ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতবর্ষের মুসলিম অভিজাত বা আশরাফ (Ashraf) শ্রেণীর মধ্যে একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল—ব্রিটিশরা চলে গেলে এই অঞ্চলের শাসনভার ঐতিহ্যগতভাবেই তাঁদের হাতে আসবে। এখানে সাধারণ মেহনতি মানুষ বা প্রান্তিক মুসলিমদের (আতরাফ/আজলাফ) ক্ষমতায়নের কোনো স্থান ছিল না। বিলেতের উচ্চশিক্ষিত ও জমিদারি খেতাবধারীরাই সব নিয়ন্ত্রণ করবে—এমনটাই ছিল তাঁদের অলিখিত মনস্তত্ত্ব।

অভিজাততন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি: সৈয়দ আমীর আলী
এই অভিজাততান্ত্রিক ধারণাকে বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ দিয়েছিলেন কোলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলিম বিচারপতি এবং বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Spirit of Islam’ ও ‘Personal Law of the Mahommedans’-এর লেখক সৈয়দ আমীর আলী। তাঁর পারিবারিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তাঁর প্রপিতামহ ১৭৩৯ সালে পারস্যের (ইরান) শিয়া শাসক নাদির শাহের সৈন্যবাহিনীর সাথে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। এই ‘আগত’ বা বিদেশী রক্তজাত পরিচয়ই তৎকালীন সমাজে আভিজাত্যের প্রধান মাপকাঠি ছিল। আমীর আলী এবং তাঁর সমসাময়িক নবাব আব্দুল লতিফদের রাজনীতি মূলত ছিল মুসলিম জমিদার ও উচ্চবিত্তদের স্বার্থরক্ষা করা, সাধারণ কৃষকের অধিকার আদায় নয়।
সৈয়দ আমীর আলী ১৮৭৭ সালে ‘ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ভারতের প্রথম মুসলিম রাজনৈতিক অঙ্গন। কিন্তু এর সদস্যপদ ও লক্ষ্য মূলত উচ্চবিত্ত আশরাফ (অভিজাত) মুসলিমদের চাকরির কোটা ও জমিদারি রক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই ধারার নেতারা ফার্সি বা ইংরেজি আভিজাত্যে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বাংলার কোটি কোটি সাধারণ মেহনতি মুসলমান—যাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলতেন ও লাঙল চালাতেন—তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে এই অভিজাত শাসকেরা অবজ্ঞা করতেন। এই আভিজাত্যিক বলয়ই পরবর্তীতে ঢাকাকেন্দ্রিক নবাব সলিমুল্লাহদের হাত ধরে মুসলিম লীগের জন্ম দেয়, যা ছিল দিল্লির ড্রয়িংরুমের রাজনীতি। বাংলার সাধারণ মানুষের ন্যায্যতার লড়াইয়ের সাথে তাঁদের এই আভিজাত্যের ফারাক ছিল যোজন যোজন।

পাকিস্তান প্রস্তাব ও রহমত আলীর খণ্ডিত স্বপ্ন
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার চৌধুরী রহমত আলী ১৯৩৩ সালে তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা “Now or Never; Are We to Live or Perish For Ever?”-এ প্রথম ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম প্রধান পাঁচটি অঞ্চল—পাঞ্জাব (P), আফগান প্রদেশ বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (A), কাশ্মীর (K), সিন্ধু (S) এবং বেলুচিস্তান (TAN) নিয়ে ‘PAKSTAN’ (তখন ‘i’ ছিল না) নামের প্রথম প্রস্তাব করেন।
পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকে তিনি তাঁর এই ধারণাকে আরও প্রসারিত করেন। তিনি কেবল উত্তর-পশ্চিম নয়, ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলিম প্রধান অঞ্চলের জন্যও পৃথক আবাসভূমির রূপরেখা দিয়েছিলেন:
- বাং-ই-ইসলাম (Bang-i-Islam): অবিভক্ত বাংলা ও আসাম অঞ্চল নিয়ে।
- উসমানিস্তান (Osmanistan): দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদ রাজ্য নিয়ে (তৎকালীন নিজাম উসমান আলী খানের নামানুসারে)।
রহমত আলীর এই মানচিত্রের পরিকল্পনা ছিল মূলত বিচ্ছিন্ন কতগুলো দ্বীপের মতো। ভারতের ভূখণ্ডের ভেতর ছড়ানো-ছিটানো এই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ধারণা ছিল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অবাস্তব।
তৎকালীন কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের প্রথম সারির নেতারা (যেমন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) রহমত আলীর এই প্রস্তাবকে অবাস্তব, খণ্ডিত এবং “ছাত্রসুলভ কল্পনা” (Chimerical and impractical) বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে যে একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের (States) কথা বলা হয়েছিল, তা রহমত আলীর প্রস্তাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। মূলত অভিজাত মুসলিম লীগের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু উত্তর-পশ্চিম ভারতে শিফট হয়ে যাওয়ায় রহমত আলীর খণ্ডিত স্বপ্ন আড়ালে চলে যায় এবং ১৯৪৬ সালের দিল্লি কনভেনশনে এসে তা একক ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ পাকিস্তান রাষ্ট্রে রূপ নেয়—যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল আপামর বাঙালিকে।
বাংলার প্রতি বঞ্চনা: সোহরাওয়ার্দী ও লিয়াকত আলী খান
পাকিস্তানের এই ‘চেইন অব কমান্ড’ বা অভিজাততন্ত্রের শাসন ধরে রাখতে ভারতের যুক্তপ্রদেশের (ইউপি) অভিজাত পরিবারের সন্তান নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানকে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী করা হয়। অথচ এই পদের সবচেয়ে বড় হকদার ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সোহরাওয়ার্দীকে সহ্য করতে পারেনি, কারণ তিনি দিল্লির অভিজাত ড্রয়িংরুমের রাজনীতি ছেড়ে বাংলার সাধারণ মেহনতি মানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি দেশভাগের পর লিয়াকত আলী খানের সরকার সোহরাওয়ার্দীর ভারতীয় পাসপোর্ট দেখিয়ে তাঁর পাকিস্তানি গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল করে এবং তাঁকে পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা দেয়। আভিজাত্যের মোহ ছেড়ে বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণেই তাঁকে এই জুলুম সহ্য করতে হয়েছিল।

সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর: বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ
পশ্চিম পাকিস্তানে যখন সামন্তবাদী জমিদার ও সামরিক জান্তার আভিজাত্য জেঁকে বসে, তখন এর বিপরীতে একমাত্র নিয়মতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান)। এ দেশের সাধারণ, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অবিসংবাদিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
মুসলিম লীগের সেই অবজ্ঞাকারী আভিজাত্যের দম্ভের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের মূল হাতিয়ার হিসেবে ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। এই রাজনৈতিক দলটি দিল্লির উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে সরাসরি গ্রামের মেহনতি মানুষের কুঁড়েঘরে পৌঁছে যায়।
ন্যায্যতার লড়াইয়ে শোষক দল মুসলিম লীগ যখন ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো, তখন তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে গায়ে জড়াল জলপাই রঙের সামরিক উর্দি। আইয়ুব খানের সেই পুরোনো পাকিস্তানি সামরিক ধারা ও একনায়কতন্ত্রের হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে পরবর্তীতে জন্ম নেয় দলছুট ও সুবিধাবাদীদের প্লাটফর্ম ‘বিএনপি’।
সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এলিটদের সেই পাকিস্তানি ধারার সামন্তবাদী রাজনীতি আজ বাংলার মাটিতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ। আগামীতে হয়তো তাঁরা ভোল পাল্টে নতুন কোনো নামে বা ছদ্মবেশে ফিরবে।
কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষ তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাবে তাঁদের সেই একমাত্র রাজপথের পরীক্ষিত ভরসার স্থল—আওয়ামী লীগের পতাকাতলে।
আরও দেখুন:
