আপনি আওয়ামী লীগের এসেট হতে পারলে ফেরত আসুন, আমাদের আর লায়াবিলিটি দরকার নেই

আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র হয়েছে—এটা নতুন নয়। বাংলাদেশের পক্ষের জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক হিসেবে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক হিসেবে—এটিই আওয়ামী লীগের নিয়তি। দেশবিরোধী ও পরাশক্তির দোসরেরা যেমন অতীতে ষড়যন্ত্র করেছে, আগামীতেও করবে। যতদিন না দেশ উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাবে এবং পুরো রাজনৈতিক স্পেকট্রাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসবে, ততদিন এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

এ নিয়ে আমরা শোক প্রকাশ করব, জনগণের কাছে অভিযোগ করব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিচার চাইব—সবই করব। কিন্তু একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এটিই একমাত্র কাজ নয়। এর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো ঘুরে দাঁড়ানো, নিজেদের সামাজিক অবস্থান আবার সুসংহত করা এবং নিজেদের রাজনীতি জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা। …তারপর জনগণকে সাথে নিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগোনো।

সেটি তখনই সম্ভব, যখন আমরা দল হিসেবে শক্তিশালী থাকব। দল শক্তিশালী হওয়া মানে শুধুমাত্র জননেত্রী শেখ হাসিনার শক্তিশালী হওয়া নয়। দল শক্তিশালী হওয়া মানে কেন্দ্র ও জেলা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের নেতৃত্ব শক্তিশালী হওয়া, জনসম্পৃক্ত হওয়া এবং জনগণের মধ্যে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা থাকা। প্রতিটি স্তরের মানুষ যেন তাদের ভালো-মন্দের জন্য সেই স্তরের নেতা-কর্মীর ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে এবং সুসময় ও দুঃসময়—উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের আস্থায় থাকতে পারে। সেটি কেবল জননেত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি ইউনিটের প্রতিটি নেতার কাজ এবং এটিই প্রকৃত রাজনীতি।

আমরা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব যে, বিগত ১৫ বছর সেই কাজটি আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে করেছি? যদি সেটি না করে থাকি, তবে আমি আওয়ামী লীগের দায় বা ‘লায়াবিলিটি’। এই দুঃসময়ে আমি দলের কাঁধের ওপর ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’। আর যদি সেটি করে থাকি, তবেই আমি আওয়ামী লীগের সম্পদ বা ‘অ্যাসেট’। এই দুঃসময়ে তবেই আমি দলের কাজে লাগব।

আসুন, একবার নিজেদের দিকে আয়না ধরি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। উন্নয়ন সুষম করার পরিকল্পনাও তাঁর সরকারই করেছে। আপনার-আমার এলাকায় কয়টি বা কী ধরনের অবকাঠামো হবে, সেটিও কেন্দ্রীয় সরকারই ঠিক করেছে। এসব অবকাঠামো উন্নয়নে এলাকার নেতা হিসেবে আপনার আসলে তেমন কোনো অবদান নেই (খুব বড় প্রকল্প তদ্বির করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া)। আপনার এলাকার বিভিন্ন ধরনের ভাতা সরকার বরাদ্দ করেছে; সেটির সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করা ছাড়া এখানেও আপনার বিশেষ কোনো অবদান নেই। তাহলে নেতা হিসেবে আপনার প্রকৃত অবদানটি কী?

 

একবার বলেন তো, দলের পক্ষে এই ১৫ বছর আসলে কী অবদান রেখেছেন?

আপনার কাজ ছিল নিজের এলাকায় বা স্তরে জনগণের কাছে আপনার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান ক্রমশ উন্নত ও সুসংহত করা। তার জন্য আপনি কী করেছেন?

আপনি আওয়ামী লীগের নতুন ভোটার তৈরিতে কী কাজ করেছেন? সরকারি উদ্যোগের বাইরে আপনার এমন কী উদ্যোগ ছিল, যার মাধ্যমে নতুন ভোটার তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছে?

আওয়ামী লীগের পুরনো সমর্থকদের ধরে রাখতে কী কাজ করেছেন? কোন কোন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন, যাতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দলের প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়ে?

সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে থাকলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কী কাজ করেছেন? কটি নতুন কর্মী তৈরি করেছেন এবং তাদের প্রশিক্ষিত করতে কী ভূমিকা রেখেছেন? তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এবং আদর্শিকভাবে দীক্ষিত করতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

তরুণ প্রজন্ম সবসময় ক্ষমতাবিরোধী ও বিদ্রোহী মনোভাবের হয়। তাদের ধরে রাখতে হলে নিয়মিত বাড়তি উদ্যোগ নিতে হয়। তরুণ প্রজন্মের সমর্থন ধরে রাখতে আপনি কী করেছেন? আপনার কী কী কর্মসূচি ছিল, যাতে নতুন প্রজন্ম আপনার ও দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়?

বাঙালি সংস্কৃতি আমাদের রক্ষাকবচ। সেই সংস্কৃতির প্রসারে আপনার ভূমিকা কী? সংস্কৃতিকর্মীদের সমর্থন ধরে রাখতে কী কাজ করেছেন? কয়টি নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে সংস্কৃতিকর্মীরা তাদের কর্মকাণ্ড ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারে এবং নতুন সংস্কৃতিকর্মী ও সংস্কৃতিসেবী তৈরি হয়?

ধর্মান্ধতা আওয়ামী লীগের প্রধানতম শত্রু। সেটিকে মোকাবিলা করতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন? ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আপনার পদক্ষেপ কী ছিল এবং মানুষকে সঠিক বিষয়টি বোঝাতে কী ভূমিকা রেখেছেন?

আওয়ামী লীগ সবসময় অপতথ্য এবং অপপ্রচারের আক্রমণে জর্জরিত ছিল। সঠিক তথ্য প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে আপনার কী কী উদ্যোগ ছিল? কয়টি জায়গায় প্রচার করেছেন কিংবা কয়টি লেখা লিখেছেন?

সরকারি দলের কর্মীদের প্রতি মানুষ এমনিতেই সমালোচনামূলক (Critical) দৃষ্টি রাখে। তাই তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। সেজন্য আপনি কী উদ্যোগ নিয়েছেন? নিজের ভাবমূর্তি (Image) উজ্জ্বল করতে কী করেছেন?

এবার মেলান তো, দলের বিপক্ষে আপনি কী কী কাজ করেছেন?

আপনার, আপনার পরিবারের বা আপনার তল্পিবাহকদের দাম্ভিকতার কারণে, ‘ভালগার’ বা কুরুচিপূর্ণ খরচের কারণে এবং নতুন ‘ঠাঠ-বাঠের’ কারণে আওয়ামী লীগের কত সমর্থক এবং সাধারণ জনগণ বিরক্ত হয়েছে? আপনি যতটুকু বিরক্তি উৎপাদন করেছেন, তার পুরো দায়ভার গিয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের কাঁধে।

আপনি আপনার কতজন অযোগ্য ও জনবিচ্ছিন্ন আত্মীয় বা তল্পিবাহককে আওয়ামী লীগের নানা পর্যায়ের কমিটিতে ঢুকিয়েছেন? অথবা টাকা নিয়ে কমিটিতে নাম দিয়েছেন? আপনার ‘গ্রুপ’ করে না বলে দলের কতজন ডেডিকেটেড কর্মীকে কমিটিতে জায়গা পেতে দেননি? কতজন ভালো কর্মীকে ষড়যন্ত্র করে দল থেকে বিতাড়িত করেছেন?

দলের যেসব কর্মী নানা ভালো কাজের উদ্যোগ নিয়েছে, আপনি তাদের কতগুলো থামিয়ে দিয়েছেন? আমি যেমন ১৫ আগস্ট উপলক্ষে ফ্রি চক্ষু অপারেশনের আয়োজন করেও করতে পারিনি। এরকম কতগুলো কাজে আপনি বাধা দিয়েছেন? আমাকে থামাতে পারেননি কারণ আমার জেদ ও সামর্থ্য ছিল; তাই কুমারখালীর লোককে বাস ভরে খুলনায় নিয়ে গিয়ে অপারেশন করিয়েছি। সবাই সেটি পারে না বলে এরকম বহু ভালো উদ্যোগ আপনার কারণে থেমে গেছে।

কতটা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বন্ধ করেছেন? আপনার মনের মতো বা আপনার গ্রুপের নয় বলে কতগুলো সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বা সংগঠনকে কাজ করতে দেননি? তার বদলে কয়জন জামায়াতের বক্তাকে দিয়ে মাহফিল করিয়েছেন, যার মাধ্যমে আওয়ামী-বিরোধী মানসিকতার লোক তৈরি হয়েছে?

কয়টি সালিশ-বিচারে গিয়ে টাকা খেয়ে রায়কে ভিন্ন খাতে নিয়ে গেছেন? ঠিক সেদিন থেকেই সেই ভুক্তভোগী মনে মনে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে চলে গেছে।

কয়জনের কাছ থেকে চাকরি দেবেন বলে টাকা নিয়েছেন? কয়জনের কাছ থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছেন? কয়জন দলীয় কর্মীকে মামলা দিয়ে ‘সাইজ’ করেছেন বা কতজন সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন?

আপনি এই কাজগুলো যেদিন করেছেন, সেদিন থেকেই ভুক্তভোগীরা (এমনকি তারা আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেও) মনে মনে আপনার পতন চেয়েছে। দিনশেষে সেই দায় আওয়ামী লীগের ওপর এসেই পড়েছে।

একটা বিষয় খেয়াল করে দেখেন, ৫ আগস্টের আগে যারা ‘লালবদর’ হয়নি, আবার আওয়ামী লীগের পক্ষে এক লাইন লেখেনি, অথচ আজ দলের পক্ষে চরম সরব—তারা সবাই কিন্তু আপনার মতো কোনো না কোনো নেতা-কর্মীর দুষ্কর্মের ভুক্তভোগী। আজ আওয়ামী লীগের বিপদ দেখে তারা সক্রিয় হয়েছে। অথচ এই লোকগুলোই ৫ আগস্টের আগে আপনার কারণে নিষ্ক্রিয় (Inactive) ছিল।

তাই আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে স্পষ্ট করে বলছি, আপনি যদি দলের জন্য দায় (Liability) হন, দয়া করে মুখ দেখাবেন না। আপনার মুখ দেখলে আজ অনেক সক্রিয় লোক আবার নিশ্চুপ হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো লোকের অভাব নেই। একমাত্র জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগে কেউই আজ পর্যন্ত অপরিহার্য নয়। আপনি ঘরে থাকেন, ভোট আসলে ভোট দেবেন; কিন্তু আপনার আর নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।