“ইসলামের স্বর্ণযুগ” বা “ইসলামি স্বর্ণযুগ” কী, কেন, কিভাবে? | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

“ইসলামি স্বর্ণযুগ” বা “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age] কী, কেন এবং কীভাবে? রমজানে গঠিত আমাদের “বায়তুল হিকমাহ” পাঠচক্র থেকে প্রথম লেখাটি লিখেছেন—রাজিব হাসান

তিনি লিখেছেন “ইসলামের স্বর্ণযুগ”-এর অর্জন নিয়ে, যেটিকে আমি আমার ভাষায় বলি “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ”। সেই যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিমদের অগণিত অবদান এবং কুরআনের প্রথম আদেশ “ইকরা”-কে প্রকৃত অর্থে গ্রহণ করার ফলাফল নিয়ে তিনি আলোকপাত করেছেন।

এরপর আপনাদের সম্মিলিত আলোচনায় অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে এসেছে। আমি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সেই বিশেষ সময়টির ওপর একটু আলো ফেলতে চাই। সেই সময়টি কোনটি? কীভাবে এসেছিল? কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

সেটি কি সামরিক শক্তি বা যুদ্ধজয়ের কারণে এসেছিল?

আব্বাসীয়দের মতো সামরিক উত্থান তো বহুবার হয়েছে, বড় খেলাফতও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু সেই সব খেলাফতকে তো “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ” বলা হয় না।

বাগদাদের খলিফা আল-মনসুরের “বায়তুল হিকমাহ” স্থাপন (৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে শুরু করে ১১ শতকের শেষ বা ১২ শতকের শুরু পর্যন্ত (কেউ কেউ ১২৫৮ সালের মঙ্গোল আক্রমণ পর্যন্ত বলেন) সময়কালকে “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ” বলা হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অর্জনের এমন সুসময় মুসলিমদের দীর্ঘ ইতিহাসে কেন আর কখনোই আসেনি?

আব্বাসীয় আমলে চিকিৎসকের জটিল অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া শিক্ষা
আব্বাসীয় আমলে চিকিৎসকের জটিল অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া শিক্ষা

 

“ইসলামি স্বর্ণযুগ” কিভাবে এসেছিল সে সময়?

আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী যখন দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানান্তরিত হলো, তখন খলিফা আল-মনসুর অনুভব করলেন—একটি সাম্রাজ্যকে শুধু তলোয়ার দিয়ে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তাকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী ‘কলম’ এবং ‘প্রজ্ঞা’। বাগদাদ তখন ছিল বিশ্বের মিলনকেন্দ্র। পারস্য, ভারত, চীন এবং গ্রিসের প্রাচীন সব পাণ্ডুলিপি তখন বাগদাদের বাজারে ঘুরত। এই জ্ঞানকে এক জায়গায় জড়ো করার তাড়না থেকেই খলিফা আল-মনসুর একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে আল-মামুনের হাতে পূর্ণতা পায়।

কারণ আল-মনসুর এবং তার সুযোগ্য পুত্র হারুন-আল-রশিদের খেলাফতে পুরো মুসলিমদের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী সময় ও পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল। ইতিহাসে কোন দেশের মুসলিমরা আর একবারও পারেনি।

এমন একটি পরিবেশ- যেখানে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি কুসংস্কার ও অহংকার মুক্ত হয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করতে পেরেছিল। মামুন বিশ্বাস করতেন জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তারের জন্য সকল কুসংস্কার মুক্ত হয়ে, সব জানালা দরজা খুলে দিতে হবে। খিলাফত হতে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে। আর শুধুমাত্র ইসলামিক টেক্সটই নয়, সব দেশের, সব ধর্মের, মতের টেক্সটগুলোকেও পড়তে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই এমন একটি পরিবেশ তিনি তৈরি করেছিল- যেখানে শুধুমাত্র মুসলিমরাই নয়, সব মতের, সব ধর্মের, সব বিশ্বাসের, সব যুক্তির আলেম/পণ্ডিতরা নিশ্চিন্তে, নিরাপদে ও নির্ভয়ে জ্ঞানচর্চা করেছে।

শিক্ষক শিক্ষার্থীরা উভয়ই খেলাফতের বৃত্তির আওতায় থাকবে, তাই তাদের আর্থিক দুশ্চিন্তা করতে হবেনা। তার গবেষণার বিষয়বস্তু কোন দলের সেন্টিমেন্ট বিরোধী হলও খিলাফতের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সে নিরাপদ থাকবে। তার গবেষণার ফলাফল নেগেটিভ/পজিটিভ যাই হোক, প্রকাশ করতে তাকে ভয় পেতে হবে না।

 

আব্বাসীয় গ্রন্থাগারে পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ। আল হারিরির মাকামাতে ইয়াহিয়া আল ওয়াসিতি কর্তৃক অঙ্কিত, বাগদাদ, ১২৩৭ খ্রিষ্টাব্দ
আব্বাসীয় গ্রন্থাগারে পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ। আল হারিরির মাকামাতে ইয়াহিয়া আল ওয়াসিতি কর্তৃক অঙ্কিত, বাগদাদ, ১২৩৭ খ্রিষ্টাব্দ

 

কেমন ছিল সেই সময়, “ইসলামি স্বর্ণযুগ”?

