ভাষার মাসে এসে ইদানীং ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘মজলুম’, ‘জালিম’ কিংবা ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর মতো ভারী ভারী শব্দগুলো নিয়ে রাজপথে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে বেশ বিতর্ক দানা বেঁধেছে। গত দুটো বছর ধরে যারা খুব সুকৌশলে এই শব্দগুলোকে আমাদের রোজকার চেনা জনপরিসরে গেলানোর চেষ্টা করছিল, নির্বাচনের আগে এসে তাদের আসল রাজনৈতিক চেহারাটা আর মোটেও ধোঁয়াশায় ঢাকা নেই। পর্দাটা এখন পুরোপুরি পরিষ্কার—এরা আসলে একাত্তরের সেই পরাজিত শক্তি কিংবা তাদেরই বিভিন্ন ঘরানার ছদ্মবেশী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
তবে এই বিতর্কের একটা পজিটিভ দিকও আছে। এই সুড়সুড়ি দেওয়া বাহাসের বিপক্ষে যথারীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা তো দাঁড়িয়েছেনই, পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে তাঁদের সাথে এক লাইনে এসে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীরাও। বিভিন্ন মত আর পথের মানুষের এই যে পারস্পরিক ধাক্কাধাক্কি বা মিথস্ক্রিয়া, এটা আমাদের নিজেদের ভেতরের দিকে আরেকবার নতুন করে তাকানোর একটা দারুণ সুযোগ করে দিচ্ছে; যা গত দুটো বছর আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে আক্ষরিক অর্থেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তবে এই রাজনৈতিক চাপান-উতোরের একদম গভীরে গিয়ে আমাদের এর মনস্তাত্ত্বিক আর ঐতিহাসিক আসল সত্যটা দেখা উচিত।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে উর্দুকে আমরা সবসময়ই ‘শত্রু’র আসনে পেয়েছি। কিন্তু একটা মৌলিক প্রশ্ন এখানে করাই যায়—আমাদের আসল লড়াইটা কি উর্দুর মতো একটা নির্দিষ্ট ভাষার বিরুদ্ধে ছিল, নাকি মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের পক্ষে? তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক, উর্দুর বদলে পাকিস্তান সরকার যদি সেই সময় পাঞ্জাবি, পাশতু, সিন্ধি বা সারাইকি আমাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইত (পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তানে উর্দুর চেয়ে এসব ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল), আমরা কি তা মুখ বুজে মেনে নিতাম? অবশ্যই নিতাম না!
সুতরাং, শত্রু আসলে কোনো ভাষা নয়; আসল শত্রুর নাম হলো ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’। আর উর্দু ছিল সেই বৈষম্যের সিন্ড্রোম বা রোগটাকে পূর্ব বাংলায় বাস্তবায়ন করার একটা রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র।
বায়ান্নর আন্দোলনের উপরিভাগের আবেগটা পুরোপুরি ভাষার হলেও, এর নেপথ্যের আসল কারণটা কিন্তু ছিল পুরোপুরি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। আমরা চেয়েছিলাম স্বাধীন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সমস্ত লেনদেন, যোগাযোগ আর সুযোগ-সুবিধা হবে আমাদের নিজেদের মাতৃভাষায়। সিভিল সার্ভিসের চাকরির পরীক্ষা, সরকারি অফিসের নামফলক কিংবা আদালতের আইনের ভাষা হবে বাংলা। তাছাড়া আমাদের বহু যুগ ধরে গড়ে ওঠা যে সাংস্কৃতিক পুঁজি, তার আসল মুনাফাটাও যেন আমরা পাই।
উর্দু যদি সেই সময় একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হয়ে যেত, তবে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাতারাতি রাষ্ট্রের চোখে ‘অশিক্ষিত’ আর ‘অযোগ্য’ বনে যেত। এটা ছিল একটা জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক বঞ্চনা।
সবচেয়ে মজার এবং হাস্যকর ব্যাপার হলো, উর্দু কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের সাধারণ মেজরিটি মানুষের মাতৃভাষাও ছিল না! এটা ছিল মূলত ভারতের লখনউ, এলাহাবাদ, মিরাট, সাহারানপুর, দিল্লি, বিহার, হায়দ্রাবাদ, মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থান থেকে দেশভাগের পর হিজরত করে আসা মাত্র ১০ শতাংশ ‘মোহাজির’দের চেনা ভাষা। আর সেই ১০% মোহাজিরের একটা বড় অংশই থিতু হয়েছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থাৎ, এক শতাংশের একটা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাকে গায়ের জোরে মেজরিটির ওপর চাপিয়ে দিয়ে পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা আর চাকরি-বাকরি কুক্ষিগত করাই ছিল জিন্না-লিয়াকতদের আসল ছক। এই সুপরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের নামই হলো ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’।
