আমার জগজিৎ সিং | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

“তুমকো দেখা তো ইয়ে খয়াল আয়া” যখন শুনি, তখন “জিন্দেগি ধূপ” এর জায়গাটিতে যেভাবে মধ্যম থেকে ধৈবতে যায়, যেন অন্তরের গহীন ভেতরে এক প্রখর দারুণ রৌদ্রে দগ্ধ দুপুর তৈরি হয়। তারপর “তুম ঘনা সায়া”-তে মধ্যমে এসে আবার ধৈবত হয়ে পঞ্চমে গিয়ে আবার ঘন ছায়া দেন। এরকম বহু জাদু তিনি তাঁর গানে তৈরি করে দিয়ে গেছেন।

বেগম আখতারের গজল স্বর্গীয়, ওটার সাথে কোনো তুলনা নেই। আমি যতদূর জেনেছি, তাতে দেখেছি মেহেদি হাসান যুগের আগে সাধারণ গজল গায়কিটা তেমন আধুনিক, সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল ছিল না। খুব একটা গবেষণা বা উন্নয়ন হয়নি। ওস্তাদ মেহেদি হাসান চেঁছেছিলে গজলকে আধুনিক করে ওই সময়ের সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর পরে এসে স্ট্যান্ডার্ডটা ধরে রাখাই একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, তার থেকে উন্নয়ন বা অন্য কিছু করার কথা কে ভাববে? মেহেদি হাসানের পরে গজলে নিজের আলাদা সিগনেচার প্রতিষ্ঠা করা এত সহজ ছিল না।

জগজিৎ সিং
জগজিৎ সিং

মেহেদি হাসান সাহেবের পরে পুরুষ গায়কদের মধ্যে গজল জনরায় আলাদা সিগনেচার তৈরির কথা বললে মাত্র দুটো নাম আসে—গোলাম আলী আর জগজিৎ সিং। গোলাম আলী সাহেব বেছে নিয়েছিলেন সিলসিলাদার রাস্তা, সেটাও লা-জওয়াব। তবে জগজিৎ নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন একদম নতুন একটা আধুনিক রাস্তা, অনেকটা আধুনিক গানের জনরার মতো। তাঁর মাধ্যমে তিনি গজল জনরায় নতুন অনেক শ্রোতাও এনেছিলেন (যারা আগে গজলের শ্রোতা ছিলেন না)। ইনফ্যাক্ট, ওই সময় গজল নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে পপুলারিটি এবং কোয়ালিটির বিচারে জগজিতের চেষ্টাটাই সবচেয়ে সফল বলা যায়।

জগজিতের গান নিয়ে ভাবতে বসলে বোঝা যায়, তিনি বিস্তর গবেষণা করেছিলেন তাঁর আল্টিমেট ফর্মটি তৈরির জন্য। পাকা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম ছিল তাঁর। তিন সপ্তক মিলিয়ে তিনি যে সুর করতে পারতেন এবং গাইতে পারতেন, সেটা “সুনতে হ্যায় কি মিল জাতি হ্যায় হার চিজ দুয়া সে” গানটি শুনলেই বুঝবেন। কিন্তু তিনি সেটা নিয়মিত করেননি। তিনি প্রায় একটা সপ্তকের মধ্যে তাঁর সেরা রেঞ্জটুকু খুঁজে নিয়েছিলেন। তাঁর বেশিরভাগ বিখ্যাত কম্পোজিশনগুলো ওখানেই করা। অনেকেই কাজ দেখাতে গিয়ে গমক, লম্বা তান, জমজমা বা অর্পিত সরগম এনেছেন গজলে। জগজিৎ কিন্তু একদম সেই রাস্তায় হাঁটেননি। তাঁর গজলে মীড়, গিটকারী, খটকা, মুড়কি, পুকারের প্রয়োগ খুবই সাটল (Subtle/সূক্ষ্ম)। আসর ছাড়া রেকর্ডিংয়ে তেমন সরগম করতেও শোনা যায়নি। শুনে মনে হতো কম্পোজার হিসেবে কম্পোজ করে, আবার শ্রোতা হিসেবে বারবার শুনে, সব ফ্যাট বাদ দিয়ে আবার কারেকশন করে চূড়ান্ত করেছেন। এখানেই তাঁর প্রতি আমার ভক্তি বেড়েছে।

‘ব্যারিটোন ভয়েস’ তো বটেই, তার সঙ্গে তাঁর গায়কির চলনকে নদীর বাঁকের সঙ্গে তুলনা করলে কিছু ভুল হবে না। শেষ বয়স পর্যন্ত নিয়মিত রেয়াজ করে গেছেন। দারুণ কনসার্ট জমাতে পারতেন।

জগজিৎ সিং কেবল সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। তৎকালীন বোম্বেতে যখন রেকর্ডিং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল, তখন তিনি নিজ উদ্যোগে বিদেশ থেকে মাল্টি-ট্র্যাক মিক্সিং কনসোল আনিয়েছিলেন। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টুডিওতে বসে ব্যাকগ্রাউন্ডের গিটার বা ভায়োলিনের সুরকে হালকা করে নিজের ব্যারিটোন ভয়েসটাকে এমন এক ফ্রিকোয়েন্সিতে মিক্স করতেন, যা ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজলে মনে হতো তিনি শ্রোতার কানের খুব কাছে এসে তিনি গাইছেন।

আজ সেই প্রয়াত গজল সম্রাট জগজিৎ সিং-এর জন্মদিন। আজ তিনি মানুষের মধ্যে শারীরিক ভাবে না থাকলেও, গজলের ইতিহাসে তিনি জীবিত। তিনি জীবিত বহু গানে, বহু সুরে।

jagjit singh | জগজিৎ সিং
jagjit singh | জগজিৎ সিং

১৯৪১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরের এক পাঞ্জাবি শিখ পরিবারে যখন জন্ম নিলেন, বাবার দেওয়া নাম ছিল জগমোহন। বাবা অমর সিং চেয়েছিলেন ছেলে বড় হয়ে আইএএস অফিসার হবে, কিন্তু ছেলের রক্তে তো তখন সুরের বীজ বোনা হয়ে গেছে। বাবার অমতেই হোক আর প্রশ্রয়েই হোক—অন্ধ সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত ছগনলাল মিশ্র এবং পরে কিরানা ঘরানার ওস্তাদ জামাল খানের কাছে টানা ছয় বছর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠিন তালিম-রেয়াজে তৈরি হলেন তিনি। কিন্তু জলন্ধরে পড়াশোনা শেষ করে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গাইতে গাইতে একসময় বুঝতে পারলেন, এই চেনা বৃত্তে তাঁর হবে না। এক বুক স্বপ্ন আর পকেটে মাত্র কয়েকটা টাকা নিয়ে, ১৯৬৫ সালে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে বোম্বের ট্রেনে চেপে বসলেন। বোম্বেতে তার হলো ‘জগজিৎ’।

বোম্বের সেই কঠিন স্ট্রাগলের দিনে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল গাইতে গাইতে, ১৯৬৭ সালের এক রেকর্ডিং স্টুডিওতে তাঁর প্রথম দেখা গায়িকা চিত্রা দত্তের সাথে। প্রথম দেখায় চিত্রা নাকি তাঁর সেই ভারী ব্যারিটোন ভয়েস একদম পছন্দই করেননি! কিন্তু জগজিতের সঙ্গীতের মায়াজায় এবং যত্নশীল ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ হন, শেষ পর্যন্ত প্রণয়ে গড়ায়। ১৯৬৯ সালে মাত্র ৩০ টাকা খরচ করে কোর্টে গিয়ে বিয়ে করেন দুজনে। শুরু হলো ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের সবচেয়ে মায়াবী এক দ্বৈত সফর।

জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং
জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং

১৯৭৬ সালে এই জুটি যখন রিলিজ করল তাঁদের ঐতিহাসিক অ্যালবাম ‘দ্য আনফরগেটেবলস’ (The Unforgettables), তখন পুরো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল। গজলে প্রথমবার সোলো ভায়োলিন, গিটার আর ইলেকট্রনিক পিয়ানো এনে তাঁরা গজলকে অভিজাতদের জলসাঘর থেকে টেনে এনে মধ্যবিত্তের ক্যাসেট প্লেয়ারে পুরে দিলেন। এরই মাঝে তাঁদের ঘর আলো করে এলো একমাত্র সন্তান বিবেক—যাঁকে তাঁরা ডাকতেন ‘বাবু’ বলে।

আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই কিংবদন্তি জুটি যখন আমাদের ঢাকায় গাইতে এলেন, তখন ঢাকার বুকে যে কী পরিমাণ উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের বাবা-চাচাদের জেনারেশনের সাথে কথা না বললে বিশ্বাস করা কঠিন। তখনকার পুরো তরুণ সমাজ আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে গিয়েছিল এই জুটির জন্য, বিশেষ করে চিত্রা সিংয়ের জন্য! তার কাটা কাটা মায়াবী চেহারা আর তাঁর কণ্ঠের মখমলে বিরহ আমাদের চাচাদের জেনারেশনের বুকে অন্যরকম এক ঝড় তুলেছিল।

জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং
জগজিৎ সিং ও চিত্রা সিং

আমাদের চাচাদের জেনারেশন মূলত বুঁদ হয়েছিল তাঁদের সেই সব কালজয়ী বাংলা গান আর অ্যালবামের জাদুতে। তখনকার দিনে এই গানগুলোর জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশচুম্বী ছিল যে, সৌখিন শ্রোতাদের ড্রয়িংরুমে শোভা পেত এদের এলপি রেকর্ড, আর প্রায় প্রতিটি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরেই ক্যাসেট প্লেয়ারে ঘুরত এই গানগুলোর ফিতা।

চিত্রা সিং এলবাম

বিশেষ করে ১৯৭৯ সালে রিলিজ হওয়া চিত্রা সিংয়ের সেই বিখ্যাত একক ইপি রেকর্ডের গানগুলো প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে বিষাদের সুর বুনে দিয়েছিল। মুকুল দত্তের লেখা আর জগজিৎ সিংয়ের সুরে এই রেকর্ডের চারটি গানই তরুণ সমাজকে আবিষ্ট করে রেখেছিল:

  • পথে চলিতে চলিতে
  • কী দিলে আমায় তুমি
  • আমার আঙিনা থেকে
  • জীবনের ওড়নাটাতে

 

চিত্রা সিং এলবাম

 

এর ঠিক পরেই, ১৯৮৭ সালে যখন এইচএমভি (HMV) থেকে রিলিজ হলো জগজিৎ-চিত্রার যৌথ অ্যালবাম ‘অন্য পথে’। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং জগজিৎ সিংয়ের জাদুকরী সুরে এই অ্যালবামের প্রতিটি গানই ছিল আক্ষরিক অর্থে সুপারহিট:

  • তুমি এসে আমার মনে
  • বুঝিনি তো আমি
  • আমাকে দেখছ কেমন
  • আতরদানির আতর আমি
  • বাঁকা চোখে
  • বেদনা মধুর হয়ে যায়
  • শিশু কাঁদে খেলনা চেয়ে
  • এ মনের কৃষ্ণ রাধায়

এই গানগুলোর ক্যাসেটের ফিতা ক্ষয় করে শোনার সেই রোমাঞ্চ, ঘরে ঘরে জমানো সেই সব এলপি-ক্যাসেটের স্মৃতি আর ঢাকার মঞ্চে তাঁদের সরাসরি দেখার মুহূর্তগুলো আজও আমাদের চাচারা গভীর নস্টালজিয়া নিয়ে রোমন্থন করেন।

চিত্রা সিং এলবাম

কিন্তু নিয়তি বোধহয় এই রূপকথা সইতে পারল না। ১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ১৮ বছর বয়সে মারা গেল তাঁদের সেই কলিজার টুকরো বাবু। এই এক আঘাতে চিত্রা সিং মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়লেন যে, চিরকালের জন্য গান গাওয়া ছেড়ে দিলেন। জগজিৎও স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দীর্ঘ ছয় মাস তিনি গানের কোন কথাই বলেননি।

কিন্তু সুর যাঁর নিয়তি, তাকে তো সুরেই ফিরতে হয়। তবে এই ট্র্যাজেডির পর জগজিতের গায়কীটা চিরতরে বদলে গেল। আগে তাঁর কণ্ঠে যে রোমান্টিক চপলতা, তারুণ্যের ওজস্বিতা কিংবা একটা মিষ্টি অভিমানী বিরহ ছিল; ছেলের মৃত্যুর পর সেখানে জায়গা নিল এক মহাসমুদ্রের মতো নিস্তব্ধতা আর বৈরাগ্যের হাহাকার। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯১ সালে যখন লতা মঙ্গেশকরের সাথে তাঁর যৌথ মহাকাব্যিক অ্যালবাম ‘সাজদা’ (Sajda) কিংবা ‘হোপ’ (Hope) নিয়ে ফিরলেন, শ্রোতারা এক সম্পূর্ণ নতুন জগজিৎকে আবিষ্কার করল। এই পর্বে এসে অলঙ্কার বা কারুকাজের ব্যবহার তিনি খুব কমিয়ে দিলেন। আর তার প্রতিটি ‘পুকার’ আর ‘স্ট্যান্ডিং নোট’ হয়ে উঠল যেন একেকটি দীর্ঘশ্বাস। ১৯৯৮ সালে ‘দুশমন’ ছবিতে যখন তিনি গাইলেন—”চিটঠি না কোই সান্দেস, জানে ওহ কনসা দেস জাহা তুম চলে গ্যায়ে”—তখন সেটি আর সিনেমার প্লেব্যাক ছিল না, বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের প্রতি এক অভাগা পিতার বুকফাটা আর্তনাদ হয়ে কোটি শ্রোতার চোখ ভাসিয়ে দিল।

জগজিৎ সিং
জগজিৎ সিং

গজলের দুনিয়ায় তিনি শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, ছিলেন পুরো একটা যুগ। ‘প্রেম গীত’, ‘অর্থ’, কিংবা ‘সাথ সাথ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি গজলকে এমন এক সহজ ভাষায় রূপান্তর করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষ—যারা কোনোদিন উর্দু কবিতা বা শায়েরি বোঝেনি—তাদেরকেও এক মুহূর্তে গজলের প্রেমে ফেলে দিত। দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে প্রায় ১৫০টিরও বেশি অ্যালবাম উপহার দেওয়া এই মানুষটিকে ২০০৩ সালে ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত করে।

২০১১ সালের অক্টোবর মাসে ওস্তাদ গুলাম আলীর সাথে একটি যৌথ কনসার্ট করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু মঞ্চে ওঠার ঠিক আগেই ব্রেন হ্যামারেজে আক্রান্ত হন তিনি। অবশেষে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর, ৭০ বছর বয়সে এই গজল সম্রাটের সুর চিরকালের মতো থেমে যায়। মুম্বইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তবে সুরের যে আধুনিক, সুশৃঙ্খল আর মায়াবী রাজপথ তিনি একহাতে তৈরি করে গেছেন, তা চিরকাল রয়ে যাবে প্রতিটা দগ্ধ হৃদয়ের পরম উপশম হিসেবে।

 

 

আজ তার জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধ জানাই।

 

আরও দেখুন: