অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা: আমরা আসলে কোন রাস্তায় হাঁটছি?

অনলাইন গণমাধ্যমগুলোকে একটু নিয়মের মধ্যে আনতে সরকার নাকি নতুন নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার জন্য একটা প্রাথমিক খসড়াও প্রকাশ করা হয়েছে, আর লিখিত মতামত জমা দেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ দিন। কাগজটিকে ‘নীতিমালার খসড়া’ বলা হলেও এর ভেতরের চেহারাটা কিন্তু হুবহু কোনো কড়া আইন বা সরকারি প্রজ্ঞাপনের মতো। অনুমোদন নেওয়া, বাধ্যতামূলক শর্ত, শাস্তি আর জরিমানার যে ফিরিস্তি সেখানে দেওয়া হয়েছে—তা কোনো সাধারণ নীতিমালার লক্ষণ নয়।

আমাদের তথ্যসচিব অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আমরা নীতিমালার নামে অনলাইন গণমাধ্যমের পথচলা আটকে দিতে চাই না, বরং এর বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করতে চাই।” সরকার অনলাইনে যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা, দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ড বা অসামাজিক কার্যকলাপ রুখতে চাইছে—এই সদিচ্ছাকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। কিন্তু মুশকিল হলো, পুরো খসড়াটি পড়ে অনলাইনের ‘বিকাশ’ নিয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা চোখে পড়ল না, যা পাওয়া গেল তা হলো স্রেফ নিয়ন্ত্রণের কড়া চাবুক।

এই উদ্যোগটি দেখে অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট যে, সরকার এখন অনলাইনকে মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এটিকে তদারকি করা প্রয়োজন মনে করছে। তবে কোনো কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার আগে সেই মাধ্যমটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। আমাদের ঠান্ডা মাথায় ভাবা উচিত—জিনিসটা আসলে কী? এর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যৌক্তিক? আর আমাদের যে জনবল বা অবকাঠামো আছে, তা দিয়ে এর কত ভাগ আসলেই বাস্তবায়ন করা যাবে? তার চেয়েও বড় কথা, আমরা আদৌ এই নিয়ন্ত্রণের রাস্তায় হাঁটব কি না, সেই সিদ্ধান্তটা আগে নেওয়া দরকার।

অনলাইন গণমাধ্যম আসলে কী?

প্রস্তাবিত খসড়াটিতে ‘অনলাইন গণমাধ্যম’-এর কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাই দেওয়া হয়নি। কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে একটা মাধ্যমকে অনলাইন গণমাধ্যম বলা যাবে, তা মোটেও পরিষ্কার নয়। আজকের দিনে অনলাইন মানে তো শুধু সাদাসিধে কিছু ওয়েবসাইট আর ই-মেইল নয়। লেখক আর পাঠকের যোগাযোগের চেনা পরিধি ভেঙে এখন অজস্র নতুন চ্যানেল তৈরি হয়েছে। নিউজ পোর্টাল, নিউজ এজেন্সি, পিটুপি (P2P), মিডিয়া শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, কমিউনিটি ব্লগ, ব্যক্তিগত ব্লগ, মিনি ব্লগ, মাইক্রো ব্লগ, ফোরাম, মেইল-গ্রুপ, চ্যাটরুম, ডিসকাশন গ্রুপ কিংবা বুকমার্কিং সাইট—মাধ্যমের কোনো শেষ নেই।

এর প্রতিটি মাধ্যমেই লাখ লাখ পাঠকের কাছে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাঠক এখানে শুধু খবর পড়েই ক্ষান্ত হয় না, নিজের মতামত দেয় এবং সেটা রি-শেয়ার করে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই মাধ্যমগুলোর কয়েকটির পাঠক বা দর্শকসংখ্যা দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংবাদপত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখানে দিনে যতবার খুশি লেখা, ছবি বা ভিডিও আপলোড করা যায়। এমনকি কিছু মানুষের ব্যক্তিগত ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে অনেক নামী পত্রিকার চেয়েও বেশি দেশি-বিদেশি ফলোয়ার যুক্ত আছেন। প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে এগুলোর কোনোটার গুরুত্বই কম নয়। এখন প্রশ্ন হলো, সরকার এর কতগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনবে?

অবাস্তব নিয়ন্ত্রণের মোহ

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এর কতগুলোকে আইন, লাইসেন্স আর তদারকির বেড়াজালে আটকে রাখা সম্ভব? বাস্তব কথা হলো, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পুরো জনশক্তিকে যদি শুধু এই এক কাজেই নিয়োজিত করা হয়, তাও এই প্রযুক্তির দৌড়ে জেতা সম্ভব নয়। গোঁ ধরে একের পর এক নীতিমালা হয়তো তৈরি করা যাবে, লাইসেন্স নিতেও বাধ্য করা যাবে; কিন্তু বর্তমান মাধ্যমগুলোর নীতিমালা তৈরি শেষ হতে না হতেই বাজারে শত শত নতুন প্রযুক্তি চলে আসবে। আর সেই প্রযুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রিত হবে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ থেকে, যে দেশের আইনের ওপর আমাদের কোনো হাত নেই। অথচ আমাদের দেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও মানুষ সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই খবর আদান-প্রদান করতে পারবে। আর লেখক-পাঠক যেখানে বেশি স্বাধীনতা পাবেন, স্বভাবতই তাঁরা সেখানেই গিয়ে ভিড় করবেন।

তারপরও যদি এই নীতিমালা নিয়েই এগোতে হয়, তবে খসড়ার কিছু ধারা নিয়ে কথা বলা দরকার। যেমন—১১ ও ১২ নম্বর ধারায় কিছু কারিগরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সার্ভারে ডেটা হোস্টিং করার বিষয়টি আমাদের বর্তমান অবকাঠামো ও নীতিমালার কারণে এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্য আর্কাইভ মাত্র ৯০ দিনের বদলে প্রথম থেকেই অনলাইনে আজীবন সংরক্ষণের নির্দেশনাটি বেশ যৌক্তিক।

তবে একটা বড় খামতি হলো, সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজস্ব কারিগরি অবকাঠামো ও কর্মপদ্ধতি কেমন হবে, তা নিয়ে কোনো গাইডলাইন নেই। কোনো সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড না থাকলে সাইবার দুর্ঘটনা বা হ্যাকিংয়ের মুখে প্রয়োজনীয় তথ্য উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। খবরটি কোথা থেকে এলো আর কোন পথে প্রকাশিত হলো, তার উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে না; ফলে প্রকৃত অপরাধীকেও চেনা যাবে না। সে ক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রকাশ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত (যাকে আমরা নিউজ লাইফ সাইকেল বলি) প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড থাকা দরকার। তবে সেই স্ট্যান্ডার্ড মেনে সাইট চালানো অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক হবে, সেটাও হিসাব করে দেখতে হবে।

বৈষম্যমূলক খরচের খতিয়ান

নীতিমালায় যে আর্থিক খরচের কথা বলা হয়েছে, তার ন্যায্যতা নিয়েও নতুন করে ভাবার দরকার আছে। একটা সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হলে একই ধরণের শিল্পের খরচ ও আয়ের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকতে হয়। আমাদের দেশে দেশি বিজ্ঞাপনদাতারা অনলাইনে বিজ্ঞাপনের পেছনে এখনো খুব বড় বাজেট বরাদ্দ করেন না।

