূর্ণ রূপ: আবার কোনো কোনো ঘরানায় আরোহণে ঋষভ যুক্ত করে একে ‘সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ’ জাতির রাগ হিসেবেও পরিবেশন করা হয়।

কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও চলন

এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও বাগেশ্রীর মূল মেজাজ ফুটে ওঠে এর ধৈবত (ধা) এবং মধ্যম (মা) স্বরের নিবিড় সংলাপে। ধৈবত স্বরটির বহুত্ব বা বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে রাগের একটি বিশেষ আভিজাত্য তৈরি হয়। কারিগরি দিক থেকে বাগেশ্রীর চলনে কোমল গান্ধার (জ্ঞা) স্বরটি সরাসরি ব্যবহৃত না হয়ে কিছুটা বক্রভাবে প্রযুক্ত হয়। বিশেষ করে মধ্যম ও কোমল গান্ধারের (ম-জ্ঞা) পৌনঃপুনিক ব্যবহার বিরহের এক গভীর আবহ সৃষ্টি করে। একইভাবে ষড়জ ও মধ্যমের (সা-মা) সরাসরি সংযোগ এই রাগের অন্যতম প্রধান চেনারূপ।

সংগীতপিপাসু শ্রোতা যদি রাগের এই মৌলিক চরিত্রটি—অর্থাৎ মধ্যমের প্রাধান্য এবং পঞ্চমের বক্র চলনটি ধরতে পারেন—তবে বিভিন্ন শিল্পীর গায়কীতে বাগেশ্রীর যে অজস্র রঙের খেলা দেখা যায়, তার সবটুকুই তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে উপভোগ করতে পারবেন।

রাগ বাগেশ্রী

রাগ বাগেশ্রীর শাস্ত্র [Grammar of this Raga]

কাফী ঠাটের অন্তর্গত এই রাগের গান্ধার ও নিখাদ কোমল; কিন্তু ঋষভ ও ধৈবত শুদ্ধ। বাগেশ্রী একটি অত্যন্ত সুমধুর ও গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর চলন সাধারণত মন্দ্র এবং মধ্য সপ্তকেই বেশি ফুটে ওঠে। আরোহণের সময় ‘পঞ্চম’ (পা) বর্জিত থাকে, কিন্তু অবরোহণে এটি মৃদুভাবে ব্যবহৃত হয়। কোমল গান্ধারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব এবং মধ্যমকে কেন্দ্র করে যে মীড় ও গমকের কাজ হয়, তা এই রাগের প্রাণ। এটি মূলত বিরহ ও শৃঙ্খলিত প্রেমের অনুভুতি প্রকাশ করে।

  • আরোহণ: স জ্ঞা ম ধা নী র্স
  • অবরোহণ: র্স নী ধা, ম ধা গ ম রে স
  • ঠাট: কাফী
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম)
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (স)
  • অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান
  • সময়: রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর (মধ্যরাত)

 

রাগের মূল অবয়বটি দ্রুত চেনার জন্য কয়েকটি প্রচলিত পকড়:

  • ধ্ ণ্ স, ম জ্ঞ র স
  • ম প ধ ম, জ্ঞ র স
  • ধা ম জ্ঞা ম রে স
  • ধ্ ণ্ স ম, ধ প ধ ম জ্ঞ
  • ম প ধ জ্ঞ (এখানে প খুবই লঘু বা ‘অল্পত্ব’ হিসেবে ব্যবহৃত)

রাগের ছাঁচটা মনে বসাতে কিছু রাগাশ্রয়ী গান শোনার অভ্যাস করলে ভালো হয়। বিভিন্ন ধারার কিছু বেছে দিচ্ছি। গানগুলো শুনতে থাকুন আর কমন সুরগুলো খেয়াল করতে থাকুন।

 

কণ্ঠে বাগেশ্রী

নজরুল গীতে রাগ বাগেশ্রীর সঠিক অবস্থান:

নজরুলের অজস্র সৃষ্টিই রাগাশ্রয়ী। যেসব গানে তিনি নির্দিষ্ট রাগের কাঠামো ব্যবহার করেছেন, সেখানে মূল রাগের অবয়ব বা ব্যাকরণ বজায় রাখার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান; সুরের পথ থেকে তিনি খুব একটা বিচ্যুত হননি। এ কারণেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঠিক স্বরলিপি এবং রাগের চলন বোঝার জন্য নজরুলের গানগুলো শ্রোতা বা শিক্ষার্থীর ‘কান’ তৈরিতে বিশেষভাবে সহায়ক বলে আমি মনে করি।

১. হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে: এটি বিশুদ্ধ বাগেশ্রী রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এটি বাগেশ্রীর চলন বোঝার জন্য অন্যতম সেরা উদাহরণ।

২. আর লুকাবি কোথায় মা কালী: এই শ্যামাসঙ্গীতটি মূলত বাগেশ্রী  রাগে পান্নালাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৩. চাঁদের পেয়ালাতে আজি: এটিও বাগেশ্রী রাগের ওপর আধারিত। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গায়কিতে বাগেশ্রীর বাইরেও মাঝে মধ্যে একটু উঁকি দিয়েছেন।

৪. সংসারেরই দোলনাতে মা: এটি মূলত বাগেশ্রী রাগের একটি জনপ্রিয় ভজন/শ্যামাসঙ্গীত।

৫. চাঁদ হেরিছে চাঁদমুখ তার (রাগঃ বাগেশ্রী, তালঃ কাওয়ালি)

৬. আমি ময়নামতীর শাড়ি দেবো: এটি মূলত একটি লোকজ সুর বা ঝুমুর অঙ্গের গান, যা রাগপ্রধানের চেয়েও লৌকিক ছাঁচে বেশি গড়া।

৭. আবার শ্রাবণ এলো ফিরে

 

রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাগ বাগেশ্রী:

রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহু সৃষ্টিতে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময়ই নিজেকে রাগের ধরাবাঁধা ব্যাকরণে আটকে রাখতে চাননি। সুরের প্রয়োজনে তিনি প্রায়শই রাগের চেনা কাঠামো অতিক্রম করে গিয়েছেন। তাই আমার সীমিত উপলব্ধিতে মনে হয়, বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গানের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তাঁর গান সবসময় উপযুক্ত নয়; বরং সেখানে রাগের চেয়ে ‘ভাব’ এবং ‘সুরের মুক্তি’ অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

১. নিশীথ শয়নে ভেবে রাখি মনে (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়)

২. যে রাতে মোর দুয়ারগুলি (ইন্দ্রনী সেন)

৩. দুঃখ দিয়ে মেটাব দুঃখ তোমার

৪. সঘন গহন রাত্রি (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)

 

গজলে রাগ বাগেশ্রী:

গজলে বাগেশ্রী ব্যবহারের একটি বড় কারণ হলো এর ‘নি-ধা-মা’ বা ‘মা-গা-রে-সা’ চলন, যা খুব সহজেই শ্রোতার মনে এক ধরণের ‘নিবিড় বিষাদ’ বা ‘অপেক্ষার হাহাকার’ তৈরি করতে পারে। গজলের প্রতিটি পঙক্তির শেষে যখন শিল্পী বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারে এসে স্থিতি নেন, তখন সেই গজলটি সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে।

বাগেশ্রী গজলের জন্য দারুণ রাগ। কিছু গজলের লিংক দেয়া হলো। শুনে দেখা যেতে পারে।

১.মেহদি হাসানের গজল :

১.১ Kaise kaise log hamare jee ko jalane : এটি বিশুদ্ধ বাগেশ্রী রাগের ওপর ভিত্তি করে গাওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ গজল। মেহদি হাসান এই গানে বাগেশ্রীর ‘আন্দোলন’ এবং বিরহের মেজাজটি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা গজল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পাঠ্যপুস্তকতুল্য।

১.২ Dilki baat labope – Ust. Mehdi Hassan : এটিও বাগেশ্রী রাগের একটি ভাল উদাহরণ।

২. গুলাম আলির গাওয়া:

২.১ Chaman Mein Rang-e-Bahar : এটি মূলত বাগেশ্রী রাগের একটি পরিবেশনা। গুলাম আলির গায়কিতে এখানে বাগেশ্রীর গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এক ধরণের আলঙ্কারিক চপলতাও লক্ষ্য করা যায়।

৩.ফরিদা খানমের গাওয়া:

৩.১ মীর্জা গালিব এর গজল – Yeh Na Thi Hamari : মির্জা গালিবের এই অমর গজলটিতে ফরিদা খানম বাগেশ্রী রাগের এক বিষাদময় আবহ তৈরি করেছেন। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ ‘হরকত’ বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

৪. আবিদা পারভিন এর গাওয়া

৪.১ Yar tha gulzar tha bad-e-saba thi main na tha : এটি বাহাউদ্দিন জাকারিয়ার লেখা সুফিয়ানা কালাম হিসেবেও পরিচিত। এটি মূলত বাগেশ্রী রাগের ওপর আধারিত। আবিদা পারভিনের কণ্ঠে এই গজলটিতে এক ধরণের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা (Sufi Trance) তৈরি হয়, যা বাগেশ্রীর সাধারণত শান্ত মেজাজকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়।

৫. Dil Mein Ab -by Basavi Mukherji : বাসবী মুখোপাধ্যায়ের গায়কিতে আধুনিক গজল আঙ্গিকে বাগেশ্রীর প্রয়োগ দেখা যায়।

 

রাগ বাগেশ্রী নিয়ে প্লেব্যাক:

বাগেশ্রী রাগে অনেক হিট ফিল্মের গান হয়েছে। সেসব গানের থেকে কিছু গান এর রেফারেন্স যুক্ত করা হল।

১. Aaja re pardesi (Madhumati): সলিল চৌধুরীর এই অমর সৃষ্টিটি বিশুদ্ধ বাগেশ্রী রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি বাগেশ্রীর রহস্যাবৃত ও অপেক্ষার মেজাজকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।

২. Jao jao nand ke lala (Rangoli): এটি বাগেশ্রী রাগের একটি শাস্ত্রীয় ধাঁচের গান, যা মূলত একটি বন্দিশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। লতা মঙ্গেশকরের গায়কিতে এটি অসাধারণ।

৩. Na bole radha na bole (Azaad): এই অত্যন্ত জনপ্রিয় গানটি মূলত রাগ কানাড়া এবং বাগেশ্রী-র সংমিশ্রণ। তবে এটি মূলত রাগ বাগেশ্রী-র চেয়েও রাগ ধনশ্রী বা কানাড়া অঙ্গের কাছাকাছি। তবে অনেকেই একে মিশ্র বাগেশ্রী হিসেবেও লিখে গেছেন করেন।

৪. Bedardi dagabaaz (Bluffmaster): এটি বাগেশ্রী রাগের একটি অত্যন্ত চপল ও দ্রুত লয়ের গান। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে এটি বাগেশ্রীর একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

৫. Humse aaya na gaya (Dekh Kabir Roya): মদন মোহনের সুর করা এই গজলটি তালত মাহমুদের কণ্ঠে বাগেশ্রী রাগের বিষাদ ও আর্তি প্রকাশের শ্রেষ্ঠ উদাহরণগুলোর একটি।

৬. Jaa re beimaan tujhe (Private Secretary): মান্না দের দরাজ গলায় বাগেশ্রীর শাস্ত্রীয় চলনটি এই গানে খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।

৭. Jaag dard-e-ishq jaag (Anarkali): হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া এই দ্বৈত গানটি রাগ বাগেশ্রী-র একটি অত্যন্ত ধ্রুপদী রূপ। সি. রামচন্দ্রন এর সুর করেছিলেন।

৮. Kaise kate rajani (Kshudito Pashan): ওস্তাদ আমির খাঁ সাহেবের কণ্ঠে এই বাগেশ্রীর অপুর্ব একটি গান। আলি আকবর খাঁ সাহেব এর সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন।

 

**** ইচ্ছে আছে বাগেশ্রীতে যেসব আধুনিক, টাপ্পা, হরি, কাজরি, চৈতি আছে সেগুলোর লিংক যুক্ত করবো। কেউ এরকম লিংক পেলে কমেন্টে যুক্ত করে সহায়তা করলে কৃতজ্ঞ থাকব।

 

রাগ বাগেশ্রীতে ধ্রুপদ/ধামার:

বাগেশ্রিতে অসাধারন সব ধ্রুপদের কম্পজিশন আছে। এই লেখায় কয়েকটি যুক্ত করা হল।

১. সিনিয়র ডাগর ভ্রাতৃদ্বয় (নাসির মঈনুদ্দিন ও নাসির আমিনুদ্দিন ডাগর): তাঁদের ‘The Royal Collection of Mewar’ অ্যালবামের বাগেশ্রী আলাপটি ধ্রুপদ জগতের একটি কালজয়ী দলিল। তাঁদের কণ্ঠের গম্ভীর অনুরণন বাগেশ্রীর আদি রূপটি প্রকাশ করে।

২. জুনিয়র ডাগর ভ্রাতৃদ্বয় (নাসির জহিরুদ্দিন ও নাসির ফৈয়াজুদ্দিন ডাগর): তাঁদের গাওয়া বাগেশ্রী ধ্রুপদ (বিশেষ করে ‘আলাপ’ অংশটি) ধ্রুপদ বাণীর নির্যাসটুকু ফুটিয়ে তোলে।

৩. পণ্ডিত সিয়া রাম তিউয়ারি (দরভাঙ্গা ঘরানা): দরভাঙ্গা ঘরানার বলিষ্ঠ গায়কীতে তাঁর প্রায় ১১ মিনিটের সেই ধামার কম্পজিশনটি (ECSD 2771) লয়কারির এক অনন্য নিদর্শন।

৪. পণ্ডিত আশীষ সাংকৃত্যায়ন (ডাগর ঘরানা): তাঁর গাওয়া বাগেশ্রী আলাপ এবং ধামার ধ্রুপদের বর্তমান সময়ের শুদ্ধতম প্রয়োগগুলোর একটি।

৫. ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা): যদিও তিনি খেয়ালের জন্য বিখ্যাত, তবে তাঁর গাওয়া বাগেশ্রী ধামার এবং নোম-তোম আলাপ আগ্রা ঘরানার ধ্রুপদী আভিজাত্যকে তুলে ধরে।

৬. ওস্তাদ এইচ. সায়িদুদ্দিন ডাগর: ডাগর পরিবারের এই গুণী শিল্পীর বাগেশ্রী আলাপ অত্যন্ত ধীর লয়ের এবং প্রতিটি স্বরের ওপর তাঁর নিখুঁত দখল শ্রোতাকে এক অপার্থিব শান্তি দেয়।

৭. গুন্দেচা ভ্রাতৃদ্বয় (উমাকান্ত ও রমাকান্ত গুন্দেচা): তাঁদের দ্বৈতকণ্ঠের বাগেশ্রী ধ্রুপদ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনাগুলোর একটি।

৮. পণ্ডিত ঋত্বিক সান্যাল (ডাগর বাণী): বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রখ্যাত অধ্যাপকের বাগেশ্রী আলাপ ও ধ্রুপদ ধ্রুপদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শুদ্ধতার এক চমৎকার উদাহরণ।

৯. ওস্তাদ বাহাউদ্দিন ডাগর (রুদ্র বীণা): ধ্রুপদ অঙ্গের যন্ত্রসঙ্গীত হিসেবে তাঁর রুদ্র বীণায় বাগেশ্রীর আলাপ ও ধামার এই তালিকার জন্য অপরিহার্য।

১০. ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁ (রুদ্র বীণা): খাণ্ডারবাণী শৈলীতে তাঁর বাজানো বাগেশ্রী ধ্রুপদ-অঙ্গের মিড় ও গাম্ভীর্যের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

১১. পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকর (ডাগর ঘরানা): তাঁর কণ্ঠের মলায়েম বুনন বাগেশ্রীর মতো গম্ভীর রাগকে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপ দান করে।

১২. পণ্ডিত বিদুর মল্লিক (দরভাঙ্গা ঘরানা): দরভাঙ্গা ঘরানার ঐতিহ্যবাহী গায়কীতে তাঁর বাগেশ্রী ধামার এবং লয়কারি অত্যন্ত চমৎকার।

১৩. পণ্ডিত রাম চতুর মল্লিক (দরভাঙ্গা ঘরানা): ধ্রুপদ সম্রাট হিসেবে পরিচিত এই শিল্পীর বাগেশ্রী কম্পজিশনগুলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অমূল্য সম্পদ।

১৪. নাসির মঈনুদ্দিন ও নাসির আমিনুদ্দিন ডাগর (The Royal Collection – তারানা): ধ্রুপদ ঘরানার শিল্পীদের গাওয়া এই বিরল তারানাটি বাগেশ্রীর ছন্দোময় রূপটিকে অনন্য করে তুলেছে।

১৫. ডাগর সপ্তক (The Dagar Dynasty): ডাগর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সমন্বিত কণ্ঠে বাগেশ্রীর ধ্রুপদী আলাপ যা এই রাগের বংশপরম্পরায় টিকে থাকা আভিজাত্যকে প্রমাণ করে।

 

রাগ বাগেশ্রীর খেয়াল:

১. ওস্তাদ আমির খান (ইন্দোর/কিরানা): ঝুমরা তালে বিলম্বিত এবং অতি বিলম্বিত লয়ে তাঁর গায়নশৈলী বাগেশ্রীর গভীরতা ও প্রশান্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

২. ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খাঁ (পাতিয়ালা): “প্রীত না জানে” বন্দিশ ও তারানা; তাঁর দরাজ কণ্ঠ এবং তানের বর্ষণ বাগেশ্রীকে রাজকীয় মহিমা দান করেছে।

৩. ওস্তাদ রশীদ খান (রামপুর-সহাসওয়ান): তাঁর লাইভ রেকর্ডিংগুলো বর্তমান যুগের গায়কী ও রাগের বিশুদ্ধতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

৪. পণ্ডিত জসরাজ (মেওয়াতি): তাঁর আধ্যাত্মিক ভাব ও কোমল স্বরপ্রয়োগ বাগেশ্রীতে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করে।

৫. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব: গতানুগতিক ধারার বাইরে তাঁর নিজস্ব মেজাজে গাওয়া বাগেশ্রী এক ভিন্ন স্বাদের ও চমকপ্রদ।

৬. কৌশিকী চক্রবর্তী (পাতিয়ালা): “মাতা সরস্বতী” বন্দিশের দ্রুত অংশে তাঁর কণ্ঠের ক্ষিপ্রতা ও তৈয়ারি বিস্ময়কর।

৭. শ্রীকৃষ্ণ নারায়ণ রতনজনকার (আগ্রা): আগ্রা ঘরানার তন-পল্টা ও বোল-বাঁট সহযোগে তাঁর বাগেশ্রী অত্যন্ত শিক্ষামূলক।

৮. পণ্ডিত জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী (বিষ্ণুপুর): “কৌন করত তোরি বিনতি” বন্দিশটি বাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল সম্পদ।

৯. ওস্তাদ মুস্তাক হুসেইন খান (রামপুর-সহাসওয়ান): অত্যন্ত ওজনদার কণ্ঠ এবং তানের বৈচিত্র্যে তাঁর বাগেশ্রী এক ধ্রুপদী আভিজাত্য বহন করে।

১০. হীরাবাঈ বরদেকর (কিরানা): তাঁর নারী সুলভ কোমল কণ্ঠে বাগেশ্রীর মিড় ও স্থিতি অত্যন্ত শ্রুতিমধুর।

১১. পণ্ডিত ভীমসেন যোশী (কিরানা): তাঁর দরাজ গলার তান এবং বাগেশ্রীর আলাপ অংশটি যে কাউকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে বাধ্য।

১২. ওস্তাদ আমানত আলী ও ফাতেহ আলী খান (পাতিয়ালা): দুই ভাইয়ের অসাধারণ যুগলবন্দী এবং পাতিয়ালা ঘরানার তানের কারুকাজ এতে ফুটে উঠেছে।

১৩. গাঙ্গুবাঈ হাঙ্গাল (কিরানা): তাঁর গম্ভীর ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে বাগেশ্রীর আলাপ ও বন্দিশ এক দীর্ঘস্থায়ী রেশ রেখে যায়।

১৪. বেগম ফরিদা খানম (পাতিয়ালা): উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আধারে তাঁর গায়কি গজল ও খেয়ালের এক অপূর্ব মিলনস্থল।

১৫. বেগম পারভীন সুলতানা (কসুর-পাটিয়ালা): তাঁর তিন সপ্তকের অবলীলায় বিচরণ এবং বাগেশ্রীর সূক্ষ্ম কাজ এক কথায় জাদুকরী।

১৬. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্র (গোয়ালিয়র): কুমার গান্ধর্বের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর গায়কিতে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও গভীরতা পাওয়া যায়।

১৭. পণ্ডিত সত্যশীল দেশপাণ্ডে: শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগে তাঁর বাগেশ্রী এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

১৮. পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র): তাঁর অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও নাটকীয় গায়কি ঢঙে বাগেশ্রী এক অনন্য বিষাদ ও আকুলতা পায়।

১৯. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি): তাঁর “ভাব-প্রধান” গায়কিতে বাগেশ্রী রাগের কোমল গান্ধারের প্রয়োগ এক অপার্থিব অনুভূতি দেয়।

২০. পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর (জয়পুর-আত্রৌলি): অপ্রচলিত ও জটিল স্বরবিন্যাসের মাধ্যমে তিনি বাগেশ্রীকে যেভাবে পরিবেশন করেন, তা বিদগ্ধ শ্রোতাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

 

রাগ বাগেশ্রী ও নাট্যসঙ্গীত:

নাট্যসঙ্গীত (Natya Sangeet) বা মরাঠি সঙ্গীত নাটকগুলোতে রাগ বাগেশ্রী-র প্রয়োগ অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই ধারায় রাগাশ্রয়ী গানগুলো সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

১. মাস্টার কৃষ্ণরাও (Phulambrikar): তিনি নাট্যসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর গাওয়া বাগেশ্রী অঙ্গের পদগুলো (যেমন— ‘কুলতিলক রাজা’) শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা এবং নাট্যিক আবেগের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। তাঁর কণ্ঠের নমনীয়তা বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারকে অনন্য মাধুর্য দিত।

২. পণ্ঢরিনাথ কোলহাপুরে ও পূর্ণা শেঠ: তাঁদের গাওয়া বাগেশ্রী দ্বৈতকণ্ঠের এক বিরল ও সুমধুর নিদর্শন। পণ্ঢরিনাথ কোলহাপুরে ছিলেন পণ্ডিত জীতেন্দ্র অভিষেকি-র শিষ্য এবং একজন নামী অভিনেতা-গায়ক; তাঁদের এই রেকর্ডিংয়ে বাগেশ্রীর গায়কী অঙ্গের সূক্ষ্ম কাজ ফুটে ওঠে।

৩. পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব (নাট্যসঙ্গীত – ‘দে ঘর হাত লান’): কুমার গন্ধর্ব প্রথাগত রাগের কাঠামো ভেঙে নতুন রূপ দিতে ভালোবাসতেন। তাঁর গাওয়া ‘দে ঘর হাত লান’ গানটিতে বাগেশ্রীর এক ভিন্নধর্মী ও তেজস্বী রূপ পাওয়া যায়, যা নাট্যসঙ্গীতের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী।

৪. বাল গন্ধর্ব (Narayan Shripad Rajhans): মরাঠি নাট্যসঙ্গীতের সম্রাট বাল গন্ধর্বের কণ্ঠে বাগেশ্রী ভিত্তিক পদগুলো (যেমন— ‘মদমৎসাৎসর সোডুনি’) ঐতিহাসিক। তাঁর নারীসুলভ সুকোমল কণ্ঠ বাগেশ্রীর করুণ ও অপেক্ষার রসকে জীবন্ত করে তুলত।

৫. পণ্ডিত জীতেন্দ্র অভিষেকি (Katyaar Kaljat Ghusli): এই বিখ্যাত সঙ্গীত নাটকের অনেক গানেই তিনি বাগেশ্রীর ছায়া ব্যবহার করেছেন। তাঁর গাওয়া বা সুর করা বাগেশ্রী অঙ্গের গানগুলো আধুনিক নাট্যসঙ্গীতের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

রাগ বাগেশ্রীতে তারানা:

১. ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা): ‘আফতাব-এ-মৌসিকি’ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের এই তারানাটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগ্রা ঘরানার বলিষ্ঠ গায়কীতে বাগেশ্রীর গম্ভীর মেজাজ এবং তবলার বোলের সাথে তাঁর কণ্ঠের ছন্দময় লড়াই এই রেকর্ডিংটিকে অনন্য করে তুলেছে।

২. ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ (পাতিয়ালা ঘরানা): তাঁর গাওয়া বাগেশ্রী তারানাটি দ্রুত লয়ের এবং অত্যন্ত আলঙ্কারিক। পাতিয়ালা ঘরানার বিশেষ তানের কাজ এবং প্রতিটি স্বরের ওপর তাঁর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ বাগেশ্রীর চপল ও উজ্জ্বল রূপটি প্রকাশ করে।

৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব (মধ্য লয় ও দ্রুত তারানা): আপনার উল্লেখিত এই ৭ মিনিটের রেকর্ডিংটি বাগেশ্রীর এক নিরীক্ষাধর্মী রূপ। কুমার গন্ধর্ব প্রথাগত তারানার বাইরে গিয়ে নিজস্ব ঢঙে বাগেশ্রীর স্বরগুলোকে যেভাবে সাজিয়েছেন, তা এক অভূতপূর্ব সাঙ্গীতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

৪. মালিনী রাজুরকার (গোয়ালিয়র ঘরানা): গোয়ালিয়র ঘরানার বিখ্যাত এই শিল্পী তাঁর ‘টপ্পা’ অঙ্গের গায়কীর জন্য পরিচিত। তাঁর বাগেশ্রী তারানাটিতে ঘরানার বিশুদ্ধতা এবং লয়ের জটিল কাজগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

৫. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা): এই তালিকায় তাঁর নাম অত্যন্ত জরুরি। কিশোরী তাই-এর গাওয়া বাগেশ্রী তারানাটি (বিশেষ করে তাঁর ‘ভাব-প্রধান’ গায়কীতে) শ্রোতাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। তিনি তারানার শব্দের মাধ্যমেও বাগেশ্রীর অন্তর্নিহিত আর্তি ও বিরহকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

 

 

যন্ত্রে রাগ বাগেশ্রী:

আমরা কণ্ঠে আরও ভারি গানে যাবার আগে একটু শুনে আসব যন্ত্রসঙ্গীতে বাগেশ্রী। বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন যন্ত্রে বাজিয়েছেন এ রাগ। তার কিছু লিংক যুক্ত করলাম।

 

সুরবাহারে রাগ বাগেশ্রী:

ইউটিউবে অন্য ঘরানার সুরবাহারে বাগেশ্রী পেলাম না বলে শুধু ইমদাদখানি এবং ইটাওয়াহ ঘরের গুলোই যুক্ত করলাম। এই তালিকা দেখে মনে হতে পারে শুধুমাত্র ঘরের লোকজনই বোধহয় সুরবাহার বাজায়। এটা ঠিক না, আবার খুব বেঠিকও না 😉 কারণ এই ঘরের বাইরে অনেকেই সুরবাহার বাজালেও এখন পর্যন্ত সুরবাহারে এই ঘরটি সবচেয়ে প্রমিনেন্ট।

১. ওস্তাদ ইমরাত খান (১৪ মিনিটের আলাপ): ইমদাদখানি ঘরানার এই কিংবদন্তির বাজনায় বাগেশ্রীর গাম্ভীর্য ও গায়কী অঙ্গের এক অনন্য সংমিশ্রণ ফুটে উঠেছে।

২. ওস্তাদ এনায়েত খান (৩:২৪ মিনিটের আলাপ): ১৯৩০-এর দশকের এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংটি সুরবাহারে বাগেশ্রীর আদি ও বিশুদ্ধ রূপের এক অমূল্য দলিল।

৩. অন্নপূর্ণা দেবী (আলাপ ও জোড়): মাইহার ঘরানার এই নিভৃতচারী সাধিকার বাগেশ্রী পরিবেশনা সুরবাহারের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ও আধ্যাত্মিক বলে গণ্য করা হয়।

৪. ওস্তাদ মুশতারাক আলী খান (পুরানো রেকর্ড): ইটাওয়াহ ঘরানার এই প্রবীণ ওস্তাদের বাজনায় বাগেশ্রীর অত্যন্ত সরল কিন্তু হৃদয়স্পর্শী মীড়ের কাজ লক্ষ্য করা যায়।

৫. রামপ্রপন্ন ভট্টাচার্য (Alap – Imdadkhani Gharana): বর্তমান প্রজন্মের এই শিল্পীর বাদনে ইমদাদখানি ঘরানার বিশুদ্ধতা এবং সুরবাহারের গম্ভীর ধ্বনি খুব স্পষ্ট।

৬. রাজীব জনার্দন (Bageshri Alap): ইমদাদখানি-ইটাওয়াহ ঘরানার প্রথা মেনে দীর্ঘ ও টানা মীড়ের সাহায্যে তিনি বাগেশ্রীর বিরহী মেজাজটি চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন।

৭. পণ্ডিত পুষ্করজ মুখার্জি (Full Alap on Surbahar): ওস্তাদ বিলায়েত খান সাহেবের এই শিষ্যের বাজনায় অত্যন্ত ধীর লয়ে বাগেশ্রীর প্রতিটি স্বরের সূক্ষ্ম কাজ ফুটে ওঠে।

৮. ইরশাদ খান (Surbahar & Sitar Jugalbandi style): ওস্তাদ ইমরাত খান সাহেবের পুত্র হিসেবে তিনি সুরবাহারে বাগেশ্রীর তাত্ত্বিক ও আলঙ্কারিক দিকগুলো আধুনিক ঢঙে পরিবেশন করেছেন।

৯. পণ্ডিত মণি লাল নাগ (বিষ্ণুপুর ঘরানা): মূলত সেতারী হলেও তাঁর সুরবাহারে বাগেশ্রীর আলাপটি বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী গাম্ভীর্যকে চমৎকারভাবে তুলে ধরে।

১০. শুভায়ু সেন মজুমদার (Bageshri on Surbahar): বর্তমান সময়ের এই তরুণ শিল্পীর বাজনায় সুরবাহারের ঐতিহ্যবাহী বাদনশৈলী এবং বাগেশ্রীর মাধুর্য একীভূত হয়েছে।

সিতারে রাগ বাগেশ্রী :

১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (Monterey Pop Festival, 1967): এই ঐতিহাসিক লাইভ পারফরম্যান্সে বাগেশ্রীর বিস্তার ও দ্রুত গৎ বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছিল।

২. ওস্তাদ বিলায়েত খান (Studio Recording): তাঁর ‘গায়কী অঙ্গ’ বা সেতারে মানুষের কণ্ঠের অনুকরণে বাজানো বাগেশ্রী এই রাগের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর একটি।

৩. ওস্তাদ নিখিল ব্যানার্জি (Live in Berkeley, 1968): নিখিল বাবুর বাজানোয় বাগেশ্রীর যে গভীর প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিকতা ফুটে ওঠে, তা অনন্য।

৪. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (জার্মানি লাইভ, ১৯৭১): ৫৪ মিনিটের এই মহাকাব্যিক ট্র্যাকে আলাপ, রূপক তালের বিলম্বিত এবং তিন তালের দ্রুত গতের এক নিখুঁত সমন্বয় পাওয়া যায়; তবলায় ফইয়াজ আহমেদ খাঁর সঙ্গত একে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

৫. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ (Live Concert): বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এই শিল্পীর দ্রুত তান এবং বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারের কাজ এক কথায় অবিশ্বাস্য।

৬. ওস্তাদ ইমরাত খান (Sitar & Surbahar): তিনি সেতারে বাগেশ্রীর আলাপ করার সময় সুরবাহারের গাম্ভীর্য নিয়ে আসেন, যা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

৭. ওস্তাদ ইমরাত খান (৬:৩১ মিনিটের রেকর্ডিং): ইমদাদখানি ঘরানার এই সংক্ষিপ্ত বাজনাটি বাগেশ্রীর নির্যাসটুকু বোঝার জন্য চমৎকার; সেতারে সুরবাহারের গাম্ভীর্য আনার এক অনন্য উদাহরণ।

৮. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জি (Imdadkhani Gharana): তাঁর অত্যন্ত দ্রুত গতির এবং নিখুঁত তানের কাজ বাগেশ্রী রাগকে এক আধুনিক ও উজ্জ্বল রূপ দেয়।

৯. ওস্তাদ রইস খান (Mewati Gharana): তাঁর বাজানোয় এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য থাকে; বাগেশ্রীর শৃঙ্গার রস তাঁর সেতারে খুব সুন্দর ফুটে ওঠে।

১০. পণ্ডিত কুশল দাস (Maihar Gharana): নিখিল ব্যানার্জির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর বাগেশ্রী পরিবেশনায় রাগের শুদ্ধতা এবং পরিমিতিবোধ লক্ষ্যণীয়।

১১. সুজাত খান (Gayaki Ang): ওস্তাদ বিলায়েত খানের পুত্র হিসেবে তাঁর সেতারে বাগেশ্রীর সেই চিরচেনা গায়কী ঢঙ এবং লোকজ সুরের এক অদ্ভুত মিশ্রণ পাওয়া যায়।

১২. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ (উপস্থাপনায় সুজাত খান): বর্তমান সময়ের গায়কী অঙ্গের সেতার বাদনের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যেখানে বাগেশ্রীর প্রতিটি স্বর জীবন্ত হয়ে ওঠে।

১৩. ওস্তাদ শরিফ খান পুঁছওয়ালে (১৯২৬-১৯৮০): শিল্পীর নিজস্ব কণ্ঠে রাগের পরিচয় দিয়ে শুরু হওয়া এই রেকর্ডিংটি ঐতিহাসিক; তাঁর বাজানোয় বীণার রেশ এবং বাগেশ্রীর আদি রূপটি খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

১৪. পণ্ডিত কার্তিক কুমার (মাইহার ঘরানা): পণ্ডিত রবিশঙ্করের অন্যতম প্রবীণ শিষ্য হিসেবে তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর চলন অত্যন্ত ধ্রুপদী এবং পরিশীলিত।

১৫. নীলাদ্রি কুমার (Sitar-i-tar): আধুনিক যুগের এই শিল্পী বাগেশ্রীর গাম্ভীর্যকে বজায় রেখেই তাঁর নিজস্ব সিগনেচার স্টাইলে রাগের এক নতুন ও উজ্জ্বল রূপ উপস্থাপন করেছেন।

সারোদে রাগ বাগেশ্রী :

১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (Live at Monterey, 1967): সারোদের সম্রাট আলীবাবার বাজানো এই বাগেশ্রীতে বিষাদ ও আধ্যাত্মিকতার যে সংমিশ্রণ পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়।

২. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (Sovereign of Sarod): তাঁর বিশেষ ‘ইখারা’ তান এবং দ্রুত গতির লয় বাগেশ্রী রাগকে এক রাজকীয় আভিজাত্য দান করেছে।

৩. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (Old Rare Recording): আমজাদ আলী খাঁর পিতার এই দুষ্প্রাপ্য রেকর্ডিংটি বাগেশ্রীর আদি ও শুদ্ধ ঘরানাদার রূপটি বোঝার জন্য এক অনন্য দলিল।

৪. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (Shahajahanpur Gharana): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর যে গাণিতিক নিখুঁত চলন এবং রাগের বিশুদ্ধতা পাওয়া যায়, তা শিক্ষানবিশদের জন্য পাঠ্য।

৫. ওস্তাদ আশীষ খাঁ (Maihar Gharana): ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর পুত্র হিসেবে তাঁর বাজানোয় মাইহার ঘরানার সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য ও অলঙ্করণ স্পষ্ট।

৬. পণ্ডিত ব্রিজ নারায়ণ (Live in London): পণ্ডিত রাম নারায়ণের পুত্র সারোদে বাগেশ্রীর যে বিস্তার করেছেন, তাতে এক ধরণের ধ্রুপদী প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

৭. পণ্ডিত রাজীব তারাণাথ (Maihar Gharana): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর আলাপ অংশটি অত্যন্ত মায়াবী; তিনি প্রতিটি স্বরকে অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন।

৮. অভিষেক লাহিড়ী (Modern Sarod): বর্তমান প্রজন্মের এই শিল্পীর বাজানো বাগেশ্রীতে দ্রুত গতির কাজের পাশাপাশি এক ধরণের আধুনিক উজ্জ্বলতা লক্ষ্য করা যায়।

৯. অমান আলী খাঁ ও অয়ান আলী খাঁ (Jugalbandi): ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁর দুই পুত্রের এই দ্বৈত বাদনে বাগেশ্রীর এক চমৎকার তারুণ্যময় রূপ ফুটে উঠেছে।

১০. পণ্ডিত বিকাশ মহারাজ (Banaras Gharana): বেনারস ঘরানার বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁর সারোদ বাদনে বাগেশ্রীর একটি লোকজ ও শাস্ত্রীয় মিশ্র মেজাজ পাওয়া যায়।

 

বীণায় রাগ বাগেশ্রী :

বীণা যন্ত্রের গম্ভীর ও অনুনাদপূর্ণ ধ্বনিতে রাগ বাগেশ্রী এক অপার্থিব রূপ লাভ করে। বিশেষ করে রুদ্র বীণা বা বিচিত্র বীণার মতো প্রাচীন যন্ত্রগুলোতে এই রাগের ‘আন্দোলন’ বা স্বরের কম্পন খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।:

১. ওস্তাদ দাবির খান (রামপুর ঘরানা): রুদ্র বীণায় বাজানো এই বাগেশ্রীটি ঐতিহাসিক; রামপুর ওজির খাঁ সাহেবের পৌত্র হিসেবে তাঁর বাজানোয় বিশুদ্ধ ধ্রুপদী গাম্ভীর্য বিদ্যমান।

২. পণ্ডিত বিশ্বমোহন ভাট (মোহন বীণা): তাঁর আবিষ্কৃত মোহন বীণায় বাগেশ্রীর এই পরিবেশনাটি আধুনিক ও শাস্ত্রীয় মেলবন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।

৩. ওস্তাদ আসাদ আলী খান (খাণ্ডারবাণী শৈলী): রুদ্র বীণার এই কিংবদন্তি শিল্পীর বাজানো বাগেশ্রীতে ধ্রুপদ অঙ্গের বিস্তার এবং মীড়ের কাজ এক প্রশান্তিময় আধ্যাত্মিকতা তৈরি করে।

৪. ওস্তাদ আসিক আলী খান (রুদ্র বীণা): চৌতালে বাজানো এই ধ্রুপদ বন্দিশটি বাগেশ্রীর ছন্দোময় এবং প্রাচীন রূপটি বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. এস. বালচন্দর (চন্দ্র বীণা): চন্দ্র বীণায় তাঁর আলাপ ও ধামার তালের কাজ বাগেশ্রী রাগের এক ভিন্নধর্মী দাক্ষিণাত্য প্রভাবযুক্ত গাম্ভীর্য প্রকাশ করে।

৬. ওস্তাদ বাহাউদ্দিন ডাগর (রুদ্র বীণা): ডাগর বাণীর এই শিল্পী বাগেশ্রীর অতি কোমল স্বরগুলোকে অত্যন্ত ধীর লয়ে এবং দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন।

