আমাদের ইতিহাসের বইগুলোতে আমরা বন্ধুদের গল্প পড়ি, শত্রুদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনি; কিন্তু তথাকথিত ‘ধর্মভাই’দের চরম বিশ্বাসঘাতকতার অধ্যায়টি কি আমরা মনে রেখেছি? নাকি নিজেদের বিশ্বাসের গোঁড়ামি বাঁচাতে আমরা তা জোর করে ভুলে যেতে চাই?
১৯৭১ সালে যখন এই পলিমাটি আমাদের ৩০ লক্ষ মানুষের রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, তখন আরব বিশ্বের অবস্থান ছিল আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন কিংবা হেনরি কিসিঞ্জারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি জঘন্য। নিক্সন তো কেবল রাজনৈতিক দাবার চালে পাকিস্তানের পাশে ছিলেন, কিন্তু আমাদের ‘আরব ভাইরা’ এই গণহত্যাকে ধর্মের চাদরে ঢেকে দিয়েছিলেন। তারা বাঙালিদের কেবল ‘মুসলিম’ হিসেবেই অস্বীকার করেনি, বরং আমাদের বাঁচবার অধিকার আছে—এমন ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও বিসর্জন দিয়েছিল।
সেদিন মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমি থেকে শুরু করে লিবিয়ার মরুপ্রান্তর পর্যন্ত সবখান থেকে যে হুঙ্কার এসেছিল, তা ছিল ঘাতক ইয়াহিয়ার বুটের শব্দের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তারা আমাদের মুক্তিকামী মানুষকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আর ‘ভারতের দালাল’ বলে গালি দিয়েছিল। যে সময় আমাদের মা-বোনের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছিল, তখন তারা পাকিস্তানকে পাঠাচ্ছিল মরণাস্ত্র আর উপচে পড়া অর্থ সাহায্য। সেই চরম বৈরী ও অমানবিক ইতিহাসের অন্ধকার গলিগুলোতে আসুন সংক্ষেপে একবার ঘুরে আসি।

১/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সৌদি আরবের ভূমিকা:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সৌদি আরব চরমভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে সমর্থন করেছিল।
পাকিস্তানকে সরাসরি সমর্থন ও গণহত্যার বৈধতা প্রদান
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই সৌদি আরব পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম উম্মাহর একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করত। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে, তখন সৌদি আরব একে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে অভিহিত করে।
সৌদি রাজপরিবার ও ধর্মীয় নেতারা পাকিস্তানের এই দমন-পীড়নকে “জিহাদ-এ-ফি সাবিলিল্লাহ” (আল্লাহর পথে যুদ্ধ) বা ধর্মরক্ষার যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাদের দাবি ছিল, পাকিস্তান ভেঙে গেলে ইসলামি শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক অনুদান এবং লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল সৌদি আরব। এমনকি জর্ডান ও লিবিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানকে যুদ্ধবিমান সরবরাহের ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের পরোক্ষ প্রভাব ছিল।
সূত্র: “The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide” – Gary J. Bass; এবং “The Pakistan-Saudi Arabia Relationship” – Christophe Jaffrelot.
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের বিরোধিতা
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে সৌদি আরব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে এবং পাকিস্তানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। তারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (তৎকালীন ওআইসি) মাধ্যমে তারা মুসলিম দেশগুলোকে বাংলাদেশের বিপক্ষে রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের প্রভাবেই অনেক মুসলিম দেশ ১৯৭৪ সালের আগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করেছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী অসহযোগিতা ও হজ্জে বাধা
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হবার পরও সৌদি আরবের বৈরি আচরণ কমেনি। তারা নবজাত রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সৌদি আরব হজ্জ পালনের অনুমতি দেয়নি। ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশি হাজিদের হজ্জে যাওয়া অত্যন্ত দুরূহ ছিল কারণ সৌদি আরব বাংলাদেশের পাসপোর্টকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিল।
১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দিলে মুসলিম বিশ্বের সাথে বরফ গলতে শুরু করে। সেখানে বঙ্গবন্ধু রাজা ফয়সালের সাথে বৈঠক করলেও সৌদি আরব তাদের কঠোর অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরেনি।
১৫ই আগস্ট এবং দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান
সৌদি আরবের ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হলো বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাদের অতি-দ্রুত প্রতিক্রিয়া।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরদিন, অর্থাৎ ১৬ই আগস্ট সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তারা বারবার স্বীকৃতির দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছিল।
২/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিশরের ভূমিকা :
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিশরের নীতি ছিল অনেকটা “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” ধরনের। তারা একদিকে যেমন পাকিস্তানের সাথে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেও পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছিল না।
মার্চ – এপ্রিল ১৯৭১: পাকিস্তানের অখণ্ডতায় সমর্থন
যুদ্ধের শুরুর দিকে মিশর স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে।
মিশরীয় সরকার ২৫শে মার্চের কালরাত্রি এবং পরবর্তী দমন-পীড়নফে পাকিস্তানের “অভ্যন্তরীণ বিষয়” হিসেবে অভিহিত করে।
তৎকালীন আরব বিশ্বে পাকিস্তান পৃথিবীর প্রথম ইসলামিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তাই মিশর কোনোভাবেই একটি মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয়নি।
মিশরের ঘনিষ্ঠ মিত্র জর্ডান ও সৌদি আরব সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায় মিশরও শুরুতে তাদের বলয়েই ছিল।
মে – জুলাই ১৯৭১: নিরপেক্ষ অবস্থান (Neutrality)
যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে মিশরের অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
এই সময়ে মিশর সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া কমিয়ে দেয়। তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে দুই পক্ষকেই (পাকিস্তান ও বাঙালি নেতৃত্ব) আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানায়।
তারা শরণার্থী সমস্যার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কোনো বিবৃতি দেয়নি।
আগস্ট – ডিসেম্বর ১৯৭১: ভারত-রাশিয়া চুক্তির প্রভাব
১৯৭১ সালের ৯ই আগস্ট ভারত-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মিশরের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন আসে।
মিশর সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়ায় মিশরও পরোক্ষভাবে ভারতের অবস্থানের প্রতি নমনীয় হয়।
ভারত ও রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখলেও মিশর জর্ডান ও সৌদি আরবের চাপের কারণে সরাসরি “বাংলাদেশ” শব্দটির ব্যবহার এড়িয়ে যায়। তারা একে ‘পূর্ব পাকিস্তানের সংকট’ হিসেবেই বর্ণনা করতে থাকে।
ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত তখন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, যা মিশরের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল যেন তারা বাংলাদেশকে সরাসরি সমর্থন না দেয়।
যুদ্ধ পরবর্তী সময় ও স্বীকৃতি
মিশরের ভূমিকা ছিল অনেকটা সুবিধাবাদী বা কৌশলগত। তারা ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পরও দ্রুত স্বীকৃতি দেয়নি।
মিশর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৪ সালের লাহোর ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যখন আরব দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন, তখন আনোয়ার সাদাত (মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট) বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে শুরু করেন।
১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিশরে মেডিকেল টিম এবং চা পাঠিয়ে ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেন। এই ঘটনার পরই মিশর ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
৩/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জর্ডানের ভূমিকা :
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জর্ডান ছিল পাকিস্তানের অন্যতম কট্টর এবং অন্ধ সমর্থক। তাদের এই অবস্থানের মূলে ছিল কয়েক দশকের সামরিক ও কূটনৈতিক লেনদেন, যা জর্ডানকে পাকিস্তানের একটি অঘোষিত মিত্রে পরিণত করেছিল।
সামরিক কৃতজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের প্রভাব
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পাকিস্তান জর্ডানকে বিমানবাহিনী ও সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছিল। সেই সময় থেকে জর্ডানের রাজপরিবার ও সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে পাকিস্তানের একটি গভীর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৭১ সাল নাগাদ জর্ডান, মিশর ও সৌদি আরবের সামরিক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানি প্রশিক্ষকদের অধীনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। এই সামরিক ঋণের কারণেই জর্ডান পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষাকে নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
১৯৭১ সালের জুলাই: জর্ডানি হাই-কমিশনারের ঢাকা সফর
মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানের গণহত্যার নিন্দা জানানো হচ্ছিল, তখন জর্ডানের হাই-কমিশনারের ঢাকা সফর ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা সফরকালে জর্ডানের হাই-কমিশনার সরাসরি পাকিস্তানের সামরিক অভিযানকে সমর্থন জানান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলা নৃশংসতাকে “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা” হিসেবে অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যখন লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ও নারী নির্যাতনের খবর আসছিল, তখন তিনি একে “ভারতীয় প্রোপাগান্ডা” বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেবল ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ দমন করছে।
তিনি তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে বলেন, “একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানই কেবল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের শক্তি ধরে রাখতে পারবে।” অর্থাৎ, ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা বাংলাদেশে চালানো গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
সরাসরি সামরিক সহায়তা: এফ-১০৪ (F-104) স্টারফাইটার প্রেরণ
জর্ডান কেবল কথা দিয়েই পাকিস্তানকে সমর্থন করেনি, বরং সরাসরি অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করেছিল।
ডিসেম্বরের শুরুতে যখন ভারত-পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তখন জর্ডানের রাজা হোসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৌন সম্মতিতে পাকিস্তানের সহায়তায় বেশ কিছু এফ-১০৪ স্টারফাইটার যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিলেন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন, কারণ মার্কিন অস্ত্র তৃতীয় কোনো দেশকে দেওয়ার নিয়ম ছিল না।
কূটনৈতিক বিরোধিতা ও স্বীকৃতির বিলম্ব
জাতিসংঘে জর্ডান সবসময়ই পাকিস্তানের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছে এবং ভারতকে ‘আক্রমণকারী’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে।
১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পরও জর্ডান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে। ১৯৭৩ সালের আগে তাদের সাথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।
৪/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইরাকের ভূমিকা :
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইরাকের ভূমিকা ছিল অন্যান্য আরব দেশগুলোর (যেমন: সৌদি আরব বা জর্ডান) তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। ইরাকের এই অবস্থানের নেপথ্যে ছিল তাদের সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ‘সফট কর্নার’
ইরাকের তৎকালীন বাথ পার্টি (Ba’ath Party) শাসিত সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল এবং ভারতকে সমর্থন দিচ্ছিল, তাই ইরাকের নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও বাংলাদেশের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন ‘সফট কর্নার’ বা নমনীয়তা তৈরি হয়েছিল।
পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক ও ‘ইউনাইটেড পাকিস্তান’ তত্ত্ব
সোভিয়েত প্রভাব থাকলেও ইরাক তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়নি। পাকিস্তানও একটি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় ইরাক সরাসরি রাষ্ট্র ভাঙার পক্ষে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।
১৯৭১ সালের ২৮শে এপ্রিল ইরাক সরকার পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তারবার্তা পাঠায়। সেখানে তারা জানায়: “ইউনাইটেড পাকিস্তানকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তাদের (পাকিস্তান সরকারের) সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্যোগটা ইরাক বোঝে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরাক পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানালেও ‘গণহত্যা’ শব্দটিকে এড়িয়ে যায় এবং বিষয়টিকে পাকিস্তানের ‘একীভূত থাকার চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করে। এটি ছিল মূলত একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা।
গণহত্যার প্রশ্নে নীরবতা ও সমাধান প্রক্রিয়া
ইরাক জর্ডান বা সৌদি আরবের মতো পাকিস্তানের সামরিক অভিযানকে “জিহাদ” বলে আখ্যা দেয়নি। তবে তারা সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষেও কোনো জোরালো অবস্থান নেয়নি।
যুদ্ধ পরবর্তী সময় ও স্বীকৃতি
ইরাকের ভূমিকার সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি দেখা যায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পর। আরব দেশগুলোর মধ্যে ইরাকই ছিল অন্যতম যারা খুব দ্রুত বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিল। ১৯৭২ সালের ৮ই জুলাই ইরাক বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
৫/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ফিলিস্তিন, পিএলও, ইয়াসির আরাফাতের ভূমিকা :
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সমর্থন দিয়ে আসছিল। তাই ১৯৭১ সালে যখন বাঙালিরা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল, তখন তারা আশা করেছিল ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর সংগঠন পিএলও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল অনেক বেশি জটিল।
শুরুর দিকের অবস্থান: প্রো-পাকিস্তান ও নীরবতা
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে (মার্চ-এপ্রিল ১৯৭১) ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অবস্থান ছিল মূলত পাকিস্তানের পক্ষে। এর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ ছিল:
পাকিস্তান ছিল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি এবং ফিলিস্তিন সংকটে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ইয়াসির আরাফাত পাকিস্তানকে একটি অবিভাজ্য ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি আমিন আল-হুসেইনি একটি কঠোর বিবৃতি দেন। সেখানে তিনি ভারতকে পাকিস্তানের “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে” হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। এটি ছিল সরাসরি পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতি পরোক্ষ সমর্থন।
১৯৭১ সালের এপ্রিলে ইসরায়েল যখন অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তখন আরব বিশ্ব ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি হয়। তারা মনে করেছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া মানে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসরায়েলের একটি নতুন মিত্র তৈরি হওয়া।
ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর (Black September) ও পাকিস্তানের ভূমিকা
ফিলিস্তিনের অবস্থানে ‘ইউ-টার্ন’ বা পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিল জর্ডানের গৃহযুদ্ধ বা ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭০ – জুলাই ১৯৭১)।
জর্ডানের রাজা হোসেন এবং ইয়াসির আরাফাতের অনুগত ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের (ফেদাইন) মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। জর্ডান থেকে পিএলও-কে বিতাড়িত করাই ছিল রাজার লক্ষ্য।
অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গৃহযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জর্ডানের রাজাকে সরাসরি সহায়তা করে। তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জিয়া-উল-হক (যিনি পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন) জর্ডানে পাকিস্তানি ট্রেনিং মিশনের প্রধান ছিলেন এবং তিনি সরাসরি ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ওপর নৃশংস আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বা পিএলও-র (PLO) তৎকালীন নেতা ইয়াসির আরাফাত দাবি করেছিলেন যে, এই অভিযানে প্রায় ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার) ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে জর্ডান থেকে পিএলও পুরোপুরি বিতাড়িত হয়। পাকিস্তানের এই ভূমিকার কারণে ইয়াসির আরাফাত ও ফিলিস্তিনিরা বুঝতে পারেন যে, পাকিস্তান আসলে তাদের অকৃত্রিম বন্ধু নয়।
অবস্থানের পরিবর্তন: জুলাই ১৯৭১-এর পর
জুলাই মাসে জর্ডান ট্র্যাজেডি শেষ হওয়ার পর ফিলিস্তিনের অবস্থান পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন থেকে সরে আসতে শুরু করে।
জর্ডানে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা দেখে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বুঝতে পারেন যে, পূর্ব পাকিস্তানেও একই ধরণের গণহত্যা চালানো হচ্ছে। ফলে বছরের শেষ দিকে ফিলিস্তিনের সাধারণ যোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়।
যদিও ইয়াসির আরাফাত প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খুব বেশি সোচ্চার হননি, তবে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রশ্নে আগের মতো গোঁড়া অবস্থান থেকেও সরে আসেন।
যুদ্ধ পরবর্তী সম্পর্ক ও স্বীকৃতি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পরও ফিলিস্তিন দ্রুত স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে মিশরে মেডিকেল টিম ও চা পাঠিয়ে আরবদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ইয়াসির আরাফাতের মন জয় করে নেয়।
১৯৭৩ সালের পর ফিলিস্তিন ও বাংলাদেশের মধ্যে এক গভীর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। ইয়াসির আরাফাত পরবর্তীতে বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে নিজের ‘বড় ভাই’ হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন।

৬/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লিবিয়ার ভূমিকা :
১৯৭১ সালে লিবিয়ার তৎকালীন তরুণ ও বিপ্লবী নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর ছিলেন। তিনি ঢাকাকে নয়, বরং ইসলামাবাদকে মুসলিম বিশ্বের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন।
সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন ও ‘জিহাদ’ তত্ত্ব
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই লিবিয়া পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় জোরালো ভূমিকা নেয়। গাদ্দাফি মনে করতেন, পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া মানে মুসলিম উম্মাহর একটি বৃহৎ শক্তির পতন।
লিবিয়া যুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক অনুদান দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, জর্ডানের মতো লিবিয়াও তাদের নিজেদের এফ-৫ (F-5) যুদ্ধবিমান পাকিস্তানকে ব্যবহারের জন্য পাঠিয়েছিল, যা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল।
গাদ্দাফি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে হিন্দু (ভারত) ও মুসলিমের (পাকিস্তান) যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। তিনি একে ‘ইসলাম রক্ষার যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করে পাকিস্তানের গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নেন।
কূটনৈতিক বিরোধিতা ও আন্তর্জাতিক চাপ
জাতিসংঘে লিবিয়া ছিল ভারতের অন্যতম কঠোর সমালোচক। তারা ভারতকে ‘আক্রমণকারী’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়, যা মূলত পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকানোর একটি কৌশল ছিল।
ওআইসি-র অভ্যন্তরে লিবিয়া বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির কট্টর বিরোধী ছিল। ১৯৭৪ সালের আগে তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে কোনোভাবেই রাজি ছিল না।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও খুনিদের আশ্রয় প্রদান
লিবিয়ার বাংলাদেশের প্রতি শত্রুতা কেবল ১৯৭১ সালেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও তাদের ভূমিকা অত্যন্ত নেতিবাচক ছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর লিবিয়া অত্যন্ত দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কর্নেল রশিদ, কর্নেল ফারুকসহ আত্মস্বীকৃত খুনিরা যখন দেশত্যাগ করে, তখন মুয়াম্মার গাদ্দাফি তাদের লিবিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় এবং বিশেষ নিরাপত্তা প্রদান করেন। দীর্ঘদিন লিবিয়া ছিল এই খুনিদের প্রধান আস্তানা এবং সেখান থেকেই তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল।
১৯৭৪ সালের লাহোর সম্মেলন ও গাদ্দাফি
১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দিলে গাদ্দাফির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও গাদ্দাফি তাঁর পাকিস্তানপ্রীতি থেকে পুরোপুরি সরেননি। যদিও পরবর্তীতে বাণিজ্যিক স্বার্থে লিবিয়ায় বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে লিবিয়া দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের বিরোধী শক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছে।
৭/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সিরিয়ার ভূমিকা :
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সিরিয়া ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। তাদের পররাষ্ট্রনীতি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আরব জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো।
শুরুর দিকের অবস্থান: ‘ইউনাইটেড পাকিস্তান’ ও ইউএআর ফ্যাক্টর
যুদ্ধের শুরুতে (মার্চ-মে ১৯৭১) সিরিয়া মিশরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে সমর্থন জানায়। সিরিয়া তখন মিশরের সাথে একটি রাজনৈতিক কনফেডারেশনের (United Arab Republic) অধীনে ছিল। যেহেতু মিশর পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তাই সিরিয়াও সেই বলয়ের বাইরে যেতে পারেনি। তারা একে পাকিস্তানের “অভ্যন্তরীণ বিষয়” হিসেবে বর্ণনা করে। আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো সিরিয়াও বিশ্বাস করত যে পাকিস্তান ভেঙে গেলে মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত শক্তি হ্রাস পাবে।
মোড় পরিবর্তন: ভারতীয় কৃষিমন্ত্রীর সফর ও সত্যের মুখোমুখি
মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে (জুন-জুলাই ১৯৭১) ভারত বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে মন্ত্রীপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাতে শুরু করে। তৎকালীন ভারতের কৃষিমন্ত্রী ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ সিরিয়া সফর করেন। তিনি সিরীয় নেতৃত্বের কাছে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংসতা এবং শরণার্থী সমস্যার ভয়াবহতা তুলে ধরেন।
এই সফরের পর সিরিয়ার সরকারি গণমাধ্যম এবং কর্মকর্তাদের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা দেখা দেয়। তারা প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করে এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেয়। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়।
অক্টোবর ১৯৭১: জাতিসংঘের অফিসিয়াল অবস্থান
এতদসত্ত্বেও, যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ের ঠিক আগে (অক্টোবর ১৯৭১) সিরিয়া পুনরায় একটি রক্ষণশীল অবস্থানে ফিরে যায়। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘে সিরিয়ার প্রতিনিধি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান যে, সিরিয়া একটি “ইউনাইটেড পাকিস্তান” বা ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে। এর কারণ ছিল জর্ডান ও সৌদি আরবের মতো রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর চাপ। তারা চাচ্ছিল না একটি মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে নতুন কোনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠিত হোক। সিরিয়া যদিও সোভিয়েত বলয়ের বন্ধু ছিল, কিন্তু আরব ভ্রাতৃত্বের খাতিরে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানের ভাঙন ঠেকাতে চেয়েছিল।
স্বাধীনতা উত্তর সম্পর্ক ও স্বীকৃতি
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিরিয়া দ্রুত বাস্তবতাকে মেনে নেয়। ১৯৭৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সিরিয়া ও মিশরে চা এবং মেডিকেল টিম পাঠিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর এই দূরদর্শী উদ্যোগের ফলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সাথে বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
৮/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকা:
তুরস্ক তখন পাকিস্তানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কৌশলগত মিত্র ছিল। তারা সরাসরি পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে সমর্থন করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করে। তুরস্ক জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত (১৯৭৪ সালের আগে) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।
৯/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইরানের ভূমিকা :
তৎকালীন শাহ শাসিত ইরান ছিল পাকিস্তানের চরম মিত্র। ইরান কেবল রাজনৈতিক সমর্থনই দেয়নি, বরং ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছিল যে ভারত যদি পাকিস্তান আক্রমণ করে তবে ইরান পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে। তারা পাকিস্তানকে জ্বালানি তেল এবং সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করেছিল। মূলত পারস্য উপসাগরে ভারতের প্রভাব ঠেকানো এবং পাকিস্তানের সাথে আঞ্চলিক জোটের (RCD) খাতিরে তারা এই অবস্থান নিয়েছিল।
১০/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকা :
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া শুরুতে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তারা পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। ১৯৭১ সালেও তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে যুদ্ধের শেষের দিকে তারা কিছুটা নমনীয় হয় এবং ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
১১/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিউনিসিয়ার ভূমিকা :
আরব বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে তিউনিসিয়া জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে কট্টর অবস্থান নিয়েছিল। তারা ভারতকে ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে প্রচার করে।
১২/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মরক্কোর ভূমিকা :
মরক্কোর রাজপরিবার ও সরকার সরাসরি পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও মুসলিম সংহতির দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তারা মনে করত পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া মানে মুসলিম বিশ্বের পরাজয়।
১৩/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলজেরিয়ার ভূমিকা :
আলজেরিয়া শুরুতে কিছুটা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলেও ওআইসি-র (OIC) প্রভাবে তারা পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমাজতান্ত্রিক ও ভারতীয় প্রভাবাধীন আন্দোলন হিসেবে সন্দেহ করত। তবে ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনের সময় আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিন বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতায় বড় ভূমিকা পালন করেন।
১৪/ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কুয়েতের ভূমিকা :
অন্যান্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো কুয়েতও পাকিস্তানের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থক ছিল। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনেক দিন পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক আশ্চর্য ও বেদনাদায়ক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ১৯৭১ সালে যখন এই ভূখণ্ডে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চলছিল, তখন তথাকথিত ‘মুসলিম ভ্রাতৃত্বের’ দোহাই দিয়ে প্রায় পুরো আরব বিশ্ব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘাতক পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর, যখন আমরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি, তখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়—দূরপ্রাচ্যের দেশ ইসরায়েল স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। অদ্ভুত এক রাজনৈতিক সমীকরণে ইসরায়েলের সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করা হয়। আমরা চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিলাম সেই আরব বিশ্বের দিকে, যারা আমাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে উদ্যত পাকিস্তানকে অর্থ, অস্ত্র আর অভয় দিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি ফিলিস্তিন ও ইয়াসির আরাফাতও নিজেদের গায়ে আঁচড় না লাগা পর্যন্ত (ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর ট্র্যাজেডির আগে) বাংলাদেশের আর্তনাদে কর্ণপাত করেননি।
ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! যে রাষ্ট্রটি আমাদের ৩০ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করল, যে দেশগুলো সেই হত্যাযজ্ঞকে “জিহাদ” বলে ফতোয়া দিল এবং আমেরিকার চেয়েও জঘন্যভাবে পাকিস্তানের হাতকে শক্তিশালী করল—তাদের আমরা আজও ‘ধর্মভাই’ বলে পরম মমতায় বুকে টেনে নিই। অথচ যারা যুদ্ধের শুরুতেই আমাদের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিল, যারা আমাদের কোটি শরণার্থীর জন্য অকাতরে ত্রাণ ও অর্থ সাহায্য পাঠিয়েছিল—তাদেরকে আমরা এক অজ্ঞাত ও আবেগসর্বস্ব কারণে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে নিষিদ্ধ করে রেখেছি।
আজ ঠান্ডা মাথায় ভাবলে শিউরে উঠতে হয়—আরব বিশ্ব যদি সেদিন পাকিস্তানকে এই অন্ধ সমর্থন আর নৈতিক ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) না দিত, তবে হয়তো নয় মাস ধরে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলত না। ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যেত না, ২ থেকে ৪ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হতো না। আরব বিশ্ব চাইলে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করতে পারত, একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাধানের পথ তৈরি করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি; বরং ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা খুনিদের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের এই ঐতিহাসিক সত্যটুকু মেনে নেওয়ার সাহস অর্জন করতে হবে—কাকে আমরা বন্ধু ভেবেছি আর কারা আসলে আমাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল।
সূত্র:
১/ The Blood Telegram: Nixon, Kissinger, and a Forgotten Genocide – Gary J. Bass: এই বইটিতে হোয়াইট হাউসের গোপন নথি ও টেপ রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে জর্ডান কর্তৃক পাকিস্তানকে এফ-১০৪ স্টারফাইটার বিমান প্রদান এবং সৌদি আরব ও লিবিয়ার আর্থিক ও সামরিক সমর্থনের বিস্তারিত কূটনৈতিক দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে।
২/ Bangladesh: A Legacy of Blood – Anthony Mascarenhas: এটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে লিবিয়া ও সৌদি আরবের অতি-দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং খুনি ফারুক-রশিদ চক্রকে লিবিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীমূলক উৎস।
৩/ The Pakistan-Saudi Arabia Relationship: Accommodating Strategic Expectations – Christophe Jaffrelot: সৌদি আরব কেন পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ায় “ইসলামের দুর্গ” মনে করত এবং প্যান-ইসলামিজমের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তার গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এখানে পাওয়া যাবে।
৪/ The Black September in Jordan 1970-1971 – (PLO Archives / Historical Records): জর্ডানে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ওপর জর্ডানি সেনাবাহিনী ও পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জিয়া-উল-হকের কমান্ডে থাকা ইউনিটের চালানো নৃশংসতা এবং এর ফলে ফিলিস্তিনিদের মোহভঙ্গের ঐতিহাসিক নথিপত্র এখানে সংকলিত।
৫/ War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh – Richard Sisson and Leo E. Rose: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (বিশেষ করে মিশর ও সিরিয়া) কেন শুরুতে বৈশ্বিক সমীকরণে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল এবং পরবর্তীতে ভারত-সোভিয়েত চুক্তির পর কেন অবস্থানে পরিবর্তন এনেছিল, তার বিস্তারিত একাডেমিক বিবরণ এই গবেষণায় আছে।
৬/ Across Borders: Fifty Years of India’s Foreign Policy – J.N. Dixit: সাবেক এই অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদের বইতে ওআইসি (OIC) ভুক্ত দেশগুলোর বাংলাদেশ বিরোধী কঠোর অবস্থান এবং যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের অযাচিত স্বীকৃতির প্রস্তাব ও মুজিবনগর সরকার কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যানের নেপথ্য কারণ বর্ণিত হয়েছে।
৭/ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায় – মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর লবিং এবং আরব দেশগুলোর নেতিবাচক অবস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিল ও সাক্ষ্য এখানে পাওয়া যায়।
৮/ The Trials of Independence: 1971 – Dr. M.A. Hasan: জর্ডানের হাই-কমিশনারের ঢাকা সফর, পাকিস্তানের সামরিক অভিযানকে সরাসরি সমর্থন এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমে আসা গণহত্যার খবরকে “ভারতীয় প্রোপাগান্ডা” বলে অভিহিত করার প্রত্যক্ষ বিবরণ ও রেফারেন্স এতে রয়েছে।
৯/ Inside Intelligence: The Story of Israel’s Foreign Intelligence Service – Ephraim Kahana: ইসরায়েল কর্তৃক ১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতির প্রস্তাব এবং তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে আরব বিশ্বের সমর্থনের আশায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে গোয়েন্দা নথির উল্লেখ এখানে পাওয়া যায়।
১০/ The Arabs and the Bangladesh Crisis (Research Papers on Middle Eastern Studies): ইরাক ও সিরিয়ার মতো বাথ পার্টি শাসিত রাষ্ট্রগুলো কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র হওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রতি কিছুটা ‘সফট কর্নার’ বা নমনীয়তা দেখিয়েছিল, তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ এই ধরণের গবেষণাপত্রে পাওয়া যায়।
১১/ মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ (Liberation War e-Archive): এই ডিজিটাল আর্কাইভে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসের আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের (যেমন: The New York Times, The Guardian) মূল কপি সংরক্ষিত আছে, যেখানে সৌদি ও জর্ডানি কর্মকর্তাদের সরাসরি পাকিস্তানপন্থী বক্তব্য পাওয়া যাবে।
১২/ বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঐতিহাসিক দলিলসমূহ (Bangladesh Foreign Policy Documents): ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আরব দেশগুলোর সাথে স্বীকৃতির দরকষাকষি এবং বাংলাদেশি হাজিদের হজ্জ পালনে সৌদি আরবের বাধা প্রদান সংক্রান্ত মূল সরকারি চিঠিপত্র ও নথিপত্র।