পাকিস্তান সেই বায়ান্নর সময় থেকেই দুনিয়াজুড়ে উর্দুর প্রতি এক অন্ধ প্রেম দেখিয়ে আসছে। কিন্তু ভেতরের আসল সত্যটা কী? আজও পাকিস্তানে ১০%-এর বেশি মানুষ উর্দুতে কথা বলে না। ভাষাভাষীর দিক থেকে গোটা পাকিস্তানে উর্দুর অবস্থান এখনো ৫ম! অফিস বা মিডিয়ায় দেখানোর জন্য তারা উর্দু বললেও, নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে তারা কিন্তু ঠিকই নিজেদের আসল মাতৃভাষায় কথা বলে; যে ভাষার সংখ্যা অন্তত আটটি। তারা উর্দুর জন্য লম্বা চওড়া ভাষণ দেয় ঠিকই, কিন্তু গত সাড়ে সাত দশকেও পাকিস্তান উর্দুকে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি।
আমাদের এই বাংলাদেশেও দেখবেন, যারা ইদানীং উর্দুর জন্য সবচেয়ে বেশি লাফালাফি করে, এদের বেশিরভাগই কিন্তু ঠিকঠাক নুন্যতম উর্দু বলতে বা বুঝতেও পারে না। জীবনে কোনো ওজনদার উর্দু সাহিত্য বা কবিতা পড়া তো দূরের কথা! স্রেফ মাদ্রাসায় পড়ার কারণে তারা হয়তো কোনোরকমে নাস্তালিক ফন্টে রিডিং পড়তে পারে, কিন্তু এই উগ্র উর্দুপ্রেমীদের হাতে যদি মওলানা আবুল কালাম আজাদের বিখ্যাত “গুব্বার-এ-খাতির” বইটা ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়—”ভাই, একটু পড়ে অর্থটা বুঝিয়ে দিন তো”—দেখবেন তারা নিমেষে লেজ গুটিয়ে দৌড়ে পালাবে। উর্দুর প্রতি এই চরম লোকদেখানো ভণ্ডামি আর ভেতরে ভেতরে এক ফোঁটা যোগ্যতা না থাকার নামই হলো “পাকিস্তান সিন্ড্রোম”।
বাস্তবতা হলো, এদের উর্দুর প্রতি আসলে কোনো খাঁটি প্রেম নেই; এদের এই তথাকথিত প্রেমের মূল উৎস হলো বাংলার প্রতি এক ধরণের গভীর ও আদিম ঘৃণা। যখনই এ দেশে বাংলা বা বাঙালি পরিচয়ের প্রসঙ্গ আসে, অবধারিতভাবেই তার পিছু পিছু চলে আসে ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান আর ৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। আর এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসগুলো সামনে আসলেই এদের রাজনৈতিক অস্তিত্বে ফোস্কা পড়ে যায়।
ঠিক এই চিরকালের চুলকানি আর ঘৃণা থেকেই তারা বাংলার একটা ‘বিকল্প’ বা ‘অল্টারনেট’ খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি পরিচয় দিয়ে আমরা এ যাবৎকালে যা যা অর্জন করেছি, তারা যেকোনো উপায়ে তার একটা প্রতিস্থাপন বা অল্টারনেটিভ খাড়া করতে চায়। এই মানসিক অস্থিরতা আর হীনম্মন্যতা থেকেই তারা বারবার সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ছদ্মবেশী তাত্ত্বিক শব্দ বা গালভরা ধারণা ছাড়ে এবং প্রতিবারই মুখ থুবড়ে পড়ে। ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’ তাদের পিছু ছাড়ে না বলেই তারা এই অন্ধ গলির গোলকধাঁধায় বারবার আবর্তিত হয় এবং ব্যর্থ হয়।
এদের এই উর্দু প্রেম যে কতটা ভুয়া আর সস্তা, তা প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ারও কিন্তু দরকার নেই। পরীক্ষা করতে চান? এদের সামনে পাকিস্তানি লেখক সাদাত হাসান মান্টোর কালজয়ী গল্প নিয়ে একটা নাটক বানিয়ে দেখান। কিংবা পাকিস্তানের বিখ্যাত প্রগতিশীল লেখক ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, হাবিব জালিব, কিশওয়ার নাহিদ, ফাহমিদা রিয়াজ বা আহমদ ফরাজের সেই বিপ্লবী ও সেক্যুলার লেখাগুলো জনপরিসরে নিয়ে আসুন। দেখবেন, মুহূর্তের মধ্যে এদের ভেতরের আসল জ্বলুনি শুরু হয়ে গেছে! এক সেকেন্ডে এদের মেকি উর্দু প্রেম কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। কারণ সেই আদিম “পাকিস্তান সিন্ড্রোম” তখন তাকে উর্দুর ভেতরেও আবার একটা অল্টারনেট খুঁজতে বাধ্য করবে!
২১শে ফেব্রুয়ারি আজ আর শুধু আমাদের নয়, গোটা দুনিয়ার ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এটি আমাদের বাঙালি জাতির অন্যতম সেরা এক বৈশ্বিক অর্জন। পৃথিবীর কোনো ভাষার প্রতি কুৎসিত ঘৃণা ছড়ানো আমাদের এই মহান অর্জনকে কোনোভাবেই মহিমান্বিত করে না। আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে—আমাদের লড়াইটা কিন্তু উর্দুর মতো একটা ভাষার বিরুদ্ধে নয়; আমাদের আসল লড়াইটা হলো ‘পাকিস্তান সিন্ড্রোম’-এর সেই কুৎসিত মানসিকতার বিরুদ্ধে।
আমাদের দেখার দৃষ্টিকে এবার আরও একটু প্রসারিত করতে হবে এবং আসল শত্রুকে চিনে নিতে হবে। এই লড়াইটা মূলত ধর্মীয় উগ্রতা, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, ছদ্মবেশ আর সুচতুর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে। আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভিত্তি আর লিবারেল বা উদারনৈতিক মূল্যবোধকে এতটাই শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে, যেন অপশক্তির এই তথাকথিত ‘নয়া বন্দোবস্ত’ বা সস্তা এজেন্ডাগুলো আমাদের টেবিলে আলোচনা বা বাহাসে আসার আগেই চিরতরে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে বিলীন হয়ে যায়।
আরও পড়ুন:
