একাত্তরের ঘাতক, আলবদর বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে বাঙালি জাতি কলঙ্কমুক্তির পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। অথচ এই মুজাহিদই জীবদ্দশায় ইতিহাসের সাথে সবচেয়ে বড় তামাশা করার চেষ্টা করেছিলেন।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সাথে সংলাপ শেষে দম্ভভরে মুজাহিদ বলেছিলেন:
“বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নাই। এটা তাদের কল্পনাপ্রসূত, নিজেদের বানোয়াট একটা উদ্ভট চিন্তা। বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নাই—তখন থেকেও নাই, এখনো নাই। বাংলাদেশে কোনো স্বাধীনতাবিরোধীও নাই।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর, ২০১০ সালের ৩১ মার্চ জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আবারও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, “পাস্ট ইজ পাস্ট (Past is past)। এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না।”
একাত্তরে ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি হিসেবে মুজাহিদ ছিলেন কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠকদের একজন। হত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়াই ছিল এই বাহিনীর লক্ষ্য।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যে বাংলার পবিত্র মাটিতে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত মিশে আছে, সেই বাংলার লাল-সবুজ পতাকা গাড়ির সামনে উড়িয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন এই আলবদর কমান্ডার। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে!
ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ে জিয়াউর রহমান যেমন কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তেমনি খালেদা জিয়াও ফরিদপুরে কোনোদিন নির্বাচনে জিততে না পারা এই আলবদর কমান্ডারকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী বানিয়েছিলেন।
আশার বিষয় হলো, বাংলার মাটিতে শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়েছে। শত বাধা ও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। দম্ভোক্তি করা সেই মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে।
তবে জাতির প্রত্যাশা এখনো শেষ হয়নি। এই স্বাধীনতাবিরোধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের যারা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে শহীদদের অবমাননা করেছে, তাদেরও একদিন বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে।
যেদিন বাংলার মাটি থেকে যুদ্ধাপরাধের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাবে, সেদিনই আমরা গর্ব করে বলতে পারব—“প্রকৃত অর্থেই আজ বাংলাদেশে আর কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই!”
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