৭. পণ্ডিত গোপাল কৃষ্ণ (বিচিত্র বীণা): বিচিত্র বীণার এই দিকপাল শিল্পীর বাজানো বাগেশ্রীতে তন্ত্রী যন্ত্রের এক বিশেষ ধরনের গুমরানো বিষাদ ও মাধুর্য ফুটে ওঠে।

৮. পণ্ডিত রেবা প্রকাশ শর্মা (বিচিত্র বীণা): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর প্রতিটি স্বরের স্পষ্টতা এবং রাগের শুদ্ধতা বজায় রাখার বিষয়টি লক্ষণীয়।

৯. ড. জেয়ন্তি কুমারেশ (সরস্বতী বীণা): দক্ষিণ ভারতীয় এই বীণায় বাগেশ্রীর রূপটি কর্ণাটকী ঢঙের ছোঁয়ায় এক নতুন ও বৈচিত্র্যময় মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে।

১০. পণ্ডিত বিশ্বমোহন ভাট ও ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (যুগলবন্দী): মোহন বীণা ও সারোদের এই সংলাপে বাগেশ্রী রাগের এক মহাকাব্যিক বিস্তার পাওয়া যায়।

সারেঙ্গীতে রাগ বাগেশ্রী :

সারেঙ্গীর কান্নাসুর আর বাগেশ্রীর নিবিড় বিরহ মিলে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।

১. ওস্তাদ সুলতান খান (The Giant of Sarangi): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর যে মিষ্টতা এবং হৃদস্পর্শী আবেদন পাওয়া যায়, তা এক কথায় অতুলনীয়।

২. পণ্ডিত রাম নারায়ণ (Sarangi Maestro): সারেঙ্গীকে একক যন্ত্র হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করা এই শিল্পীর বাগেশ্রী বাদনে এক গভীর গাম্ভীর্য ও গায়কী অঙ্গের পূর্ণতা লক্ষ্য করা যায়।

৩. ওস্তাদ সাবরি খান (Sainia Gharana): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর প্রতিটি স্বরের সূক্ষ্ম কাজ এবং প্রাচীন ঘরানার শুদ্ধতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

৪. ওস্তাদ শাকির খান (Studio Recording): বর্তমান সময়ের এই শিল্পীর বাজানো বাগেশ্রীতে সারেঙ্গীর চিরাচরিত বিষাদের পাশাপাশি এক ধরনের উজ্জ্বল আধুনিকতা পাওয়া যায়।

৫. পণ্ডিত হনুমান প্রসাদ মিশ্র (Benaras Gharana): বেনারস ঘরানার এই প্রবীণ শিল্পীর সারেঙ্গীতে বাগেশ্রীর একটি বিশেষ লোকজ ও শাস্ত্রীয় মিশ্র মেজাজ পাওয়া যায়।

৬. পণ্ডিত সন্তোষ মিশ্র (Live in Concert): তাঁর দ্রুত তান এবং বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারের সূক্ষ্ম আন্দোলন শ্রোতাকে মুগ্ধ করার মতো।

৭. ওস্তাদ লতিফ আহমেদ খান (Rare Recording): তাঁর সারেঙ্গী বাদনে বাগেশ্রীর যে ধীর লয়ের বিস্তার, তা রাগের আসল রসটুকু আস্বাদন করতে সাহায্য করে।

৮. পণ্ডিত ধ্রুব ঘোষ (Modern Sarangi): তাঁর বাজানোয় রাগ বাগেশ্রীর এক তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক রূপ লক্ষ্য করা যায়, যা অত্যন্ত পরিশীলিত।

৯. ওস্তাদ মুরাদ আলী খান (Generation Next): বর্তমান প্রজন্মের এই শিল্পীর সারেঙ্গীতে বাগেশ্রীর অত্যন্ত দ্রুত এবং নিখুঁত কাজের সমন্বয় দেখা যায়।

১০. কামাল সাবরি (The Heritage): ওস্তাদ সাবরি খানের পুত্র হিসেবে তাঁর বাজানোয় পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন এবং বাগেশ্রীর এক চমৎকার উপস্থাপন পাওয়া যায়।

.

বাঁশিতে রাগ বাগেশ্রী :

বাঁশির মায়াবী সুরে রাগ বাগেশ্রী এক অপূর্ব শান্ত ও গভীর মেজাজ তৈরি করে। বিশেষ করে মধ্যরাতের এই রাগে বাঁশির ‘মিন্ড’ বা এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়ার কাজগুলো অত্যন্ত শ্রুতিমধুর শোনায়।

১. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (Live in London): বাঁশিতে বাগেশ্রীর আলাপ ও ঝালার কাজে তিনি যে বৈচিত্র্য আনেন, তা এই রাগের আধুনিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

২. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ (Legacy Collection): বাঁশিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রবর্তক হিসেবে তাঁর বাজানো বাগেশ্রীতে এক গম্ভীর আধ্যাত্মিকতা ও বিশুদ্ধতা পাওয়া যায়।

৩. পণ্ডিত রঘিনাথ শেঠ (Emotive Flute): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর কোমল গান্ধারের কাজ এবং মিড় অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৪. পণ্ডিত বিজয় রাঘব রাও (Classical Flute): তাঁর পরিবেশনায় বাগেশ্রীর একটি ধ্রুপদী আভিজাত্য এবং পরিষ্কার স্বরবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়।

৫. পণ্ডিত রনু মজুমদার (Maihar Gharana): মাইহার ঘরানার বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁর বাঁশিতে বাগেশ্রীর বিস্তার ও দ্রুত গৎ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

৬. পণ্ডিত ভেঙ্কটেশ গোডখিন্ডি (Hindustani Flute): তাঁর বাঁশিতে বাগেশ্রীর আলাপে এক ধরণের প্রশান্তি এবং গাম্ভীর্য খুঁজে পাওয়া যায়।

৭. শশাঙ্ক সুব্রহ্মণ্যম (Carnatic Fusion): উত্তর ভারতীয় বাগেশ্রীকে দক্ষিণ ভারতীয় বাঁশির ঢঙে তাঁর পরিবেশনাটি এক ভিন্নধর্মী রস তৈরি করে।

৮. পণ্ডিত রূপক কুলকার্নি (Disciple of Pt. Chaurasia): তাঁর গুরু হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার ঘরানায় বাগেশ্রীর যে অলঙ্করণ, তা তাঁর বাঁশিতে খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়ে।

৯. পণ্ডিত রাজেন্দ্র প্রসন্ন (Banaras Gharana): বেনারস ঘরানার গায়কী অঙ্গের বাঁশিতে বাগেশ্রীর ‘হরকত’ ও ‘তান’ অত্যন্ত মধুর শোনায়।

১০. পণ্ডিত দেবু নায়েক (Flute & Tabla): তাঁর বাজানোয় বাগেশ্রীর একটি সরল কিন্তু অত্যন্ত গভীর ও নিবিড় আবহ পাওয়া যায়।

 

রাগ বাগেশ্রীতে যুগলবন্দী:

১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (সেতার) ও ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (সারোদ): এই দুই মহারথীর বাগেশ্রী যুগলবন্দী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক মহাকাব্যিক নিদর্শন; তাঁদের আলাপ ও দ্রুত গতের সংলাপ অতুলনীয়।

২. ওস্তাদ বিলায়েত খান (সেতার) ও ওস্তাদ ইমরাত খান (সুরবাহার): ইমদাদখানি ঘরানার দুই ভাইয়ের এই যুগলবন্দীতে সেতারের চপলতা এবং সুরবাহারের গাম্ভীর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন পাওয়া যায়।

৩. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (বাঁশি) ও পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা (সন্তুর): ‘শিব-হরি’ জুটির বাগেশ্রী অত্যন্ত জনপ্রিয়; বাঁশির মিড় এবং সন্তুরের ঝঙ্কারে এই রাগের এক মায়াবী রূপ তৈরি হয়।

৪. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সারোদ) ও পণ্ডিত এল. সুব্রহ্মণ্যম (ভায়োলিন): উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় পদ্ধতির এই যুগলবন্দীতে বাগেশ্রী রাগের এক ভিন্নধর্মী ও বৈশ্বিক আবেদন ফুটে উঠেছে।

৫. পণ্ডিত এন. রাজম (ভায়োলিন) ও পণ্ডিত গজেন্দ্র প্রসন্ন (বাঁশি): গায়কী অঙ্গের ভায়োলিন এবং বাঁশির যুগলবন্দীতে বাগেশ্রীর প্রতিটি স্বর অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৬. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ (সেতার) ও ওস্তাদ রশীদ খান (কণ্ঠ): যন্ত্র ও কণ্ঠের এই বিরল সংলাপে বাগেশ্রী রাগের শাস্ত্রীয় ও গায়কী—উভয় রূপই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

৭. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জি (সেতার) ও পণ্ডিত ভজন সপোরি (সন্তুর): দ্রুত গতির তান এবং সন্তুরের সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে বাগেশ্রীকে এখানে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রূপে পাওয়া যায়।

৮. পণ্ডিত রনু মজুমদার (বাঁশি) ও পণ্ডিত তরুণ ভট্টাচার্য (সন্তুর): মাইহার ঘরানার প্রভাবে এই যুগলবন্দীতে বাগেশ্রীর শান্ত ও গভীর মেজাজটি খুব সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।

৯. ড. জেয়ন্তি কুমারেশ (সরস্বতী বীণা) ও পণ্ডিত কুশল দাস (সেতার): দক্ষিণ ও উত্তর ভারতীয় তন্ত্রী যন্ত্রের এই সংলাপে বাগেশ্রী ও কর্ণাটকী ‘শ্রী’ রাগের এক চমৎকার আভা পাওয়া যায়।

১০. পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র (কণ্ঠ – বেনারস ঘরানা): দুই ভাইয়ের এই দ্বৈত কণ্ঠের বাগেশ্রী খেয়াল বেনারস ঘরানার গাম্ভীর্য ও অলঙ্করণের এক অনবদ্য উদাহরণ।

 

টিউটোরিয়াল:

যেকোনো রাগের স্বরের চলন এবং মেজাজ আয়ত্ত করার জন্য সরাসরি গান শোনার আগে কয়েকটি বিশেষ ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। বাগেশ্রীর ক্ষেত্রেও স্বরমালিকা (সারগম-গীত) এবং লক্ষণগীতের ভূমিকা অপরিসীম।

কেন স্বরমালিকা ও লক্ষণগীত শুনবেন?

স্বরমালিকা বা সারগম-গীত মূলত রাগের গাণিতিক কাঠামো এবং স্বরবিন্যাস বুঝতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি এক বা একাধিক লক্ষণগীত শোনা জরুরি, কারণ লক্ষণগীতের কথাগুলোর মধ্যেই রাগের তাত্ত্বিক পরিচয় (যেমন: বাদী, সমবাদী, ঠাট ও সময়) লুকিয়ে থাকে। লক্ষণগীত ও ছোট খেয়াল মূলত একই ধরনের কাজ করে—রাগের অবয়বকে সহজভাবে শিক্ষার্থীর মনে গেঁথে দেয়।

অনলাইনে বাগেশ্রী শেখার গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স (নির্বাচিত ৫টি):

১. গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ের স্বরমালিকা: বাগেশ্রী রাগের শুদ্ধ ও প্রামাণ্য স্বরমালিকা শোনার জন্য এটি শ্রেষ্ঠ উৎস। এখানে রাগের আরোহ-অবরোহের সাথে তালের ছন্দবদ্ধ স্বরবিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

২. ‘From Raga to Reel’ – Part 6 (Raag Bageshri): জাস্টিন উডসের এই সিরিজটি পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধনে বাগেশ্রীকে বোঝার জন্য একটি অনন্য টিউটোরিয়াল। এটি বিশেষ করে যারা যন্ত্রসঙ্গীত শিখছেন বা রাগের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বুঝতে চান, তাদের জন্য উপযোগী।

৩. সরিতা পাঠক যজুর্বেদীর টিউটোরিয়াল: বিদুষী সরিতা পাঠক যজুর্বেদীর এই টিউটোরিয়ালটিতে বাগেশ্রীর আলাপ এবং একটি শাস্ত্রীয় বন্দিশের সূক্ষ্ম কাজগুলো অত্যন্ত দরদ দিয়ে শেখানো হয়েছে। বিশেষ করে ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘মধ্যম’ স্বরের প্রয়োগ বুঝতে এটি খুব সাহায্য করবে।

৪. ওস্তাদ শাফকাত আলি খানের টিউটোরিয়াল: শাম চৌরাসিয়া ঘরানার এই কিংবদন্তি শিল্পী বাগেশ্রীর প্রথাগত ব্যাকরণের পাশাপাশি এর মায়াবী গায়কী অঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর টিউটোরিয়ালে ঘরানাদার তানের কাজ এবং রাগের মেজাজ ফুটিয়ে তোলার কৌশল পাওয়া যায়।

৫. আশিস কুলকার্নির আলাপ ও সারগম গীত: নবীন প্রজন্মের এই শিল্পী অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বাগেশ্রীর আরোহ-অবরোহ এবং একটি সুন্দর সারগম গীত পরিবেশন করেছেন। যারা একদম শুরু থেকে রাগের চলনটি গলায় বসাতে চান, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার রেফারেন্স।

 

বাগেশ্রী রাগ বিষয়ে আরও জানার সোর্স:

১. When Bageshree blossoms…

২. Short Takes: Bageshree by Rajan P. Parrikar

 

Declaimer:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ আড়ানা বা আডানা।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment