৮ মে—এই দিনটি আমাদের কাছে শুধু একটি জন্মতারিখ নয়, বরং এক অনন্য সঙ্গীতঋষির স্মরণদিন। তিনি জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ—আমাদের সকলের প্রিয় ‘গুরু’। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষকে আমার সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন কবির সুমন তার কোন পথে গেল গানের মাধ্যমে। আজ তার জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতে সামান্য লেখাটি লিখছি।
১৯০৯ সালের ৮ মে, কলকাতার এক সংগীতপ্রিয় পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যই যেন ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন দ্বারকানাথ ঘোষের নাতি—যিনি “দ্বারকিন হারমোনিয়াম”-এর উদ্ভাবক। ফলে সঙ্গীত তাঁর কাছে বাইরের কিছু ছিল না; বরং ছিল ঘরের বাতাসের মতো স্বাভাবিক।
শিক্ষাজীবনে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন। তবে শুধু পড়াশোনা নয়—খেলাধুলা, চিত্রাঙ্কন—সবকিছুর প্রতিই ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। ফুটবল, হকি, পোলো, বিলিয়ার্ড—সব ক্ষেত্রেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু জীবনের এক দুর্ঘটনা—ফুটবল খেলতে গিয়ে চোখে আঘাত—তাঁকে থামিয়ে দেয় সেই পথ থেকে।
এই বিরতিই যেন তাঁকে প্রকৃত পথে নিয়ে এল। তিনি সম্পূর্ণভাবে সংগীতের দিকে ঝুঁকলেন। শুরু হলো গুরুপরম্পরায় তালিম—গিরিজা শঙ্কর, মোহাম্মদ সাগির খান, মোহাম্মদ দবির খানের কাছে শিক্ষা গ্রহণ। এরপর ফারুকাবাদ ঘরানার ওস্তাদ মাসিত খানের কাছে তবলার সাধনা—যেখানে তিনি প্রবীণ শিষ্যদের একজন হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে পাঞ্জাব ঘরানার ওস্তাদ ফিরোজ খানের কাছ থেকেও তালিম নেন।
এই সাধনার ভিতর দিয়েই গড়ে উঠল এক অনন্য শিল্পীসত্তা—যেখানে তবলা, হারমোনিয়াম, রাগসঙ্গীত, তাল—সব মিলেমিশে এক পরিপূর্ণ রূপ পেল।
শৈশব থেকেই বাংলা গানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সঙ্গীত তাঁর ভাব, ভাষা ও সৃষ্টির ভিত গড়ে দেয়। পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলাম-এর গানও তাঁর সঙ্গীতচেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
তিনি নিজেই স্মৃতিচারণায় বলেছেন—এম.এ পড়ার সময় গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুলগীতি রেকর্ড করার সুযোগ এসেছিল, যদিও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে রাগ, স্বরবিন্যাস ও সুরের গভীর অনুশীলনে প্রবলভাবে সাহায্য করে।
তাঁর সঙ্গীতচিন্তায় পূর্বসূরি সৃষ্টিশীলদের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তিনি শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র দে-কে ‘সিদ্ধপুরুষ’ হিসেবে স্মরণ করেছেন, আবার তুলসী লাহিড়ীর রাগপ্রধান বাংলা গানের ধারাকেও গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ কেবল একজন বাদ্যযন্ত্রী ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক বিস্তৃত সঙ্গীতবিশ্বের নির্মাতা। তাঁর রাগাশ্রয়ী বাংলা গান এক নতুন দিগন্ত তৈরি করে। একই সঙ্গে আধুনিক গান, সুগম সংগীত—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান দক্ষতায় কাজ করেছেন।
রেডিওর স্বর্ণযুগে তাঁর সুরারোপিত গান বহু গুণী শিল্পীর কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নিজে গান লিখেছেন, আবার অন্য গীতিকারদের গানেও সুর দিয়েছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে প্রায় ১৫ বছর সংগীত প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে অর্কেস্ট্রা, করাল, পারকাশন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ‘সৌরভ একাডেমি অফ মিউজিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সংগীত গবেষণা একাডেমি-র সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্রেও তাঁর সুরের ছোঁয়া রয়েছে—যেমন “যদুভট্ট”, “অন্ধের আলো”, “রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত” (১৯৫৮)। গ্রামোফোন রেকর্ডেও তাঁর সুরারোপিত বহু গান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
তাঁর সৃষ্টির ভাণ্ডারও বিস্ময়কর। “দ্য ড্রামস অফ ইন্ডিয়া”, পণ্ডিত ভি.জি. যোগের সঙ্গে যুগলবন্দি, এবং ‘চতুরং’—যেখানে তবলা, পাখোয়াজ, কথক ও তারানার সম্মিলন—এসবই তাঁর সৃজনশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য। শিষ্যদের তিনি শুধু শেখাতেন না—তাদের গড়ে তুলতেন। গভীর রাত পর্যন্ত অনুশীলন, ভুল ধরিয়ে দেওয়া—এই কঠোর সাধনার মধ্য দিয়েই তিনি এক প্রজন্মের শিল্পী তৈরি করেছেন।
কলকাতার বউবাজারের ২৫ নম্বর ডিক্সন লেনের তাঁর বাসা ছিল এক উন্মুক্ত সঙ্গীতআশ্রম। সেখানে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। ১৯৪৪ সালে উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খানের রাগ “ছায়ানট” পরিবেশনের মতো স্মরণীয় ঘটনাও সেই ঘরেই ঘটেছিল।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের বিস্তার ছিল। কানাডার ন্যাশনাল ফিল্ম বোর্ডের জন্য ইশু প্যাটেলের পরিচালিত এক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালনা করেন, যা একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।
১৯৯৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান হলেও, তাঁর সৃষ্টি আজও বেঁচে আছে।
জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ—আমার কাছে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং এক ধারার নাম। তাঁর মধ্যে আমি দেখি সাধনা, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা আর ঐতিহ্যের এক গভীর সমন্বয়।
তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে নয়—একটি সঙ্গীতধারাকে সম্মান জানানো।