আওয়ামী লীগ পরিবারে জন্ম বলেই তিনি সারা জীবন আওয়ামী লীগের আদর্শ ধারণ করবেন, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। মানুষ নানা কারণে, নানা স্বার্থে বদলে যায়। কেউ বদলে যায় সুবিধা না পেয়ে, কেউ কেউ আবার অনেক সুবিধা পেয়েও বদলায়। তার কারণ থাকে অনেক সময় অবহেলা, কখনো অন্যায্যতার ক্ষোভ, কখনো বা নিতান্তই কুশিক্ষা এবং অপপ্রচারের ফাঁদে পড়ে।
আজ একজন সহযোদ্ধা জন্মগতভাবে আওয়ামী লীগ বলে খুব গর্ব করছিলেন। তাতে আমি সামান্য দ্বিমত করে বলেছি—আদর্শটাই মূল, পিতৃপরিচয় মূল নয়। একজন রাজাকারের সন্তান আওয়ামী লীগে আসতে চাইলে যেমন সন্দেহ করা জরুরি, ঠিক তেমনভাবে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পরিবারে জন্ম বলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার কিছু নাই। আমার জন্ম আওয়ামী লীগ পরিবারে, তিন প্রজন্ম ধরে আমরা আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মী। তারপরেও আমার রাজনৈতিক লেখাপড়া ও দর্শন পারিবারিক পরিচয়কে আদর্শের উপরে স্থান দিতে দেয় না।
আমার এই বক্তব্যকে সমর্থন করে ইতিহাসে এমন অনেক অকাট্য গল্প আছে। তার একটি আজ বলবো। তবে কেউ যদি মনে করে তার পরিবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ পরিবার, তবে তার জন্য এই লেখা নয়। তাই বন্ধুবরের কথার উত্তরটা আমার দাদুদের নেতা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে দিয়েই শুরু করলাম।
আদর্শ বনাম পিতৃপরিচয় : একাত্তরে সোহরাওয়ার্দী পরিবার
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজে জন্মের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতীয়, ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিক এবং এরপর ১৯৬৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি গড়ে তোলার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর একমাত্র ছেলে রশিদ সোহরাওয়ার্দী এবং কাজিনের মেয়ে সালমা সোবহান ছাড়া পরিবারের বাকি প্রায় সমস্ত প্রভাবশালী সদস্যই বাংলাদেশের অস্তিত্বের চরম বিরোধী ছিলেন এবং অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
নিচে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের পরিচয় এবং একাত্তরে তাঁদের বিতর্কিত ভূমিকার একটি ঐতিহাসিক খতিয়ান তুলে ধরা হলো:
হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দী (ভাই)
তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই। তিনি একাধারে একজন নামকরা পাকিস্তানি শিক্ষাবিদ, কবি, লেখক, বহুভাষাবিদ ও শিল্প সমালোচক ছিলেন। তিনি দেশভাগের পর রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকেই বেছে নেন এবং পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবেই মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে তাঁর কোনো আদর্শিক বা আত্মিক সংযোগ ছিল না।
বেগম নিয়াজ ফাতিমা ও ভেরা আকেকজান্দ্রোবনা (স্ত্রীদ্বয়)
সোহরাওয়ার্দীর প্রথম স্ত্রী বেগম নিয়াজ ফাতিমা (যিনি ব্রিটিশ ভারতের প্রধান বিচারপতি স্যার আবদুর রহিমের কন্যা ছিলেন) ১৯২২ সালে মারা যান। এরপর ১৯৪০ সালে তিনি ভেরা আকেকজান্দ্রোবনা টিশেনকো কল্ডারকে বিয়ে করেন, যিনি ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত একজন বিখ্যাত রাশিয়ান অভিনেত্রী। বিয়ের পর তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজের নাম রাখেন ‘নূর জাহান’।
বেগম আখতার সুলেইমান (কন্যা) – একাত্তরের কুখ্যাত ভূমিকা
সোহরাওয়ার্দীর প্রথমা স্ত্রীর ঘরের কন্যা বেগম আখতার সুলেইমান (১৯২২-১৯৮২) একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত জঘন্য ও প্রকাশ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নারকীয় গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন আখতার সুলেইমান সরাসরি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা সরকারের পক্ষে সাফাই গান। তিনি জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে বিবৃতি দেন যে, তাঁর বাবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বাঙালিরা যা করছে তা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি ইয়াহিয়া সরকারের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেন।
শাহিদা জামিল (নাতনি)
বেগম আখতার সুলেইমানের কন্যা (সোহরাওয়ার্দীর নাতনি) শাহিদা জামিল হলেন পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে দেশটির কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী (Federal Minister for Law) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পুরো ক্যারিয়ার, পরিচিতি এবং রাজনীতি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশকে অস্বীকার করে উগ্র পাকিস্তানকেন্দ্রিক ভাবাদর্শের ওপর ভিত্তি করে।
শায়িস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ (কাজিন)
তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর চাচাতো বোন। তিনি পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাকালীন নারী রাজনীতিবিদ, লেখক ও কূটনৈতিক ছিলেন। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি এবং পরবর্তীতে মরক্কোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও মনে-প্রাণে অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করেননি।
প্রিন্সেস সারভাত আল হাসান (ভাতিজি)
শায়িস্তা সুলেইমান ইকরামুল্লাহর মেয়ে (সোহরাওয়ার্দীর ভাতিজি) প্রিন্সেস সারভাত আল হাসান কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নেন। তিনি জর্ডানের যুবরাজ প্রিন্স হাসান বিন তালালকে বিয়ে করেন এবং জর্ডানের রাজপরিবারের অন্তর্ভুক্ত হন। বাংলাদেশ বা এদেশের স্বাধীনতার সাথে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল না।
ব্যতিক্রম: রক্তের উত্তরাধিকার বনাম আদর্শের জয়
পরিবারের সিংহভাগ সদস্য পাকিস্তানের দালালি করলেও, কেবল দুজন ব্যক্তি এই রক্তের মোহ ও পারিবারিক পরিচিতির ঊর্ধ্বে গিয়ে সত্য ও আদর্শের পথ বেছে নিয়েছিলেন:
সালমা সোবহান (ভাগনি):
শায়িস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহর আরেক কন্যা, অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দীর ভাগনি সালমা সোবহান (১৯৩৭-২০০৩) ছিলেন এই পরিবারের অন্যতম এক ব্যতিক্রমী ও গৌরবোজ্জ্বল চরিত্র। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার। তিনি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম খসড়া প্রণেতা ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান-এর স্ত্রী ছিলেন। সালমা সোবহান শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষেই ছিলেন না, বরং স্বাধীনতার পর এদেশের মানবাধিকার রক্ষায় ও আইনি সহায়তায় অনন্য অবদান রাখেন এবং বিখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (ASK) প্রতিষ্ঠা করেন।
রশিদ সোহরাওয়ার্দী / রবার্ট অ্যাশবি (একমাত্র পুত্র):
সোহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয় স্ত্রী (রাশিয়ান মা) নূর জাহানের ঘরের একমাত্র পুত্র ছিলেন রশিদ সোহরাওয়ার্দী (১৯৪০-২০১৯)। তিনি যুক্তরাজ্যে ‘রবার্ট অ্যাশবি’ (Robert Ashby) মঞ্চনামে একজন অত্যন্ত নামকরা ব্রিটিশ অভিনেতা ও রয়্যাল শেকসপিয়র কোম্পানির সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন তাঁর সৎ বোন বেগম আখতার সুলেইমান করাচিতে বসে ইয়াহিয়া খানের গণহত্যার পক্ষে দালালি করছিলেন, তখন রশিদ সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে তাঁর বোনের এই কুৎসিত ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন যে তাঁর বোন তাঁদের পিতার উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আদর্শের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে লন্ডনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, রশিদ সোহরাওয়ার্দী তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বোনের এই পাকিস্তানপন্থী ও ঘাতক তোষণকারী ভূমিকার কারণে রশিদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর বোন ও পাকিস্তানের অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে ধীরে ধীরে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং আমৃত্যু আর তা জোড়া লাগেনি। তিনি পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথেও যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে দেশজুড়ে জোরালো ক্যাম্পেইনে অংশ নেন। ২০১৯ সালে ৭৯ বছর বয়সে লন্ডনে এই নিভৃতচারী দেশপ্রেমিক মৃত্যুবরণ করেন।
কী বুঝলেন?
সোহরাওয়ার্দী পরিবারের এই ইতিহাস আমাদের চিরকালের জন্য এই রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়ে যায় যে—রক্ত ও বংশের বিচারে এক ঘর বা এক পরিবারে জন্ম নিলেই সবাই একই আদর্শ ধারণ করে না। যে নেতার হাত ধরে এই অঞ্চলের স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল, তাঁরই কন্যা ও বংশধরেরা একাত্তরের জেনোসাইড বা গণহত্যাকে চোখ বুজে সমর্থন দিয়েছিলেন।cnf
অতএব, আমার বন্ধুবরকে আবারও বলতে চাই—পিতৃপরিচয় বা জন্মগত ট্যাগ দিয়ে কখনো আদর্শ মাপা যায় না। রাজনীতিতে অন্ধ বিশ্বাসের স্থান নেই, পরীক্ষার স্থান সবসময় উন্মুক্ত রাখা উচিত।
আরও দেখুন:
