যেকোনো সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লক্ষ্য থাকে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেমন বিপণন, অর্থ বা মানবসম্পদ বিভাগের পরিকল্পনা থাকে, ঠিক তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি বিভাগের জন্যও একটি সুসংগঠিত ব্লু-প্রিন্ট প্রয়োজন। একেই বলা হয় ‘আইটি মাস্টার প্ল্যান’।
আমাদের দেশে অনেক সময় আইটিকে কেবল একটি সেবা প্রদানকারী বিভাগ হিসেবে দেখা হয়। যখন যা প্রয়োজন—একটি কম্পিউটার কেনা বা একটি সফটওয়্যার ইনস্টল করা—এভাবেই টুকরো টুকরো সিদ্ধান্তে আইটি পরিচালিত হয়। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদে খরচ বাড়ে এবং বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। একটি কার্যকর মাস্টার প্ল্যান আপনার প্রতিষ্ঠানের আইটি খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিতে পারে এবং বড় ধরণের কারিগরি বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। এই ৫ পর্বের সিরিজে আমরা ধাপে ধাপে শিখব কীভাবে একটি দেশীয় প্রেক্ষাপটে উপযোগী এবং বৈশ্বিক মানের আইটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা যায়।

পর্ব ১: বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন—কোথায় আছি এবং কোথায় যেতে চাই?
একটি আইটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কারিগরি অবস্থার একটি স্বচ্ছ চিত্র তৈরি করা। একে বলা হয় ‘এজ-ইজ’ (As-Is) অ্যানালাইসিস। আপনি যদি না জানেন আপনি এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, তবে আপনি কখনোই আপনার গন্তব্যে পৌঁছানোর সঠিক ম্যাপ তৈরি করতে পারবেন না।
১. বর্তমান অবকাঠামোর ইনভেন্টরি তৈরি
মাস্টার প্ল্যান শুরুর আগে আপনার হাতের কাছে থাকা প্রতিটি কারিগরি সম্পদের তালিকা করুন।
হার্ডওয়্যার: কতটি সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং নেটওয়ার্ক ডিভাইস আছে? এগুলোর বয়স কত এবং কার্যকারিতা কেমন?
সফটওয়্যার: প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কী কী সফটওয়্যার বা ইআরপি ব্যবহার করছে? এগুলোর লাইসেন্স কি হালনাগাদ?
নেটওয়ার্ক: অফিসের ইন্টারনেট সংযোগ, রাউটার এবং কানেক্টিভিটির অবস্থা কী?
এই তালিকাটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে আপনার বিদ্যমান সম্পদের কতটুকু ভবিষ্যতে ব্যবহারযোগ্য এবং কোনটি দ্রুত বদলে ফেলা প্রয়োজন।
২. ব্যবসার লক্ষ্য ও আইটির সমন্বয় (Business Alignment)
আইটি মাস্টার প্ল্যান কখনোই আইটি বিভাগের একার পরিকল্পনা নয়। এটি তৈরি করতে হয় ‘বটম-আপ’ (Bottom-Up) এপ্রোচে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগের (যেমন: সেলস, ফিন্যান্স, এইচআর) সাথে বসতে হবে। তাদের জিজ্ঞেস করুন—আগামী ৩ বা ৫ বছরে তাদের লক্ষ্য কী?
- সেলস টিম কি তাদের কার্যক্রম অনলাইনে নিতে চায়?
- ফিন্যান্স কি অটোমেটেড রিপোর্টিং চায়? ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় না থাকলে সেই মাস্টার প্ল্যান কেবল কাগজের দস্তাবেজ হয়েই থাকবে।
৩. সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ
বর্তমান অবস্থায় আপনার আইটি সিস্টেমে বড় ধরণের কোনো ফাঁক বা গ্যাপ আছে কি না তা খুঁজে বের করুন।
- আপনার তথ্য কি নিরাপদ?
- সিস্টেম কি প্রায়ই ডাউন হয়?
- আপনার টিমের দক্ষ কর্মীর অভাব আছে কি না? এই ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা মাস্টার প্ল্যানের অন্যতম লক্ষ্য, যাতে পরবর্তী ধাপে এগুলো সমাধানের পথ বের করা যায়।
৪. আর্থিক সক্ষমতা যাচাই
আইটি মাস্টার প্ল্যান করার সময় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বা বাজেট সক্ষমতা মাথায় রাখা জরুরি। আপনি এমন কোনো মহাপরিকল্পনা করতে পারেন না যা বাস্তবায়ন করার মতো তহবিল প্রতিষ্ঠানের নেই। তাই বর্তমান ব্যয়ের ধরণ বিশ্লেষণ করুন—প্রতি বছর আইটি রক্ষণাবেক্ষণে কত খরচ হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য কতটুকু সুযোগ আছে।
৫. বিদেশি মডেল বনাম দেশীয় বাস্তবতা
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট উন্নত বিশ্বের চেয়ে ভিন্ন। এখানে ইন্টারনেটের স্থিতিশীলতা, বিদ্যুতের অবস্থা এবং লোকবলের দক্ষতা ভিন্ন হতে পারে। তাই হুবহু কোনো বিদেশি আইটি প্ল্যান কপি না করে আমাদের স্থানীয় সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন: ক্লাউডে সব ডাটা রাখা কি আমাদের জন্য সাশ্রয়ী হবে, নাকি হাইব্রিড মডেল বেশি কার্যকর? এই সিদ্ধান্তগুলো এই প্রাথমিক ধাপেই নিতে হয়।
পর্ব ২: লক্ষ্য নির্ধারণ ও কৌশলী রোডম্যাপ—ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনা
একটি প্রতিষ্ঠানের আইটি মাস্টার প্ল্যান কেবল কিছু ডিভাইসের তালিকা নয়, এটি হলো একটি ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের কারিগরি নকশা। প্রথম পর্বে আমরা বর্তমান অবস্থার যে মূল্যায়ন করেছি, তার ওপর ভিত্তি করে এখন আমাদের নির্ধারণ করতে হবে আগামী ৩ থেকে ৫ বছরে আমরা আইটিকে কোথায় দেখতে চাই। এই পর্যায়টিকে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ’ তৈরি করা। একটি অগোছালো আইটি বিভাগকে একটি সুশৃঙ্খল ও লাভজনক বিভাগে রূপান্তর করার জন্য এই রোডম্যাপটি কম্পাসের মতো কাজ করে।
১. স্বল্পমেয়াদী বনাম দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ
আইটি মাস্টার প্ল্যানকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
স্বল্পমেয়াদী (৬ মাস থেকে ১ বছর): এখানে মূলত বর্তমানের সমস্যা সমাধান এবং সিস্টেম স্থিতিশীল করার দিকে নজর দেওয়া হয়। যেমন: ইমেইল সিস্টেম আধুনিকায়ন বা সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা।
মধ্যমেয়াদী (১ থেকে ৩ বছর): এই সময়ে নতুন প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার চালু করা হয়। যেমন: প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগকে একটি কেন্দ্রীয় ইআরপি (ERP) বা সিআরএম (CRM) সিস্টেমের আওতায় আনা।
দীর্ঘমেয়াদী (৩ থেকে ৫ বছর): এটি মূলত উদ্ভাবন এবং ব্যবসার প্রসারের জন্য। যেমন: ডেটা অ্যানালিটিক্স বা এআই (AI) ব্যবহার করে ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন সম্পন্ন করা।
২. ‘বটম-আপ’ ও ‘টপ-ডাউন’ এপ্রোচের সমন্বয়
আপনার মূল লেখায় চমৎকার একটি পয়েন্ট আছে—আইটি মাস্টার প্ল্যান সাধারণত ‘বটম-আপ’ এপ্রোচে হয়। এর মানে হলো, নিচের স্তরের ব্যবহারকারী এবং বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা প্রতিদিন যে ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তা থেকে রিকোয়ারমেন্ট সংগ্রহ করা। এরপর ম্যানেজমেন্টের ভিশন অনুযায়ী (টপ-ডাউন) সেই চাহিদাকে পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করা হয়। এই দুইয়ের সমন্বয় না হলে এমন এক মাস্টার প্ল্যান তৈরি হবে যা কাগজে সুন্দর, কিন্তু বাস্তবে কর্মীরা তা ব্যবহার করতে পারবে না।
৩. অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি সেট করা (Prioritization)
সব কাজ একসাথে শুরু করা আইটি প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। মাস্টার প্ল্যানে প্রতিটি কাজের একটি অগ্রাধিকার ক্রম থাকতে হবে।
ক্রিটিক্যাল: যা না করলে প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে (যেমন: সিকিউরিটি বা ডাটা ব্যাকআপ)।
প্রয়োজনীয়: যা উৎপাদনশীলতা বাড়াবে (যেমন: নতুন সফটওয়্যার)।
ঐচ্ছিক: যা অতিরিক্ত সুবিধা দেবে কিন্তু এখনই জরুরি নয়। এই অগ্রাধিকার নির্ধারণের সময় ব্যবসার মুনাফা (ROI) এবং ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
৪. রোডম্যাপের মাইলফলক (Milestones) তৈরি
একটি ৩ বা ৫ বছরের পরিকল্পনা একবারে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। একে ছোট ছোট ‘মাইলফলক’ বা মাইলস্টোনে ভাগ করতে হবে। প্রতিটি মাইলস্টোনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা (Deadline) থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:
প্রথম কোয়ার্টারে সার্ভার আপগ্রেড সম্পন্ন হবে।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে নতুন এইচআরএম সফটওয়্যার ট্রায়াল শুরু হবে। মাইলস্টোন থাকলে কাজের অগ্রগতি পরিমাপ করা সহজ হয় এবং টিমের মধ্যে কাজের গতি বজায় থাকে।
৫. পরিবর্তনের ব্যবস্থাপনা (Change Management)
প্রযুক্তি পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন করা কঠিন। মাস্টার প্ল্যানে একটি অংশ থাকতে হবে—কীভাবে আপনি নতুন প্রযুক্তির সাথে কর্মীদের অভ্যস্ত করবেন। প্রশিক্ষণ, কর্মশালা এবং নিয়মিত ফিডব্যাক গ্রহণ করার বিষয়টি রোডম্যাপে যুক্ত থাকতে হবে। কর্মীরা যদি পরিবর্তনকে ভয় পায়, তবে দামী দামী সফটওয়্যারও কোনো কাজে আসবে না।
৬. ঝুঁকি এবং নমনীয়তা (Flexibility)
আইটি জগত খুব দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই আপনার ৩ বছরের মাস্টার প্ল্যান যেন পাথরে খোদাই করা না হয়। এটি হতে হবে ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ বা নমনীয়। ধরুন, আপনি পরিকল্পনা করেছেন নিজস্ব ডাটা সেন্টার করবেন, কিন্তু পরের বছর ক্লাউড কম্পিউটিং অনেক বেশি সাশ্রয়ী হয়ে গেল। আপনার মাস্টার প্ল্যানে সেই পরিবর্তন গ্রহণ করার মতো সুযোগ থাকতে হবে। প্রতি ৬ মাস বা ১ বছর অন্তর পরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়ন (Review) করার সময় রাখতে হবে।
পর্ব ৩: প্রযুক্তি নির্বাচন ও অবকাঠামো ডিজাইন—সঠিক সমাধান বাছাইয়ের কৌশল
একটি মাস্টার প্ল্যানের রোডম্যাপ যখন তৈরি হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—আমরা কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করব? আইটি খাতে হাজারো অপশন থাকে। আপনি কি ডেল নাকি এইচপি সার্ভার কিনবেন? আপনি কি মাইক্রোসফটের ইকোসিস্টেমে থাকবেন নাকি ওপেন সোর্স ব্যবহার করবেন? এই সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে আপনার আইটি পরিকাঠামো কতটা শক্তিশালী এবং সাশ্রয়ী হবে।
প্রযুক্তি নির্বাচন ও ডিজাইন করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপট ও ব্যবসার ধরন মাথায় রেখে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
১. হার্ডওয়্যার বনাম ক্লাউড: সঠিক ভারসাম্য (Hybrid Strategy)
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো—নিজের অফিসে সার্ভার বসানো নাকি ক্লাউডে (Azure, AWS, Google Cloud) চলে যাওয়া।
- বেস্ট প্রাকটিস: আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘হাইব্রিড’ মডেল সবচেয়ে কার্যকর। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং লোকাল ডেটাগুলো নিজের অফিসে ফিজিক্যাল সার্ভারে রাখা ভালো (বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অনিশ্চয়তার কারণে)। আর ইমেইল, ওয়েবসাইট বা কোলাবরেশন টুলসগুলো ক্লাউডে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। মাস্টার প্ল্যানে এই ডিজাইনটি স্পষ্ট থাকতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় বড় হার্ডওয়্যার কেনার বাজেট সাশ্রয় হয়।
২. স্কেলেবিলিটি (Scalability) ও ফিউচার প্রুফিং
আজ আপনি যে প্রযুক্তি কিনছেন, তা কি আগামী ৫ বছর পর আপনার প্রতিষ্ঠানের ভার নিতে পারবে? অনেক সময় সস্তা বা মান্ধাতা আমলের প্রযুক্তি কিনে আমরা মনে করি সাশ্রয় হলো, কিন্তু ২ বছর পরই তা অকেজো হয়ে যায়।
- মাস্টার প্ল্যানে এমন অবকাঠামো ডিজাইন করতে হবে যা সহজে বাড়ানো যায়। একে বলে ‘পে-অ্যাজ-ইউ-গ্রো’ মডেল। অর্থাৎ আজ যতটুকু দরকার ততটুকু কিনুন, কিন্তু এমনভাবে ডিজাইন করুন যেন পরে সহজেই ধারণক্ষমতা বাড়ানো যায়।
৩. সফটওয়্যার সিলেকশন: কাস্টম বনাম অফ-দ্য-শেলফ
প্রতিষ্ঠানের জন্য ইআরপি (ERP) বা অন্য কোনো সফটওয়্যার নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটি পথ থাকে: নিজে তৈরি করা অথবা তৈরি করা সফটওয়্যার কেনা।
- বেস্ট প্রাকটিস: যদি আপনার ব্যবসা খুব অনন্য না হয়, তবে বাজারে প্রচলিত এবং পরীক্ষিত সফটওয়্যার কেনাই ভালো। নিজে সফটওয়্যার বানাতে গেলে তা রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে আপডেট রাখা কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। মাস্টার প্ল্যানে সফটওয়্যারের ‘লাইফ সাইকেল’ বা আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করে দিতে হবে।
৪. নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা আর্কিটেকচার
একটি মজবুত আইটি অবকাঠামোর মেরুদণ্ড হলো তার নেটওয়ার্ক। ডাটা সেন্টারের ক্যাবলিং থেকে শুরু করে ওয়াইফাই রাউটার—সবকিছুর একটি মানসম্মত ডিজাইন থাকতে হবে।
- মাস্টার প্ল্যানে নিরাপত্তাকে ‘বাই ডিফল্ট’ বা মূল কাঠামোর অংশ হিসেবে রাখতে হবে। ফায়ারওয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাস এবং ডেটা এনক্রিপশন যেন পরে যোগ করা কোনো তালি না হয়, বরং ডিজাইনের শুরুতেই থাকে। সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি ‘জিরো ট্রাস্ট’ আর্কিটেকচার ফলো করা বর্তমান সময়ের সেরা প্রাকটিস।
৫. ইন্টারঅপারেবিলিটি: ভিন্ন ভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে মেলবন্ধন
একটি বড় ভুল হলো এমন সব বিচ্ছিন্ন সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার কেনা যা একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে না। ফিন্যান্সের সফটওয়্যারের ডেটা যদি এইচআর সফটওয়্যারে না পৌঁছায়, তবে আইটি মাস্টার প্ল্যান ব্যর্থ।
- ডিজাইন করার সময় নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি সিস্টেম যেন অন্যটির সাথে ইন্টিগ্রেট বা যুক্ত হতে পারে। এতে ডেটা ডুপ্লিকেশন কমে এবং রিপোর্ট তৈরি করা সহজ হয়।
৬. ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ও এক্সেসিবিলিটি
অবকাঠামো ডিজাইন কেবল সার্ভার রুমের জন্য নয়। কর্মীরা কীভাবে সিস্টেমটি ব্যবহার করবে—সেটি ল্যাপটপে হোক বা মোবাইলে—তা পরিকল্পনায় থাকতে হবে। বর্তমানের ‘রিমোট ওয়ার্ক’ বা ‘হাইব্রিড অফিস’ কালচারে কর্মীরা যেন সুরক্ষিতভাবে যেকোনো জায়গা থেকে কাজ করতে পারে, সেই অবকাঠামো নিশ্চিত করা আধুনিক মাস্টার প্ল্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭. ভেন্ডর নিরপেক্ষতা (Vendor Neutrality)
মাস্টার প্ল্যানে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা ভেন্ডরের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হওয়া বিপজ্জনক। একে বলে ‘ভেন্ডর লক-ইন’। আপনার ডিজাইন এমন হওয়া উচিত যেন ভবিষ্যতে কোনো বিশেষ কারণে ভেন্ডর পরিবর্তন করতে হলেও যেন পুরো সিস্টেম অকেজো হয়ে না পড়ে।
পর্ব ৪: বাজেট প্রণয়ন ও রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট—অর্থ ও মেধার সঠিক প্রয়োগ
একটি দুর্দান্ত আইটি মাস্টার প্ল্যান এবং আধুনিক অবকাঠামোর নকশা কাগজে-কলমে যতই সুন্দর হোক না কেন, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক আর্থিক সংস্থান এবং দক্ষ জনবল। অনেক সময় দেখা যায়, পরিকল্পনার মাঝপথে গিয়ে টাকা ফুরিয়ে যায় অথবা উপযুক্ত লোকবলের অভাবে দামী প্রযুক্তিগুলো অকেজো পড়ে থাকে। তাই চতুর্থ পর্বে আমাদের লক্ষ্য হলো—কীভাবে একটি টেকসই বাজেট তৈরি করা যায় এবং কাদের দিয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা হবে তা নির্ধারণ করা।
১. ক্যাডেন্স অব ইনভেস্টমেন্ট: ক্যাপেক্স (CapEx) বনাম ওপেক্স (OpEx)
আইটি বাজেটিংয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি।
CapEx (Capital Expenditure): এটি হলো বড় অংকের এককালীন বিনিয়োগ। যেমন—সার্ভার কেনা বা ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক বসানো।
OpEx (Operational Expenditure): এটি হলো মাসভিত্তিক বা বাৎসরিক খরচ। যেমন—ইন্টারনেট বিল, ক্লাউড সাবস্ক্রিপশন বা সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি। বেস্ট প্রাকটিস: মাস্টার প্ল্যানে চেষ্টা করুন বড় এককালীন বিনিয়োগ (CapEx) কমিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবহার ভিত্তিক খরচে (OpEx) যেতে। এতে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ (Cash flow) ঠিক থাকে এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে তাল মেলানো সহজ হয়।
২. টোটাল কস্ট অফ ওনারশিপ (TCO) হিসাব করা
একটি সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার কেনার সময় আমরা কেবল তার ‘প্রাইস ট্যাগ’ দেখি। কিন্তু মাস্টার প্ল্যানে আমাদের দেখতে হবে আগামী ৫ বছরে ওই জিনিসের পেছনে মোট কত খরচ হবে।
ক্রয়মূল্য + ইমপ্লিমেন্টেশন খরচ + বিদ্যুৎ ও জায়গা + বার্ষিক মেইনটেন্যান্স (AMC) + ট্রেনিং খরচ। এই ৫ বছরের টোটাল হিসাব মাথায় রেখে বাজেট করলে মাঝপথে অর্থের সংকট হওয়ার ভয় থাকে না।
৩. আপতকালীন তহবিল বা কন্টিনজেন্সি ফান্ড (Contingency Fund)
আইটি খাতে হুট করে বড় ধরণের সমস্যা আসতে পারে (যেমন: র্যানসমওয়্যার অ্যাটাক বা হার্ডওয়্যার ক্র্যাশ)। মাস্টার প্ল্যানের বাজেটে অন্তত ১০-১৫% টাকা ‘আপতকালীন’ খাতের জন্য আলাদা করে রাখা উচিত। বিপদের সময় এই তহবিলটি প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে।
৪. ইন্টারনাল টিম বনাম আউটসোর্সিং (Resource Management)
সব কাজ নিজের লোক দিয়ে করানো বা সব কাজ বাইরে থেকে করিয়ে নেওয়া—কোনোটিই আদর্শ নয়।
কোর টিম: প্রতিষ্ঠানের ডাটা সিকিউরিটি, নেটওয়ার্ক এবং স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্তগুলো নিজের বিশ্বস্ত টিমের হাতে রাখুন।
আউটসোর্সিং: স্পেশালাইজড কাজ (যেমন: কাস্টম সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা অ্যানুয়াল মেইনটেন্যান্স) বাইরের দক্ষ ভেন্ডরকে দিতে পারেন। এতে নিজের টিমের ওপর চাপ কমে এবং বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া যায়।
৫. দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ বাজেট
মাস্টার প্ল্যানে নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করলে সেই প্রযুক্তি চালানোর জন্য বর্তমান কর্মীদের তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি কেনা যত সহজ, তা চালানোর মতো দক্ষ লোক পাওয়া তত কঠিন। তাই বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রতি বছর কর্মীদের ‘ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন’-এর জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া দামী প্রযুক্তি একটি অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক বা লোহার টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়।
৬. ভেন্ডর ম্যানেজমেন্ট এবং নেগোসিয়েশন
মাস্টার প্ল্যানের বাস্তবায়ন সফল করতে হলে ভালো ভেন্ডর বা সাপ্লায়ারের সাথে সুসম্পর্ক প্রয়োজন।
বাজেটে ভেন্ডরের পেমেন্ট টার্মস এবং সাপোর্ট লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA) পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। একাধিক ভেন্ডরের কাছ থেকে কোটেশন নিয়ে তুলনা করা এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে ছাড় আদায় করা একটি সাশ্রয়ী আইটি বাজেটের অন্যতম কৌশল।
পর্ব ৫: বাস্তবায়ন, তদারকি ও নবায়ন—আইটি মাস্টার প্ল্যানকে জীবন্ত রাখা
আমরা একটি দীর্ঘ যাত্রার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। প্রথম চার পর্বে আমরা বর্তমান অবস্থা বুঝেছি, লক্ষ্য স্থির করেছি, প্রযুক্তি নির্বাচন করেছি এবং বাজেট ও জনবল গুছিয়েছি। এখন সময় এসেছে সেই ব্লু-প্রিন্ট বা নকশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। আইটি মাস্টার প্ল্যান কোনো স্থির বা মৃত দলিল নয় যা একবার লিখে ড্রয়ারে ফেলে রাখা হবে; এটি একটি ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ বা জীবন্ত পরিকল্পনা যা প্রতিষ্ঠানের সাথে সাথে প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়।
১. পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন (Phased Implementation)
পুরো মাস্টার প্ল্যান একসাথে শুরু করা আইটি প্রজেক্টের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
বেস্ট প্রাকটিস: মাস্টার প্ল্যানটিকে ছোট ছোট প্রজেক্টে ভাগ করে নিন। প্রথমে সেই প্রজেক্টগুলো হাতে নিন যা দ্রুত সুফল দেবে (Quick Wins) এবং প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমাবে। উদাহরণস্বরূপ: আগে ব্যাকআপ ও সিকিউরিটি নিশ্চিত করুন, তারপর নতুন ইআরপি (ERP) সফটওয়্যারে হাত দিন। প্রতিটি সফল ধাপ ম্যানেজমেন্টের আস্থা বাড়াবে এবং পরবর্তী বড় বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করবে।
২. স্টিয়ারিং কমিটি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা
আইটি মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য একটি ‘আইটি স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করা জরুরি। এই কমিটিতে কেবল আইটি বিশেষজ্ঞ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা থাকবেন।
প্রতি মাসে বা তিন মাস অন্তর কমিটির মিটিং হওয়া উচিত। সেখানে প্ল্যানের অগ্রগতি, কোনো বাধা আছে কি না এবং বাজেটের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে। এটি আইটি বিভাগকে একা হয়ে পড়ার হাত থেকে বাঁচায় এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে।
৩. পারফরম্যান্স মেজারমেন্ট বা কেপিআই (KPI)
মাস্টার প্ল্যানটি কতটুকু সফল হচ্ছে তা বোঝার জন্য কিছু পরিমাপক থাকা দরকার।
আপনার নেটওয়ার্ক ডাউন-টাইম কি কমেছে?
নতুন সফটওয়্যার ব্যবহারের ফলে কর্মীদের কাজের গতি কি বেড়েছে?
আইটি খরচ কি বাজেটের মধ্যে আছে? এই ডেটাগুলো নিয়মিত সংগ্রহ করুন। যখন আপনি সংখ্যা দিয়ে সাফল্য প্রমাণ করতে পারবেন, তখন আইটি মাস্টার প্ল্যানের গুরুত্ব সবার কাছে স্পষ্ট হবে।
৪. তদারকি ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা (Monitoring & Change Management)
বাস্তবায়নের সময় অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা আসতে পারে। হয়তো কোনো একটি প্রযুক্তি আমরা যেভাবে কাজ করবে ভেবেছিলাম, বাস্তবে তা করছে না।
বেস্ট প্রাকটিস: নমনীয় বা ফ্লেক্সিবল হোন। যদি দেখা যায় পরিকল্পনার কোনো অংশ বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাজ করছে না, তবে তা পরিবর্তন করতে দ্বিধা করবেন না। মনে রাখবেন, মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে ব্যবসাকে সহায়তা করতে, ব্যবসাকে আটকে রাখতে নয়।
৫. নিয়মিত নবায়ন ও রিভিউ (Annual Review)
প্রযুক্তি জগত অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তনশীল। তিন বছর আগে যা সেরা প্রযুক্তি ছিল, আজ তা সেকেলে হতে পারে। তাই প্রতি বছর অন্তত একবার আইটি মাস্টার প্ল্যানটি আনুষ্ঠানিকভাবে নবায়ন (Renew) করতে হবে।
বাজারের নতুন ট্রেন্ড (যেমন: এআই বা সাইবার থ্রেট) বিবেচনা করে পরিকল্পনায় নতুন ধারা যুক্ত করুন। আপনার ৩ বছর বা ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগেই পরবর্তী মেয়াদের পরিকল্পনার মহড়া শুরু করুন।
৬. দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি ও কন্টিনিউটি (BCP)
মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিষ্ঠানের কাজ যেন এক মুহূর্তের জন্যও থমকে না যায়। ‘বিজনেস কন্টিনিউটি প্ল্যান’ (BCP) যেন মাস্টার প্ল্যানের প্রতিটি স্তরে মিশে থাকে। কোনো নতুন সিস্টেম চালু করার সময় যদি তা ফেইল করে, তবে আগের সিস্টেমে ফিরে যাওয়ার (Rollback) পথ সবসময় খোলা রাখতে হবে।

আইটি মাস্টার প্ল্যান কেবল টেকনিক্যাল লোকেদের কাজ নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠানের মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়। একটি কার্যকরী মাস্টার প্ল্যান থাকলে প্রতিষ্ঠান জানে সে আজ কোথায় এবং আগামী পাঁচ বছরে কোথায় যাবে। এটি অন্ধভাবে টাকা খরচ করা বন্ধ করে এবং প্রযুক্তির প্রতিটি পয়সার হিসাব নিশ্চিত করে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে রিসোর্স বা সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে, সেখানে একটি সুচিন্তিত মাস্টার প্ল্যানই পারে বিশৃঙ্খলা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। আপনি যখন ‘বটম-আপ’ এপ্রোচে সবার চাহিদা বুঝবেন এবং ‘টপ-ডাউন’ সমর্থনে তা বাস্তবায়ন করবেন, তখনই আপনার প্রতিষ্ঠান সত্যিকারের ডিজিটাল শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
এই ৫ পর্বের সিরিজের মাধ্যমে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এটি আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মনে রাখবেন, পরিকল্পনা হলো অর্ধেক যুদ্ধ জয়, আর বাকি অর্ধেক হলো তার নিরবচ্ছিন্ন বাস্তবায়ন ও যত্ন।
