আমার অখিলবন্ধু ঘোষ (১৯২০-১৯৮৮) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

অখিলবন্ধু ঘোষের দরবারী-কানাড়ার উপরে গাওয়া ‘আমি কেন রহিলাম’ গানটি যেদিন প্রথম শুনেছিলাম, সেদিন থেকেই তাঁর ভক্ত হয়েছিলাম। কী মোলায়েম কণ্ঠ! তখন তাঁর স্বরের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ বা দরবারী-কানাড়ার কিছুই বুঝতাম না। শুধু পেয়েছিলাম এক অসম্ভব মেলানকোলিক অনুভূতি।

কুষ্টিয়াতে ‘সঙ্গীতা’ নামের যে গানের দোকানটি ছিল, সেখানে এরকম গানের এলপি রাখা হতো। সেখান থেকে আমরা ক্যাসেটে কপি করিয়ে শুনতাম। সব গান পাওয়া যেত না। গানের সব খবর বা সঙ্গীতবিষয়ক বই, পত্রিকাও তেমন একটা ছিল না। কিন্তু যখনই কোনো জায়গায় অখিলবন্ধু ঘোষের নামটি দেখতাম, চোখ আটকে যেত।

ঢাকায় এসে আরও কিছু রেকর্ড এবং বইপত্র পাওয়ার সুযোগ হলো। এরপর যখন কলকাতা থেকে বইপত্র-রেকর্ড আনা শুরু হলো, তখন প্রাণ ভরে পেয়েছিলাম অখিলবন্ধু ঘোষের গান আর তাঁর গানের ইতিহাস। তখন জেনেছি— অখিলবন্ধু ঘোষের পারিবারিক শিকড় নদিয়ার রানাঘাট অঞ্চলে হলেও, তাঁদের বংশপরিচয় যুক্ত ছিল বালির সুপ্রসিদ্ধ ঘোষ পরিবারের সঙ্গে—যে বংশের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ঋষি অরবিন্দ। তাঁর শৈশব কেটেছে চাকদায় মাতুলালয়ে, যেখানে তাঁর মামা কালিদাস গুহর প্রভাবে সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয়। পরবর্তীকালে পরিবারসহ কলকাতার ভবানীপুরে চলে আসার পরই তাঁর শিল্পীজীবনের প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয়।

অখিলবন্ধু ঘোষ

সঙ্গীতশিক্ষার প্রাথমিক সূত্রপাত হয় মামার কাছেই। পরে তিনি পর্যায়ক্রমে তালিম নেন নিরাপদ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী এবং পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর মতো প্রতিষ্ঠিত গুণীজনদের কাছে। ধারণা করা হয়, স্বল্পকাল তিনি পণ্ডিত কে. জি. ঢেকনের কাছেও শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর দৃঢ় ভিত্তি থাকলেও, তিনি মূলত নিজস্ব ঢঙে আধুনিক বাংলা গানকে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে যান; শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তাঁর গায়কির অন্তঃসলিলা শক্তি হয়ে থাকলেও তা সরাসরি প্রদর্শনের বিষয় হয়ে ওঠেনি।

১৯৪৪-৪৫ সালের দিকে কলকাতা বেতারে গান গাওয়ার মাধ্যমে তাঁর পেশাদার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়—সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘একটি কুসুম যবে’ এবং ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল’। প্রথম গানটির কথা লিখেছিলেন তিনি নিজেই, দ্বিতীয়টির গীতিকার ব্যোমকেশ লাহিড়ী। পরবর্তী কয়েকটি রেকর্ডের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পরিচিতি পেলেও, ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত একটি রেকর্ড তাঁর শিল্পীসত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ‘মায়ামৃগ সম’ এবং ‘কেন প্রহর না যেতে’—এই দুটি গান তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে। সুরকার ছিলেন যথাক্রমে দুর্গা সেন ও দিলীপ সরকার। জটিল রাগভিত্তিক সুরচালনা, স্বরের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ এবং বাণীর প্রতি সংবেদনশীলতা—এই তিনের সমন্বয়ে তাঁর গায়কির স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অখিলবন্ধু ঘোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি নিজের বহু জনপ্রিয় গানের সুর নিজেই করেছেন। ‘শিপ্রা নদীর তীরে’, ‘কবে আছি কবে নেই’, ‘এমনি দিনে মা যে আমার’, ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’ প্রভৃতি গান তারই প্রমাণ। বিশেষত ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা’ গানটি মাঝ-খাম্বাজ রাগের ভিত্তিতে নির্মিত, যেখানে তিনি সূক্ষ্ম তানকারি প্রয়োগ করে গায়কির বৈচিত্র্য প্রকাশ করেছেন।

তাঁর গায়কিতে আবেগ প্রকাশের পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত রূপ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘ও দয়াল বিচার করো’ এবং ‘ও বাঁশুরিয়া বাঁশি বাজাইয়ো না’—এই দুই গানে একই ধরনের বিষয়ের ভিন্ন আবেগকে তিনি পৃথকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথমটিতে প্রার্থনার সুর, দ্বিতীয়টিতে বেদনামিশ্রিত নিবৃত্তির আবেদন—এই পার্থক্য তাঁর কণ্ঠনিয়ন্ত্রণ ও অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতারই পরিচায়ক।

অখিলবন্ধু ঘোষ ও তার স্ত্রী দীপালি দেবী
অখিলবন্ধু ঘোষ ও তার স্ত্রী দীপালি দেবী

বাংলা রাগপ্রধান গানের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ‘আজি চাঁদিনি রাতি গো’ (কেদার), ‘জাগো জাগো প্রিয়’ (ভাটিয়ার), ‘বরষার মেঘ ভেসে যায়’ (সুরদাসী মল্লার), ‘আমার সহেলী ঘুমায়’ (মারু বেহাগ)—এই গানগুলোতে রাগের মাধুর্য ও ভাবপ্রকাশের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। রাগসংগীতকে কেবল কারিগরি কাঠামো নয়, বরং আবেগের ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা তাঁর বিশেষ শক্তি ছিল। নজরুলগীতিতেও তিনি নিজস্ব ভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন; শ্যামকল্যাণ রাগে ‘রসঘন শ্যাম’ তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

যদিও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর দৃঢ় দখল ছিল, তবুও খেয়াল বা ঠুংরি তাঁর বাণিজ্যিক রেকর্ডে তেমনভাবে ধরা পড়েনি। তবে বেতারে তাঁর গাওয়া ভজনের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন—‘ফরিয়াদ মেরি সুনলে ও ভগবান’ এবং ‘তুম মুরলী শ্যাম বাজাও’। এগুলো তাঁর বহুমাত্রিক সঙ্গীতচর্চার পরিচয় বহন করে।

সুরকার হিসেবেও তাঁর কাজ সীমিত হলেও তা উল্লেখযোগ্য। অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর সুরারোপিত গান খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ‘যমুনা কিনারে’ এবং ‘মনে নেই মন’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কবীরদাসের ভজন ‘গুরু মোহে দে গ্যয়ে’—যা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গেয়েছেন—তাতেও তাঁর সুরারোপ দেখা যায়। চলচ্চিত্রে তিনি নিয়মিত কাজ না করলেও ‘শ্রীতুলসীদাস’, ‘মেঘমুক্তি’ এবং ‘বৃন্দাবনলীলা’ ছবিতে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত ও প্রচারবিমুখ। তাঁর স্ত্রী দীপালি ঘোষ ছিলেন তাঁর নিকটতম সহচরী ও সুরসঙ্গিনী। গান গাওয়ার সময় চোখ বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে পরিবেশন করা ছিল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গি, যা তাঁর সংগীতচর্চার অন্তর্মুখী চরিত্রকে প্রতিফলিত করে।

১৯৮৮ সালের ২০ মার্চ তাঁর জীবনাবসান ঘটে। সমসাময়িক বিশিষ্ট শিল্পী যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যও মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতির সম্পূর্ণ অংশ পাননি। তাঁর গানের মধ্যে যে সংযম, রাগভিত্তিক গভীরতা এবং ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির মিশ্রণ দেখা যায়, তা বাংলা গানের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে।

Leave a Comment