আসল বনাম নকল নোবেল !

১৮৮৮ সালে আলফ্রেড নোবেলের ভাই লুদভিগ নোবেল ফ্রান্সে মারা যান। কিন্তু একটি ফরাসি সংবাদপত্র ভুলবশত একে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু মনে করে শিরোনাম ছাপে— “Le marchand de la mort est mort” অর্থাৎ “দ্য মার্চেন্ট অফ ডেথ ইজ ডেড” (মৃত্যুর সওদাগর আজ মৃত)। নিজের জীবদ্দশায় নিজেরই এমন নেতিবাচক শোকসংবাদ পাঠ করে আলফ্রেড নোবেল স্তম্ভিত হয়ে যান। ডিনামাইট আবিষ্কার করে তিনি বিপুল ধনসম্পদ অর্জন করলেও, বিশ্ব তাঁকে ‘অস্ত্র ব্যবসায়ী’ বা ‘রক্তপিপাসু’ হিসেবে মনে রাখবে—এই উপলব্ধি তাঁকে দগ্ধ করতে থাকে। ইতিহাসে নিজের নামকে কলঙ্কমুক্ত করতে এবং মানবতার কল্যাণে কিছু করার তাগিদে তিনি তাঁর উইলে আমূল পরিবর্তন আনেন। ১৮৯৫ সালে করা সেই নতুন উইলে তিনি তাঁর বিশাল সম্পত্তির ৯৪ শতাংশ উৎসর্গ করেন পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে (পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও শান্তি) বিশ্বসেরা অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদানের জন্য। এভাবেই এক ভুল শোকসংবাদ থেকে জন্ম নেয় পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা— ‘নোবেল পুরস্কার’।

আলফ্রেড নোবেল যখন তাঁর উইলে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে তাঁর সম্মানের এই মুকুটটি ভবিষ্যতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে—একটি ‘আসল’ এবং অন্যটি ‘বিতর্কিত’। সারা বিশ্বের কাছে ‘নোবেল প্রাইজ’ মানেই এক পরম শ্রদ্ধা ও অস্পৃশ্য আভিজাত্যের নাম, কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায় এর এক পিঠে আছে বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা আর অন্য পিঠে আছে বৈশ্বিক রাজনীতির দাবার চাল।

সুইডিশ নোবেল

পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা কিংবা সাহিত্য—সুইডিশ একাডেমি যে পুরস্কারগুলো দিয়ে আসছে, সেগুলো আজ অবধি প্রায় বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কেন? কারণ এখানে ব্যক্তির আদর্শের চেয়ে তাঁর কাজের গভীরতাকে দেখা হয়। আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করছে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে। আইনস্টাইন থেকে রবীন্দ্রনাথ—যাঁরা এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস খোদ ইতিহাসও পায়নি। স্টকহোম থেকে যখন কোনো নাম ঘোষিত হয়, পৃথিবী একবাক্যে তা মেনে নেয়। এটিই হলো ‘আসল’ নোবেল, যা মেধার জয়গান গায়।

সুইডিশ নোবেল কিভাবে দেয়া হয়, এর প্রক্রিয়া কী, কেন এটা বিতর্ক মুক্ত?

ইডিশ নোবেল পুরস্কার (পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং অর্থনীতি) কেন আজ অবধি পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত এবং নির্ভরযোগ্য পদক হিসেবে টিকে আছে, তার প্রধান কারণ হলো এর জটিল, দীর্ঘ এবং অত্যন্ত গোপনীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া।

নিচে এই প্রক্রিয়ার ধাপগুলো এবং কেন এটি বিতর্কযুক্ত নয়, তা আলোচনা করা হলো:

সুইডিশ নোবেল বিজয়ী নির্ধারণে প্রায় এক বছর সময় লাগে। এর ধাপগুলো হলো:

  • মনোনয়ন আহ্বান (সেপ্টেম্বর-জানুয়ারি): নোবেল কমিটি নিজে থেকে কাউকে খুঁজে বের করে না। তারা বিশ্বের প্রায় ৩,০০০ জন যোগ্য ব্যক্তির (বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পূর্বতন নোবেল বিজয়ী এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানী) কাছে গোপনীয় চিঠি পাঠায় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। কেউ নিজেকে নিজে মনোনীত করতে পারেন না।
  • প্রাথমিক বাছাই (ফেব্রুয়ারি-মে): হাজার হাজার নামের মধ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্যানেল যাচাই-বাছাই করে একটি ‘শর্টলিস্ট’ তৈরি করে।
  • বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (জুন-আগস্ট): এই পর্যায়ে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে মনোনীত ব্যক্তিদের কাজের ওপর বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
  • চূড়ান্ত নির্বাচন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর): রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস (পদার্থ ও রসায়ন) বা ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট (চিকিৎসা) পূর্ণাঙ্গ সভার মাধ্যমে ভোটাভুটির মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটই শেষ কথা।

সুইডিশ নোবেলের গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে ৪টি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে:

ক. ৫০ বছরের কঠোর গোপনীয়তা (Rule of Secrecy)

নোবেল কমিটির একটি কঠোর নিয়ম হলো—মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কার নাম ছিল, কে কাকে ভোট দিয়েছেন বা কার নাম বাদ পড়েছে, তা ৫০ বছর পার না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা যাবে না। এই দীর্ঘমেয়াদী গোপনীয়তার কারণে কোনো রাজনৈতিক দল বা দেশ প্যানেল মেম্বারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।

খ. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্যানেল

সুইডিশ নোবেল কমিটিগুলো গঠিত হয় মূলত একাডেমিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে, কোনো রাজনীতিক বা সরকারি আমলা দিয়ে নয়। ফলে এখানে ‘লবিং’ করার কোনো সুযোগ নেই। তারা ব্যক্তিকে নয়, বরং ব্যক্তির আবিষ্কার বা সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেয়।

গ. সময়ের পরীক্ষা (The Test of Time)

সুইডিশ একাডেমি হুট করে কাউকে পুরস্কার দেয় না। কোনো বিজ্ঞানী একটি আবিষ্কার করার পর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বুঝতে তারা অনেক সময় ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এজন্যই দেখা যায়, অনেক প্রবীণ বিজ্ঞানী তাঁদের যৌবনের কাজের জন্য বৃদ্ধ বয়সে নোবেল পান। এই ধৈর্যই ভুল মানুষকে পুরস্কৃত করার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

 

নরওয়েজিয়ান নোবেল

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি হলো নরওয়ের ‘শান্তি পুরস্কার’। নরওয়ে সুইডেন থেকে আলাদা হয়ে এই শাখাটি পরিচালনা করতে শুরু করার পর থেকেই নোবেল পুরস্কারের সেই পবিত্রতা ধূলিসাৎ হতে শুরু করেছে। যেখানে সুইডিশ শাখা ব্যস্ত থাকে ল্যাবরেটরি আর লাইব্রেরির মেধাবীদের নিয়ে, সেখানে নরওয়েজিয়ান কমিটি ব্যস্ত থাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ মেলাতে।

তাদের তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যায় এমন সব ব্যক্তির নাম, যাঁদের হাতে শান্তির পায়রা নয়, বরং রক্তের দাগ কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের গন্ধ পাওয়া যায়। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি যেন পুরস্কার নয়, বরং পশ্চিমা শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি ‘সার্টিফিকেট’ বিতরণ করে। যাকে খুশি শান্তিরাজ ঘোষণা করা আর যাকে খুশি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা—এই খেলায় তারা সিদ্ধহস্ত। ফলে এটি এখন আর আলফ্রেড নোবেলের সেই আদর্শিক পুরস্কার নেই, বরং পরিণত হয়েছে একটি ‘পিআর (PR) স্ট্যান্ট’-এ।

নরওয়েজিয়ান নোবেল – কিভাবে দেয়া হয়, এর প্রক্রিয়া কী, কেন এটা এত বিতর্কিত?

শান্তি পুরস্কারের বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে ‘নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি’। এর প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

  • কমিটি গঠন: নরওয়ের সংসদ (Storting) ৫ জন সদস্যকে নিয়ে এই কমিটি গঠন করে। মজার ব্যাপার হলো, এই সদস্যরা প্রায়ই নরওয়ের প্রাক্তন রাজনীতিক বা দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে থাকেন।
  • মনোনয়ন: প্রতি বছর ১লা ফেব্রুয়ারির মধ্যে মনোনয়ন জমা দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়র অধ্যাপক, সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক এবং প্রাক্তন বিজয়ীরা মনোনয়ন দিতে পারেন।
  • বাছাই ও পরামর্শ: কমিটি একটি ছোট তালিকা (Shortlist) তৈরি করে এবং কিছু নির্দিষ্ট উপদেষ্টার (যাঁরা মূলত নরওয়েজিয়ান বিশেষজ্ঞ) কাছ থেকে মতামত নেয়।
  • সিদ্ধান্ত: অক্টোবর মাসে কমিটির ৫ জন সদস্য নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণ করেন। এখানে কোনো বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি টেস্ট নেই, বিচার করা হয় শুধুমাত্র ৫ জন ব্যক্তির ‘রাজনৈতিক!!! বা মানবিক !!!’ দৃষ্টিভঙ্গি।

 

নরওয়েজিয়ান নোবেল বিতর্কিত হওয়ার পেছনে প্রধান ৩টি কারণ নিচে দেওয়া হলো:

ক. রাজনীতিকদের আধিপত্য (Political Bias)

সুইডিশ নোবেল দেয় বিজ্ঞানীরা, আর নরওয়েজিয়ান নোবেল দেয় রাজনীতিকদের দ্বারা নির্বাচিত কমিটি। ফলে, এই কমিটি প্রায়ই পশ্চিমাবিশ্ব বা ‘ন্যাটো’ (NATO) পন্থী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে। যাকে পশ্চিমাবিশ্ব ‘শান্তিভাণ্ডার’ মনে করে, নরওয়ে তাকেই পদক দেয়। এতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে না।

খ. ‘আশার’ ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার (Predictive Awards)

সুইডিশ নোবেল দেওয়া হয় অতীতে প্রমাণিত সাফল্যের জন্য। কিন্তু নরওয়েজিয়ান শান্তি পুরস্কার অনেক সময় দেওয়া হয় ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা থেকে। ২০০৯ সালে বারাক ওবামাকে যখন নোবেল দেওয়া হয়, তিনি তখন মাত্র কয়েক মাস ক্ষমতায়। তিনি শান্তিতে কী অবদান রেখেছেন তা কমিটি নিজেও জানত না; তারা কেবল ‘আশা’ করেছিল তিনি ভালো কিছু করবেন। এই ‘আশাবাদী’ নোবেলই একে প্রহসনে পরিণত করেছে।

গ. খুনি ও অত্যাচারীদের হাতে পদক

ইতিহাসে এমন অনেককে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যাঁদের হাতে পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের রক্ত লেগে আছে।

  • হেনরি কিসিঞ্জার (১৯৭৩): ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাঁর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

  • অং সান সু চি (১৯৯১): যাঁর আমলেই রোহিঙ্গা গণহত্যা হয়েছে।

  • ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ (২০১৯): পদক পাওয়ার কিছুদিন পরেই তিনি নিজের দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু করেন।

ঘ. যোগ্যদের অবজ্ঞা:

নরওয়েজিয়ান কমিটির অযোগ্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মহাত্মা গান্ধী। অহিংস আন্দোলনের এই পুরোহিতকে তারা ৫ বার মনোনীত করেও কোনোদিন নোবেল দেয়নি। অথচ বহু যুদ্ধের নায়ক বা করপোরেট ব্যক্তিত্বরা সহজেই এই পদক বাগিয়ে নিয়েছেন।

আসল নোবেল কোনটা?

আজকের সচেতন পৃথিবীর কাছে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, প্রকৃত নোবেল পুরস্কার এখনো সুইডিশ কর্তৃপক্ষের দেয়া সেই পদকগুলোই। মানুষ জানে বিজ্ঞানের আবিষ্কার কিংবা সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টি কোনো রাজনীতির ধার ধারে না। অন্যদিকে, অসলো থেকে যে শান্তি পুরস্কার ঘোষিত হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

আলফ্রেড নোবেল হয়তো চেয়েছিলেন শান্তি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক, কিন্তু নরওয়েজিয়ান কমিটি সেই শান্তিকে বানিয়ে ফেলেছে তাদের ড্রইংরুমের খেলনা। তাই যতদিন পর্যন্ত মেধা আর গবেষণার জয়গান থাকবে, ততদিন সুইডিশ নোবেলই থাকবে ‘আসল’ হয়ে, আর নরওয়ের শান্তি পুরস্কারটি ইতিহাসের পাতায় এক ‘বিতর্কিত ছায়া’ হিসেবেই থেকে যাবে।

যাঁদের হাতে শান্তির ‘রক্তমাখা’ পায়রা

নরওয়ের এই শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায় এমন সব নাম, যা শুনলে শান্তি নিজেই হয়তো লজ্জায় মুখ লুকাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বারাক ওবামার কথা। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, কোনো দৃশ্যমান শান্তি স্থাপন ছাড়াই ‘ভবিষ্যৎ আশার’ ভিত্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর শাসনামলেই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছে অগুনতি নিরপরাধ মানুষ। কিংবা অং সান সু চি—যাঁর নোবেল জয়ের পর নিজ দেশেই রোহিঙ্গাদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে। শান্তির এই পদক কি তবে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

প্রফেসর ইউনূস: শান্তি নাকি সুদের ব্যবসায়িক সাফল্য?

এই তালিকায় বাংলাদেশের প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নামটিও আজ বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে চড়া সুদের যে ‘ক্ষুদ্রঋণ’ মডেল তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছেন, তা শান্তি এনেছে নাকি গ্রামীণ জনপদে ঋণের বোঝা আর হাহাকার বাড়িয়েছে—তা নিয়ে তর্কের শেষ নেই। শান্তিতে নোবেল কি তবে এখন ব্যাংকিং লভ্যাংশ আর করপোরেট সাকসেসের বিকল্প পুরস্কার? প্রশ্ন জাগে, শান্তির সংজ্ঞায় কি এখন থেকে ‘সুদের ব্যবসা’ও অন্তর্ভুক্ত হলো?

লাইসেন্স যখন রাজনৈতিক দানে প্রাপ্ত: ড. ইউনূসের ‘এম্পায়ার’ ও শেখ হাসিনার সরলতা

প্রফেসর ইউনূসের আজকের এই গ্লোবাল ইমেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। বাংলাদেশের প্রথম জিএসএম মোবাইল ফোন লাইসেন্সটি (গ্রামীণফোন) যখন দেওয়া হয়, তখন ড. ইউনূস এক অভিনব স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলেন—মোবাইল ফোন হবে গ্রামের দরিদ্র মানুষের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার, যাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘পল্লী ফোন’।

শূন্য বিনিয়োগে বিশাল সাম্রাজ্য

ড. ইউনূস অত্যন্ত চতুরতার সাথে সরকারকে বুঝিয়েছিলেন যে, একটি মোবাইল লাইসেন্স নিশ্চিত করতে পারলে কোনো বড় ধরনের ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Investment) আনা সম্ভব। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। নরওয়ের টেলিনরকে বড় পার্টনার হিসেবে যুক্ত করে তিনি কার্যত বিনা পুঁজিতে এক বিরাট মুনাফার অংশীদার হন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর নিজের বিনিয়োগের উৎস ছিল ‘গ্রামীণ ব্যাংক’—যা মূলত জনসাধারণের আমানত এবং সরকারি সহায়তায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান।

কৃতজ্ঞতার বদলে প্রতারণা

আশ্চর্যের বিষয় হলো, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকার যখন পরম মমতায় তাঁকে এই ঐতিহাসিক সুযোগটি করে দিয়েছিল, তখন ধারণা ছিল এর সুফল পাবে দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার পর চিত্রটি বদলে যায়। ড. ইউনূস এই বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রামীণ ব্যাংকের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুললেও, সময়ের আবর্তে সেগুলোকে নিজের ব্যক্তিগত ‘এম্পায়ার’ হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন।

 ক্ষতিগ্রস্ত হলো দেশ ও সরকার

তীর্যকভাবে বলতে গেলে, ড. ইউনূস সরকার ও রাষ্ট্রের দেওয়া সুযোগ-সুবিধাকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ঠিকই, কিন্তু শিখরে পৌঁছানোর পর সেই সিঁড়িটিকেই লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকার সরল বিশ্বাসে এই লাইসেন্স দিয়েছিল দেশের কল্যাণে, কিন্তু দিনশেষে ড. ইউনূস সেই মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি ব্যবহার করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। প্রতারিত হয়েছে সরকার, আর গ্রামীণফোনের উচ্চমূল্যের নেটওয়ার্কে পিষ্ট হয়েছে সাধারণ দেশবাসী।

নোবেল পাওয়া যায় শান্তিতে, কিন্তু সেই শান্তির পথটি নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পাওয়া একটি ‘মোবাইল লাইসেন্স’-এর পিচঢালা রাস্তায়। ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন যে, সুন্দর স্বপ্ন দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে সম্পদ আদায় করা এবং পরবর্তীতে সেই সম্পদকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে জাহির করার চেয়ে বড় ‘শান্তি’ আর কিছু হতে পারে না। শেখ হাসিনা তাঁকে দিয়েছিলেন গ্রামীন জনগোষ্টির ভাগ্য বদলের সুযোগ, আর তিনি বদলালেন নিলেন নিজের ভাগ্য।

নরওয়ের এই ‘নকল’ নোবেলের গন্তব্য কোথায়?

অসলো থেকে ঘোষিত এই পুরস্কারগুলো তাকালে মনে হয়, আলফ্রেড নোবেলের আদর্শের চেয়ে এখানে পশ্চিমা পরাশক্তিদের তুষ্ট করাই প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন কিংবা নির্দিষ্ট আদর্শের মানুষকে লাইমলাইটে আনাই যেন নরওয়েজিয়ান কমিটির আসল কাজ। বিপরীতে, সুইডিশ কর্তৃপক্ষের দেওয়া পদার্থ, রসায়ন বা চিকিৎসার নোবেল আজও বিশ্ববাসীর কাছে পরম আকাঙ্ক্ষিত এবং শ্রদ্ধার। কারণ, সেখানে লবিং চলে না, চলে মেধার লড়াই।

তাই বিশ্ববিবেক আজ দ্বিধাবিভক্ত নয়। তারা জানে, স্টকহোম থেকে যা আসে তা ‘আসল’ মেধার স্বীকৃতি, আর অসলো থেকে যা আসে তা প্রায়শই রাজনৈতিক স্বার্থে মোড়ানো এক ‘নকল’ শান্তি-প্রহসন। আলফ্রেড নোবেলের উইল হয়তো নরওয়ে রক্ষা করছে, কিন্তু তাঁর সম্মান রক্ষা করতে তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ।

শেষ আপডেট : ২১/০১/২০২৪