আমাদের দেশে একটি সামাজিক মিথ বা অন্ধবিশ্বাস কাজ করে—তা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটা বড় ডিগ্রি হাতে পেলেই বুঝি জীবন উদ্ধার হয়ে গেল, একেবারে ‘বর্তে গেলাম’! শিক্ষার্থীরা ভাবেন, সমাবর্তনের কালো গাউন গায়ে জড়ানোর পরদিন থেকেই চাকরির বাজার তাঁদের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে বসে থাকবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, আমাদের প্রচলিত বিদ্যাপীঠগুলো কারিগরি বা প্রয়োগিক দিক থেকে শিক্ষার্থীদের আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পারছে না।
আসলে বিদ্যাপীঠের কাছে এই প্রত্যাশা রাখাটাও খুব একটা যৌক্তিক নয়। কিছু সুনির্দিষ্ট ফলিত (Applied) বা ব্যবহারিক বিষয় ছাড়া—বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের মূল কাজ হলো আপনাকে “শিখতে শিখিয়ে দেওয়া” (Learn how to learn), সরাসরি কোনো চাকরির জন্য তৈরি করে দেওয়া নয়। সরাসরি কাজের উপযোগী হতে গেলে নিজস্ব গ্রুমিং, সফট স্কিল এবং প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিংয়ের মতো অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিকল্প নেই। তাই নিজের ডিগ্রি নিয়ে খুব বেশি ‘নাক উঁচু’ বা অহংকারী মনোভাব পোষণ করলে পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে নানা রকম অনভিপ্রেত বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে।
ডিগ্রির মোহ এবং বাংলাদেশের ‘ছদ্ম বেকারত্ব’
আজকের বাংলাদেশে একটু চোখ মেলেই দেখা যায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী বড় বড় ডিগ্রি হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের অনেকেরই চাকরি হচ্ছে না, অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হচ্ছে এক নীরব মহামারী—ছদ্ম বেকারত্ব (Underemployment)।
ছদ্ম বেকারত্ব কী? যখন একজন মাস্টার্স পাস করা তরুণ তাঁর ডিগ্রির সাথে সামঞ্জস্যহীন কোনো সাধারণ কাজ করতে বাধ্য হন, কিংবা স্রেফ টিউশনি করে বা ঘরে বসে সময় পার করেন—তখনই তাকে ছদ্ম বেকারত্ব বলে। ডিগ্রি তাঁদের হাতে আছে, কিন্তু পকেটে আয়ের নিশ্চয়তা নেই।
এর মূল কারণ হলো—ডিগ্রি অর্জনের চার-পাঁচ বছরে তাঁরা স্রেফ মুখস্থ বিদ্যা আর পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার পেছনে ছুটেছেন। কিন্তু সমসাময়িক কর্পোরেট বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ঠিক কী চাইছে, কোন কোন সফটওয়্যার বা টেকনিক্যাল স্কিল প্রয়োজন—সেদিকে নজর দেননি। ফলে ডিগ্রির কাগজটি যখন হাতে আসে, তখন দেখা যায় বাজারের চাহিদার সাথে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যোজন যোজন দূরত্ব!
মনে রাখার মতো কিছু গোল্ডেন রুলস (Golden Rules):
ডিগ্রি শুধু দরজা খোলে, কাজ দেয় না: আপনার সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি আপনাকে ইন্টারভিউ বোর্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতের পদোন্নতিতেও সহায়ক হবে। কিন্তু ডিগ্রি কখনোই আপনার চাকরি নিশ্চিত করবে না।
সার্টিফিকেট আয়বর্ধক নয়: একটি সহজ সত্য মনে রাখবেন—কোম্পানির ড্রয়ারে আপনার দামি গোল্ড মেডেল বা ফার্স্ট ক্লাস ডিগ্রি পড়ে থাকলে তা থেকে কোনো ব্যবসায়িক আউটপুট বা আয় আসে না। আয় হয় আপনার সরাসরি কাজ ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের মাধ্যমে।
যোগ্যতাই আসল মানদণ্ড: কাজের বাজারে প্রবেশের প্রধান শর্ত হলো আপনার “কাজ করার ক্ষমতা ও বাস্তব দক্ষতা”, স্রেফ কাগজের ডিগ্রি নয়। নিয়োগকর্তারা ডিগ্রির চেয়ে আপনার সমস্যা সমাধানের (Problem Solving) সক্ষমতা এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুণকে (Adaptability) বেশি মূল্যায়ন করেন।
তরুণদের জন্য সরাসরি পরামর্শ:
ডিগ্রি অর্জনের সময়টুকুকে স্রেফ আড্ডা আর পরীক্ষার পেছনে নষ্ট করবেন না। ডিগ্রিকে অহংকার নয়, বরং ভিত্তি হিসেবে ধরে নিয়ে তার ওপর বাস্তব দক্ষতার ইমারত গড়ে তুলুন।
১. পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, ভলান্টিয়ারিং বা ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা অর্জন করুন।
২. কমিউনিকেশন স্কিল, ইংরেজি ভাষা ও ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের ওপর দখল আনুন।
৩. নেটওয়ার্কিং বাড়ান এবং নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করুন।
মনে রাখবেন, ডিগ্রি একটি অলংকার মাত্র; কিন্তু কাজের হাতিয়ার হলো আপনার দক্ষতা। হাতিয়ার ধারালো না হলে শুধু অলংকার পরে যুদ্ধে জেতা যায় না!

মন্তব্য করা বন্ধ রয়েছে।