আমাদের সমাজে ‘উদ্যোক্তা’ বা ‘ব্যবসায়ী’ পরিচয়টি দীর্ঘকাল ধরেই এক ধরণের দোটানার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং যুগ যুগ ধরে আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বে গেঁথে থাকা কিছু নির্দিষ্ট ধারণারই প্রতিফলন। আমরা যখন একজন উদ্যোক্তার কথা বলি, তখন সমাজ তাকে কেবল ‘ব্যবসায়ী’ তকমা দিয়ে বিচার করতে শুরু করে, যা অনেক ক্ষেত্রে তার প্রকৃত সৃজনশীলতাকে আড়াল করে ফেলে।

আমাদের মনস্তত্ত্ব ও উদ্যোক্তা পরিচয়
শব্দের অপপ্রয়োগ ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব
আমাদের শব্দকোষে ‘মুনাফাখোর’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যেন এটি নীতিহীন কোনো কাজের সমার্থক। অথচ একটি উদ্যোগকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য বৈধ মুনাফা অপরিহার্য। যখন এই শব্দগুলো নেতিবাচকভাবে উচ্চারিত হয়, তখন অবচেতনভাবেই মানুষের মনে একজন ব্যবসায়ীর যে প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা একজন আদর্শিক মানুষের ছবির সাথে মেলে না। এই দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক মেধাবী তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও সামাজিকভাবে সেটিকে তুলে ধরতে কুণ্ঠাবোধ করেন।

মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরিচয় সংকট
ঐতিহ্যগতভাবে আমরা একজন উদ্যোক্তাকে মাপি তার দৃশ্যমান ধন-সম্পদ বা জৌলুস দিয়ে। তার আইডিয়াটি কতটুকু বৈপ্লবিক কিংবা তার প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের জিডিপিতে কী অবদান রাখছে—সেসব নিয়ে আলোচনার চর্চা আমাদের এখানে এখনও সীমিত। এই কারণেই অনেক উদ্যোক্তা নিজের মূল পরিচয় দিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন।

উদ্যোক্তা পরিচয়: এখন সময় পরিবর্তনের
এই দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি পরিবর্তন হবে না, তবে পরিবর্তনটা শুরু হওয়া প্রয়োজন। উদ্যোক্তা মানে কেবল পণ্য কেনা-বেচা করা কেউ নন; তিনি একজন ‘সৃজনশীল কারিগর’ যিনি শূন্য থেকে সম্ভাবনা তৈরি করেন।
একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য ধূর্ত হওয়া নয়, বরং দূরদর্শী এবং চরিত্রবান হওয়া জরুরি।
সফলতার মানদণ্ড হওয়া উচিত—কতজন মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং সমাজ তার থেকে কী ভ্যালু পেল।
তাই পরিচয় দিতে আমাদের লজ্জা পেলে চলবে না। আমাদের পরিচয় টাকার অংকে নয়, বরং কাজের ধরন এবং তার ইতিবাচক ফলাফল দিয়ে গর্বের সাথে তুলে ধরতে হবে। আমরা যদি নিজে নিজের কাজের গুরুত্ব বুঝতে পারি এবং তা পেশাদারিত্বের সাথে উপস্থাপন করি, তবে সমাজের এই দীর্ঘদিনের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গিও ক্রমশ বদলে যেতে বাধ্য।
আরও পড়ুন: