শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে উঠলেও তাঁর জীবনদর্শন ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর গানগুলোকে মূলত কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়: মুর্শিদি বা তত্ত্বগান, বিচ্ছেদ গান, গণসংগীত এবং ধামাইল।
শাহ আব্দুল করিমের গান
জীবন ও আধ্যাত্মিক দর্শন
হাসন রাজা যেখানে জমিদারি বিলাস ছেড়ে বৈরাগ্য নিয়েছিলেন, শাহ আব্দুল করিম সেখানে আজীবন অভাবের সাথে লড়াই করে মানুষের কথা গেয়েছেন। তাঁর গানে ‘কালনী নদী’র ঢেউয়ের মতো এক ধরনের প্রবাহ আছে। তিনি কেবল আধ্যাত্মিকতায় ডুবে থাকেননি, বরং সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধেও গান গেয়েছেন।
গানের সুর ও বৈশিষ্ট্য
তাঁর গানের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো একতারা ও মন্দিরা। তবে ভাটি অঞ্চলের চিরাচরিত ধামাইল গানের সুরেও তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর গানের ভাষা সহজ কিন্তু ভাব অনেক গভীর।
“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”— এই একটি লাইনেই তিনি গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সরলতাকে তুলে ধরেছেন।
গানের বিষয়বস্তু
বিচ্ছেদ: প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা।
দেহতত্ত্ব: মানুষের দেহ ও আত্মার সম্পর্ক।
সাম্য ও প্রতিবাদ: শোষিত মানুষের অধিকার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
শাহ আব্দুল করিমের গানের তালিকা
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও, সাধারণত ধারণা করা হয় তিনি ১৬০০ থেকে ২০০০-এর মতো গান রচনা করেছেন। তবে তাঁর মোট ছয়টি প্রকাশিত গ্রন্থে (যেমন: কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে, মানস তরণী ও শীতল পাটি) প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০-এর মতো গান সংকলিত হয়েছে। বাকি অনেক গান তাঁর শিষ্য ও ভক্তদের মুখে মুখে বা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে রয়ে গেছে।
অন্য সব ব্যর্থ প্রচেষ্টার মতো তালিকাটি শুরু করলাম। দেখা যাক কতদুর পর্যন্ত যেতে পারি ….
১. আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম ॥
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ॥
বর্ষা যখন হইত গাজীর গান আইত, রঙ্গে ঢঙ্গে গান গাইত আনন্দ পাইতাম।
কে হবে মেম্বার কে হবে গ্রাম সরকার, আমরা কি তার খবর রাখিতাম ॥
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ॥
২. আসি বলে গেল বন্ধু আইল না
আসি বলে গেল বন্ধু আইল না।
আমারও কপালে বন্ধু মিলল না ॥
বসন্ত সময়ে কোকিল ডাকে কুহু সুরে।
পরাণ কান্দে রে বন্ধুর লাগিয়া ॥
পথের পানে চাইয়া থাকি দিন রজনী জাগিয়া।
বন্ধু বিনে এ যৌবন তো আর রাখা যায় না ॥
৩. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, ছেড়ে যাইবায় যদি।
কেমনে রাখিব তোমায় এই মনে অবধি ॥
অভাগিনীরে দিয়া ফাঁকি, সদায় করাও কান্দাকান্দি।
আমি তো তোমারও বন্ধু, চিরকালের বন্দি ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, মইলে পাব কি নিধি।
ছেড়ে যাইবায় যদি বন্ধু, কেন বাড়াইলায় রে পিরিতি ॥
৪. গাড়ি চলে না চলে না
গাড়ি চলে না চলে না, চলে না রে।
গাড়ি চলে না ॥
পড়িয়া রহিল গাড়ি উজানধল গ্রামে রে।
গাড়ির ভিতরে ছিল এক সুন্দর নারী।
গাড়ি চালায় দয়াল গুরু, নামটা তাহার ধরি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে, আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরু পার করিয়া লও তোমার ওই তরী রে ॥
৫. ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
মাঝি বাইয়া যাও রে ॥
মাঝি কও রে আমারে, ঐ তো দেখা যায় রে।
উজানধল গ্রামখানি বন্ধুয়ার ঘর রে ॥
নাও বাও রে মাঝি, ধরো গুরুর নাম।
কালনী নদীর তীরে আমার উজানধল গ্রাম ॥
৬. দিওনা দিওনা বন্ধু বিচ্ছেদ যাতনা
দিওনা দিওনা বন্ধু বিচ্ছেদ যাতনা।
সইতে পারি না রে বন্ধু, সইতে পারি না ॥
বিচ্ছেদ আগুনে জ্বলে অঙ্গ ছারখার।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু নিভাও এই অনল ॥
করিম বলে মইলে পরে আসিবায় নি বন্ধু।
বাঁচিয়া থাকিতে যেন পাই গো দেখা তোমার ॥
৭. বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে
বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে।
বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে ॥
বন্ধুর বাড়ির ফুলবাগান বাড়ির উত্তরে।
ফুলের গন্ধ পাইয়া সই গো মন পাগল করে ॥
ফুলের গন্ধ পাইলে পরে কেন ঘরে রই।
বসন্ত বাতাসে সই গো প্রাণ বন্ধুয়া কই ॥
৮. বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে।
দেওয়ানা বানাইছে কি জাদু করিয়া রে ॥
বন্দে মায়া লাগাইছে ॥
বসে ভাবি নিরালায়, গো দয়াল তোমারও আশায়।
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া রে ॥
৯. মারফতি গান শিখিতে চায় যারা
মারফতি গান শিখিতে চায় যারা।
গুরুর চরণে মন দাও গো তোরা ॥
গুরু বিনে গতি নাই রে ভবের বাজারে।
অন্ধকারে পথ দেখাবে দয়াল গুরু তোমারে ॥
১০. মুর্শীদ ধন হে কেমনে চিনিব তোমায়
মুর্শীদ ধন হে কেমনে চিনিব তোমায়।
চিনিতে নারিলাম আমি ভব অন্ধকার ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
১১. রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না
রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না।
মিছা মায়ার এই জগতে শান্তি মিলে না ॥
ধন জন কিসের আশা, কিসের জমিদারি।
একলা আইলায় একলা যাইবায় হবে ঘর বাড়ি ॥
১২. সখী কুঞ্জ সাজাও গো
সখী কুঞ্জ সাজাও গো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।
আকাশেতে উদয় হইল পূর্ণিমারই চাঁদ রে ॥
আমারই অঙ্গের গয়না খুলে ফেলে দাও।
প্রাণবন্ধুর লাগিয়া রে কুঞ্জ সাজাও ॥
১৩. হারানো দিনের সেই কথা মনে পড়ে যায়
হারানো দিনের সেই কথা মনে পড়ে যায়।
কেমনে ভুলিব তোরে বিরহের জ্বালায় ॥
কত রঙ্গে কত ঢঙ্গে খেলতাম মোরা সবে।
আজ কেন একলা আমি এই ভবের হাটে ॥
১৪. আমি কূলহারা কলঙ্কিনী
আমি কূলহারা কলঙ্কিনী।
আমারে কেউ ছুঁইও না গো সখী, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী ॥
যেই জন রাধার প্রেমে মজেছে, সে কি আর ঘরে ফিরেছে।
শ্যাম পিরিতে পাগল হয়ে ছেড়েছি গৃহিণী ॥
লোকে বলে আমি মন্দ, আমি তো জানি কৃষ্ণের ছন্দ।
শ্যাম আমার হদয়-মণি আমি তাঁর চাতকিনী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, প্রেম সাগরে ভাসলাম যখন।
কলঙ্ক আমার গলার হার, আমি শ্যাম সোহাগিনী ॥
১৫. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু (সংস্করণ ২)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, ছেড়ে যাইবায় যদি।
কেমনে রাখিব তোমায় এই মনে অবধি ॥
অভাগিনীরে দিয়া ফাঁকি, সদায় করাও কান্দাকান্দি।
আমি তো তোমারও বন্ধু, চিরকালের বন্দি ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, মইলে পাব কি নিধি।
ছেড়ে যাইবায় যদি বন্ধু, কেন বাড়াইলায় রে পিরিতি ॥
১৬. কেমনে চিনিব তোমায় ওহে দয়াময়
কেমনে চিনিব তোমায় ওহে দয়াময়।
হৃদয় অন্ধকারে আমি ঘুরিয়া মরি রে ॥
চোখে দেখি জগতময়, অন্তরেতে দেখি ভয়।
তুমি ছাড়া এই জগতে আপন কেহ নয় রে ॥
দয়া করে দেখা দিলে ঘুচবে মনের ভয়।
আব্দুল করিম তোমায় খোঁজে সর্বদাই রে ॥
১৭. জল ভরিয়া আনো লো সই (ধামাইল)
জল ভরিয়া আনো লো সই, যমুনারই কূলে।
শ্যাম কালিয়া বাজায় বাঁশি কদমতলার মূলে ॥
ধীরে চলো লো সই, পায়ের মল বাজে।
দেখতে যদি যায় রে কেউ ধরবে আমাদের লাজে ॥
যমুনারই নীল জল সই, দেখতে চমৎকার।
সারা অঙ্গে শ্যামের রূপের লেগেছে জোয়ার ॥
আব্দুল করিম বলে সই রে, পিরিত বড় বিষ।
পিরিত করিয়া হারাইলাম আমার প্রাণের ইশ ॥
১৮. তোমার কি দয়া হয় না রে (দয়াল গুরু)
তোমার কি দয়া হয় না রে, দয়াল গুরু রে।
অধমরে দেখা দিয়া তরাও এবারে ॥
আমি তো গুনাগার অতি, নাই রে আমার কোনো গতি।
তব নাম লয়ে গুরু ডাকি বারে বারে ॥
ভবসিন্ধু পার হইতে নাই মোর সম্বল।
তব চরণে যেন ঠাঁই পাই গো সফল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৯. দুনিয়া দুদিন পরে হবে অন্ধকার
দুনিয়া দুদিন পরে হবে অন্ধকার।
কেন মিছে মত্ত হইলা শাহ আব্দুল করিম আমার ॥
ধন জন পরিবার কেহ নহে তোর।
যম দূতে আসি যখন দিবে ডুরি জোর ॥
পিঞ্জিরা ছাড়িয়া যখন উড়িয়া যাইবে জান।
মাটিতে মিশিবে কায়া রবে না সম্মান ॥
নামটি জপিলে সার পাইবে দিদার।
আল্লা বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
২০. বন্ধু বিনে এ জনমে সুখ পাইলাম না
বন্ধু বিনে এ জনমে সুখ পাইলাম না।
বিচ্ছেদ যাতনা বন্ধু সইতে পারি না ॥
যেদিন হতে গেলা বন্ধু আমায় ছাড়িয়া।
সেই হতে কাঁদি আমি পথে চাহিয়া ॥
একবার দেখা দিয়ে বন্ধু নিভাও অন্তরের জ্বালা।
তোমার আশায় গেঁথেছি আমি হৃদয়ে মালের মালা ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর মনে।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি আমি এই ভুবনে ॥
২১. মন মাতাল পাগল আব্দুল করিম
মন মাতাল পাগল আব্দুল করিম, কি গান গাইবায় রে।
ভাবতরঙ্গে ডুবলে পরে বন্ধুকে পাইবায় রে ॥
মনরে কেন বুঝাও না তুমি আপনারে।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে আছ অন্ধকারে ॥
মনরে আমার শোন কথা, করিস না আর ব্যাথা।
দয়াল গুরুর চরণে মোর প্রাণ সঁপিলাম এথা ॥
২২. মাটির পিঞ্জিরা সোনার ময়না পাখি
মাটির পিঞ্জিরা সোনার ময়না পাখি।
কোনদিন দিবে রে ফাঁকি ও ময়না পাখি ॥
মায়া জালে বন্ধ হয়ে আছ ময়না রে।
পিঞ্জিরা ভাঙিয়া একদিন যাইবায় উইড়া রে ॥
যাবার কালে নিষ্ঠুর ময়না চাইবা না ফিরিয়া।
মাটির তন মাটিতে রবে ধুলায় পড়িয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মনকে বুঝাই কারে।
ময়না আমার উইড়া যাবে ভব পারাবারে ॥
২৩. মেলাত গেলা বন্ধু মোরে না লইলা
মেলাত গেলা বন্ধু মোরে না লইলা।
একলা গিয়া বন্ধু রঙ্গে মজিলা ॥
আশা করি রইলাম ঘরে পথ পানে চাইয়া।
তুমি আইলা না বন্ধু আমায় ভুইলা গিয়া ॥
কি উপহার আনলা বন্ধু দেখাও না মোরে।
পাগল করিম কান্দে বন্ধু তোমারও তরে ॥
২৪. সখী গো আমার মন মানে না
সখী গো আমার মন মানে না।
প্রাণবন্ধুর লাগি আমার মনে শান্তি মিলে না ॥
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে দেখি তারে ভাই।
জাগিয়া দেখিলে পরে বন্ধের দেখা নাই ॥
কি যাদু করিল বন্ধু মন নিল হরিয়া।
পাগল আব্দুল করিম কান্দে পথে বসিয়া ॥
২৫. আমি কূলহারা এক মাঝি
আমি কূলহারা এক মাঝি রে, আমার নেইকো চেনার ঘর।
ভাটি গাঙের ঢেউ লেগেছে, জীবন বড়ই পর রে ॥
কোথা হতে আইলাম আমি, কোথায় আমার ঠাঁই।
ভবের হাটে বিকিকিনি, লাভের দেখা নাই রে ॥
মাঝি বিহীন নাওখানি মোর, তুফানেতে টলে।
দয়াল গুরু পার করিয়া, লও গো তোমার কোলে রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, জীবন হলো শেষ।
দয়াল গুরুর দেখা পেলে, ঘুচত সকল ক্লেশ রে ॥
২৬. আসমান জমিিনর মালিক তুমি
আসমান জমিনের মালিক তুমি, সবই তোমার দান।
তুমি বিনে এই জগতে, কে জোগাবে প্রাণ রে ॥
পাহাড় পর্বত নদ-নদী রে, তোমার মহিমায়।
পাগল আব্দুল করিম বলে, ডুবে তোমার মায়ায় রে ॥
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা, তোমার ইশারায়।
দয়া করো দয়াল প্রভু, তোমার এই বান্দায় রে ॥
২৭. ওরে আমার মন-ভোমরা
ওরে আমার মন-ভোমরা, কিসে মজিলি।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে, আপন পাসরিলি ॥
পিঞ্জিরা তো পুরান হলো, ছাড়তে হবে ভাই।
কোনদিন যে উড়াল দিবে, তার তো ঠিকানা নাই ॥
রঙের বাজার মিছে রে সব, মিছে মায়াজাল।
আব্দুল করিম ভেবে বলে, সামনে বিষম কাল ॥
২৮. কি যাদু করিয়া বন্দে মন নিল কাড়ি
কি যাদু করিয়া বন্দে মন নিল কাড়ি।
ঘর করিলাম বাহির আমি, পাগল বেশ ধরি ॥
আঁখি মেলা করলি বন্ধু, আড়াল হলে তুই।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি, কেমনে একা শুই ॥
লোকে বলে পাগল আমি, আমি তো জানি রে।
বন্ধের মায়ায় মজেছি আমি, কালনী নদীর তীরে ॥
২৯. কূলহারা কলঙ্কিনী বানাইলি মোরে
কূলহারা কলঙ্কিনী বানাইলি মোরে।
শ্যাম পিরিতে মজাইয়া কেন, লুকালি আড়ালে রে ॥
গৃহবাস তেয়াগিলাম, তোরই কারণে।
এখন কেন দেখা দাও না, অভাগীর সনে রে ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, কলঙ্ক আমার হার।
চরণতলে ঠাঁই দিও, চাই না কিছু আর রে ॥
৩০. দয়াল তোমার দয়া হলে
দয়াল তোমার দয়া হলে, সব হবে রে শেষ।
ঘুচিয়া যাইবে রে আমার, ভব যাতনা ক্লেশ ॥
আমি তো অধম অতি, নাহি জানি ভক্তি।
তুমি বিনে এই জগতে, কার আছে আর শক্তি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, ডাকি না তোমারে।
বিপদকালে দেখা দিও, দয়াল গো আমারে ॥
৩১. মায়া লাগাইছে বন্ধু পিরিতি শিখাইছে
মায়া লাগাইছে বন্ধু পিরিতি শিখাইছে।
দেওয়ানা বানাইছে বন্ধু কি যাদু করিয়া রে ॥
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে, দেখি যে তোমারে।
জাগিয়া না পাই বন্ধু, কাঁদি অন্ধকারে রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে, পিরিত বড় দায়।
একবার যে মজেছে সে কি, মুক্তি খুঁজে পায় রে ॥
৩২. মুর্শীদ দয়াল ওরে আমার প্রাণের মুর্শিদ রে
মুর্শীদ দয়াল ওরে আমার প্রাণের মুর্শিদ রে।
ভব নদী কেমনে হব পার, আমি গুনাগার রে ॥
নাই সম্বল মোর সাথে রে, নাই কোনো সম্বল।
তব নাম লয়ে মুর্শিদ, ভাসাই নয়ন জল রে ॥
পার করিয়া দাও গো আমারে, দয়াল মুর্শিদ তুমি।
তোমার চরণে যেন, জনম সফল করি আমি রে ॥
৩৩. শোনেন বলি দেশবাসী ভাই
শোনেন বলি দেশবাসী ভাই, আমার নিবেদন।
সবাই মিলে গড়ব আমরা, সোনার এক ভুবন ॥
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে, মানুষ হবো রে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, সমাজ গড়বো রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, এই আমার সাধ।
সবার মাঝে ঘুচে যাক, সব ভেদাভেদ বাদ ॥
৩৪. সখী গো আমার জীবন ধন্য হলো
সখী গো আমার জীবন ধন্য হলো।
প্রাণবন্ধুর দেখা আমি, স্বপনে পাইলাম গো ॥
কালনী নদীর তীরে সখী, বসিয়া নিরালায়।
বন্ধুর সাথে দেখা হলো, প্রেমেরই মেলায় গো ॥
আব্দুল করিম বলে সখী, আর তো ভয় নাই।
হৃদয় জুড়ে বসতি হলো, আমার বন্ধুয়ারই ঠাঁই গো ॥
৩৫. ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
মাঝি বাইয়া যাও রে ॥
মাঝি কও রে আমারে, ঐ তো দেখা যায় রে।
উজানধল গ্রামখানি বন্ধুয়ার ঘর রে ॥
নাও বাও রে মাঝি, ধরো গুরুর নাম।
কালনী নদীর তীরে আমার উজানধল গ্রাম ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, নাও ছেড়ে দাও।
প্রেমের নদী পার হয়ে বন্ধুয়ার বাড়ি যাও ॥
৩৬. আমি অপার হয়ে বসে আছি
আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়।
পাড়ে লয়ে যাও আমারে করি এই বিনয় ॥
আমি তো গুনাগার অতি, নাই মোর কোনো গতি।
তব চরণেতে মতি যেন সদাই রয় ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি, মিছে কাজে দিন কাটাইলাম।
আসল কাজ তো ভুলিয়া রইলাম, এখন মনে ভয় হয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, ডাকি না তোমারে।
বিপদকালে দয়া করে দিও হে আশ্রয় ॥
৩৭. এই দুনিয়া দুদিন পরে
এই দুনিয়া দুদিন পরে হবে রে আন্ধার।
কেন মিছে মত্ত হইলা শাহ আব্দুল করিম আমার ॥
ধন জন পরিবার কেউ হবে না তোর।
সাঙ্গ হবে জীবনের খেল, যমে দিবে জোর ॥
পিঞ্জিরা ছাড়িয়া যখন পাখি দিবে উড়াল।
মাটির কায়া মাটিতে রবে, ওরে অবোধ কাল ॥
গুরুর নাম জপিলে সার, মিলিবে দিদার।
নইলে তোমার মরণকালে হবে ছারখার ॥
৩৮. বন্ধুরে বিচ্ছেদের অনলে মরি পুড়িয়া
বন্ধুরে বিচ্ছেদের অনলে মরি পুড়িয়া।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু যাও রে বাঁচাইয়া ॥
বসন্ত আসিলে সই গো, ফুল ফোটে বনে।
বন্ধুর কথা মনে পড়লে বিষ লাগে মোর মনে ॥
জ্বলিয়া পুড়িয়া অঙ্গ হলো মোর ছাই।
বন্ধু বিনে এই জগতে আপন কেহ নাই ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, আর তো সয় না।
দয়া যদি নাইবা হবে, কেন পিরিতি করলা ॥
৩৯. বসন্ত বাতাসে সই গো (বিস্তারিত সংস্করণ)
বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে।
বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে ॥
বন্ধুর বাড়ির ফুলবাগান বাড়ির উত্তরে।
ফুলের গন্ধ পাইয়া সই গো মন পাগল করে ॥
মন পাগল করে রে সই গো প্রাণ পাগল করে।
বসন্ত বাতাসে কেন মন ঘরে না ধরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, সই গো মন কেন উদাসী।
ফুলের গন্ধ পাইলে পরে কেন ঘরে বসি ॥
৪০. মারফতি গান শিখিতে চায় যারা
মারফতি গান শিখিতে চায় যারা।
গুরুর চরণে মন দাও গো তোরা ॥
গুরু বিনে গতি নাই রে ভবের বাজারে।
অন্ধকারে পথ দেখাবে দয়াল গুরু তোমারে ॥
আগে আপন চিনো রে মন, তবে চিনবে খোদা।
নিজেরে না চিনলে পরে সবই রবে বাধা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর দয়া হলে তবেই হব জারি ॥
৪১. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু (ভাব বিস্তার)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, ছেড়ে যাইবায় যদি।
কেমনে রাখিব তোমায় এই মনে অবধি ॥
অভাগিনীরে দিয়া ফাঁকি, সদায় করাও কান্দাকান্দি।
আমি তো তোমারও বন্ধু, চিরকালের বন্দি ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে, মইলে পাব কি নিধি।
ছেড়ে যাইবায় যদি বন্ধু, কেন বাড়াইলায় রে পিরিতি ॥
৪২. কালনী নদীর পাড়ে আমার বাড়ি
কালনী নদীর পাড়ে আমার বাড়ি।
উজানধল গ্রামখানি দেখতে লাগে ভারি ॥
মাটি আর মানুষের কথা গাই যে গানে।
শান্তি পাই আমি ওই কালনী নদীর তানে ॥
নদীর পাড়ে বসে আমি গুরুর নাম জপি।
চরণেরই ধূলি যেন কপালে মোর মাখি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, নদীর ঢেউয়ের মতো।
জীবন আমার বয়ে যায়, স্মৃতি আছে কত ॥
৪৩. দিন গেলে দিন আর পাব না
দিন গেলে দিন আর পাব না রে মন আমার।
মিছে কাজে কেন করো সময়ের অপহার ॥
অন্ধকারে আইলাম একা, যাইব একা একা।
পাথেয় তো নাই রে কিছু, হবে না তো দেখা ॥
গুরুর চরণ ধরে যদি করিস রে সাধনা।
তবেই হবে জীবনের সকল যাতনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে, সময় থাকতে সচেতন হও।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
৪৪. কেমনে চিনিব তোমায় মুর্শীদ রে
কেমনে চিনিব তোমায় মুর্শীদ রে।
আমি অন্ধ গুনাগার, চিনিতে নারিলাম তোমায় রে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা রে ॥
তুমি বিনে এই জগতে আপন কেহ নাই।
চরণ তলে ঠাঁই দিও হে, এই মিনতি জানাই রে ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর দেখা পেলে তবেই হব জারি রে ॥
৪৫. আমি তোমার সনে পিরিতি করিয়া
আমি তোমার সনে পিরিতি করিয়া।
সবই তো হারাইলাম বন্ধু গো দয়া না করিয়া ॥
লোকে বলে পাগল মোরে, আমি তো জানি রে।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি কালনী নদীর তীরে রে ॥
বসন্ত সময়ে যেমন কোকিল ডাকে কুহু।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ করে দুরু দুরু রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
বিষের কাঁটা বিঁধলে হৃদয়ে পরিতে হয় মালা রে ॥
৪৬. রঙিলা বাড়ৈ রে
রঙিলা বাড়ৈ রে, ঘর বানাইলায় কি দিয়া।
চৌদ্দ পোয়া ঘরখানি পবন দিয়া ছাওয়া রে ॥
মাটির পিঞ্জিরা সোনার ময়না কোনদিন দিবে ফাঁকি।
পিঞ্জিরা ছাড়িয়া যখন পাখি দিবে উঁকি রে ॥
খুঁটি নাই তার চাল নাই গো, কিসে ধরে আছে।
দয়াল গুরুর হাতে তালা, চাবি কার কাছে রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা, ভাঙবে রে এই মেলা রে ॥
৪৭. বন্ধু বিনে আর তো কেহ নাই
বন্ধু বিনে আর তো কেহ নাই রে আমার।
হৃদয় মন্দিরে মোর আছে ছবি তোমার ॥
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে দেখি বারে বার।
জাগিয়া না পাই বন্ধু খুঁজি অন্ধকার রে ॥
কি যাদু করিয়া বন্দে মন নিল হরিয়া।
দেওয়ানা বানাইল মোরে পাগল করিয়া রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিয়া নিভাও বিচ্ছেদ অনল মোর রে ॥
৪৮. দয়াল গো পার করিয়া লও গো আমারে
দয়াল গো পার করিয়া লও গো আমারে।
ভব নদী কেমনে হব পার, ভাবি বারে বারে ॥
আমি তো গুনাগার অতি, নাই রে কোনো সম্বল।
তব নাম লয়ে দয়াল ভাসাই নয়ন জল রে ॥
পার না করিলে দয়াল আমায় যাইব কি নিধি।
তোমার চরণে যেন জনম কাটাই নিরবধি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ রে ॥
৪৯. মানুষে মানুষ কেন বিভেদ করে রে
মানুষে মানুষ কেন বিভেদ করে রে।
একই মাটি একই পানি সবার শরীরে রে ॥
হিন্দু কি মুসলমান কিবা বৌদ্ধ কি খ্রিস্টান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ রে ॥
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে চলো প্রেমের গান গাই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই আমার দেশ।
মিলিয়া মিশিয়া থাকলে ঘুচবে সকল ক্লেশ রে ॥
৫০. ওরে আমার অবোধ মন
ওরে আমার অবোধ মন কি করলি তুই।
মিছে কাজে দিন কাটাইলি হারালি দিন কাল রে ॥
আসলে তো একা তুমি যাবে একা একা।
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা রে ॥
গুরুর চরণ ধরে যদি করিস রে সাধনা।
তবেই হবে জীবনের সকল যাতনা রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে হও সচেতন।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও রে ॥
৫১. কালনী নদীর কূলে কূলে (স্মৃতিচারণ)
কালনী নদীর কূলে কূলে ঘুরি আমি একা।
বন্ধুর স্মৃতি মনে পড়লে মন হয় গো ফাঁকা ॥
একই সাথে খেলতাম মোরা একই সাথে গান।
এখন কেন পর করিলে ব্যথায় কাঁদে প্রাণ রে ॥
মাটি আর মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে রে ॥
৫২. কোন মেস্তরি নাও বানাইল
কোন মেস্তরি নাও বানাইল রে, দেখিয়া প্রাণ জুড়ায়।
আচানক এক নৌকা দেখি ভব নদী বয় রে ॥
রঙ-বেরঙের তক্তা দিয়া নাওখানি সাজাইল।
নয়টি দরোজা দিয়া পবন চালিত হইল রে ॥
মাঝ দরজায় খিল দিয়াছে দয়াল গুরুর চাবি।
খুলিতে না পারলে তুমি সবই হবে ফাঁকি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর দয়া হলে তবেই হবে জারি রে ॥
৫৩. ওরে আমার মন পাগল
ওরে আমার মন পাগল কেন হইলি উদাস।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি বিশ্বাস রে ॥
চিনলি না রে আপন পর, চিনি নিলি বাড়ি ঘর।
আসল ঘরের খবর নিতে কাটল রে সময় রে ॥
দিন গেল দিনের পথে রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই তুমি মুক্তি পাবে শান্তি লাভ করো রে ॥
৫৪. বাউলা গানে মন মজাইলি
বাউলা গানে মন মজাইলি ওরে আমার মন।
সংসার সুখের আশা ত্যজিলি তুই যখন রে ॥
একতারাটি হাতে নিয়ে পথে পথে ঘুরে।
বন্ধুর তালাশ করিস কেন মিছে ডুকরে মরে রে ॥
আগে আপন চিনো রে মন তবেই চিনবে খোদা।
নিজেরে না চিনলে পরে সবই রবে বাধা রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গানই আমার প্রাণ।
মাটি আর মানুষের কথা আমার গানের তান রে ॥
৫৫. দয়া করো ওহে দয়াময়
দয়া করো ওহে দয়াময় আমি এক গুণাহগার।
তোমার করুণা বিনে গতি নাহি আর রে ॥
ভুল পথে চলেছি আমি অন্ধ হয়ে মোহে।
এখন আমায় রক্ষা করো চরণেরই ছায়ে রে ॥
ধন-দৌলত কিসের আশা সবই হবে শেষ।
তোমার নাম জপিলে ঘুচবে সকল ক্লেশ রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ডাকি বারে বার।
পার করিয়া লও গো মোরে ভব পারাবার রে ॥
৫৬. প্রাণের সখী রে
প্রাণের সখী রে, কিসের পিরিত করলি রে।
বন্ধুর লাগি পাগল হয়ে ঘর ছাড়িলি রে ॥
শুইলে না আসে ঘুম নিশি হয় ভোর।
বন্ধুর কথা মনে পড়লে নয়ন ঝরে লোর রে ॥
পিরিত বড় বিষের জ্বালা সইতে পারা দায়।
একবার যে মজেছে সে কি মুক্তি খুঁজে পায় রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সই রে মন তো মানে না।
পিরিতের যাতনা বন্ধু তুই তো জানলা না রে ॥
৫৭. মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে
মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে ওহে আমার বন্ধু।
তুমি আছো সর্বব্যাপী প্রেমের মহাসিন্ধু রে ॥
নদী নালা পাহাড় পর্বত সবই তোমার দান।
সবার মাঝে বিরাজ করো ওহে ভগবান রে ॥
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে চলো প্রেমের গান গাই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই আমার দেশ।
মিলিয়া মিশিয়া থাকলে ঘুচবে সকল ক্লেশ রে ॥
৫৮. ওরে ও কালনী নদী
ওরে ও কালনী নদী কেন করিস খেলা।
আমার জীবন তরী লয়ে করলি কত অবহেলা রে ॥
তোমার কূলে বসে আমি কত গান গাইলাম।
সুখ-দুঃখের কথা কত তোরে শুনাইলাম রে ॥
উজান ধল গ্রামের আমি শাহ আব্দুল করিম।
তোর ঢেউয়ের তালে তালে জীবন হলো বিলীন রে ॥
৫৯. আমি একলা চলিলাম রে
আমি একলা চলিলাম রে আমার কেউ নাই রে।
দয়াল গুরু পার করিয়া লও গো আমায় ও পারে রে ॥
ভব মেলা সাঙ্গ হলো রাত্রি এল ঘন।
এখন কেন একা আমি কাঁদে মোর মন রে ॥
সাথী যারা ছিল আমার সবাই গেল চলি।
এখন আমি কারে ডাকি কারে কথা বলি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো রে ॥
৬০. আমি কি তোর মায়ার গোলকধাঁধায়
আমি কি তোর মায়ার গোলকধাঁধায় পড়ে থাকব রে।
নিজেরে না চিনলে আমি কারে চিনব রে ॥
আসল বাড়ি ঘর ছাড়িয়া পরবাসে বসতি।
মিছে কাজে দিন কাটাইলাম হইলো না মোর গতি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে আমার মন।
সময় থাকতে চিনে নে তোর আসল মহাজন রে ॥
৬১. শোনরে আমার মন-ভোমরা
শোনরে আমার মন-ভোমরা, মধু পানে মত্ত থাকিস না।
যে ফুলের সৌরভ নাই রে তার কাছেতে যাস না ॥
ভবের বাগানে অনেক ফুল ফুটে আছে দিনে রাইতে।
আসল ফুলটি চিনতে পারলে তবেই শান্তি পাইতে রে ॥
গুরুর কৃপা ছাড়া সেই ফুলের দেখা মেলা ভার।
আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ করো রে সার ॥
৬২. তোমার আমার পিরিত বন্ধু
তোমার আমার পিরিত বন্ধু জগতেরও জানা।
তুমি কেন আমার সনে করো টানাটানা রে ॥
আড়ালে থাকিয়া বন্ধু কেন হাসো মনে মনে।
দেখা দিলে কি ক্ষতি হয় এই অভাগীর সনে রে ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ রে ॥
৬৩. কেন আইলাম ভবের বাজারে
কেন আইলাম ভবের বাজারে আমি কি করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
খালি হাতে আইলাম আমি খালি হাতে যাইব।
পাথেয় তো নাই রে কিছু কার মুখ আমি চাইব রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে অবোধ মন।
গুরুর নাম জপিলে হবে পরকাল রঙিন ॥
৬৪. মুর্শিদ দয়াল পার করো আমারে
মুর্শিদ দয়াল পার করো আমারে এই ভব পারাবারে।
আমি তো সাতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে রে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ-শীর্ণ মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার রে ॥
তব চরণেতে ঠাঁই দিও ওহে দয়াময়।
আব্দুল করিম তোমার নামে জীবন সঁপে দেয় রে ॥
৬৫. সখী আমার জীবন হলো শেষ
সখী আমার জীবন হলো শেষ বন্ধু আইল না।
বসন্ত তো চইলা গেল আর তো সয় না রে ॥
কালনী নদীর তীরে বসে কত নিশি জাগলাম।
পথের পানে চাইয়া কত গান যে গাইলাম রে ॥
আব্দুল করিম বলে সখী পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা রে ॥
৬৬. মায়াময় এই জগত সংসার
মায়াময় এই জগত সংসার কিসের বা বাহাদুরি।
সাঙ্গ হলে সব খেলা রে একলাই দিবি পাড়ি ॥
স্ত্রী-পুত্র কেউ নাই রে বন্ধু কিসের অহঙ্কার।
মাটির কায়া মাটিতে রবে রবে না আর রে ॥
গুরুর নাম জপিলে পাবে মুক্তি পথের দিশা।
আব্দুল করিম বলে মিটাও এই ভব তৃষ্ণা রে ॥
৬৭. আমি দয়াল গুরুর দাস হইলাম
আমি দয়াল গুরুর দাস হইলাম এই জনমে আর।
চরণ ধূলি কপালে মোর লব বারবার রে ॥
অন্ধকারে পথ দেখাবে দয়াল গুরু আমার।
ভব সাগরে পার করবে করিয়া করুণার রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গানই আমার আরাধনা।
গুরুর আশীর্বাদে ঘুচবে সকল যাতনা রে ॥
৬৮. ওরে ও ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া
ওরে ও ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া।
উজান ধল গ্রামের খবর দিস রে গিয়া ॥
বলিস আমার গুরুজিরে দেখা যেন দেয় আমারে।
আমি তো তাঁর লাগি বসি আছি পথ চাহিয়া ॥
কালনী নদীর কূলে কূলে আমি ঘুরি একা একা।
কোনদিন যে হইবে রে আমার দয়াল গুরুর দেখা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মন আমার মানে না।
দয়াল গুরুর চরণ বিনে কিছুই যে জানে না ॥
৬৯. মানুষ ধরো মানুষ ভজো
মানুষ ধরো মানুষ ভজো শোনরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
মন্দির বলো মসজিদ বলো সবই মানুষের গড়া।
মানুষের হৃদয়ে আছে আল্লাহ-রাসূল ধরা ॥
শাস্ত্রে কিবা পাবে তুমি যদি না হয় জ্ঞান।
সবার উপরে মানুষ সত্য দিও তারে সম্মান ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৭০. কালনী নদীর পাড়ে আমার ছোট কুটিরখানি
কালনী নদীর পাড়ে আমার ছোট কুটিরখানি।
সেথায় বসে ডাকি তোমায় দিবস-রজনী ॥
নদীর কলকল তানে শুনি তোমার সুর।
তুমি আমার কাছে আছো না কি অনেক দূর ॥
মাটি আর মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার চরণে মরে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৭১. ওরে আমার অবুঝ হিয়া
ওরে আমার অবুঝ হিয়া কিসের ভাবনা তোর।
দিন তো গেল দিনের পথে আসিল যে ঘোর ॥
সাথি যারা ছিল তোমার সবাই গেল চলি।
এখন কেন একা তুমি করো কেবলই হাহাকারি ॥
গুরুর চরণ ধরে যদি করিস রে সাধনা।
তবেই হবে জীবনের সকল যাতনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে হও সচেতন।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
৭২. আমি ঘর করলাম বাহির বন্ধুয়ারই তরে
আমি ঘর করলাম বাহির বন্ধুয়ারই তরে।
লোকে মন্দ বলে মোরে আমি তো জানি রে ॥
কি যাদু করিল বন্ধু মন নিল হরিয়া।
পাগল আব্দুল করিম কান্দে পথে বসিয়া ॥
সখী আমার জীবন ধন্য হইল বন্ধুয়ারই দেখা পাইয়া।
হৃদয় জুড়ে বসতি তারে রাখিমু ধরিয়া ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু আর তো ভয় নাই।
তোমার চরণে যেন জনম কাটাই ॥
৭৩. ওরে ও রঙের বাউলা
ওরে ও রঙের বাউলা কি গান গাস রে তুই।
সুর তো লয় না রে তোর প্রাণে বাজে না গো সই ॥
মায়ের চরণে ভক্তি নাই তোর গুরুর নাই মান।
কেমনে পাবি রে তুই সেই পিরিতের টান ॥
আগে নিজেরে শুদ্ধ কর তবে গাস গান।
মানুষের তরে সঁপিয়া দে তোর সকল সম্মান ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গান তো কেবল সুর নয়।
প্রাণের টান না থাকলে গান কি কভু গান হয় ॥
৭৪. দয়াল তোমার দয়া হলে সব হবে সফল
দয়াল তোমার দয়া হলে সব হবে সফল।
তব চরণে যেন ঠাঁই পাই গো সফল ॥
আমি তো গুনাগার অতি নাই মোর কোনো গতি।
তব নাম লয়ে দয়াল ভাসাই নয়ন জল ॥
ভবসিন্ধু পার হইতে নাই মোর সম্বল।
দয়া করে পার করিও ওহে দয়াময় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৭৫. দুনিয়ার এই রঙ-তামাশা
দুনিয়ার এই রঙ-তামাশা সবই হবে শেষ।
মাটির কায়া মাটিতে মিশবে রবে না কোণো রেশ ॥
ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র কেউ হবে না তোর।
একলা আইলায় একলা যাইবায় সাঙ্গ হবে ঘোর ॥
গুরুর নাম জপিলে সার মিলিবে দিদার।
নইলে তোমার মরণকালে হবে ছারখার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লা বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৭৬. আমি এক পাপিষ্ঠ অধম
আমি এক পাপিষ্ঠ অধম, ওহে দয়াময়।
তোমার করুণা ছাড়া নেই কোনো উপায় ॥
ভবের মায়ায় মজে আমি দিন কাটাইলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
গুরুর চরণে আমায় দিও একটু ঠাঁই।
তব করুণা ছাড়া আমি কার মুখ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে আমার মন।
সময় থাকতে চিনে নে তোর আসল মহাজন ॥
৭৭. পিরিত বিষের কাঁটা
পিরিত বিষের কাঁটা বিঁধলে হৃদয়ে।
শান্তি পাওয়া যায় না আর বিরহ সয়ে ॥
বন্ধুর পিরিতে আমি পাগল হইলাম।
কুল-মান যা ছিল সব সঁপিয়া দিলাম ॥
লোকে বলে পাগল মোরে, আমি তো জানি রে।
বন্ধুর পিরিতে জ্বলে মরি কালনী নদীর তীরে ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিয়া নিভাও বিচ্ছেদ অনল মোর ॥
৭৮. এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া
এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া, ভাবিয়া দেখ মন।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে না তো কোনো জন ॥
টাকা-পয়সা বাড়ি-গাড়ি সব রবে পড়ে।
মাটির কায়া মিশবে তলে অন্ধকার ঘরে ॥
গুরুর চরণ ধরে যদি করিস রে সাধনা।
তবেই কাটবে তোর মনের সকল যাতনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা, ভাঙবে রে এই মেলা ॥
৭৯. সখী গো আমার মন মানে না
সখী গো আমার মন মানে না, বন্ধু বিনে আর।
হৃদয় মন্দিরে মোর আছে ছবি শুধু তাঁর ॥
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে দেখি বারে বার।
জাগিয়া না পাই বন্ধু খুঁজি অন্ধকার ॥
কি যাদু করিয়া বন্দে মন নিল হরিয়া।
দেওয়ানা বানাইল মোরে পাগল করিয়া ॥
আব্দুল করিম বলে সখী, পিরিত বড় দায়।
একবার যে মজেছে সে কি মুক্তি খুঁজে পায় ॥
৮০. মুর্শিদ ধন হে কেমনে চিনিব
মুর্শিদ ধন হে কেমনে চিনিব তোমায়।
চিনিতে নারিলাম আমি ভব অন্ধকার ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
পার করিয়া লও গো মোরে ভব পারাবারে।
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৮১. রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না (তত্ত্বগান)
রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না রে মন।
মিছে মায়ার এই জগতে শান্তি মিলে না ॥
ধন জন কিসের আশা, কিসের জমিদারি।
একলা আইলায় একলা যাইবায় নেই যে ঘর বাড়ি ॥
গুরুর নাম জপিলে সার, মিলিবে দিদার।
নইলে তোমার মরণকালে হবে ছারখার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লা বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৮২. আমি তোমার কিবা করি অপরাধ
আমি তোমার কিবা করি অপরাধ ওহে দয়াময়।
কেন আমায় রাখলে দূরে দিয়ে মনের ভয় ॥
তব চরণেতে ঠাঁই পাইলে ঘুচত অন্ধকার।
দয়া করে দেখা দিলে হতো চমৎকার ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করিয়া লও তোমার ওই তরী রে ॥
৮৩. জীবন তরী চলছে বাইয়া
জীবন তরী চলছে বাইয়া নদীর কূলে কূলে।
হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে দেখো দিন শেষে সব ভুলে ॥
উজান গাঙে বাইবা নাওখানি গুরুর নাম লয়ে।
তবেই তুমি পৌঁছে যাবে ভব পার হয়ে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে ও মন মাঝি।
পার না হলে মিছে হবে তোর জীবনের বাজি ॥
৮৪. মনরে আমার শোন কথা
মনরে আমার শোন কথা, করিস না আর ব্যাথা।
দয়াল গুরুর চরণে মোর প্রাণ সঁপিলাম এথা ॥
ভবের মায়ায় মজে তুই হারালি দিনকাল।
সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তোর বিষম মহাকাল ॥
এখনও সময় আছে গুরুর চরণ ধর।
আপন মানুষ চিনলি না তুই কেবল করলি পর ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বৃথা গেল সময়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৮৫. ওরে আমার প্রাণের সখী
ওরে আমার প্রাণের সখী, কিসের পিরিত করলি রে।
বন্ধুর মায়ায় মজে তুই তো পাগল হইলি রে ॥
খাইতে বসলে অন্ন রোচে না, ঘুমে ধরে না আঁখি।
বন্ধুর কথা মনে হলে মনে হয় কি সখী ॥
পিরিত বড় বিষের জ্বালা সইতে পারা ভার।
আব্দুল করিম বলে সখী পিরিত গলার হার ॥
৮৬. আমি মায়ার জালে বন্দি হইলাম
আমি মায়ার জালে বন্দি হইলাম এই ভবের বাজারে।
আসল কাজ তো ভুলিয়া রইলাম পড়িয়া অন্ধকারে ॥
ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র সবই তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে সব মায়া ভাই ভাঙবে রে এই মেলা ॥
গুরুর কৃপা ছাড়া পথ চেনা বড়ই দায়।
আব্দুল করিম ডাকি তোমায় দাও হে আশ্রয় ॥
৮৭. দয়াল গুরুর নাম জপিলে
দয়াল গুরুর নাম জপিলে পাপ হবে বিনাশ।
হৃদয় জুড়ে বসতি হবে ঘুচবে মনের আশ ॥
সংসার ত্যজিলাম আমি গুরুর প্রেমের তানে।
শান্তি পাই আমি শুধু ওই গুরুর গানে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গানই আমার আরাধনা।
গুরুর দয়া হলে ঘুচবে সকল যাতনা ॥
৮৮. কেন মিছে ভাবনা করো ওরে আমার মন
কেন মিছে ভাবনা করো ওরে আমার মন।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন ॥
একলা আইলায় একলা যাইবায় সাঙ্গ হবে খেল।
মাটির কায়া মাটিতে মিশবে থাকবে না কোনো মিল ॥
গুরুর চরণ সার করো মিছে ভাবনা ছাড়ো।
পাগল আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম ধরো ॥
৮৯. আমি তোমার নামের মালা গেঁথেছি
আমি তোমার নামের মালা গেঁথেছি এই মনে।
একবার দেখা দাও হে বন্ধু আমার এই জীবনে ॥
তুমি আমার নয়ন মণি তুমি প্রাণের ধন।
তোমায় ছাড়া অন্ধকার মোর এই ত্রিভুবন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
দয়াল গুরুর চরণ বিনে গতি নাহি আর ॥
৯০. ওরে ও মায়ার দুনিয়া
ওরে ও মায়ার দুনিয়া কেন করিস ছল।
তোর মায়ায় মজে আমি হারাইলাম সম্বল ॥
দিন থাকতে দিন গেল আমার রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৯১. বন্ধু আমার প্রাণের বন্ধু
বন্ধু আমার প্রাণের বন্ধু দেখা দাও আমারে।
বিচ্ছেদ অনলে আমি পুড়ি অন্ধকারে ॥
বসন্ত সময়ে ফুল ফুটেছে ডালে ডালে।
তুমি বিনে বিরহ বিষ লাগে মোর কপালে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় বিষ।
তোমায় ছাড়া কার কাছে আমি হইব রে আশিস ॥
৯২. গুরুর চরণে মন দাও গো তোরা
গুরুর চরণে মন দাও গো তোরা এই আমার বিনয়।
গুরুর কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে উপায় ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
আব্দুল করিম বলে গুরু আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৯৩. আমি ভবের হাটে পথ হারালাম
আমি ভবের হাটে পথ হারালাম ওহে দয়াময়।
অন্ধকারে পথ দেখাও দিয়ে আমায় আশ্রয় ॥
সাথি যারা ছিল আমার সবাই গেল চলি।
এখন আমি কারে ডাকি কারে কথা বলি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৯৪. মাটির মানুষ মাটি হবে
মাটির মানুষ মাটি হবে কিসের অহঙ্কার।
একবার ভেবে দেখো তুমি কী এনেছো আর ॥
খালি হাতে আইলায় তুমি খালি হাতে যাইবায়।
মাঝপথে মিছে তুমি মায়ার ঘর বানাইলায় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে আমার মন।
গুরুর নাম জপিলে হবে পরম সে ধন ॥
৯৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইল না।
কালনী নদীর তীরে বসে আর তো সয় না ॥
পথের পানে চাইয়া কত নিশি কাটলো আমার।
বন্ধুর দেখা পাইলাম না আমি পাইলাম অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জ্বালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৯৬. পিরিত করা সহজ কথা নয়
পিরিত করা সহজ কথা নয় রে আমার ভাই।
পিরিত করলে কলঙ্ক হয় এই জগতে জানাই ॥
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম আমি।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম যে পাগলিনী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৯৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছলনা।
বিচ্ছেদ অনল দিয়ে আমার পুরাও যাতনা ॥
তুমি তো আছো সুখে বন্ধু পরবাসে গিয়া।
আমি তো কাঁদি সদাই তোমার পথ চাহিয়া ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিলে ঘুচত মনের অন্ধকার মোর ॥
৯৮. দয়াল গুরু তোমার নামে
দয়াল গুরু তোমার নামে জীবন সঁপিলাম।
ভব নদী পার হওয়ার আসা আমি করিলাম ॥
নৌকা আমার জীর্ণ-শীর্ণ মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর দয়া হলে তবেই হব জারি ॥
৯৯. মানুষের মাঝে আল্লা বিরাজ করে
মানুষের মাঝে আল্লা বিরাজ করে শোনরে আমার মন।
মন্দির-মসজিদে কেন করিস অন্বেষণ ॥
শুদ্ধ মনে ডাকলে তাঁরে পাইবে নিজের ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
১০০. ইতি কথা
জীবন আমার গানের মেলা কালনী নদীর তীরে।
গানের সুরে থাকতে চাই আমি সবার মাঝারে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম আমি।
আমার গানের সুরে থেকো বন্ধু তুমি চিরদামী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজে তোমরা পাবে ॥
১০১. কে তোমার আর কে আমার
কে তোমার আর কে আমার ভাবিয়া দেখ মন।
যাবার বেলায় কেউ হবে না তোমার আপন জন ॥
যারে তুমি ভাবো আপন সে তো কেবল মায়ার বাঁধন।
সাঙ্গ হলে সব মায়া ভাই রবে পড়ে ধন-রতন ॥
মাটির কায়া মাটিতে মিশবে রবে না কোণো চিহ্ন।
শাহ আব্দুল করিম বলে পরকাল হবে রে শূন্য ॥
১০২. মুর্শিদ নামের নৌকাখানি
মুর্শিদ নামের নৌকাখানি লয়ে যাও হে বাইয়া।
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে গুরুর নাম লইয়া ॥
ভব নদীর উথাল পাথাল ঢেউ লেগেছে নৌকায়।
দয়াল গুরু হাল ধরো গো আমায় বাঁচাও এবেলায় ॥
আমি তো মাঝি নয় রে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
১০৩. প্রেমের বাজারে আমি হইলাম যে ফতুর
প্রেমের বাজারে আমি হইলাম যে ফতুর।
বন্ধুর পিরিতে মজে হারাইলাম সব চতুর ॥
কি করি কি করি বন্ধু কিছুই তো জানি না।
তোমার দেখা বিনে সখী মনে শান্তি মিলে না ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
পাগল আব্দুল করিম কান্দে বন্ধুয়ার আশায় ॥
১০৪. সখী গো আমার জীবন তরী চলে উজান গাঙে
সখী গো আমার জীবন তরী চলে উজান গাঙে।
কালনী নদীর তীরে বসে বন্ধুয়ার ছবি মনে জাগে ॥
আগে যেমন ছিলাম মোরা এখন তেমন নাই।
বন্ধুর স্মৃতি লয়ে আমি কেবল গান গেয়ে যাই ॥
মাটি আর মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে।
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দেখা দাও আমারে ॥
১০৫. ওরে আমার অবোধ মন কি খেলা খেললি
ওরে আমার অবোধ মন কি খেলা খেললি রে।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে সব হারাইলি রে ॥
খুঁটি নাই তোর ঘরখানি চাল তো বাতাসে উড়ে।
এখন কেন কান্দো রে মন একলা অন্ধকারে ॥
গুরুর কৃপা ছাড়া পথ চেনা বড়ই দায়।
আব্দুল করিম ডাকি তোমায় দাও হে আশ্রয় ॥
১০৬. দয়াল মুর্শিদ তোমার প্রেমে পাগল হইলাম আমি
দয়াল মুর্শিদ তোমার প্রেমে পাগল হইলাম আমি।
তব চরণে সঁপিলাম মোর প্রাণেরই স্বামী ॥
অন্ধকারে পথ দেখাও ওহে দয়াময়।
তোমার নাম জপিলে যেন হয় জীবন অক্ষয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১০৭. কেন পিরিতি করলা বন্ধু মোরে না বলিয়া
কেন পিরিতি করলা বন্ধু মোরে না বলিয়া।
এখন কেন কান্দো তুমি একলা বসিয়া ॥
পিরিত করা সহজ কথা নয় রে আমার ভাই।
পিরিত করলে কলঙ্ক হয় এই জগতে জানাই ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
১০৮. মাটি দিয়া গড়া কায়া কিসের গর্ব কর
মাটি দিয়া গড়া কায়া কিসের গর্ব কর।
একটু পবন ফুরাইলে হইবা তুমি পর ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গী হবে শুধু গুরুর সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১০৯. বন্ধু তুমি দূরে কেন থাকো আড়ালে
বন্ধু তুমি দূরে কেন থাকো আড়ালে।
দেখা দিলে কি ক্ষতি হয় আমার এই কপালে ॥
তোর লাগিয়া আমার পরাণ করে দুরু দুরু।
তুমি আমার দয়াল বন্ধু তুমি আমার গুরু ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিয়ে নিভাও অন্ধকার মোর ॥
১১০. জীবন ডুরি ছিঁড়ে যাবে একদিন হঠাৎ করে
জীবন ডুরি ছিঁড়ে যাবে একদিন হঠাৎ করে।
রঙের খেলা সাঙ্গ হবে অন্ধকার ঘরে ॥
সাথি যারা ছিল তোমার সবাই যাবে চলে।
একলা তুমি রইবে পড়ে মাটিরই তলে ॥
গুরুর নাম জপিলে সার মিলিবে দিদার।
নইলে তোমার মরণকালে হবে ছারখার ॥
১১১. মায়া জালে বন্দি হয়ে আর কতকাল রবে
মায়া জালে বন্দি হয়ে আর কতকাল রবে।
দিন ফুরালে একলা তুমি কোন পথে যে যাবে ॥
যারে তুমি ভাবো আপন সে তো তোমার নয়।
সাঙ্গ হলে প্রাণের খেলা রবে শুধু ভয় ॥
গুরুর চরণ সার করো মিছে ভাবনা ছাড়ো।
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম ধরো ॥
১১২. আমি এক ভিখারি বন্ধু তোমার চরণে
আমি এক ভিখারি বন্ধু তোমার চরণে।
একবার দেখা দিয়া তরাও আমায় জীবনে ॥
তব নামে গান গেয়ে আমি কাটাই দিন-রজনী।
তুমি আমার নয়ন মণি তুমি আমার ধমনী ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে দয়া নাই কি তোর।
বিচ্ছেদ অনল দিয়ে পুড়াইলি অঙ্গ মোর ॥
১১৩. ওরে ও রঙিলা মাঝি
ওরে ও রঙিলা মাঝি নাওখানি বাও সাবধানে।
উজান গাঙে ঢেউ লেগেছে দয়াল গুরুর টানে ॥
নদী তো নয় সাগর যেন কুল-কিনারা নাই।
দয়াল গুরুর দেখা পেলে তবেই রক্ষা পাই ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা আছে অল্প।
গুরুর দয়া ছাড়া সব যে আমার গল্প ॥
১১৪. কেন তুমি পর করিলে আমায় বন্ধুয়া
কেন তুমি পর করিলে আমায় বন্ধুয়া।
আমি তো তোমারও তরে আছি পথ চাহিয়া ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার মনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
১১৫. মানুষে মানুষে কেন এত ভেদাভেদ
মানুষে মানুষে কেন এত ভেদাভেদ ভাই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে।
তবে কেন মারামারি তুচ্ছ স্বার্থের তরে ॥
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে চলো গলার মালা গাঁথি।
আব্দুল করিম বলে প্রেমই হবে বাতি ॥
১১৬. দয়াল গুরু পার করো ওহে দয়াময়
দয়াল গুরু পার করো ওহে দয়াময়।
তোমার দয়া ছাড়া আমার নাই তো উপায় ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১১৭. সখী গো আমার মন মানে না ঘরে
সখী গো আমার মন মানে না ঘরে।
বন্ধুর কথা মনে পড়লে আঁখি শুধু ঝরে ॥
কি মায়া করিল বন্ধু মন নিল কাড়িয়া।
পাগল আব্দুল করিম কান্দে উজান ধলে বসিয়া ॥
একবার যদি আসতো বন্ধু দেখা দিতাম তারে।
প্রাণের কথা খুলে বলে নিতাম আপন করে ॥
১১৮. ওরে আমার অবুঝ মন কি করলি তুই
ওরে আমার অবুঝ মন কি করলি তুই রে।
আসল পথটি ছেড়ে দিয়ে ভুল পথে গেলি রে ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গী হবে শুধু গুরুর সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১১৯. আমারে পাগল করিল রে ঐ বন্ধুয়ার প্রেমে
আমারে পাগল করিল রে ঐ বন্ধুয়ার প্রেমে।
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে ডাকি তারে নামে ॥
লোকে বলে আমি মন্দ আমি তো জানি রে।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম দেওয়ানি রে ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
১২০. জীবনের এই বেলা শেষে
জীবনের এই বেলা শেষে কি বা পাইলাম আমি।
গুরুর নামের মালা শুধু গলে পরলাম দামি ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজে তোমরা পাবে ॥
১২১. মনরে তুই করলি কি কাজ
মনরে তুই করলি কি কাজ ভবের বাজারে।
আসল রত্ন হারিয়ে এখন কান্দিস অন্ধকারে ॥
মিছে মায়ার জালে জড়িয়ে কাটলো সারা বেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
গুরুর চরণ সার না করলে নাই রে তোর উপায়।
শাহ আব্দুল করিম বলে দিন তো বয়ে যায় ॥
১২২. ওরে আমার প্রাণের মুর্শিদ রে
ওরে আমার প্রাণের মুর্শিদ রে, তোমায় কই পাব।
হৃদয় পিঞ্জিরা খুলে তোমায় কোথায় বসাব ॥
অন্ধকারে পথ হারালাম ওহে দয়াময়।
তোমার দয়া ছাড়া আমার নাই তো উপায় ॥
তুমি বিনে এই জগতে আপন কেহ নাই।
আব্দুল করিম বলে তোমার চরণ ধূলি চাই ॥
১২৩. বন্ধু বিনে বিফল এ যৌবন
বন্ধু বিনে বিফল এ যৌবন, বিফল আমার হিয়া।
কেমনে থাকিব আমি একলা ঘরে শুইয়া ॥
বসন্ত আসিলে সই গো কোকিল ডাকে ডালে।
বন্ধুর কথা মনে পড়লে বিরহ বিষ লাগে কপালে ॥
পাগল আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
১২৪. এই দুনিয়ার মায়ায় পইড়া
এই দুনিয়ার মায়ায় পইড়া হারাইলাম সম্বল।
দুই দিনের এই রঙ-তামাশা সবই যে বিফল ॥
যারে তুমি আপন ভাবো কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর হবে না রে বাতি ॥
গুরুর নাম জপিলে রে মন পাবি রে নিস্তার।
শাহ আব্দুল করিম বলে এই জীবনের সার ॥
১২৫. আমি তোমার প্রেমের ভিখারি
আমি তোমার প্রেমের ভিখারি ওহে প্রাণের বন্ধু।
তুমি আছো সর্বব্যাপী দয়ার মহাসিন্ধু ॥
কি যাদু করিয়া বন্দে মন নিল কাড়ি।
ঘর করিলাম বাহির আমি পাগল বেশ ধরি ॥
আব্দুল করিম বলে বন্ধু দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিয়া নিভাও বিচ্ছেদ অনল মোর ॥
১২৬. ওরে ও দয়াল গুরু
ওরে ও দয়াল গুরু পার করো আমারে।
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবি অন্ধকারে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা আছে অল্প।
গুরুর দয়া ছাড়া সব যে মায়ার গল্প ॥
ভবসিন্ধু পার হইতে নাই মোর সম্বল।
দয়া করে দেখা দিলে হবে রে সফল ॥
১২৭. মানুষে মানুষে মিল না থাকিলে
মানুষে মানুষে মিল না থাকিলে ধর্ম কিসে হয়।
সবার উপরে মানুষ সত্য দিও মানুষের পরিচয় ॥
জাত-পাত আর ধর্মের নামে করো মারামারি।
ভুল পথে চলেছ তুমি অহঙ্কার লয়ে ভারি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই আমার সাধ।
সবার মাঝে ঘুচে যাক সব ভেদাভেদ বাদ ॥
১২৮. সখী আমার দিন যায় রে
সখী আমার দিন যায় রে বন্ধুয়ার চরণে।
একবার দেখা দিলে শান্তি পেতাম জীবনে ॥
কালনী নদীর তীরে সখী বসি নিরালায়।
বন্ধুর স্মৃতি মনে পড়লে মন হয় গো উদাসী ॥
আব্দুল করিম বলে সখী পিরিত গলার হার।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কিছু আর ॥
১২৯. ওরে অবোধ মন আমার
ওরে অবোধ মন আমার কেন হইলি দেওয়ানা।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি ঠিকানা ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৩০. আমি তোমার নামের গান গেয়ে যাই
আমি তোমার নামের গান গেয়ে যাই এই ভুবনে।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার চরণে ॥
মাটি আর মানুষের কথা আমার গানের তানে।
উজানধল গ্রামখানি আমার প্রাণের সনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৩১. আমি কুল-মান সবই হারাইলাম
আমি কুল-মান সবই হারাইলাম বন্ধু তোমার তরে।
লোকে মন্দ বলে মোরে আমি তো জানি রে ॥
গৃহবাস তেয়াগিলাম পিরিত করিয়া।
এখন কেন আছো বন্ধু আমায় ভুলিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
১৩২. দয়া করো ওহে দয়াময় (নতুন সংস্করণ)
দয়া করো ওহে দয়াময় আমি এক গুনাগার।
তব চরণেতে ঠাঁই দিও ওহে কর্ণধার ॥
ভুল পথে চলিয়া আমি কাটাইলাম দিন।
গুরুর দয়া বিনে আমি অতিশয় দীন ॥
অন্ধকারে পথ দেখাও ওহে কৃপাময়।
আব্দুল করিম তোমার নামে জীবন সঁপে দেয় ॥
১৩৩. ওরে আমার অবুঝ হিয়া (বিচ্ছেদ গান)
ওরে আমার অবুঝ হিয়া কিসের ভাবনা তোর।
দিন তো গেল দিনের পথে আসিল যে ঘোর ॥
সাথি যারা ছিল তোমার সবাই গেল চলি।
এখন কেন একা তুমি করো হাহাকারি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
১৩৪. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায়
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় রে মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে সেই যে মহাজন ॥
মন্দির-মসজিদ বলো সবই তোমাার মাঝে।
নিজেকে চিনে নে মন অকারণের কাজে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
১৩৫. আমার মন-পাখিটা উড়াল দিল
আমার মন-পাখিটা উড়াল দিল পিঞ্জিরা ছাড়িয়া।
কোন বনে যে গেল রে সে মোরে ভুলিয়া ॥
কত যত্ন করে পাখি পালিলাম অন্তরে।
একবারও না চাইল পাখি যাবার বেলা ফিরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মায়ার পিঞ্জিরা।
সাঙ্গ হলে সব খেলা ভাই সবই তো অন্ধকার ॥
১৩৬. ওরে ও মায়ার নদী
ওরে ও মায়ার নদী কেন করিস খেলা।
আমার জীবন তরী লয়ে করলি কত অবহেলা ॥
তোমার কূলে বসে আমি কত গান গাইলাম।
সুখ-দুঃখের কথা কত তোরে শুনাইলাম ॥
আব্দুল করিম বলে কালনী নদীর তীরে।
গানের সুরে থেকো তোমরা এই অধমেরে ॥
১৩৭. কি করি কি করি বন্ধু কিছুই তো জানি না
কি করি কি করি বন্ধু কিছুই তো জানি না।
তোমার দেখা বিনে সখী মনে শান্তি মিলে না ॥
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে দেখি যে তোমারে।
জাগিয়া না পাই বন্ধু খুঁজি অন্ধকারে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
১৩৮. আমি তোমার নামের তসবিহ জপি
আমি তোমার নামের তসবিহ জপি এই জীবনে।
একবার দেখা দাও হে বন্ধু আমার এই মরণে ॥
তুমি আমার নয়ন মণি তুমি প্রাণের ধন।
তোমায় ছাড়া অন্ধকার মোর এই ত্রিভুবন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৩৯. দিন যায় রে দিন যায়
দিন যায় রে দিন যায় মিছে মায়ার টানে।
একবারও ডাকিলে না সেই গুরুরই নামে ॥
সময় থাকতে সচেতন হও ওরে আমার মন।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
১৪০. এই তো আমার গান
এই তো আমার গান বন্ধু এই তো আমার সুর।
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে দূর ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় বেলা এলো।
গানের মাঝে আমারে তোমরা স্মরণ করো ॥
১৪১. কে দিবে গো দরশন
কে দিবে গো দরশন, আমি কারে ডাকি।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম আঁখি ॥
চোখ থাকিতে অন্ধ আমি চিনি না তোমারে।
বিপদকালে দেখা দিও দয়াল গো আমারে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
১৪২. ভাবতরঙ্গে মন মজাইলে
ভাবতরঙ্গে মন মজাইলে বন্ধুকে পাওয়া যায়।
ভক্তি ছাড়া এই জগতে মুক্তি নাহি পায় রে ॥
তব নামে গান গেয়ে আমি কাটাই দিন-রজনী।
তুমি আমার নয়ন মণি তুমি আমার ধমনী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে আমার মন।
সময় থাকতে চিনে নে তোর আসল মহাজন ॥
১৪৩. কালনী নদী রে
কালনী নদী রে, তোর কূলে আমার ঘর।
তোর ঢেউয়ের তালে তালে জীবন হলো পর ॥
কত মানুষের চোখের জল মিশেছে তোর বুকে।
আমিও তো গান গেয়েছি তোরই অভিমুখে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
১৪৪. কেন পিরিতি বাড়াইলায় (ধামাইল সংস্করণ)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, আমায় করিয়া দেওয়ানি।
আমি তো তোমারও বন্ধু চিরকালের বন্দিনী ॥
বাপের বাড়িত মন টেকে না, শাশুড়িবড়ো কড়া।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি হইয়া গেছি মরা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
১৪৫. আমারে কি পড়বে মনে
আমারে কি পড়বে মনে আমি গেলে পরে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়েছি আজীবন।
তোমাদেরই ভালোবাসায় ধন্য আমার মন ॥
আব্দুল করিম বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
১৪৬. ওরে আমার মন মাঝি
ওরে আমার মন মাঝি, নাওখানি বাও সাবধানে।
উজান গাঙে ঢেউ লেগেছে দয়াল গুরুর টানে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা আছে অল্প।
গুরুর দয়া ছাড়া সব যে মায়ার গল্প ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৪৭. মুর্শিদ চরণে করি যে নিবেদন
মুর্শিদ চরণে করি যে নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
ভবের মায়ায় মজে আমি হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
আব্দুল করিম বলে গুরু আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৪৮. আমি তোমার নামের তরী
আমি তোমার নামের তরী বাইয়া যাব পার।
তব চরণেতে ঠাঁই দিও ওহে কর্ণধার ॥
অন্ধকারে পথ দেখাও ওহে কৃপাময়।
তোমার নাম জপিলে যেন হয় জীবন অক্ষয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৪৯. দুনিয়াটা মিছে রে ভাই
দুনিয়াটা মিছে রে ভাই মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে সব মায়া ভাই ভাঙবে রে এই মেলা ॥
যারে তুমি ভাবো আপন কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর হবে না রে বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
১৫০. গানের সুরে আমি বাঁচি
গানের সুরে আমি বাঁচি গানের সুরে মরি।
গানের মাঝেই আমি আমার বন্ধুয়ারে পাই ॥
কালনী নদীর তীরে বসে যে সুর আমি বাঁধলাম।
তোমাদেরই তরে সেই সুর আমি রেখে গেলাম ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৫১. মন তোর মিছে বাহাদুরি
মন তোর মিছে বাহাদুরি, কেন করিস অহঙ্কার।
একটু পবন ফুরাইলে রবে না তো আর ॥
যারে ভাবিস চিরস্থায়ী সে তো মায়ার খেলা।
অচিন পাখি উড়াল দিবে ভাঙবে জীবন মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
নইলে তোমার ভব তরী হবে না কো পার ॥
১৫২. ওরে ও পরানের বন্ধুয়া
ওরে ও পরানের বন্ধুয়া, কেন করো ছলনা।
বিচ্ছেদ অনলে আমি করি যে যাতনা ॥
কত নিশি জাগলাম আমি তোমার পথ চাহিয়া।
দেখা দিলে কি ক্ষতি হয় আমায় ডাকিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
১৫৩. কেমনে চিনিব আমি দয়াল মুর্শিদ তোমারে
কেমনে চিনিব আমি দয়াল মুর্শিদ তোমারে।
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে ॥
তব চরণেতে ঠাঁই দিলে ঘুচতো মনের ভয়।
দয়া করে দেখা দিও ওহে কৃপাময় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৫৪. ওরে ও পাষাণ বন্ধু
ওরে ও পাষাণ বন্ধু, দিলা কেন বিচ্ছেদ জ্বালা।
তোর লাগিয়া গেঁথেছিলাম আমি প্রেমের মালা ॥
মায়ার জালে বন্দি করিলা আমার এই মন।
এখন কেন দূরে থাকো ওহে আমার মহাজন ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জ্বালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
১৫৫. মানুষের মাঝে আল্লাহ বিরাজমান
মানুষের মাঝে আল্লাহ বিরাজমান, কেন খোঁজ করো দূরে।
শুদ্ধ মনে ডাকলে তাঁরে পাইবে নিজের ঘরে ॥
জাত-পাত আর ধর্মের নামে মিছে করো দ্বন্দ্ব।
মানুষ ভজলে খুলে যাবে তোমার হদয় কন্দ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
১৫৬. দয়াল গুরু তোমার দয়া বড়ই অপার
দয়াল গুরু তোমার দয়া বড়ই অপার।
তুমি বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
অন্ধকারে পথ দেখাও ওহে কৃপাময়।
তোমার নাম জপিলে যেন হয় জীবন অক্ষয় ॥
আব্দুল করিম বলে গুরু আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৫৭. সখী গো আমার জীবন ধন্য হইল
সখী গো আমার জীবন ধন্য হইল বন্ধুয়ারই দেখা পাইয়া।
হৃদয় জুড়ে বসতি তারে রাখিমু ধরিয়া ॥
কালনী নদীর তীরে সখী বসিয়া নিরালায়।
বন্ধুর সাথে দেখা হলো প্রেমেরই মেলায় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আর তো ভয় নাই।
তোমার চরণে যেন জনম কাটাই ॥
১৫৮. ওরে ও মায়ার দুনিয়া (আক্ষেপের গান)
ওরে ও মায়ার দুনিয়া কেন করিস ছল।
তোর মায়ায় মজে আমি হারাইলাম সম্বল ॥
দিন থাকতে দিন গেল আমার রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
১৫৯. আমি তোমার নামের নৌকা বাইলাম
আমি তোমার নামের নৌকা বাইলাম এই ভবের কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
নদী তো নয় সাগর যেন কুল-কিনারা নাই।
দয়াল গুরুর দেখা পেলে তবেই রক্ষা পাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৬০. এই গানের মাঝেই আমি
এই গানের মাঝেই আমি থাকব চিরকাল।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো রে চিরকাল ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৬১. দয়াল গুরুর দয়া হবে কতদিনে
দয়াল গুরুর দয়া হবে কতদিনে।
আমি চাতক পাখি আশায় থাকি তৃষ্ণার্ত মনে ॥
অন্ধকারে পথ চলিতে নাহি পাই দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
তব চরণেতে ঠাঁই দিও ওহে কর্ণধারী ॥
১৬২. মনরে আমার চিনলি না মানুষ
মনরে আমার চিনলি না মানুষ, করলি কত ভুল।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে শাশ্বত মূল ॥
মন্দির-মসজিদ ঘুরি ফিরি মিছে সময় কাটে।
আসল মানুষ বসত করে তোরই হদয় ঘাটে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন স্রষ্টার দিদার ॥
১৬৩. ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া
ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া, করলি আমায় পর।
মায়ার জালে বন্দি করে কাড়লি আমার ঘর ॥
আপন ভেবে যারে ডাকি কেউ তো আপন নয়।
যাবার বেলা দেখি একা শুধুই মনে ভয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
নইলে তোমার ভব তরী হবে না কো পার ॥
১৬৪. আমি তোমার নামের তরী বাইলাম উজান ধলে
আমি তোমার নামের তরী বাইলাম উজান ধলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমার ছায়া পেলে ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে জীর্ণ তরী মোর।
দয়া করে দেখা দিলে ঘুচবে মনের ঘোর ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপি।
চরণেরই ধূলি যেন ললাটে মোর মাখি ॥
১৬৫. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু (ভাটিয়াল সুর)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, আমায় দিয়া ফাঁকি।
তোর লাগিয়া সারা নিশি আমি জেগে থাকি ॥
বসন্ত আসিলে বনে কত কুহু ডাকে।
তুমি বিনে আমার মনে শুধুই বিষ থাকে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
১৬৬. ওরে ও মন-পাগলা কি করলি তুই
ওরে ও মন-পাগলা কি করলি তুই রে।
আসল কথা ভুইলা গিয়া মিছে মজিলে রে ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৬৭. সখী গো আমার জীবন হলো আন্ধার
সখী গো আমার জীবন হলো আন্ধার বন্ধু আইল না।
বসন্ত তো চইলা গেল আর তো সয় না ॥
পথের পানে চাইয়া কত নিশি কাটলো মোর।
বন্ধুর দেখা পাইলাম না আমি পাইলাম আন্ধার ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
১৬৮. মুর্শিদ ধনের তালাশে আমি
মুর্শিদ ধনের তালাশে আমি ঘর করিলাম বাহির।
কেমনে চিনিব আমি দয়াল গুরুর হির ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৬৯. মানুষে মানুষে পিরিত থাকলে
মানুষে মানুষে পিরিত থাকলে জগত হবে আলো।
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সবাই বাসো রে ভালো ॥
একই স্রষ্টার সৃষ্টি সবে কেন ভেদাভেদ।
মানুষ ভজলে মিটে যাবে সকল মনস্তাপ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
১৭০. গানের মাঝেই বিদায় নিলাম
গানের মাঝেই বিদায় নিলাম তোমাদেরই কাছ হতে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৭১. আগে যদি জানতাম রে বন্ধু
আগে যদি জানতাম রে বন্ধু তোমার পিরিত মিছে।
তবে কি আর এই মন দিতাম তোমার নামের পিছে ॥
বসন্ত তোমারে দিলাম কানন ভরিয়া।
যাবার কালে গেলা বন্ধু আমায় কাঁদাইয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
১৭২. কি যাদু করিলা বন্দে
কি যাদু করিলা বন্দে মন নিলা হরিয়া।
দেওয়ানা বানাইলা মোরে পাগল করিয়া ॥
ঘর ছাড়িলাম বাহির হইলাম তোমারও কারণে।
এখন কেন দূরে থাকো আড়াল নির্জনে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে দয়া নাই কি তোর।
একবার দেখা দিয়া নিভাও বিচ্ছেদ অনল মোর ॥
১৭৩. আমার অন্তরে বৈরাগী সাজে
আমার অন্তরে বৈরাগী সাজে বাইরে গেরুয়া নাই।
গুরুর নামের মালা গেঁথে মনেতে পরাই ॥
ভবের হাটে বিকিকিনি কিসের আশা করি।
সাঙ্গ হলে সব খেলা ভাই গুরুর নাম ধরি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে ওরে আমার মন।
সময় থাকতে চিনে নে তোর আসল মহাজন ॥
১৭৪. ওরে আমার অবুঝ হিয়া (তত্ত্ব গান)
ওরে আমার অবুঝ হিয়া কিসের বাহাদুরি।
সাঙ্গ হলে সব খেলা ভাই একলাই দিবি পাড়ি ॥
যারে তুমি আপন ভাবো কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর হবে না রে বাতি ॥
গুরুর চরণ সার করো মিছে ভাবনা ছাড়ো।
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম ধরো ॥
১৭৫. পরদেশি বন্ধুয়া রে
পরদেশি বন্ধুয়া রে, একবার দেখা দাও।
বিচ্ছেদ অনল দিয়ে আমার হৃদয় পুড়াইয়া যাও ॥
বসন্ত সময়ে কোকিল ডাকে কুহু সুরে।
পরাণ কান্দে রে বন্ধুর লাগিয়া ঘরে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
১৭৬. কি সুন্দর দিন কাটাইতাম (বিকল্প লিরিক)
কি সুন্দর দিন কাটাইতাম মোরা উজানধল গ্রামে।
গানের মেলা বসত কত দয়াল গুরুর নামে ॥
হিন্দু আর মুসলমান সবে মিলিয়া মিশিয়া।
গান গাইতাম মোরা তখন হৃদয় খুলিয়া ॥
এখন কেন সেই দিনগুলো হলো রে আন্ধার।
শাহ আব্দুল করিম বলে মিলিবে কি আর ॥
১৭৭. দয়াল গুরুর দয়া ছাড়া
দয়াল গুরুর দয়া ছাড়া পারের উপায় নাই।
ভব নদী কেমনে হব পার আমি তাই ভাবি সদাই ॥
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবি অন্ধকারে।
পার করিয়া লও গো মোরে ভব পারাবারে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৭৮. ওরে ও কালনী নদী (বিরহ সংস্করণ)
ওরে ও কালনী নদী কেন করিস খেলা।
আমার জীবন তরী লয়ে করলি কত অবহেলা ॥
তোমার কূলে বসে আমি কত গান গাইলাম।
সুখ-দুঃখের কথা কত তোরে শুনাইলাম ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
১৭৯. মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে (অসাম্প্রদায়িক গান)
মানুষের মাঝে খুঁজি যে তোমারে ওহে আমার সাঁই।
তোমার প্রেমে মগ্ন আমি এই তো জগতময় ॥
হিন্দু কি মুসলমান কিবা বৌদ্ধ কি খ্রিস্টান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
১৮০. গানের সুরে বিদায় বেলা
গানের সুরে বিদায় বেলা আসলো মোর কাছে।
গানের মাঝে আমার স্মৃতি যদি কিছু বাঁচে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৮১. মুর্শিদ চরণে আমি বিকাইলাম প্রাণ
মুর্শিদ চরণে আমি বিকাইলাম প্রাণ।
তব নামের মালা গেঁথে গাই যে মরমী গান ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
১৮২. ওরে আমার মন ভোমরা (নতুন ভাব)
ওরে আমার মন ভোমরা, করলি কী ভুল কাজ।
মায়ার ফুলে মধু খুঁজে হারালি আজ লাজ ॥
অচিন দেশে যাবি যখন সঙ্গী কেহ নাই।
গুরুর নামের মধু ছাড়া গতি যে আর নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৮৩. পিরিত করা সহজ নয় রে মন
পিরিত করা সহজ নয় রে মন, পিরিত বড় দায়।
একবার যে মজেছে সে কি মুক্তি খুঁজে পায় ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
১৮৪. দিন যে গেলো মিছে কাজে
দিন যে গেলো মিছে কাজে, রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন, কী বা লাভ আছে ॥
ধন-জন কিসের মায়া, কিসের জমিদারি।
একলা আইলায় একলা যাইবায় নেই যে ঘর-বাড়ি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার, শান্তি লাভ করো ॥
১৮৫. সখী গো বন্ধুয়ার দেখা পাইলাম না
সখী গো বন্ধুয়ার দেখা পাইলাম না এই জীবনে।
কত নিশি কাটলো আমার বিরহী এই মনে ॥
বসন্ত তো চইলা গেলো কোকিল ডাকে ডাল।
আমার মনে বইছে সদাই বিচ্ছেদের মহাকাল ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
১৮৬. ওরে আমার অবুঝ হিয়া (বিচ্ছেদ সুর)
ওরে আমার অবুঝ হিয়া, কিসের ভাবনা তোর।
দিন তো গেলো দিনের পথে, আসিল যে ঘোর ॥
সাথি যারা ছিলো তোমার সবাই গেলো চলি।
এখন কেন একা তুমি করো কেবলই হাহাকারি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা, ভাঙবে রে এই মেলা ॥
১৮৭. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টারে পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
১৮৮. দয়াল গুরু তোমার নামে জীবন সঁপিলাম
দয়াল গুরু তোমার নামে জীবন সঁপিলাম।
ভব নদী পার হওয়ার আসা আমি করিলাম ॥
নৌকা আমার জীর্ণ-শীর্ণ মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৮৯. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিকল ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
১৯০. বিদায় বেলা আসলো কাছে
বিদায় বেলা আসলো কাছে, গান করি শেষ দান।
মাটি আর মানুষের মাঝে সঁপলাম আমার প্রাণ ॥
উজানধল গ্রামখানি আমার প্রাণের সনে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা গানেরই তানে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
১৯১. ওরে আমার মন-পবন নাও
ওরে আমার মন-পবন নাও, বাইয়া যাও রে ভাই।
গুরুর নামের পাল উড়াইয়া চল যে ঘাটে যাই ॥
বিপদ-আপদ তুফান ভীতি কিসের করি ভয়।
হাল ধরেছেন দয়াল মুর্শিদ হবেই বিজয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে নাও তো চলে বেগে।
পার হইবো ভব নদী গুরুর অনুরাগে ॥
১৯২. আমি তোমার পিরিতের কাঙাল
আমি তোমার পিরিতের কাঙাল ওহে প্রাণপ্রিয়।
চরণেতে ঠাঁই দিয়া মোরে আপন করি নিও ॥
সবই আমি ছেড়েছি বন্ধু তোমার ঐ নামে।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার ঐ প্রেমে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে দয়া করো মোরে।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি উজানধল নগরে ॥
১৯৩. মানুষ চিনলে মরণ নাই
মানুষ চিনলে মরণ নাই রে ওরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই খুঁইজা পাবি আসল সে রতন ॥
বাইরে কেন তালাশ করিস মিছে অন্বেষণে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই মহাজন গহীনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলে খুঁজে পাবি চিরকালের সত্য ॥
১৯৪. দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার সহায়
দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার সহায় হইও রে।
ভব নদী পারের বেলায় সাথে থাইকো রে ॥
আমি তো সম্বলহীন অতি নাই মোর কোনো গুণ।
তব নামের ছায়া দিলে জুড়ায় মনের আগুন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
১৯৫. সখী আমার ভাঙা তরী
সখী আমার ভাঙা তরী কালনী নদীর কূলে।
বন্ধুর লাগি বসি আছি সকল কাজ ভুলে ॥
উজান গাঙে বাইয়া নাও বন্ধু কেন আসে না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
আব্দুল করিম কান্দে সদাই বন্ধুর পথ চাহিয়া।
দেখা দিলে কি ক্ষতি হয় একপলক আসিয়া ॥
১৯৬. কেন আইলাম ভবের মেলায়
কেন আইলাম ভবের মেলায় কি কাজ করিলাম।
আসল কথা ভুইলা গিয়া মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
সাথী যারা ছিল আমার সবাই গেল চলি।
এখন আমি কারে ডাকি কারে কথা বলি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
১৯৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া (নতুন ভাব)
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া, কেন দাও রে ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
কোকিল ডাকে কুহু কুহু বসন্তেরই দিনে।
বিষের কাঁটা বিঁধায়েছো আমার এই মনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
১৯৮. গুরুর চরণ সার করিয়া
গুরুর চরণ সার করিয়া যারা পথে চলে।
বিপদ তাদের কি করিবে গুরুর ছায়া পেলে ॥
অন্ধকারে বাতি জ্বলে গুরুর নামের তানে।
শান্তি পায় রে বাউলরা সেই গুরুর গানে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
১৯৯. দুনিয়াটা মায়ার খেলা
দুনিয়াটা মায়ার খেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
ঘর-বাড়ি আর জমিদারি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লা বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
২০০. সমাপ্তির গান
দুইশ গানের মালা গেঁথে দিলাম তোমাদের তরে।
শাহ আব্দুল করিমের কথা রাইখো মনে করে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম আজীবন।
তোমাদেরই ভালোবাসায় ধন্য আমার মন ॥
কালনী নদীর তীরে বসে যে সুর আমি বাঁধলাম।
বাংলার মানুষের তরে সেই সুর আমি রেখে গেলাম ॥
২০১. আমি তোমার রূপ দেখিয়া
আমি তোমার রূপ দেখিয়া পাগল হইলাম রে।
কোন বনেতে লুকায়ে আছো দেখা দাও আমারে ॥
নিশি রাইতে চাঁদের আলোয় খুঁজি যে তোমারে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
২০২. ওরে আমার অবুঝ মন-পাখি
ওরে আমার অবুঝ মন-পাখি কেন করিস কান্দন।
মায়ার খাঁচায় বন্দি থাকা তোর মিছে এই বন্ধন ॥
একদিন তোর ডানা মেলা হবে রে অচিন দেশে।
যাবার সময় রইবে পড়ে কায়া অবশেষ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
গুরুর নামের ডানা পরে মুক্তি পথ মাগো ॥
২০৩. পিরিত করা বড়ই কঠিন কাজ
পিরিত করা বড়ই কঠিন কাজ রে আমার ভাই।
একবার যে মজেছে পিরিতে তার কোনো রক্ষা নাই ॥
জাত-কুল মান সব দিয়াও পিরিত মেলা ভার।
বন্ধুর লাগি পাগল হওয়া এই জীবনের সার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২০৪. দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম
দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম ঘরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২০৫. সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২০৬. মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে
মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে পাগল।
সবার মাঝে বিরাজ করে সেই যে পরম কল ॥
তোরই মাঝে আমারই মাঝে একই স্রষ্টার সৃষ্টি।
হিংসা ছাড়লে মনে ফুটবে শান্তির ঐ বৃষ্টি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
২০৭. ওরে ও কালনী নদী (স্মৃতি বিজড়িত)
ওরে ও কালনী নদী কেন দিস রে ঢেউ।
আমার বুকের ভেতরে যে কান্দে একা কেউ ॥
তোর পাড়ে বসে আমি কত সুর যে বাঁধলাম।
উজানধল গ্রামের মানুষের গান যে গাইলাম ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
গানের সুরে থাকতে চাই আমি সবার অন্তরালে ॥
২০৮. ভবের মায়া কাটিয়ে যাব
ভবের মায়া কাটিয়ে যাব গুরুর নাম লইয়া।
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে মুর্শিদেরে পাইয়া ॥
ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র কিছুই যাবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর গুরুর নামই বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
২০৯. আমি তোমার নামের তসবি জপি
আমি তোমার নামের তসবি জপি দিবস আর রজনী।
তব চরণে সঁপিলাম মোর এই দেহা তরণী ॥
নৌকা আমার জীর্ণ-শীর্ণ মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
২১০. গানই আমার শেষ সম্বল
গানই আমার শেষ সম্বল গানই আমার প্রাণ।
মাটি আর মানুষের কথা আমার গানের তান ॥
বিদায় বেলা আসলো কাছে সঁপিলাম মোর গান।
তোমাদেরই ভালোবাসায় হোক আমার অবসান ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২১১. কেন মিছে মায়ায় মজলি রে
কেন মিছে মায়ায় মজলি রে ওরে আমার মন।
সাঙ্গ হলে প্রাণের খেলা রবে না কোনো জন ॥
স্ত্রী-পুত্র পরিজন কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর গুরুর নামই বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি মাগো ॥
২১২. আমার বন্ধু দয়াময়
আমার বন্ধু দয়াময়, তার পিরিতে পাগল আমি।
হৃদয় জুড়ে বসত করে প্রাণের স্বামী ॥
বসন্ত আসিলে মনে জাগে বিরহ অনল।
বন্ধুর লাগি নয়নে ঝরে ঝরঝর করিয়া জল ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২১৩. দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে (২য় সংস্করণ)
দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে এই ভব পারাবারে।
আমি তো সাতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২১৪. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টারে পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
২১৫. সখী আমার দিন তো গেলো
সখী আমার দিন তো গেলো বন্ধু আইলো না।
বসন্ত তো চইলা গেলো আর তো সয় না ॥
পথের পানে চাইয়া কত নিশি কাটলো আমার।
বন্ধুর দেখা পাইলাম না আমি পাইলাম অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
২১৬. ওরে ও মায়ার দুনিয়া (আক্ষেপের গান)
ওরে ও মায়ার দুনিয়া কেন করিস ছল।
তোর মায়ায় মজে আমি হারাইলাম সম্বল ॥
দিন থাকতে দিন গেল আমার রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
২১৭. গুরুর চরণ সার করিয়া (তত্ত্ব গান)
গুরুর চরণ সার করিয়া যারা পথে চলে।
বিপদ তাদের কি করিবে গুরুর ছায়া পেলে ॥
অন্ধকারে বাতি জ্বলে গুরুর নামের তানে।
শান্তি পায় রে বাউলরা সেই গুরুর গানে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
২১৮. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিকল ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২১৯. পিরিত করা সহজ কথা নয়
পিরিত করা সহজ কথা নয় রে আমার ভাই।
পিরিত করলে কলঙ্ক হয় এই জগতে জানাই ॥
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম আমি।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম যে পাগলিনী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২২০. ইতি কথা
জীবন আমার গানের মেলা কালনী নদীর তীরে।
গানের সুরে থাকতে চাই আমি সবার মাঝারে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম আমি।
আমার গানের সুরে থেকো বন্ধু তুমি চিরদামী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজে তোমরা পাবে ॥
২২১. ওরে আমার মন সুজন
ওরে আমার মন সুজন, আর কতকাল করবি রে ভুল।
ভবের মায়ায় মজে তুই হারালি কি দুই কুল ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা, মিছে মায়ার ঘর।
নিশাস ফুরাইলে দেখি সবাই হবে পর ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
২২২. কি বলিব সখী রে
কি বলিব সখী রে, বন্ধুর পিরিতে হইলাম পাগল।
নয়নে বইছে আমার বারো মাস নয়ন জল ॥
শুইলে না আসে ঘুম, নিশি হয় ভোর।
বন্ধুর কথা মনে হলে হয় গো নয়ন লোর ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২২৩. ওরে ও পাষাণ হিয়া
ওরে ও পাষাণ হিয়া কিসের গর্ভে থাকো।
একবারও কি দয়াল গুরুর নামটা মুখে ডাকো ॥
মাটির কায়া মাটিতে রবে, সাঙ্গ হবে সব।
পরকালে সঙ্গে যাবে শুধু গুরুরই কলরব ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই তুমি মরণকালে শান্তি লাভ করো ॥
২২৪. আমার হদয় মাঝারে বন্ধু
আমার হদয় মাঝারে বন্ধু তোমারি বসত।
তোমায় ছাড়া অন্ধকার মোর এই জগত ॥
নিশি রাইতে চাঁদের আলোয় খুঁজি যে তোমারে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
২২৫. দিন যে গেলো মিছে মায়ার টানে
দিন যে গেলো মিছে মায়ার টানে রে আমার মন।
গুরুর নামের পাথেয় তুই করলি না রে যতন ॥
খালি হাতে আইলাম আমি, যাইব একা একা।
পাথেয় তো নাই রে কিছু, হবে না তো দেখা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই তুমি পরকালে শান্তি লাভ করো ॥
২২৬. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু (নতুন সংস্করণ)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু, দিয়া আমায় ফাঁকি।
তোর লাগিয়া সারা নিশি আমি জেগে থাকি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২২৭. দয়াল গুরুর দেখা পাইলে
দয়াল গুরুর দেখা পাইলে ঘুচত অন্ধকার।
তব চরণেতে ঠাঁই দিও ওহে কর্ণধার ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২২৮. মানুষে মানুষে কেন এত হানাহানি
মানুষে মানুষে কেন এত হানাহানি ভাই।
একই রক্ত সবার গায়ে ভিন্ন কিছু নাই ॥
হিংসা বিদ্বেষ ভুলে চলো প্রেমের গান গাই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই আমার দেশ।
মিলিয়া মিশিয়া থাকলে ঘুচবে সকল ক্লেশ ॥
২২৯. ওরে ও রঙিলা বাউলা
ওরে ও রঙিলা বাউলা কি গান গাও রে তুমি।
গানের সুরে মগ্ন আমার এই হদয় ভূমি ॥
মাটি আর মানুষের কথা গানের সুরে পাই।
তোমার গানে খুঁজে পাই এই পৃথিবীর ঠাঁই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
২৩০. আমি কি পাব দিদার
আমি কি পাব দিদার ওহে দয়াময়।
তোমার চরণে যেন জীবন অতিবাহিত হয় ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর দয়া হলে তবেই হবে জারি ॥
২৩১. আমি কারে জানাব মনের দুঃখ
আমি কারে জানাব মনের দুঃখ, কে শুনিবে আর।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম ছারখার ॥
নদীর কূলে একা বসে কাটাই দিন-রজনী।
তব চরণে সঁপিলাম মোর এই দেহা তরণী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৩২. মুর্শিদ নামের ভেলা (তত্ত্ব গান)
মুর্শিদ নামের ভেলা ধরি চলো রে ভাই যাই।
তব দয়া ছাড়া ভবে আর তো গতি নাই ॥
সংসার সমুদ্র মাঝে উথাল-পাথাল ঢেউ।
বিপদকালে সাথে তো নেই আপন চেনা কেউ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই তুমি ভব নদী পার হইয়া তরো ॥
২৩৩. ওরে ও পাগল মন-পাখি
ওরে ও পাগল মন-পাখি কেন করিস খাঁচার মায়া।
নিশ্বাস ফুরাইলে তোর থাকবে পড়ে কায়া ॥
যারে ভাবিস আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
২৩৪. কি করলায় রে ভবের হাটে
কি করলায় রে ভবের হাটে ভাবিয়া দেখ মন।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে না তো কোনো জন ॥
টাকা-পয়সা বাড়ি-গাড়ি সব রবে রে পড়ে।
মাটির মানুষ মাটি হবে অন্ধকার এক ঘরে ॥
গুরুর চরণ সার করো মিছে ভাবনা ছাড়ো।
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম ধরো ॥
২৩৫. বন্ধুয়ার দেখা যদি পাইতাম
বন্ধুয়ার দেখা যদি পাইতাম এই কালনী নদীর তীরে।
প্রাণের কথা খুলে বলে নিতাম আপন করে ॥
কত নিশি জাগলাম আমি পথ চেয়ে বন্ধুয়ার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২৩৬. দয়াল গুরু তোমার নামে জীবন তরী বাই
দয়াল গুরু তোমার নামে জীবন তরী বাই।
তব চরণেতে ঠাঁই দিলে আমি মুক্তি পাই ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
২৩৭. মানুষে মানুষে মিল থাকলে (অসাম্প্রদায়িক গান)
মানুষে মানুষে মিল থাকলে স্বর্গ নেমে আসে।
হিংসা-দ্বেষ ভুলে চলো সবাই ভালোবাসি ॥
একই সূর্যে আলো পাই রে একই মেঘে জল।
তবে কেন মানুষের মাঝে এত কোলাহল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ সত্য জানো।
মানুষের মাঝেই তুমি স্রষ্টারে তো মানো ॥
২৩৮. ওরে ও মায়ার নদী (বিচ্ছেদ ভাব)
ওরে ও মায়ার নদী কেন করিস ছল।
তোর মায়ায় মজে আমি হারাইলাম সম্বল ॥
দিন থাকতে দিন গেল আমার রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
২৩৯. মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি
মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি এই নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৪০. গানের খেয়া
গানের খেয়া বেয়ে আমি যাব বহুদূরে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৪১. ওরে মন অবুঝ বেহায়া
ওরে মন অবুঝ বেহায়া, কেন করিস মায়ার আশা।
দিন ফুরালে ভেঙে যাবে তোর এই রঙ্গিন বাসা ॥
ধন-দৌলত আর পরিবার কেউ তো হবে না সাথী।
অন্ধকার ঐ কবরে তোর হবে না রে বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৪২. সখী গো আমি পিরিতে মজেছি
সখী গো আমি পিরিতে মজেছি, লোকলজ্জা ভুলে।
বন্ধুর পিরিতে ভাসছি আমি কালনী নদীর কূলে ॥
লোকে বলে আমি মন্দ, আমি তো জানি রে।
বন্ধুর ভালোবাসার কাঙাল আমি দেওয়ানি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
২৪৩. আমারে পাগল করিল রে
আমারে পাগল করিল রে ঐ বন্ধুয়ার প্রেমে।
নিশি রাইতে ঘুমের ঘোরে ডাকি তারে নামে ॥
কি যাদু করিলা বন্দে মন নিলা কাড়িয়া।
এখন আমি কান্দি সদাই একা বসিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৪৪. মুর্শিদ নামে নাও ভাসাইলাম
মুর্শিদ নামে নাও ভাসাইলাম এই ভব সাগরে।
হাল ধরো গো দয়াল গুরু আমায় বাঁচাও এবোরে ॥
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার।
তুমি বিনে এই জগতে কে আছে আমার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৪৫. মানুষ চেনা বড়ই কঠিন
মানুষ চেনা বড়ই কঠিন এই দুনিয়ার মাঝে।
আসল মানুষ বসত করে মনের গহীন ভাঁজে ॥
বাইরে দেখে চেনা যায় না কে বা আপন পর।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারালি রে ঘর ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ সত্য জানো।
মানুষ ভজলে তবেই তুমি স্রষ্টারে তো মানো ॥
২৪৬. দিন গেলে তো আসবে রাত্রি
দিন গেলে তো আসবে রাত্রি ভাবিয়া দেখ মন।
পাথেয় তোর কি আছে রে যাবার বেলা যখন ॥
মিছে কাজে সময় গেল আসল কাজ তো বাকি।
এখন কেন কান্দো রে মন দিয়া নিজেকে ফাঁকি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
২৪৭. ওরে ও পরদেশি বন্ধু
ওরে ও পরদেশি বন্ধু কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার হদয় হইলো রে বিবাগি ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডালে।
বন্ধুর কথা মনে হলে অশ্রু ঝরে কপালে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২৪৮. দয়াল গুরু তোমার দয়া
দয়াল গুরু তোমার দয়া বড়ই অপার মহিমা।
তব চরণেতে ঠাঁই দিলে ঘুচবে মনের সীমা ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
২৪৯. হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতির গান)
হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই মায়ের সন্তান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ ॥
মিছে কেন মারামারি তুচ্ছ স্বার্থের তরে।
শান্তি যেন খুঁজে পাই মোরা মানুষেরই ঘরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
২৫০. পঁচিশ শতকের নিবেদন
দুইশ পঞ্চাশটি গানের মালা পরিয়ে দিলাম গলে।
গানের সুর যেন বাজে তোমাদেরই হদয়তলে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৫১. মনরে তুই করলি কী কাম
মনরে তুই করলি কী কাম ভবের বাজারে।
আসল রত্ন হারিয়ে এখন কান্দিস অন্ধকারে ॥
মিছে মায়ার জালে জড়িয়ে কাটলো সারা বেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
গুরুর চরণ সার না করলে নাই রে তোর উপায়।
শাহ আব্দুল করিম বলে দিন তো বয়ে যায় ॥
২৫২. কালনী নদীর পাড়ে আমার বসতবাড়ি
কালনী নদীর পাড়ে আমার বসতবাড়ি সই।
বন্ধুর লাগি বিরহী মন আমি কারে কই ॥
উজান গাঙে ঢেউ খেলিয়া তরী বাইলাম আমি।
তব দেখা না পাইলে কী হবে হে স্বামী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
২৫৩. ওরে ও অবোধ হিয়া (মরমী গান)
ওরে ও অবোধ হিয়া কেন হইলি দেওয়ানা।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি ঠিকানা ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
২৫৪. আমি তো বন্ধুয়ার প্রেমে মজিলাম
আমি তো বন্ধুয়ার প্রেমে মজিলাম রে সখী।
তোর লাগিয়া সারা নিশি জেগে থাকি আঁখি ॥
কি যাদু করিলা বন্দে মন নিলা হরিয়া।
দেওয়ানা বানাইলা মোরে পাগল করিয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২৫৫. দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল
দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল।
পার করিয়া লও গো মোরে নিভেছে যে কাল ॥
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার।
তুমি বিনে এই জগতে কে আছে আমার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৫৬. মানুষ চেনা সহজ নয় (তত্ত্ব গান)
মানুষ চেনা সহজ নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তারে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
২৫৭. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া, কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৫৮. হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের দুটি শাখা
হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের দুটি শাখা জানো।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি মানো ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
২৫৯. ওরে ও পাষাণ কালনী
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
২৬০. সুরের ভেলা
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৬১. আমি কারে কি বলিব
আমি কারে কি বলিব, দুঃখ কারে জানাব।
বন্ধুর পিরিতে আমি পাগল হইলাম গো ॥
মাটির দেহ পচে যাবে, থাকবে না যৌবন।
গুরুর নামের মালা ছাড়া সব যে অকারণ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৬২. ওরে আমার মন-ভোমরা
ওরে আমার মন-ভোমরা, কেন করিস দেরি।
গুরুর নামের মধু খেতে চল যে পাড়ি দিই ॥
মায়ার ফুলে মধু নাই রে, আছে বিষের জ্বালা।
এখন কেন কান্দো রে মন পইড়া মায়ার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি মাগো ॥
২৬৩. মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার
মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার এই ভব সংসারে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী, হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৬৪. মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায়
মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায় রে আমার মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই তো আপন ঘরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
২৬৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল, বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২৬৬. ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া (২য় সংস্করণ)
ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া, কেন করিস ছলনা।
মায়ার জালে বন্দি করিলা আমার এই চেতনা ॥
যারে ভাবি চিরস্থায়ী সে তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৬৭. পিরিত করা বড়ই বিষের কাঁটা
পিরিত করা বড়ই বিষের কাঁটা বিঁধলে হৃদয়ে।
শান্তি পাওয়া যায় না আর বিরহ সয়ে ॥
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম যে দেওয়ানি।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম আমি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
২৬৮. কেন আইলাম ভবের হাটে (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু, হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
২৬৯. দয়াল গুরুর নামের তরী
দয়াল গুরুর নামের তরী বাইয়া যাও রে ভাই।
গুরুর নামের পাল উড়াইয়া চল যে ঘাটে যাই ॥
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে মুর্শিদেরে পাইয়া।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার দয়া লইয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
২৭০. সুরের বাঁধন
সুরের বাঁধনে বেঁধে গেলাম তোমাদের হদয়।
গানের মাঝে যেন আমার পরিচয়টা রয় ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৭১. ওরে ও অবুঝ মন
ওরে ও অবুঝ মন, কেন করলি এতো ভুল।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারালি দুই কূল ॥
পরের ধনকে আপন ভেবে কাটলো সারা বেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
২৭২. বন্ধুয়ার দেখা পাইলাম না
বন্ধুয়ার দেখা পাইলাম না এই কালনী নদীর তীরে।
কত নিশি জাগলাম আমি একা অন্ধকারে ॥
বসন্ত আসিলে বনে কত কুহু ডাকে।
তুমি বিনে বিরহ বিষ লাগে মোর বুকে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৭৩. গুরুর চরণে মন দাও
গুরুর চরণে মন দাও গো তোরা এই আমার বিনয়।
গুরুর কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে উপায় ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
আব্দুল করিম বলে গুরু আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৭৪. মানুষ চেনা সহজ কথা নয়
মানুষ চেনা সহজ কথা নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তাঁরে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
২৭৫. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া, কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৭৬. দুনিয়াটা মিছে রে ভাই
দুনিয়াটা মিছে রে ভাই মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে সব মায়া ভাই ভাঙবে রে এই মেলা ॥
যারে তুমি ভাবো আপন কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর হবে না রে বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৭৭. ওরে ও মায়ার নদী
ওরে ও মায়ার নদী কেন করিস ছল।
তোর মায়ায় মজে আমি হারাইলাম সম্বল ॥
দিন থাকতে দিন গেল আমার রাত্রি এল কাছে।
এখন কেন কান্দো রে মন কি বা লাভ আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
২৭৮. মুর্শিদ ধনের তালাশে
মুর্শিদ ধনের তালাশে আমি ঘর করিলাম বাহির।
কেমনে চিনিব আমি দয়াল গুরুর হির ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৭৯. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের দুটি শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
২৮০. গানের তরী
গানের তরী বাইয়া আমি যাব বহুদূরে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৮১. মন আমার দেওয়ানা হইলো
মন আমার দেওয়ানা হইলো বন্ধুয়ার পিরিতে।
কুল-মান সব হারাইলাম আমি এই জগতে ॥
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম বিবাগী।
নিশিদিন কান্দি আমি বন্ধুয়ারই লাগি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৮২. ওরে আমার অবুঝ হিয়া (তত্ত্ব ভাব)
ওরে আমার অবুঝ হিয়া কিসের ভাবনা তোর।
সাঙ্গ হলে সব খেলা ভাই আসিলে বিভোর ॥
যারে তুমি আপন ভাবো কেউ হবে না সাথী।
অন্ধকার কবরে তোর গুরুর নামই বাতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
২৮৩. মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি
মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি এই নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৮৪. মানুষ চেনা সহজ কথা নয়
মানুষ চেনা সহজ কথা নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তাঁরে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
২৮৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল
সখী আমার দিন তো ফুরাল, বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২৮৬. ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া
ওরে ও নিষ্ঠুর দুনিয়া, কেন করিস ছলনা।
মায়ার জালে বন্দি করিলা আমার এই চেতনা ॥
যারে ভাবি চিরস্থায়ী সে তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৮৭. দয়াল গুরুর নামের তরী
দয়াল গুরুর নামের তরী বাইয়া যাও রে ভাই।
গুরুর নামের পাল উড়াইয়া চল যে ঘাটে যাই ॥
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে মুর্শিদেরে পাইয়া।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার দয়া লইয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
২৮৮. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের দুটি শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
২৮৯. ওরে ও পাষাণ কালনী
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
২৯০. গানের ভেলায় ভাসি আমি
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
২৯১. আমি কারে জানাব মনের বেদনা
আমি কারে জানাব মনের বেদনা, কে শুনে আমার।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম ছারখার ॥
কুল-মান সবই গেল পিরিত করিয়া।
এখন কেন আছো বন্ধু আমায় ভুলিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
২৯২. দয়াল মুর্শিদ আমারে পার করিয়া লও
দয়াল মুর্শিদ আমারে পার করিয়া লও।
ভব নদীর তুফানেতে আমায় রক্ষা দাও ॥
নৌকা আমার জীর্ণ-শীর্ণ মাল্লা আছে অল্প।
তুমি বিনে সব যে দয়াল মায়ারই গল্প ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
২৯৩. ওরে ও অবুঝ হিয়া (বিচ্ছেদ ভাব)
ওরে ও অবুঝ হিয়া কিসের গর্ভে থাকো।
একবারও কি দয়াল গুরুর নামটা মুখে ডাকো ॥
সাথী যারা ছিল তোমার সবাই গেল চলি।
এখন কেন একা তুমি করো হাহাকারি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৯৪. মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায়
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় রে মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
মন্দির-মসজিদ বলো সবই তোমার মাঝে।
নিজেকে চিনে নে মন অকারণের কাজে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
২৯৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (বিরহ সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
২৯৬. ওরে ও মায়ার দুনিয়া (তত্ত্ব গান)
ওরে ও মায়ার দুনিয়া কেন করিস ছলনা।
মায়ার জালে বন্দি করলি আমার এই চেতনা ॥
যারে ভাবি চিরস্থায়ী সে তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৯৭. পিরিত করা বড়ই বিষের কাঁটা
পিরিত করা বড়ই বিষের কাঁটা বিঁধলে হৃদয়ে।
শান্তি পাওয়া যায় না আর বিরহ সয়ে ॥
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম যে দেওয়ানি।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম আমি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
২৯৮. কেন আইলাম ভবের হাটে (আক্ষেপের গান)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু, হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
২৯৯. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩০০. তিনশত গানের সমাপন
তিনশত গানের মালা গেঁথে দিলাম তোমাদের তরে।
শাহ আব্দুল করিমের কথা রাইখো মনে করে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম আজীবন।
তোমাদেরই ভালোবাসায় ধন্য আমার মন ॥
গানের সুর যেন বাজে তোমাদেরই হদয়তলে।
বিদায় নিলাম আমি এই গানেরই ছলে ॥
৩০১. মুর্শিদ নামের নৌকাখানি
মুর্শিদ নামের নৌকাখানি লও রে ত্বরা করি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে ঐ নামই যে তরী ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে উজান ধলের কূলে।
গুরুর দয়া ছাড়া কেবা পথ দেখাবে ভুলে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
তবেই হবে মুক্তি রে মন ঘুচবে অন্ধকার ॥
৩০২. পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ
পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ।
বন্ধু বিনে আমার মনে নাই রে কোনো লেশ ॥
কত নিশি জাগলাম আমি একা নদীর পাড়ে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
৩০৩. ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি
ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি কেন করলি ভুল।
তোর নৌকা কেন নোঙর করলি মায়ার এই কূল ॥
উজান গাঙে বাইতে হলে গুরুর নাম চাই।
নইলে তোমার রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি মাগো ॥
৩০৪. মানুষ চেনার উপায় কি
মানুষ চেনার উপায় কি রে ওরে আমার ভাই।
একই সুরের তার বাঁধানো সবার মাঝে পাই ॥
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে এক মহাজন।
তারে চিনলে মিটে যাবে সকল আকিঞ্চন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ ভজলেই হয়।
মানুষের মাঝেই আছে স্রষ্টার পরিচয় ॥
৩০৫. দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি
দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি অন্তরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩০৬. সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৩০৭. দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা
দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
টাকা-কড়ি ঘর-বাড়ি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লা বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৩০৮. ওরে ও পাষাণ পরদেশি
ওরে ও পাষাণ পরদেশি কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিবাগি ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডাল।
বন্ধুর কথা মনে হলে হয় গো নয়ন লোর ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৩০৯. মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে
মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে পাগল।
সবার মাঝে বিরাজ করে সেই যে পরম কল ॥
তোরই মাঝে আমারই মাঝে একই স্রষ্টার সৃষ্টি।
হিংসা ছাড়লে মনে ফুটবে শান্তির ঐ বৃষ্টি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৩১০. গানের তরী চললো বহুদূর
গানের তরী চললো বহুদূর কালনী নদীর তীরে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩১১. আমি কি পাবো গো দরশন
আমি কি পাবো গো দরশন ওহে প্রাণপ্রিয়।
চরণেতে ঠাঁই দিয়া মোরে আপন করি নিও ॥
সবই আমি ছেড়েছি বন্ধু তোমার ঐ নামে।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার ঐ প্রেমে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে দয়া করো মোরে।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি কালনী নদীর তীরে ॥
৩১২. ওরে ও অবুঝ মন-পাখি (বিচ্ছেদ)
ওরে ও অবুঝ মন-পাখি কেন করিস খাঁচার মায়া।
নিশ্বাস ফুরাইলে তোর থাকবে পড়ে কায়া ॥
যারে ভাবিস আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩১৩. পিরিত করা বড়ই বিষম জ্বালা
পিরিত করা বড়ই বিষম জ্বালা রে আমার ভাই।
একবার যে মজেছে পিরিতে তার কোনো রক্ষা নাই ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৩১৪. দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে (মরমী)
দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে এই ভব পারাবারে।
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩১৫. মানুষ চিনলে মরণ নাই (তত্ত্ব গান)
মানুষ চিনলে মরণ নাই রে ওরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই খুঁইজা পাবি আসল সে রতন ॥
বাইরে কেন তালাশ করিস মিছে অন্বেষণে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই মহাজন গহীনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলে খুঁজে পাবি চিরকালের সত্য ॥
৩১৬. সখী আমার দিন তো গেলো (বিরহ)
সখী আমার দিন তো গেলো বন্ধু আইলো না।
বসন্ত তো চইলা গেলো আর তো সয় না ॥
পথের পানে চাইয়া কত নিশি কাটলো আমার।
বন্ধুর দেখা পাইলাম না আমি পাইলাম অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৩১৭. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া (ধামাইল)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া, কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩১৮. দুনিয়াটা মায়ার খেলা (আক্ষেপ)
দুনিয়াটা মায়ার খেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
ঘর-বাড়ি আর জমিদারি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লাহ বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৩১৯. হিন্দু মুসলমান একই মায়ের সন্তান (সম্প্রীতি)
হিন্দু মুসলমান একই মায়ের সন্তান সবার রক্ত লাল।
মানুষ ভজলে মিটে যাবে সকল গোলমাল ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩২০. সুরের খেয়ায় বিদায় নিলাম
সুরের খেয়ায় বিদায় নিলাম তোমাদেরই কাছ হতে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩২১. আমি কেন হইলাম দেওয়ানা
আমি কেন হইলাম দেওয়ানা বন্ধু তোমার পিরিতে।
কুল-মান সব হারাইলাম আমি এই জগতে ॥
লোকে মন্দ বলে মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম দেওয়ানি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩২২. ওরে ও পাষাণ হিয়া (তত্ত্ব ভাব)
ওরে ও পাষাণ হিয়া কিসের ভাবনা তোর।
দিন তো গেলো দিনের পথে আসলো রাত্রি ঘোর ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা ভাঙবে রে এই মেলা ॥
शाह আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩২৩. মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার (নিবেদন)
মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার এই ভব সংসারে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩২৪. মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায়
মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায় রে আমার মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
মন্দির-মসজিদ বলো সবই তোমার মাঝে।
নিজেকে চিনে নে মন অকারণের কাজে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
৩২৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩২৬. কেন আইলাম ভবের হাটে (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
शाह আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৩২৭. পিরিত করা বড়ই কঠিন কাজ
পিরিত করা বড়ই কঠিন কাজ রে আমার ভাই।
একবার যে মজেছে পিরিতে তার কোনো রক্ষা নাই ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৩২৮. দয়াল গুরুর নামের তরী
দয়াল গুরুর নামের তরী বাইয়া যাও রে ভাই।
গুরুর নামের পাল উড়াইয়া চল যে ঘাটে যাই ॥
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে মুর্শিদেরে পাইয়া।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার দয়া লইয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৩২৯. হিন্দু মুসলমান একই বৃক্ষের দুটি শাখা
হিন্দু মুসলমান একই বৃক্ষের দুটি শাখা জানো।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি মানো ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
शाह আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৩০. সুরের বাঁধনে বিদায় নিলাম
সুরের বাঁধনে বেঁধে গেলাম তোমাদের হৃদয়।
গানের মাঝে যেন আমার পরিচয়টা রয় ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৩১. মায়া জালে বন্দি হইয়া
মায়া জালে বন্দি হইয়া হারাইলাম দিশা।
মিছে কাজে সময় গেলো পুরাইলাম না আশা ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৩৩২. সখী গো বন্ধুয়ার পিরিতে
সখী গো বন্ধুয়ার পিরিতে আমি হইলাম দেওয়ানি।
কুল-মান যা ছিল আমার হারাইলাম জানি ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর ভালোবাসার কাঙাল আমি ভিখারি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৩৩. ওরে ও অবুঝ মন-পাখি
ওরে ও অবুঝ মন-পাখি কেন করিস কান্দন।
মায়ার খাঁচায় বন্দি থাকা তোর মিছে এই বন্ধন ॥
একদিন তোর ডানা মেলা হবে রে অচিন দেশে।
যাবার সময় রইবে পড়ে কায়া অবশেষ ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৩৪. দয়াল মুর্শিদ তোমার সনে
দয়াল মুর্শিদ তোমার সনে জীবন সঁপিলাম।
তব নামের তসবি জপি দিবস আর রজনী ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৩৫. মানুষ চেনা সহজ নয় (নতুন ভাব)
মানুষ চেনা সহজ নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তাঁরে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
৩৩৬. কেন আইলাম ভবের মেলায়
কেন আইলাম ভবের মেলায় কি কাজ করিলাম।
আসল কথা ভুইলা গিয়া মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
সাথী যারা ছিল আমার সবাই গেল চলি।
এখন কেন একা তুমি করো কেবল হাহাকারি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
৩৩৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিকল ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৩৩৮. হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই মায়ের সন্তান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ ॥
মিছে কেন মারামারি তুচ্ছ স্বার্থের তরে।
শান্তি যেন খুঁজে পাই মোরা মানুষেরই ঘরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৩৩৯. মুর্শিদ নামের ভেলা (মরমী)
মুর্শিদ নামের ভেলা ধরি চলো রে ভাই যাই।
তব দয়া ছাড়া ভবে আর তো গতি নাই ॥
বিপদ-আপদ তুফান ভীতি কিসের করি ভয়।
হাল ধরেছেন দয়াল মুর্শিদ হবেই বিজয় ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৩৪০. বিদায় বেলা আসলো কাছে (৩৪০তম)
বিদায় বেলা আসলো কাছে গান করি শেষ দান।
মাটি আর মানুষের মাঝে সঁপলাম আমার প্রাণ ॥
উজানধল গ্রামখানি আমার প্রাণের সনে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা গানেরই তানে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৪১. মন আমার একি ভ্রম হইল
মন আমার একি ভ্রম হইল ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
মায়ার জালে বন্দি হইয়া দিন তো গেলো বৃথা।
এখন কেন কান্দো রে মন ভেবে পরকাল কথা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৪২. মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল
মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল হইলাম গো।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম গো ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
দয়াল গুরুর চরণে আমি বিকাইলাম প্রাণ রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৪৩. ওরে ও পাষাণ হিয়া (বিচ্ছেদ ভাব)
ওরে ও পাষাণ হিয়া কিসের গর্ভে থাকো।
একবারও কি দয়াল গুরুর নামটা মুখে ডাকো ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা ভাঙবে রে এই মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩৪৪. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে (তত্ত্ব)
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টারে পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৩৪৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৪৬. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৪৭. দিন গেলে তো আসবে রাত্রি (মরমী)
দিন গেলে তো আসবে রাত্রি ভাবিয়া দেখ মন।
পাথেয় তোর কি আছে রে যাবার বেলা যখন ॥
মিছে কাজে সময় গেল আসল কাজ তো বাকি।
এখন কেন কান্দো রে মন দিয়া নিজেকে ফাঁকি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৩৪৮. দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম
দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম ঘরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৪৯. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৫০. সুরের ভেলায় সাড়ে তিনশত
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৫১. মনরে তোর দিন তো গেল বৃথা
মনরে তোর দিন তো গেল বৃথা কাজের টানে।
একবারও কি ডাকলি তারে আপন মনে ॥
সাঙ্গ হবে ভব খেলা ভাঙবে রে তোর মেলা।
তখন কেন কান্দো রে মন পইড়া মায়ার খেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৫২. সখী গো আমি পিরিতে হইলাম সারা
সখী গো আমি পিরিতে হইলাম সারা।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম ঘরছাড়া ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর ভালোবাসার কাঙাল আমি ভিখারি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৩৫৩. ওরে আমার অবুঝ হিয়া (নতুন ভাব)
ওরে আমার অবুঝ হিয়া কেন হইলি দেওয়ানা।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি ঠিকানা ॥
যারে ভাবিস আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩৫৪. মুর্শিদ নামে নাও ভাসাইলাম (২য় সংস্করণ)
মুর্শিদ নামে নাও ভাসাইলাম এই ভব সাগরে।
হাল ধরো গো দয়াল গুরু আমায় বাঁচাও এবোরে ॥
বিপদ-আপদ তুফান ভীতি কিসের করি ভয়।
হাল ধরেছেন দয়াল মুর্শিদ হবেই বিজয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৫৫. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝেই স্রষ্টা
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝেই স্রষ্টা পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৩৫৬. ওরে ও পাষাণ বন্ধু কেন দিলা ফাঁকি
ওরে ও পাষাণ বন্ধু কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৫৭. কি বলিব সখী রে (বিরহ সুর)
কি বলিব সখী রে বন্ধুর পিরিতে হইলাম পাগল।
নয়নে বইছে আমার বারো মাস নয়ন জল ॥
শুইলে না আসে ঘুম নিশি হয় ভোর।
বন্ধুর কথা মনে হলে হয় গো নয়ন লোর ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৩৫৮. দয়াল মুর্শিদ তোমার দয়া বড়ই অপার
দয়াল মুর্শিদ তোমার দয়া বড়ই অপার মহিমা।
তব চরণেতে ঠাঁই দিলে ঘুচবে মনের সীমা ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
৩৫৯. হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান (অসাম্প্রদায়িক)
হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান সবার রক্ত লাল।
মানুষ ভজলে মিটে যাবে সকল গোলমাল ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৬০. গানের মেলা
গানের মেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৬১. মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল
মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
মায়ার জালে বন্দি হইয়া দিন তো গেলো বৃথা।
এখন কেন কান্দো রে মন ভেবে পরকাল কথা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৬২. মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল
মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল হইলাম গো।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম গো ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
দয়াল গুরুর চরণে আমি বিকাইলাম প্রাণ রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৬৩. ওরে ও পাষাণ হিয়া (বিচ্ছেদ ভাব)
ওরে ও পাষাণ হিয়া কিসের গর্ভে থাকো।
একবারও কি দয়াল গুরুর নামটা মুখে ডাকো ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা ভাঙবে রে এই মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩৬৪. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে (তত্ত্ব)
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টারে পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৩৬৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৬৬. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৬৭. দিন গেলে তো আসবে রাত্রি (মরমী)
দিন গেলে তো আসবে রাত্রি ভাবিয়া দেখ মন।
পাথেয় তোর কি আছে রে যাবার বেলা যখন ॥
মিছে কাজে সময় গেল আসল কাজ তো বাকি।
এখন কেন কান্দো রে মন দিয়া নিজেকে ফাঁকি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৩৬৮. দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম
দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম ঘরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৬৯. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৭০. সুরের ভেলায় ৩৭০তম নিবেদন
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৭১. ওরে ও অবোধ মন-মাঝি (২য় সংস্করণ)
ওরে ও অবোধ মন-মাঝি, কেন করলি ভুল।
তোর নৌকা কেন নোঙর করলি মায়ার এই কূল ॥
উজান গাঙে বাইতে হলে গুরুর নাম চাই।
নইলে তোমার রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি মাগো ॥
৩৭২. আমারে দিও গো চরণ তলে ঠাঁই
আমারে দিও গো চরণ তলে ঠাঁই ওহে দয়াময়।
তোমার দয়া ছাড়া ভবে আর তো গতি নাই ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৭৩. পিরিত করা সহজ কথা নয় রে মন
পিরিত করা সহজ কথা নয় রে মন, পিরিত বড় দায়।
একবার যে মজেছে সে কি মুক্তি খুঁজে পায় ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৩৭৪. দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে (২য় সংস্করণ)
দয়াল মুর্শিদ পার করো আমারে এই ভব পারাবারে।
আমি তো সাঁতার জানি না ডুবলাম অন্ধকারে ॥
নৌকা আমার জীর্ণ অতি মাল্লা নাহি তার।
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৭৫. মানুষ চিনলে মরণ নাই রে ওরে মন
মানুষ চিনলে মরণ নাই রে ওরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই খুঁইজা পাবি আসল সে রতন ॥
বাইরে কেন তালাশ করিস মিছে অন্বেষণে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই মহাজন গহীনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলে খুঁজে পাবি চিরকালের সত্য ॥
৩৭৬. সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী দেখা দেয় না
সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৩৭৭. দুনিয়াটা মায়ার খেলা কিছুই রবে না (তত্ত্ব)
দুনিয়াটা মায়ার খেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
ঘর-বাড়ি আর জমিদারি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লাহ বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৩৭৮. ওরে ও পাষাণ বন্ধুয়া কেন দাও রে ফাঁকি
ওরে ও পাষাণ বন্ধুয়া কেন দাও রে ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৭৯. হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান সবার রক্ত লাল।
মানুষ ভজলে মিটে যাবে সকল গোলমাল ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৮০. গানের মেলা
গানের মেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৩৮১. মায়ার জালে পইড়া রে মন
মায়ার জালে পইড়া রে মন করলি কত ভুল।
আসল রতন হারাইয়া হারাইলি দুই কূল ॥
পরের ধনকে আপন ভাবলি মিছে মায়ার টানে।
একবারও কি ডাকলি তারে বিরলে আপন মনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৩৮২. দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল
দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল।
পার করিয়া লও গো মোরে নিভেছে যে কাল ॥
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার।
তুমি বিনে এই জগতে কে আছে আমার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৩৮৩. সখী গো বন্ধুয়ার লাগি আমি দেওয়ানি
সখী গো বন্ধুয়ার লাগি আমি দেওয়ানি হইলাম।
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব ভাসাইলাম ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর ভালোবাসার কাঙাল আমি ভিখারি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৮৪. মানুষ চেনার উপায় কি রে ভাই
মানুষ চেনার উপায় কি রে ওরে আমার ভাই।
একই সুরের তার বাঁধানো সবার মাঝে পাই ॥
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে এক মহাজন।
তারে চিনলে মিটে যাবে সকল আকিঞ্চন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ ভজলেই হয়।
মানুষের মাঝেই আছে স্রষ্টার পরিচয় ॥
৩৮৫. ওরে ও অবুঝ হিয়া (তত্ত্ব গান)
ওরে ও অবুঝ হিয়া কেন হইলি দেওয়ানা।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি ঠিকানা ॥
যারে ভাবিস আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩৮৬. কেন আইলাম ভবের মেলায় (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের মেলায় কি কাজ করিলাম।
আসল কথা ভুইলা গিয়া মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৮৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধু কেন করো ছল।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিকল ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৩৮৮. হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই মায়ের সন্তান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ ॥
মিছে কেন মারামারি তুচ্ছ স্বার্থের তরে।
শান্তি যেন খুঁজে পাই মোরা মানুষেরই ঘরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৩৮৯. মুর্শিদ নামের নৌকাখানি
মুর্শিদ নামের নৌকাখানি লও রে ত্বরা করি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে ঐ নামই যে তরী ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে উজান ধলের কূলে।
গুরুর দয়া ছাড়া কেবা পথ দেখাবে ভুলে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৩৯০. সুরের খেয়ায় ৩৯০তম নিবেদন
সুরের খেয়ায় বিদায় নিলাম তোমাদেরই কাছ হতে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের এই সুর-যাত্রা আজ ৪০০-এর ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে চলেছে। কালনী নদীর তীরের সেই কালজয়ী মরমী সুরগুলো কোনো পুনরাবৃত্তি ছাড়াই ৩৯১ থেকে ৪০০ নম্বর পর্যন্ত নিচে দেওয়া হলো:
৩৯১. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু ছেড়ে যাইবায় যদি।
অকূলে ভাসাইয়া মোরে কেন হইলায় নদী ॥
সুখের আশা দিয়া বন্ধু করলায় নিরাশা।
এখন আমি বুঝি বন্ধু পিরিতের কি দশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৯২. দয়াল তোমার দয়ার তরী (মরমী)
দয়াল তোমার দয়ার তরী বাইয়া দাও রে ঘাটে।
অসহায় এই আব্দুল করিম দিন কাটাইলো হাটে ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা সবই মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি দিও।
পাপী অধম জেনে মোরে দূরে ঠেলে না দিও ॥
৩৯৩. ওরে আমার অবুঝ মন-ভোমরা
ওরে আমার মন-ভোমরা কিসের মধু খাস।
মায়ার ফুলে বিষ মাখানো করলি রে সর্বনাশ ॥
গুরুর নামে মধু আছে গুরুর নামে মুক্তি।
তারে ছেড়ে মিছে কেন করিস এতো যুক্তি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৩৯৪. মানুষ ছাড়া মানুষ চেনা দায়
মানুষ ছাড়া মানুষ চেনা দায় রে আমার মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
বাইরে দেখে ভুল করো না ভিতর পানে চাও।
শুদ্ধ মনে দয়াল গুরুর নামের মালা গাও ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
৩৯৫. সখী গো বন্ধুয়ার দেখা যদি পাই
সখী গো বন্ধুয়ার দেখা যদি পাইতাম কালনী নদীর তীরে।
প্রাণের কথা বলে দিতাম আপন জন মনে ক’রে ॥
কত নিশি জাগলাম আমি পথ চেয়ে বন্ধুয়ার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৯৬. দুনিয়াটা মায়ার বাসা (তত্ত্ব গান)
দুনিয়াটা মায়ার বাসা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
টাকা-কড়ি বাড়ি-গাড়ি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৩৯৭. ওরে ও পাষাণ কালনী নদী
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৩৯৮. হিন্দু মুসলমানের মিলন (সম্প্রীতি)
হিন্দু মুসলমানের মিলন হোক এই ভবের বাজারে।
বিভেদ যেন না থাকে আর মানুষেরই অন্তরে ॥
একই স্রষ্টার সৃষ্টি মোরা একই আলো পাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৩৯৯. মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি (শেষ নিবেদন)
মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি এই নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪০০. ৪০০তম গানের মহোৎসব
চারশত গানের মালা গাঁথলাম কালনী নদীর কূলে।
শাহ আব্দুল করিমরে তোমরা রাইখো না আর ভুলে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪০১. মনরে তুই করলি কী কাম
মনরে তুই করলি কী কাম ভবের বাজারে।
আসল রত্ন হারিয়ে এখন কান্দিস অন্ধকারে ॥
মিছে মায়ার জালে জড়িয়ে কাটলো সারা বেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
গুরুর চরণ সার না করলে নাই রে তোর উপায়।
শাহ আব্দুল করিম বলে দিন তো বয়ে যায় ॥
৪০২. কালনী নদীর পাড়ে আমার বসতবাড়ি
কালনী নদীর পাড়ে আমার বসতবাড়ি সই।
বন্ধুর লাগি বিরহী মন আমি কারে কই ॥
উজান গাঙে ঢেউ খেলিয়া তরী বাইলাম আমি।
তব দেখা না পাইলে কী হবে হে স্বামী ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৪০৩. ওরে ও অবোধ হিয়া (মরমী গান)
ওরে ও অবোধ হিয়া কেন হইলি দেওয়ানা।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলি ঠিকানা ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার সময় সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মাথা রাখি দাও ॥
৪০৪. আমি তো বন্ধুয়ার প্রেমে মজিলাম
আমি তো বন্ধুয়ার প্রেমে মজিলাম রে সখী।
তোর লাগিয়া সারা নিশি জেগে থাকি আঁখি ॥
কি যাদু করিলা বন্দে মন নিলা হরিয়া।
দেওয়ানা বানাইলা মোরে পাগল করিয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪০৫. দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল
দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার ভব নদীর হাল।
পার করিয়া লও গো মোরে নিভেছে যে কাল ॥
তুফানেতে টলে তরী করি হাহাকার।
তুমি বিনে এই জগতে কে আছে আমার ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪০৬. মানুষ চেনা সহজ নয় (তত্ত্ব গান)
মানুষ চেনা সহজ নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তারে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার তত্ত্ব।
মানুষ ভজলেই পাওয়া যাবে সেই তো চির সত্য ॥
৪০৭. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া, কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪০৮. হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের দুটি শাখা
হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের দুটি শাখা জানো।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি মানো ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪০৯. ওরে ও পাষাণ কালনী
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৪১০. সুরের ভেলা (৪১০তম নিবেদন)
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪১১. মুর্শিদ নামের তরীখানি
মুর্শিদ নামের তরীখানি লও রে ত্বরা করি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে ঐ নামই যে তরী ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে উজান ধলের কূলে।
গুরুর দয়া ছাড়া কেবা পথ দেখাবে ভুলে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
তবেই হবে মুক্তি রে মন ঘুচবে অন্ধকার ॥
৪১২. পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ
পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ।
বন্ধু বিনে আমার মনে নাই রে কোনো লেশ ॥
কত নিশি জাগলাম আমি একা নদীর পাড়ে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
৪১৩. ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি
ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি কেন করলি ভুল।
তোর নৌকা কেন নোঙর করলি মায়ার এই কূল ॥
উজান গাঙে বাইতে হলে গুরুর নাম চাই।
নইলে তোমার রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর আশ্রয় তুমি মাগো ॥
৪১৪. মানুষ চেনার উপায় কি
মানুষ চেনার উপায় কি রে ওরে আমার ভাই।
একই সুরের তার বাঁধানো সবার মাঝে পাই ॥
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে এক মহাজন।
তারে চিনলে মিটে যাবে সকল আকিঞ্চন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ ভজলেই হয়।
মানুষের মাঝেই আছে স্রষ্টার পরিচয় ॥
৪১৫. দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি
দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি অন্তরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪১৬. সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৪১৭. দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা
দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
টাকা-কড়ি ঘর-বাড়ি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লাহ বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৪১৮. ওরে ও পাষাণ পরদেশি
ওরে ও পাষাণ পরদেশি কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিবাগি ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডাল।
বন্ধুর কথা মনে হলে হয় গো নয়ন লোর ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৪১৯. মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে
মানুষে মানুষে হিংসা কেন করো রে পাগল।
সবার মাঝে বিরাজ করে সেই যে পরম কল ॥
তোরই মাঝে আমারই মাঝে একই স্রষ্টার সৃষ্টি।
হিংসা ছাড়লে মনে ফুটবে শান্তির ঐ বৃষ্টি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৪২০. গানের তরী (৪২০তম নিবেদন)
গানের তরী চললো বহুদূর কালনী নদীর তীরে।
সুর ও বাণীর মাঝে আমায় খুঁজো লোকান্তরে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪২১. দয়াল গুরুর নামের তরী
দয়াল গুরুর নামের তরী বাইয়া যাও রে ভাই।
গুরুর নামের পাল উড়াইয়া চল যে ঘাটে যাই ॥
বিপদ-আপদ ঘুচে যাবে মুর্শিদেরে পাইয়া।
শান্তি যেন পাই আমি তোমার দয়া লইয়া ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৪২২. মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল
মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
মায়ার জালে বন্দি হইয়া দিন তো গেলো বৃথা।
এখন কেন কান্দো রে মন ভেবে পরকাল কথা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪২৩. মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল
মুর্শিদের পিরিতে আমি পাগল হইলাম গো।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম গো ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
দয়াল গুরুর চরণে আমি বিকাইলাম প্রাণ রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪২৪. ওরে ও পাষাণ হিয়া (বিচ্ছেদ ভাব)
ওরে ও পাষাণ হিয়া কিসের গর্ভে থাকো।
একবারও কি দয়াল গুরুর নামটা মুখে ডাকো ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা মিছে মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ তামাশা ভাঙবে রে এই মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৪২৫. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে (তত্ত্ব)
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টারে পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৪২৬. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪২৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪২৮. দিন গেলে তো আসবে রাত্রি (মরমী)
দিন গেলে তো আসবে রাত্রি ভাবিয়া দেখ মন।
পাথেয় তোর কি আছে রে যাবার বেলা যখন ॥
মিছে কাজে সময় গেল আসল কাজ তো বাকি।
এখন কেন কান্দো রে মন দিয়া নিজেকে ফাঁকি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৪২৯. হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৩০. সুরের খেয়ায় ৪৩০তম নিবেদন
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৩১. ভব নদী পাড়ি দিতে
ভব নদী পাড়ি দিতে গুরুর নাম সার।
কে আছে এই দুনিয়াতে আপন বলো আর ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৩২. ওরে ও পাগল মন
ওরে ও পাগল মন কিসের করিস দেওয়ানি।
সবই দেখি মায়ার খেলা কেউ কারো না জানি ॥
যারে তুমি ভাবো আপন সে তো হবে পর।
মাটির কায়া মিশবে মাটিতে ভাঙবে খেলাঘর ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৩৩. বন্ধু দয়া করো এই অধমেরে
বন্ধু দয়া করো এই অধমেরে দেখা দিও মোরে।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি কালনী নদীর তীরে ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব ভাসাইলাম জলে।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু নাও গো আমায় কোলে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪৩৪. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে (নতুন সুর)
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে সত্য পাওয়া যায়।
বিভেদ-বিবাদ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
মন্দির-মসজিদ বলো সবই মানুষের ঘরে।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৪৩৫. সখী গো বন্ধু আমার নিষ্ঠুর হইলো
সখী গো বন্ধু আমার নিষ্ঠুর হইলো দেখা দেয় না আর।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ জ্বলে হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৩৬. ওরে ও নিঠুর দুনিয়া (তত্ত্ব)
ওরে ও নিঠুর দুনিয়া কেন করিস ছলনা।
মায়ার জালে বন্দি করিলা আমার এই চেতনা ॥
যারে ভাবি চিরস্থায়ী সে তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ-তামাশার মেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৪৩৭. পিরিত করা বড়ই কঠিন জানি
পিরিত করা বড়ই কঠিন জানি রে আমার ভাই।
একবার যে মজেছে পিরিতে তার কোনো রক্ষা নাই ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৪৩৮. কেন আইলাম ভবের হাটে (নতুন ভাব)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৪৩৯. হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৪০. সুরের মায়ায় ৪৪০তম নিবেদন
গানের মায়ায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৪১. কেন আসিলাম ভবের বাজারে
কেন আসিলাম ভবের বাজারে মিছে কাজে দিন গেল।
পরের বোঝা মাথায় লয়ে আসল কাজ তো বাকি রইল ॥
ঘরবাড়ি আর জমিদারি সবই তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ-তামাশা ভাঙবে রে তোর বেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৪২. মুর্শিদ নামের নৌকাখানি (মরমী)
মুর্শিদ নামের নৌকাখানি লও রে ত্বরা করি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে ঐ নামই যে তরী ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে উজান ধলের কূলে।
গুরুর দয়া ছাড়া কেবা পথ দেখাবে ভুলে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
তবেই হবে মুক্তি রে মন ঘুচবে অন্ধকার ॥
৪৪৩. সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৪৪৪. মানুষে মানুষে বিভেদ কেন (সম্প্রীতি)
মানুষে মানুষে বিভেদ কেন করো রে পাগল।
সবার মাঝে বিরাজ করে সেই যে পরম কল ॥
তোরই মাঝে আমারই মাঝে একই স্রষ্টার সৃষ্টি।
হিংসা ছাড়লে মনে ফুটবে শান্তির ঐ বৃষ্টি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষে মানুষে কেন দাও মনে ব্যথা ॥
৪৪৫. ওরে ও অবুঝ মন-পাখি (তত্ত্ব)
ওরে ও অবুঝ মন-পাখি কেন করিস খাঁচার মায়া।
নিশ্বাস ফুরাইলে তোর থাকবে পড়ে কায়া ॥
যারে ভাবিস আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৪৪৬. পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ
পিরিত বিচ্ছেদে আমার তনু হইলো শেষ।
বন্ধু বিনে আমার মনে নাই রে কোনো লেশ ॥
কত নিশি জাগলাম আমি একা নদীর পাড়ে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
৪৪৭. দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি
দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি অন্তরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৪৮. দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা (আক্ষেপ)
দুনিয়াটা রঙ-তামাশার মেলা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গী হবে গুরুরই সাধনা ॥
টাকা-কড়ি ঘর-বাড়ি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো জীবনের সার।
আল্লাহ বিনে এই জগতে গতি নাই রে আর ॥
৪৪৯. ওরে ও পাষাণ পরদেশি (বিরহ)
ওরে ও পাষাণ পরদেশি কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিবাগি ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডাল।
বন্ধুর কথা মনে হলে হয় গো নয়ন লোর ॥
আব্দুল করিম কান্দে এখন মায়ার জালে পইড়া।
দয়াল গুরু পার করো তোমার তরী দিয়া ॥
৪৫০. সাড়ে চারশত গানের সমাপন (৪৫০তম)
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৫১. মন রে তুই চিনলি না আপন পর
মন রে তুই চিনলি না আপন পর ভবের বাজারে।
মায়ার জালে বন্দি হইয়া থাকিস অন্ধকারে ॥
মিছে কাজে সময় গেল দিন তো ফুরাইয়া আসে।
আসল কাজ তো বাকি রইল পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম লও।
তবেই তুমি মুক্তি পথের দিশা খুঁজে পাও ॥
৪৫২. পিরিত বিচ্ছেদে পুড়িছে জীবন (বিরহ)
পিরিত বিচ্ছেদে পুড়িছে জীবন বন্ধু আইলো না।
নিশিদিন কান্দি আমি সয় না তো যাতনা ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু ঘুচাও অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি সইবো যতো দুখ ॥
৪৫৩. ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি (তত্ত্ব)
ওরে ও অবুঝ মন-মাঝি কেন করলি ভুল।
তোর নৌকা কেন নোঙর করলি মায়ার এই কূল ॥
উজান গাঙে বাইতে হলে দয়াল গুরুর নাম চাই।
নইলে তোমার রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৪৫৪. মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি
মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি এই নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৫৫. মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায় (তত্ত্ব)
মানুষ ভজলে সত্য পাওয়া যায় রে আমার মন।
মানুষের মাঝেই বাস করে রে সেই যে মহাজন ॥
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে।
শুদ্ধ মনে খুঁজিলে তাঁরে পাইবে নিজ ঘরে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
৪৫৬. সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার হইলো অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৫৭. কেন আইলাম ভবের হাটে (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি কিছুই যাবে না।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
৪৫৮. দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি (মরমী)
দয়াল তোমার নামে বাতি জ্বেলেছি অন্তরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
ভবের হাটে আইলাম আমি মিছে কাজের আশে।
আসল কথা ভুইলা গেলাম পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৫৯. হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৬০. সুরের মেলা
গানের মেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৬১. আমার অন্তরে জ্বলে বন্ধু পিরিত অনল
আমার অন্তরে জ্বলে বন্ধু পিরিত অনল নিশিদিন।
বন্ধুয়ার বিরহে আমার কায়া হলো অতি ক্ষীণ ॥
সখী গো যারে দিলে প্রাণ মন তার দেখা না পাই।
বন্ধুর পিরিতে আমি জ্যান্ত মরা হয়ে যাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪৬২. ওরে ও পাষাণ হিয়া করলি কী কাম
ওরে ও পাষাণ হিয়া করলি কী কাম ভবের হাটে।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে দিন তো গেল বৃথা নাটে ॥
সাঙ্গ হলে রঙ-তামাশা ভাঙবে রে তোর মেলা।
তখন কেন কান্দো রে মন পইড়া মায়ার খেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৬৩. মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার (তত্ত্ব)
মুর্শিদ বিনে কে আছে আমার এই ভব সংসারে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখি আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৬৪. মানুষ চেনা সহজ কথা নয় রে মন
মানুষ চেনা সহজ কথা নয় রে মন দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত শত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তারে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
৪৬৫. সখী গো বন্ধুয়ার পিরিতে পাগল হইলাম
সখী গো বন্ধুয়ার পিরিতে আমি পাগল হইলাম জানি।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হারাইলাম আমি ॥
লোকে বলে পাগল মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর ভালোবাসার কাঙাল আমি ভিখারি রে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৬৬. কেন আইলাম ভবের হাটে (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৪৬৭. ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি
ওরে ও নিষ্ঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৪৬৮. হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান (অসাম্প্রদায়িক)
হিন্দু-মুসলিম একই মায়ের সন্তান সবার রক্ত লাল।
মানুষ ভজলে মিটে যাবে সকল গোলমাল ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৬৯. কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার দয়াল তোমারে।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার এই অন্তরে ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৪৭০. সুরের লহরীতে ৪৭০তম নিবেদন
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৭১. ওরে ও মায়ার দুনিয়া (তত্ত্ব ভাব)
ওরে ও মায়ার দুনিয়া করলি কী কাম।
আসল কথা ভুইলা গিয়া মিছে ভজলি নাম ॥
ধন-দৌলত মিছে আশা পইড়া রবে সব।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে গুরুরই অনুভব ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৪৭২. সখী গো বন্ধু আমার প্রাণপাখি
সখী গো বন্ধু আমার প্রাণপাখি উইড়া গেল কই।
তারে ছাড়া এই জীবনে আমি কেমনে রই ॥
কত নিশি জাগলাম আমি একা নদীর পাড়ে।
দেখা দিলে শান্তি পেত আব্দুল করিম অন্তরে ॥
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম বিবাগী।
নিশিদিন কান্দি আমি বন্ধুয়ারই লাগি ॥
৪৭৩. দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার পারের কাণ্ডারি
দয়াল মুর্শিদ তুমি আমার পারের কাণ্ডারি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে দয়া করো তরী ॥
পাপ-পুণ্যের হিসাব আমি জানি না তো দয়াল।
চরণ তলে ঠাঁই দিও ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৭৪. মানুষ না চিনলে মুক্তি নাই (তত্ত্ব)
মানুষ না চিনলে মুক্তি নাই রে ওরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই খুঁইজা পাবি আসল সে রতন ॥
বাইরে কেন তালাশ করিস মিছে অন্বেষণে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই মহাজন গহীনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে এই তো সার কথা।
মানুষ ভজলেই দূর হবে মনের সকল ব্যথা ॥
৪৭৫. ওরে ও পাষাণ পরদেশি বন্ধুয়া
ওরে ও পাষাণ পরদেশি বন্ধু কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিবাগী ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডালে।
বন্ধুর কথা মনে হলে মন হারাই অকূলে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৭৬. কেন আসিলাম ভবের হাটে (আক্ষেপ)
কেন আসিলাম ভবের হাটে কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
পাথেয় তো নাই রে কিছু হবে না তো দেখা।
যাবার সময় সঙ্গী হবে না তো কোনো জন একা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৭৭. পিরিত করা বড়ই কঠিন জানি রে ভাই
পিরিত করা বড়ই কঠিন জানি রে আমার ভাই।
একবার যে মজেছে পিরিতে তার কোনো রক্ষা নাই ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব দিতে হয় বিসর্জন।
তবেই মেলে সেই যে পরশ অমূল্য ঐ ধন ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম সুখ।
বন্ধুর লাগি পাগল আমি চাই না কোনো দুখ ॥
৪৭৮. হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের শাখা
হিন্দু-মুসলিম একই বৃক্ষের দুটি শাখা জানো।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি মানো ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৭৯. কালনী নদীর কূলে কূলে (বিরহ)
কালনী নদীর কূলে কূলে ঘুরি আমি একা।
বন্ধুয়ার দেখা পাইলে মিটত সব শঙ্কা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে যায় আমার সুর ও বাণী।
বন্ধুর দেখা না পাইলে সব হারাইলাম আমি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৪৮০. সুরের ভেলায় ৪৮০তম নিবেদন
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৮১. ওরে ও নিঠুর বন্ধুয়া
ওরে ও নিঠুর বন্ধুয়া, তোমায় খুঁজে মরি।
কোন বিদেশে রইলায় বন্ধু কূলের নৌকা ছাড়ি ॥
বসন্ত বাতাসে বন্ধু ফুলের গন্ধ আসে।
তুমি নাই রে পাশে বন্ধু মরি হাহুতাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৮২. দয়াল মুর্শিদ তুমি বিনে
দয়াল মুর্শিদ তুমি বিনে কে আছে আমার।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে তুমিই কাণ্ডার ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৪৮৩. মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল (৩য় সংস্করণ)
মন আমার একি ধাঁধায় পড়ল ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
মায়ার জালে বন্দি হইয়া দিন তো গেলো বৃথা।
এখন কেন কান্দো রে মন ভেবে পরকাল কথা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৮৪. মানুষ চিনলে মরণ নাই (তত্ত্ব)
মানুষ চিনলে মরণ নাই রে ওরে আমার মন।
মানুষের মাঝেই খুঁইজা পাবি আসল সে রতন ॥
বাইরে কেন তালাশ করিস মিছে অন্বেষণে।
তোরই মাঝে বসত করে সেই মহাজন গহীনে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৪৮৫. সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৪৮৬. কেন আসিলাম ভবের বাজারে
কেন আসিলাম ভবের বাজারে মিছে কাজে দিন গেল।
পরের বোঝা মাথায় লয়ে আসল কাজ তো বাকি রইল ॥
ঘরবাড়ি আর জমিদারি সবই তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ-তামাশা ভাঙবে রে তোর বেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৪৮৭. ওরে ও পাষাণ কালনী নদী (বিরহ)
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৪৮৮. হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৮৯. মুর্শিদ নামের ভেলা (মরমী)
মুর্শিদ নামের ভেলা ধরি চলো রে ভাই যাই।
তব দয়া ছাড়া ভবে আর তো গতি নাই ॥
বিপদ-আপদ তুফান ভীতি কিসের করি ভয়।
হাল ধরেছেন দয়াল মুর্শিদ হবেই বিজয় ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৪৯০. সুরের খেয়ায় ৪৯০তম নিবেদন
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৪৯১. দয়াল গুরুর নামের রশি
দয়াল গুরুর নামের রশি ধরো রে মন শক্ত করি।
ভবসিন্ধু পাড়ি দিতে ঐ নামই যে তরী ॥
অকূল পাথারে যখন নৌকা টলোমলো।
গুরুর নামের আলো জ্বেলে সঠিক পথে চলো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
৪৯২. ওরে ও নিঠুর বন্ধুয়া (নতুন ভাব)
ওরে ও নিঠুর বন্ধুয়া কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৯৩. মন আমার একি ভ্রম হইল (মরমী)
মন আমার একি ভ্রম হইল ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
মায়ার জালে বন্দি হইয়া দিন তো গেলো বৃথা।
এখন কেন কান্দো রে মন ভেবে পরকাল কথা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৪৯৪. মানুষ ভজলে মানুষের মাঝে স্রষ্টা
মানুষ ভজলে মানুষের মাঝেই স্রষ্টা পাওয়া যায়।
হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গেলে সব পাওয়া যায় হেথায় ॥
একই মাটি একই জল সবার শরীরে ভাই।
তবে কেন মানুষের মাঝে এতো বিভেদ চাই ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে রে মন দয়াময় দিদার ॥
৪৯৫. সখী আমার দিন তো ফুরাল (ধামাইল সুর)
সখী আমার দিন তো ফুরাল বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
কালনী নদীর তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৪৯৬. দুনিয়াটা মায়ার বাসা কিছুই রবে না (তত্ত্ব)
দুনিয়াটা মায়ার বাসা কিছুই রবে না।
যাবার বেলা সঙ্গে যাবে গুরুরই সাধনা ॥
টাকা-কড়ি বাড়ি-গাড়ি সবই মিছে জানো।
পরকালের পাথেয় হিসেবে গুরুর নাম টানো ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৪৯৭. ওরে ও পাষাণ কালনী নদী (বিরহ)
ওরে ও পাষাণ কালনী কেন করিস ছলনা।
তোর কূলে বসে আমি গাই বিরহ যাতনা ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার কত স্মৃতি।
গানের সুরে রেখে গেলাম আমার মনের প্রীতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৪৯৮. হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি)
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই বৃক্ষের শাখা।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি রাখা ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৪৯৯. মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি (শেষ নিবেদন)
মুর্শিদ চরণে করি যে মিনতি এই নিবেদন।
তব কৃপা ছাড়া ভবে কার আছে জীবন ॥
মায়ার জালে বন্দি হয়ে হারাইলাম দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৫০০. ৫০০তম গানের মহোৎসব
পাঁচশত গানের মালা গাঁথলাম কালনী নদীর কূলে।
শাহ আব্দুল করিমরে তোমরা রাইখো না আর ভুলে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৫০১. ওরে মন একবার ভেবে দেখ মনে
ওরে মন একবার ভেবে দেখ মনে।
কি ধন কামাইলি তুই এই ভবের জীবনে ॥
মিছে কাজে সময় গেল দিন তো ফুরাইয়া আসে।
আসল কাজ তো বাকি রইল পইড়া মায়ার পাশে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৫০২. সখী গো বন্ধু আমার রসের বিনোদিয়া
সখী গো বন্ধু আমার রসের বিনোদিয়া।
মন নিয়া সে দূরে রইল দেখা না দিয়া ॥
উজানধলের ঘাটে বসে পথ চেয়ে যে থাকি।
বন্ধু বিনে আমার মনে কেবল কান্দে আঁখি ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৫০৩. মুর্শিদ চরণে ঠাঁই দিও আমারে
মুর্শিদ চরণে ঠাঁই দিও আমারে ওহে দয়াময়।
তোমার নামের তরী ছাড়া আর তো গতি নাই ॥
বিপদ-আপদ তুফান ভীতি কিসের করি ভয়।
হাল ধরেছেন দয়াল মুর্শিদ হবেই বিজয় ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৫০৪. মানুষ চেনা সহজ নয় রে ভাই
মানুষ চেনা সহজ নয় রে ভাই এই ভবের বাজারে।
আসল রতন চিনলাম না রে পইড়া অন্ধকারে ॥
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে এক মহাজন।
তারে চিনলে মিটে যাবে সকল আকিঞ্চন ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষ ভজলেই হয়।
মানুষের মাঝেই আছে স্রষ্টার পরিচয় ॥
৫০৫. কেন আসিলাম এই মায়ার সংসারে
কেন আসিলাম এই মায়ার সংসারে মিছে কাজে দিন গেল।
পরের বোঝা মাথায় লয়ে আসল কাজ তো বাকি রইল ॥
ঘর-বাড়ি আর জমিদারি সবই তো মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হলে রঙ-তামাশা ভাঙবে রে তোর বেলা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর নাম জপো।
তবেই তুমি মুক্তি পথে শান্তি লাভ করো ॥
৫০৬. ওরে ও পাষাণ পরদেশি বন্ধুয়া
ওরে ও পাষাণ পরদেশি বন্ধু কেন গেলা ছাড়ি।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে বিবাগী ॥
বসন্ত আসিলে সখী কোকিল ডাকে ডালে।
বন্ধুর কথা মনে হলে মন হারাই অকূলে ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৫০৭. দয়াল তোমার দয়া বড়ই অপার মহিমা
দয়াল তোমার দয়া বড়ই অপার মহিমা।
তব চরণেতে ঠাঁই দিলে ঘুচবে মনের সীমা ॥
অন্ধকারে পথ হারালে দেখাও পথের দিশা।
দয়া করো দয়াল গুরু পুরাও মনের আশা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি এক ভিখারি।
দয়াল গুরুর চরণে যেন ঠাঁই পাই গো তরী ॥
৫০৮. হিন্দু-মুসলমান আমরা এক বৃক্ষের শাখা
হিন্দু-মুসলমান আমরা এক বৃক্ষের দুটি শাখা জানো।
মানুষ হিসেবে একে অন্যরে আপন করি মানো ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৫০৯. মুর্শিদ নামের ভেলা ধরি (মরমী)
মুর্শিদ নামের ভেলা ধরি চলো রে ভাই যাই।
তব দয়া ছাড়া ভবে আর তো গতি নাই ॥
কালনী নদীর ঢেউ লেগেছে উজান ধলের কূলে।
গুরুর দয়া ছাড়া কেবা পথ দেখাবে ভুলে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ সার।
তবেই হবে মুক্তি রে মন ঘুচবে অন্ধকার ॥
৫১০. সুরের মেলা
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
৫১১. মন আমার পাগল হইলো কার লাগিয়া
মন আমার পাগল হইলো কার লাগিয়া রে।
ঘরবাড়ি ছাড়লাম আমি বন্ধুয়ারি তরে ॥
লোকে বলে কুলটা মোরে আমি তো জানি রে।
বন্ধুর পিরিতে আমি হইলাম ভিখারি রে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৫১২. মুর্শিদ বিনে কে তরাবে এই অকূল পাথারে
মুর্শিদ বিনে কে তরাবে এই অকূল পাথারে।
দয়া করো দয়াল গুরু লও গো নিজ তীরে ॥
তব নামের তসবি জপি দিবস আর রজনী।
অন্ধকারে পথ দেখাও ওগো গুণমণি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে আমি তোমার দাস।
চরণ তলে রাখো আমায় মিটাও মনের আশ ॥
৫১৩. ওরে ও মায়ার সংসার কিছুই রবে না (তত্ত্ব)
ওরে ও মায়ার সংসার কিছুই রবে না।
সাঙ্গ হলে ভব মেলা কেউ তো যাবে না ॥
টাকা-কড়ি ঘর-বাড়ি সবই মিছে খেলা।
পরকালের পাথেয় করো গুরুরই মালা ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে সময় বয়ে যায়।
গুরুর দয়া ছাড়া কারেও দেখি না উপায় ॥
৫১৪. মানুষ চেনা সহজ নয় রে দেখতে মানুষের মতো
মানুষ চেনা সহজ নয় রে দেখতে মানুষের মতো।
ভিতর পানে চেয়ে দেখো আছে কত ক্ষত ॥
শুদ্ধ মনে ডাকিলে তাঁরে পাইবে নিজ ঘরে।
বাইরে কেন খোঁজ করো মিছে যাতায়াত করে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে মানুষের সেবাই সার।
মানুষের মাঝেই পাবে স্রষ্টার দিদার ॥
৫১৫. কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া (২য় ভার্সন)
কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধুয়া ছেড়ে যাইবায় যদি।
অকূলে ভাসাইয়া মোরে কেন হইলায় নদী ॥
সুখের আশা দিয়া বন্ধু করলায় নিরাশা।
এখন আমি বুঝি বন্ধু পিরিতের কি দশা ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৫১৬. সখী গো বন্ধু আমার কালনী পাড়ের ঢেউ
সখী গো বন্ধু আমার কালনী পাড়ের ঢেউ।
আমার এই মনের দুঃখ জানে না তো কেউ ॥
স্রোতের সাথে ভেসে গেল আমার সুখের স্মৃতি।
গানের সুরে গেয়ে যাই আমি বিরহের গীতি ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে জীবন নদীর কূলে।
সবই যেন পাই আমি দয়াল তোমায় পেলে ॥
৫১৭. দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম
দয়াল মুর্শিদ তোমার নামে বাতি জ্বালাইলাম ঘরে।
অন্ধকারে পথ দেখাও এই অধম পামরে ॥
তুফানেতে টলে তরী হাল ধরো গো দয়াল।
পার করো এই অধমেরে ঘুচাও মনের কাল ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
৫১৮. হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান (সম্প্রীতি-২)
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান একই মায়ের সন্তান।
সবার রক্ত লাল ভাই রে সবার এক প্রাণ ॥
বিভেদ কেন করো মিছে ধর্মের দোহাই দিয়া।
স্রষ্টা তো এক সবার মাঝে আছেন বিরাজিয়া ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে শান্তি যদি চাও।
মানুষের সেবায় তুমি নিজেরে সঁপি দাও ॥
৫১৯. ওরে ও পাষাণ হিয়া করলি কী কাম
ওরে ও পাষাণ হিয়া করলি কী কাম ভবের হাটে।
মায়ার জালে বন্দি হয়ে দিন তো গেল বৃথা নাটে ॥
সাঙ্গ হলে রঙ-তামাশা ভাঙবে রে তোর মেলা।
তখন কেন কান্দো রে মন পইড়া মায়ার খেলা ॥
আব্দুল করিম ভেবে বলে গানই আমার প্রাণ।
দয়াল গুরুর চরণে মোর শেষ নিবেদন ॥
৫২০. ৫২০তম গানের অর্ঘ্য
গানের ভেলায় ভাসছি আমি সুরের সাগর মাঝে।
স্মরণ করো আমায় তোমরা সকাল-সন্ধ্যা সাঁঝে ॥
মাটি আর মানুষের কথা গেয়ে গেলাম গানে।
শান্তি যেন পাই আমি ওই গুরুর চরণে ॥
শাহ আব্দুল করিম বলে বিদায় নিতে হবে।
গানের মাঝে আমারে তোমরা খুঁজে পাবে ॥
রেফারেন্স (তথ্যসূত্র):
১. শাহ আব্দুল করিম — ‘কালনীর কূলে’ (গীতিসমগ্র)।
২. সুমন কুমার দাশ — ‘শাহ আব্দুল করিম: জীবন ও গান’।
৩. উইকিপিডিয়া ও আর্কাইভ — শাহ আব্দুল করিমের জীবনধারা ও ডিসকোগ্রাফি।