আমার শ্যামল মিত্র | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শ্যামল মিত্রের গানের সাথে আমার ব্যক্তিগত প্রথম পরিচয় কিন্তু সলিল চৌধুরীর হাত ধরে, “যদি কিছু আমারে শুধাও” গানটি দিয়ে। সুরের কী অদ্ভুত এক জ্যামিতিক চলন! বাংলা আধুনিক গান যে কতটা চরম আধুনিক, কতটা ডেসপারেট রূপ নিতে পারে—এই গানটি তার এক জীবন্ত ইশতেহার।

আসলে শ্যামল মিত্রের গায়কির দিকে তাকালে সবচেয়ে বড় যে ধাক্কাটা লাগে, তা হলো তাঁর সেই চিরল অলৌকিক “Open-Throat” (উন্মুক্ত কণ্ঠের) গায়নশৈলী এবং শব্দের নিখুঁত স্বরক্ষেপণ (Diction)। যখন পঙ্কজ মল্লিক বা কুন্দন লাল সায়গলের থিয়েট্রিক্যাল ডাইমেনশন কিংবা অনুনাসিক (Nasal) ঘরানার প্রভাব থেকে বাংলা গান সবেমাত্র আড়মোড়া ভেঙে বের হয়ে আসছে, ঠিক তখনই শ্যামল মিত্র নামক এক ধূমকেতু এসে হাজির হলেন সম্পূর্ণ নতুন এবং এক চূড়ান্ত আধুনিক কণ্ঠস্বর নিয়ে।

তাঁর কণ্ঠে ঈশ্বরপ্রদত্ত একটা সহজাত ‘ব্রাসি’ (Brassy) এবং ‘ব্যারিটোন’ টেক্সচার ছিল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি যখন গাইতেন, তাঁর সেই সুর-প্রবাহ কোনো কৃত্রিম মাইক্রোফোনিক ট্রিকের ওপর একটুও ভরসা করত না। তারসপ্তকে (High Note) যাওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠ অবলীলায় চড়ে যেত, সেখানে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো কর্কশতা নেই।

তাঁর শ্বাস নিয়ন্ত্রণটাও একটা বলার মতো বিষয়। শব্দের মাঝে ঠিক কোথায় শ্বাস নিতে হবে, সেই প্রক্রিয়াটিকে তিনি এক অলৌকিক আর্টে রূপান্তর করেছিলেন। লাইনের পর লাইন তিনি দীর্ঘ টানে গেয়ে যেতেন, অথচ সুরের সেই অবিচ্ছিন্নতা বা ‘লেগাতো’ কোথাও এতটুকু মচকাতো না। গানের ভেতরের মেজাজ বা আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি সস্তা অকারণ কাঁপুনি (Vibrato) ব্যবহার করতেন না; বরং সোজা, সটান ও তীক্ষ্ণ সুরের লাইনে তিনি হেঁটে যেতেন। এজন্য তিনি যে তীব্র গভীর রোমান্টিকতা তৈরি করতেন, সেটা সরাসরি আমাদের বুক চিরে ভেতরে ঢুকে যেত।

সুরকার হিসেবে শ্যামল মিত্র শুধু আধুনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে বহু মাইল এগিয়ে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে ওয়েস্টার্ন অর্কেস্ট্রেশন এবং ইউরোপীয় রিদম ও আরবান সুইং তিনি দারুণভাবে মিশিয়েছিলেন। পশ্চিমা মিউজিকের ‘হার্মনি’ এবং ‘কাউন্টার-মেলোডি’র কাজগুলো তিনি রিমার্কেবলি করেছেন। তাঁর সুর করা গানগুলোতে মেইন ভোকালের পেছনে যে ভায়োলিন বা ফ্লুটের টুকরো কারুকাজ বাজত, তা মূল সুরকে কখনো আড়াল করত না, বরং তাকে রাজকীয় পরিপূরক হিসেবে ওপরে তুলে ধরত।

একজন মহৎ সুরকার তিনিই, যিনি নিজে টপ ফর্মে থেকেও সহকর্মীদের ভেতরের সেরা নির্যাসটুকু বের করে আনতে পারেন। শ্যামল মিত্র নিজে একজন শীর্ষ সারির গায়ক হওয়া সত্ত্বেও সুরকার হিসেবে মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, এবং আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো মহীরুহদের কাছ থেকে তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা কাজগুলো আদায় করে নিয়েছিলেন।

শ্যামল মিত্র
শ্যামল মিত্র

 

শ্যামল মিত্রের জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৯, আসামের গুয়াহাটিতে। বাবা ডাক্তার ছিলেন। নুসরাত ফাতেহ আলী খানের মতো তাঁর বাবাও চাইতেন তিনি ডাক্তার হন। কিন্তু সুরের আশীর্বাদ যে পেয়ে যায়, তার কি আর অন্য কোনো নেশায় পোষায়? কলেজে থাকতেই শিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সাথে দেখা। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই কলকাতা। এরপর সুধীরলাল চক্রবর্তীর মাধ্যমে আকাশবাণীতে ক্যারিয়ার শুরু।

এরপর গায়ক থেকে ক্রমশ সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, প্রযোজক। নিজে গাওয়ার বাইরেও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে গান করিয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইলা বসু, সুপ্রীতি ঘোষ, গায়ত্রী বসু, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের দিয়ে।

<a class="ng-star-inserted" href="https://www.youtube.com/watch?v=TYy4Imqjpys" target="_blank" rel="noopener">https://www.youtube.com/watch?v=TYy4Imqjpys</a>

তাঁর গাওয়া আমার সব প্রিয় গান:

১. যদি কিছু আমারে শুধাও (সুরকার: সলিল চৌধুরী)

২. আহা ওই আঁকাবাঁকা যে পথ (সুরকার: সলিল চৌধুরী)

৩. দূর নয় বেশি দূর (সুরকার: সলিল চৌধুরী)

বাংলাদেশি ও যৌথ প্রযোজনার ছায়াছবিতে তাঁর গান:

১. চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা (যৌথ প্রযোজনার আইকনিক চলচ্চিত্র ‘অমানুষ’)

তাঁর সুরে বা সঙ্গীত পরিচালনায় গান:

১. আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী (ছবি: আনন্দ आश्रम, কণ্ঠ: কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলে, গীতিকার: গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, সুরকার: শ্যামল মিত্র)

২. হয়তো কিছুই নাহি পাবো (কণ্ঠ: গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুরকার: শ্যামল মিত্র)

 

আরও দেখুন: