ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্যারিয়ার । ক্যারিয়ার গাইড । সুফি ফারুক এর পেশা পরামর্শ সভা কর্মসূচি

মানুষ সামাজিক জীব, আর উৎসব-আয়োজন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের ধরনে এসেছে আভিজাত্য ও পেশাদারিত্বের ছোঁয়া। বর্তমানে বিয়ে, জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর মতো ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে কনসার্ট, কর্পোরেট সেমিনার কিংবা বিশাল মেলা—সবকিছুই এখন সুপরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হয়। এখানেই জন্ম নিয়েছে এক আধুনিক ও শৈল্পিক পেশা, যার নাম ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’। এটি কেবল একটি কাজ নয়, বরং নান্দনিকতা ও ব্যবস্থাপনার এক সার্থক মিশেল। আপনি যদি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর নেপথ্য কারিগর হতে চান, তবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট হতে পারে আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ক্যারিয়ার [ Event Management Career ] । পেশা পরিচিতি | পেশা পরামর্শ সভা
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ক্যারিয়ার [ Event Management Career ] । পেশা পরিচিতি | পেশা পরামর্শ সভা

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্যারিয়ার: সৃজনশীলতা ও ব্যবস্থাপনার এক অনন্য শিল্প

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর ‘পেশা পরামর্শ সভা’ কর্মসূচির একটি বিশেষ ক্যারিয়ার গাইডলাইন

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট আসলে কী?

শাব্দিক অর্থে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বলতে কোনো বিশেষ ঘটনার যাবতীয় ব্যবস্থাপনাক বোঝায়। সহজভাবে বললে, একটি অনুষ্ঠানকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করাই হলো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। একজন ইভেন্ট ম্যানেজারের কাজ হলো ক্লায়েন্টের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। অনুষ্ঠানের ভেন্যু নির্বাচন থেকে শুরু করে ক্যাটারিং, সাউন্ড সিস্টেম, লাইটিং, ডেকোরেশন, অতিথিদের অভ্যর্থনা, এমনকি অনুষ্ঠান পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা—সবকিছুই এই ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত। এটি এমন একটি শিল্প যেখানে প্রতিটি ছোট বিষয়কেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়, যাতে আয়োজনে কোনো খুঁত না থাকে।

কেন এই পেশাটি বর্তমানে এত জনপ্রিয়?

ব্যস্ততম এই নগরজীবনে মানুষের হাতে সময় খুব কম। কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ও রুচির প্রশ্নে কেউ আপস করতে চান না। ফলে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান হোক বা অফিসের এজিএম (AGM)—মানুষ এখন পেশাদার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মের ওপর নির্ভর করছে। এই পেশায় যেমন রোমাঞ্চ আছে, তেমনি আছে নিজেকে প্রমাণের অবারিত সুযোগ। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা, তারকা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে নেটওয়ার্কিং তৈরি করা এবং একটি সফল আয়োজনের পর প্রাপ্ত তৃপ্তি—সব মিলিয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে অন্যতম লোভনীয় ক্যারিয়ারে পরিণত হয়েছে।

মেয়েদের জন্য অপার সম্ভাবনা

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেক্টরটি মেয়েদের জন্য অত্যন্ত চমৎকার একটি কর্মক্ষেত্র। সৃজনশীলতা, ধৈর্য এবং খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর দেওয়ার সহজাত গুণের কারণে মেয়েরা এই পেশায় দ্রুত উন্নতি করছেন। ট্র্যাডিশনাল বা গতানুগতিক পেশার বাইরে নিজেকে স্মার্ট ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক ইভেন্ট ফার্মের নেতৃত্বে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে চাকরির ধরন ও বিভাগসমূহ

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য পূর্ণকালীন (Full-time) এবং খণ্ডকালীন (Part-time)—উভয় সুযোগই রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একটি আদর্শ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় সাধারণত নিচের বিভাগগুলো থাকে:

১. প্রডাকশন বিভাগ: এটি যেকোনো ইভেন্টের মস্তিষ্ক। প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করা, ইভেন্টের মূল কাঠামো বা থিম নির্ধারণ করা এবং গ্রাহকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী আয়োজনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা এই বিভাগের কাজ।

২. ভিজ্যুয়ালাইজেশন বিভাগ: গ্রাহক তাঁর অনুষ্ঠানটি ঠিক কেমন দেখতে চান, তা কম্পিউটারের মাধ্যমে থ্রিডি (3D) বা টুডি (2D) ডিজাইনে ফুটিয়ে তোলাই এই বিভাগের কাজ। এর ফলে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই ক্লায়েন্ট একটি পরিষ্কার ধারণা পান।

৩. লজিস্টিক বিভাগ: এটি হলো ইভেন্টের মেরুদণ্ড। বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম (যেমন—স্টেজ তৈরির উপকরণ, ইলেকট্রনিক্স, ফার্নিচার) সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করা লজিস্টিক টিমের দায়িত্ব।

৪. জনশক্তি বিভাগ: একটি বড় ইভেন্টে শত শত ভলান্টিয়ার বা কর্মীর প্রয়োজন হয়। সঠিক কাজের জন্য সঠিক মানুষটিকে নিয়োগ দেওয়া এবং তাঁদের তদারকি করাই এই বিভাগের কাজ।

৫. মার্কেটিং ও পিআর বিভাগ: ইভেন্টের জন্য স্পন্সর জোগাড় করা, গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো এবং প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ইমেজ বজায় রাখা এই বিভাগের প্রধান কাজ। সারা বছর কাজের ফ্লো ধরে রাখতে এই বিভাগের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা ও কাজের পরিধি

বাংলাদেশে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের বাজার এখন বিলিয়ন ডলারের। প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের পাশাপাশি বর্তমানে রাজনৈতিক সমাবেশ, আন্তর্জাতিক মেলা, ফ্যাশন শো এবং সরকারি বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের উদ্বোধন ইভেন্ট ফার্মের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ঢাকার বাইরেও বিভাগীয় শহরগুলোতে এখন পেশাদার ফার্ম গড়ে উঠছে। এই খাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো পেমেন্ট সিস্টেম। সাধারণত মোট বাজেটের ৫০ শতাংশ টাকা অগ্রিম পাওয়া যায়, যা কাজ শুরু করতে উদ্যোক্তাকে সহায়তা করে। নতুনত্ব ও সৃজনশীলতা বজায় রাখতে পারলে এই সেক্টরে কাজের কোনো অভাব হয় না।

সফল হতে হলে কী কী গুণ থাকা চাই?

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা সংকট ব্যবস্থাপনা হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ লাইভ ইভেন্টে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। একজন সফল ইভেন্ট ম্যানেজারের গুণাবলি হলো:

  • যোগাযোগ দক্ষতা (Communication Skill): চমৎকার বাচনভঙ্গি এবং মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষমতা।
  • ব্যক্তিত্ব ও স্মার্টনেস: পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
  • ধৈর্য ও সহনশীলতা: দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার মানসিকতা।
  • টিমওয়ার্ক: সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করার নেতৃত্ব গুণ।

 

উদ্যোক্তা হিসেবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম শুরু করার কৌশল

আপনি যদি আত্মবিশ্বাসী হন, তবে নিজেই একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সুফি ফারুকের পরামর্শ অনুযায়ী, সরাসরি ব্যবসায় নামার আগে অন্তত ১-২ বছর কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অভিজ্ঞতা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

  • অল্প পুঁজিতে শুরু: আপনার যদি বড় অফিস নেওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তবে ঘরে বসেই কাজ শুরু করতে পারেন। প্রাথমিক নেটওয়ার্কিং এবং ছোট ছোট ইভেন্টের (যেমন—জন্মদিন বা ঘরোয়া হলুদ) মাধ্যমে লাখখানেক টাকা বিনিয়োগ করে যাত্রা শুরু করা সম্ভব।
  • পূর্ণাঙ্গ অফিস: প্রোফেশনাল সেটআপ নিয়ে নামতে চাইলে স্থানভেদে ১৫-২০ লাখ টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।
  • মার্কেটিং কৌশল: সরাসরি বিভিন্ন কোম্পানির এইচআর (HR) বা মার্কেটিং বিভাগে গিয়ে আপনার পোর্টফোলিও ও আকর্ষণীয় ইভেন্ট আইডিয়া প্রস্তাব করুন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমেও আপনার ফার্মের প্রচারণা চালাতে পারেন।

 

প্রশিক্ষণ ও হাতেখড়ি

বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর শর্ট কোর্স করিয়ে থাকে। এসব কোর্স থেকে আপনি কারিগরি বিষয়গুলো শিখতে পারেন। তবে শেখার সবচেয়ে বড় উপায় হলো ইভেন্ট পর্যবেক্ষণ করা। কোনো বড় প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকলে স্টেজের পেছনের কাজগুলো (Backstage activities) ভালো করে লক্ষ্য করুন। পড়াশোনার অবস্থায় খণ্ডকালীন কাজ শুরু করলে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে হতেই আপনি একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে তৈরি হয়ে যাবেন।

আয়-রোজগারের বিস্তারিত হিসাব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে আয়ের সীমা আপনার পরিশ্রম ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে।

  • চাকরিজীবীদের জন্য: শুরুতে ফুলটাইম জবে ১৫-২০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া যায়। ২-৩ বছরের অভিজ্ঞতায় এটি ৩৫-৫০ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। খণ্ডকালীন বা পার্টটাইম কাজে দিনে বা ইভেন্ট প্রতি ৫-১০ হাজার টাকা অনায়াসে আয় করা যায়।
  • উদ্যোক্তাদের জন্য: নিজস্ব ব্যবসা হলে আয় নির্ভর করে কাজের স্কেলের ওপর। একটি মাঝারি মানের প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করলে সমস্ত খরচ বাদে ৩০-৪০ শতাংশ নিট লাভ থাকে। ছোট পরিসরে শুরু করেও একজন উদ্যোক্তা মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। বড় বড় কর্পোরেট ডিল বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাজ পেলে আয়ের অঙ্ক আকাশচুম্বী হতে পারে।

 

আমাদের পরামর্শ:

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট পেশায় আপনার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো আপনার কাজের মান। একটি সফল ইভেন্ট আপনাকে আরও দশটি নতুন কাজ এনে দেবে। তাই লাভের চেয়ে কাজের মানের দিকে বেশি নজর দিন। সততা, সময়ানুবর্তিতা এবং সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই পেশায় আপনি কেবল সফলই হবেন না, বরং নিজেকে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। মনে রাখবেন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট হলো স্বপ্নের বাস্তবায়ন; আর আপনিই সেই স্বপ্নের রূপকার।

আরও দেখুন: