কিছু গান কেবল সুর আর বাণীর মেলবন্ধন নয়, তা হয়ে ওঠে একটা আস্ত যুগের দীর্ঘশ্বাস, এক চিরন্তন একাকীত্বের হাহাকার। সিনেমা হলের রূপালী পর্দায় যখন মহানায়ক উত্তম কুমার চোখ বুজে গেয়ে ওঠেন—“আমি যে জলসা ঘরে, নিশিথ রাতের দীপশিখা…”, তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও শ্রোতার বুকটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। ১৯৬৭ সালের কালজয়ী চলচ্চিত্র “অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি”-র এই অমর গানটির জন্ম ইতিহাসও ঠিক ততটাই জাদুকরী। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলম থেকে বের হওয়া সেই বিরহী বাণী, অনিল বাগচীর মায়াবী সুরের বাঁধন আর পদ্মভূষণ পণ্ডিত মান্না দে-র কণ্ঠের সেই অবিস্মরণীয় দরদ—সব মিলিয়ে গানটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু কে ছিলেন এই অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি? পর্দায় যাকে আমরা দেখি, ইতিহাসের পাতায় তাঁর রক্ত-মাংসের গল্পটা আসলে কেমন ছিল?
গল্পটা উনিশ শতকের শুরুর দিকের। লোনা জলের সমুদ্র পেরিয়ে দূর পর্তুগাল থেকে জাহাজে চড়ে এক সাহেব এসে নামলেন বাংলার মাটিতে। নাম তাঁর হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি। জন্মসালটা ইতিহাসের ধুলোয় ঠিকঠাক চেনা যায় না, তবে লোকমুখে শোনা যায় ১৭৮৬ সালের কোনো এক ভোরে পর্তুগালের মাটিতে জন্মেছিলেন তিনি। ভাগ্যের অন্বেষণে সুদূর ইউরোপ থেকে বাংলায় এসে তিনি ঘর বাঁধলেন পশ্চিমবঙ্গের ফরাসডাঙ্গা (বর্তমান চন্দননগর) এলাকায়। বিদেশী, সাহেব, সাদা চামড়া—তাই এদেশের মানুষের মুখে মুখে তাঁর নামের শেষে অবলীলায় জুড়ে গেল ‘ফিরিঙ্গি’ শব্দটি। তিনি হলেন হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি, সংক্ষেপে বাঙালির প্রিয় ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’।
কিন্তু বাংলার মাটি আর জল হাওয়া বোধহয় এই সাহেবের মনে এক অদ্ভুত জাদুমন্ত্র ফুঁকে দিয়েছিল। ইউরোপীয় রক্ত শরীরে বইলেও তাঁর মনটা পুরোপুরি মজে গেল বাংলার বাউল, কীর্তন আর লোকসংস্কৃতির প্রেমে।
তৎকালীন বাংলায় বিনোদনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জমজমাট মাধ্যম ছিল ‘কবিগান’ বা ‘কবির লড়াই’। আজকের দিনের র্যাপ ব্যাটেল (Rap Battle)-এর মতো, সেকালের ঝানু ঝানু কবিয়ালরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে তাৎক্ষণিকভাবে গানের পদ রচনা করতেন, আর চোখের পলকে তাতে সুর দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেন। হাজার হাজার মানুষ রাত জেগে সেই লড়াই দেখত।
এই মাটির গান, এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধির খেলা ফরাসডাঙ্গার সাহেবকে উথাল-পাথাল করে দিল। তিনি ঠিক করলেন, তিনিও কবিয়াল হবেন! একজন পর্তুগিজ সাহেব গাইবেন বাংলা গান—ভাবা যায়? প্রথম প্রথম বাংলা ভাষা আর গানের চলন পুরোপুরি ধরতে তিনি ‘গোরক্ষনাথ’ নামক এক ওস্তাদের সাহায্য নিয়েছিলেন। গোরক্ষনাথ গান বেঁধে দিতেন, অ্যান্টনি গাইতেন। কিন্তু জিনিয়াস তো বেশিদিন অন্যের ছায়ায় বাঁচে না। অল্প দিনেই অ্যান্টনি নিজেই মুখে মুখে চমৎকার বাংলা গান বাঁধতে পারোদর্শী হয়ে উঠলেন। নিজেই তৈরি করলেন নিজস্ব একটা কবিগানের দল।
সেদিনকার বাংলার বাঘা বাঘা কবিয়াল—হরু ঠাকুর, ভোলা ময়রা, দাশরথি রায়ের মতো কিংবদন্তিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করতেন এই ফিরিঙ্গি সাহেব। শুধু লড়াই-ই করতেন না, নিজের অসামান্য পাণ্ডিত্য, তীক্ষ্ণ রসবোধ আর সুরের জাদুতে বহুবার তিনি এই দেশী ওস্তাদদের কবিগানের আসরে পরাজিত করে সমাদর কুড়িয়েছেন। পুরো কলকাতা শহর তখন মুগ্ধ হয়ে দেখত এক সাহেবের মুখে খাঁটি বাংলার সুর।
অ্যান্টনি শুধু গান গাইতেন না, তাঁর গান ছিল জাতি, ধর্ম আর বর্ণের ঊর্ধ্বে ওঠা এক পরম মানবতার ইশতেহার। খ্রিষ্টান ধর্মে জন্ম হলেও বাংলার সনাতন ধর্মের আধ্যাত্মিকতা তাঁকে গভীরভাবে টালমাটাল করেছিল। মা কালীর প্রতি তাঁর ছিল অগাধ ভক্তি। তবে তাঁর ভক্তি কোনো অন্ধ গোঁড়ামি ছিল না। তিনি তাঁর এক বিখ্যাত গানে বুক উঁচিয়ে সমাজের জাত-পাতকে চাবুক মেরে গেয়েছিলেন:
“সাধন ভজন জানিনে মা, জেতে তো ফিরিংগি, যদি দয়া করে কৃপা কর হে শিবে মাতঙ্গী।”
তাঁর আগমনী গান—“জয় যোগেন্দ্রজায়া মহামায়া মহিমা অসীম তোমার” শুনলে বোঝার উপায় ছিল না যে এটি কোনো ভিনদেশী পর্তুগিজের হৃদয় থেকে বের হওয়া সুর। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। তাঁর গানে ফুটে উঠত এক অসাম্প্রদায়িক উজ্জ্বল সমাজচেতনা।
অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি শুধু গানেই সমাজ সংস্কারক ছিলেন না, বাস্তবেও তিনি ছিলেন এক সাহসী পুরুষ। উনিশ শতকের সমাজ তখন সতীদাহ প্রথার মতো কুৎসিত কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এক তরুণী হিন্দু ব্রাহ্মণ বিধবা, নাম সৌদামিনী, তাঁকে যখন জোর করে চিতার আগুনে পুড়িয়ে মারার আয়োজন করা হচ্ছিল—অ্যান্টনি নিজের জীবন বাজি রেখে সেই চিতা থেকে সৌদামিনীকে উদ্ধার করেন। শুধু উদ্ধারই করেননি, জাত-ধর্মের তোয়াক্কা না করে ভালোবেসে সৌদামিনীকে বিয়ে করে নিজের ঘরে তুলে নেন।
কিন্তু তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এই ‘সাহেব আর বামুনের মেয়ের’ প্রেম ও বিয়েকে মেনে নেয়নি। সমাজের অন্ধকার কীটরা এর প্রতিশোধ নিয়েছিল অত্যন্ত নৃশংসভাবে। একদিন সুযোগ বুঝে অ্যান্টনির অনুপস্থিতিতে তাঁর সাধের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং সৌদামিনীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। প্রেম আর মানবতার এই নির্মম বলিদান অ্যান্টনিকে ভেতরে ভেতরে একদম নিঃস্ব, একাকী করে দিয়েছিল। ওই যে মান্না দে-র কণ্ঠে—“আমি যে জলসা ঘরে, নিশিথ রাতের দীপশিখা…”—এই গানটি যেন সৌদামিনীকে হারানোর পর অ্যান্টনির সেই খাঁ খাঁ করা শূন্য বুকটারই এক একটা অক্ষরের আর্তনাদ।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর অ্যান্টনি হয়তো একা হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাংলার প্রতি, বাংলার মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। কলকাতার বউবাজার এলাকায় তিনি নিজ দায়িত্বে একটি মা কালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও কলকাতার বুকে ‘ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি’ নামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপীয় হয়েও এই দেশের মাটি, বাতাস, সংস্কৃতি আর গানকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলেন তিনি।
১৮৩৬ সালে এই মহান কবিয়াল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উনিশ শতকের পর বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে আর কোনো বিদেশী বা ইউরোপীয়ানের এমন গভীর, আত্মিক পদচারণা আর দেখা যায়নি। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি চলে গেছেন আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে, কিন্তু মান্না দে-র সেই জলসা ঘরের সুরের ভেতরে, আর ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির প্রদীপের আলোয় আজও বেঁচে আছে এক পর্তুগিজ সাহেবের খাঁটি বাঙালি হৃদয়ের স্পন্দন।

আমি যে জলসা ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়
![Gouri Prasanna Majumdar গৌরী প্রসন্ন মজুমদার আমি যে জলসা ঘরে -মান্না দে (প্রবোধ চন্দ্র দে) । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 3 গৌরী প্রসন্ন মজুমদার [ Gouri Prasanna Majumdar ]](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2022/03/Gouri-Prasanna-Majumdar-গৌরী-প্রসন্ন-মজুমদার-228x300.jpg)
কথা : গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
সুর : অনিল বাগচী
কণ্ঠ : মান্না দে (জন্মনাম : প্রবোধ চন্দ্র দে)
ছবি: এন্টোনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭) – Antony Firingee (1967)
আমি যে জলসা ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়
নিষি ফুরালে কেহ চায়না আমায় জানি গো আর (।।)
আমি যে জলসা ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়।
আমি যে আতর ওগো আতর দানে ভরা,
আমারই কাজ হলো যে গন্ধে খুশি করা।
কে তারে রাখে মনে ফুরালে হায় গন্ধ যে তার (।।)
আমি যে জলসা ঘরে ….
হায় গো কিযে আগুন জ্বলে বুকের মাঝে (।।)
বুঝেও তবু বলতে পারি না যে।
আলেয়ার পিছে আমি মিছেই ছুটে যাই বারেবার (।।)
আমি যে জলসা ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়
আমি যে জলসা ঘরে …