অথচ বৈষম্যটা দেখুন—একটা ছাপা পত্রিকার লাইসেন্স নেওয়ার খরচ বলতে স্রেফ আবেদন ফরমের ওপর ২০ টাকার একটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প লাগানো! কোনো সিকিউরিটি ডিপোজিট বা জামানত লাগে না। সেই ছাপা পত্রিকা যখন অনলাইনে পোর্টাল খোলে, তার জন্যও কোনো লাইসেন্স ফি লাগে না। সরকারি বিজ্ঞাপনের তালিকাভুক্তিসহ সব মিলিয়ে তাদের বার্ষিক নবায়ন খরচ ২০ হাজার টাকাও নয়। অথচ একটা খাঁটি অনলাইন পত্রিকার জন্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার টাকার আবেদন ফরম, লাইসেন্স ফি এক ধাক্কায় ৫ লাখ টাকা, জামানত ২ লাখ টাকা আর প্রতি বছর নবায়ন ফি ৫০ হাজার টাকা! ছাপা মাধ্যমের অন্য অনেক খরচ বেশি, সেটা সত্যি। তবে খরচের এই বিশাল ফারাক রেখে অনলাইনগুলোর মধ্যে কোনো স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা কঠিন।

বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মোট প্রচার সময়ের ২০ শতাংশের বেশি বিজ্ঞাপনে ব্যয় করা যাবে না। অনলাইনের বিজ্ঞাপনের প্রযুক্তি যেভাবে প্রতি মুহূর্তে পাল্টাচ্ছে (যেমন পপ-আপ বা নেটিভ অ্যাড), তাতে এই সরল বা পুরোনো সমীকরণ দিয়ে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন চালানো প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া, বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বিজ্ঞাপন নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান যুগে বেশিরভাগ ডিজিটাল বিজ্ঞাপন আসে গুগল বা ফেসবুকের মতো ‘বিজ্ঞাপন এগ্রিগেটর’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা সময় বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজ আউটসোর্স করতেই হবে।

আরেকটি আইনি খটকা হলো—দৈনিক ছাপা পত্রিকার জন্য একজন ব্যক্তি একক উদ্যোক্তা হিসেবে লাইসেন্স নিতে পারেন। সেখানে অনলাইনের বেলায় কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা বা লিমিটেড কোম্পানি হওয়া বাধ্যতামূলক কেন? এই দ্বিমুখী নীতির কারণ স্পষ্ট নয়।

তাহলে আসল সমাধান কী?

ডিজিটাল যুগের এই চ্যালেঞ্জের মুখে শুধু আমরাই পড়িনি। ইন্টারনেট যখন থেকে জনপ্রিয় হয়েছে, বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই এই জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে পৃথিবীর বেশিরভাগ সফল ও গণতান্ত্রিক দেশ কিন্তু এই ধরণের লাইসেন্স বা নীতিমালার গলিপথে হাঁটেেনি। দু-একটা দেশ এমন উদ্যোগ নিলেও তাতে সফলতার মুখ দেখেনি।

তারা বরং বুদ্ধিমানের মতো একটা কাজ করেছে—নিজেদের দেশের মৌলিক আইনগুলোকে অনলাইনের উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। কপিরাইট আইন, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় তথ্য নিরাপত্তা আইন, সাক্ষ্য-প্রমাণ আইন, মানহানি আইন—এই চেনা আইনগুলোকে তারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক করেছে। আইন প্রয়োগ করার জন্য নিজেদের কারিগরি অবকাঠামো আর জনবলকে উন্নত করেছে। একই সাথে অনলাইনের বিভিন্ন অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টদের সাথে দাপ্তরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে অপরাধীকে ধরার পথ সুগম করেছে।

আজকের দুনিয়ায় এটাই সবচেয়ে পরীক্ষিত এবং সোজা রাস্তা। আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত সেই সফল উদাহরণগুলো মাথায় রেখেই সামনের দিকে পা বাড়ানো। স্রেফ লাইসেন্স আর জরিমানার ভয় দেখিয়ে ইন্টারনেটকে খাঁচায় বন্দি করা যাবে না।

 

প্রথম আলোর লিংক: http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-09-17/news/290022

Leave a Comment