সে সময়ের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সেই মুক্তচিন্তার পরিবেশ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

সারা পৃথিবী থেকে উটের পিঠে বোঝাই হয়ে আসত বিভিন্ন দেশের দুর্লভ বই—তা ধর্ম, ইতিহাস কিংবা সাহিত্য, যা যেখানে পাওয়া যেত। ভারতের প্রথিতযশা পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল; তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন অমূল্য সব জ্ঞানভাণ্ডার।

বইয়ের বিনিময়ে মণিমুক্তা:

খলিফাদের এই জ্ঞানতৃষ্ণা কেবল শৌখিনতা ছিল না, এটি ছিল এক রাষ্ট্রীয় আদর্শ। বই সংগ্রহ করতে তাঁরা যে পরিমাণ অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতেন, তা আধুনিক যুগেও অকল্পনীয়।

খলিফা আল-মামুন সম্পর্কে একটি বিখ্যাত বর্ণনা প্রচলিত আছে যে, কোনো পণ্ডিত যদি কোনো মৌলিক বই লিখতে পারতেন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করতেন, তবে খলিফা সেই পাণ্ডুলিপিটি এক পাল্লায় রাখতেন এবং অন্য পাল্লায় সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা (Gold Dinars) দিয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করতেন। ভাবুন একবার, কয়েকশ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের ওজন যদি এক কেজি হয়, তবে সেই সময়কার হিসেবে তার দাম দাঁড়াত আকাশচুম্বী!

বায়তুল হিকমাহর সমৃদ্ধির পেছনে একটি বড় উৎস ছিল যুদ্ধজয়ের পর করা সন্ধিচুক্তি। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন, খলিফা আল-মামুন যখন বাইজেন্টাইন সম্রাটদের যুদ্ধে পরাজিত করতেন, তখন তিনি ক্ষতিপূরণ হিসেবে জমি বা অর্থ না চেয়ে দাবি করতেন—’প্রাচীন গ্রিক পাণ্ডুলিপির ভাণ্ডার’। এমনকি সম্রাট থিওফিলাস যখন শান্তি প্রস্তাব পাঠান, খলিফা শর্ত দিয়েছিলেন যে কনস্টান্টিনোপলের রাজকীয় লাইব্রেরিতে থাকা পাণ্ডুলিপিগুলো বাগদাদে পাঠাতে হবে। ইতিহাসের পাতায় এটিই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে কোনো সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় ‘যুদ্ধলব্ধ সম্পদ’ (Spoils of War) ছিল বই।

খলিফারা কেবল উপহারের অপেক্ষায় থাকতেন না। তাঁরা বই খোঁজার জন্য বিশেষ ‘সার্চ পার্টি’ বা গোয়েন্দা দল নিয়োগ করেছিলেন। হুনাইন ইবনে ইশহাককে খলিফা একবার বিপুল অর্থ এবং লোকবল দিয়ে পাঠিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে ঘুরে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করার জন্য। তিনি বিভিন্ন গির্জা, মঠ এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে এমন সব বই উদ্ধার করেছিলেন যা ইউরোপীয়রা নিজেরাই ভুলে গিয়েছিল।

৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে চীনা বন্দীদের কাছ থেকে আরবরা কাগজ তৈরির কৌশল শিখে নেয়। এর আগে বই লেখা হতো চামড়া বা প্যাপিরাসে, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। খলিফারা বাগদাদে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম বিশাল কাগজ কারখানা স্থাপন করেন। এর ফলে বইয়ের দাম কমে যায় এবং সাধারণ মানুষের হাতেও বই পৌঁছে যায়। বাগদাদে ‘ওয়াররাকুন’ বা কাগজ বিক্রেতাদের একটি পুরো বাজারই গড়ে উঠেছিল, যেখানে শতাধিক বইয়ের দোকান ছিল।

বাইজেন্টাইন সম্রাট থিওফিলোসের কাছে খলিফা আল মামুনের দূত
বাইজেন্টাইন সম্রাট থিওফিলোসের কাছে খলিফা আল মামুনের দূত

 

মুক্তচিন্তার সূতিকাগার:

বায়তুল হিকমায় শত শত স্কলার বা পণ্ডিত নতুন আসা বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করতেন। অন্য কোনো দেশের মানুষ পড়ার আগ্রহ দেখালে বিনামূল্যে তাঁর ভাষায় অনুবাদ করে দেওয়া হতো। পণ্ডিতদের নিয়মিত বক্তৃতা ও বিতর্ক হতো খলিফার উপস্থিতিতে। সেখানে সব মত ও পথের মানুষ নির্ভয়ে নিজের দর্শন তুলে ধরতেন। আজ তাঁদের কিছু লেখা পড়লে বোঝা যায়, সেসব মতামতের মধ্যে বর্তমানের বিচারে অনেক ‘ব্লাসফেমাস’ বা বিতর্কিত দর্শনও ছিল। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—বিরুদ্ধ মত হলেই তাকে হত্যা করতে হবে, এমন সংস্কৃতির বদলে সেখানে ‘ভাবনার লড়াই ভাবনা দিয়ে’ করার এক সুস্থ ধারা গড়ে উঠেছিল। তলোয়ার নয়, যুক্তিই ছিল শ্রেষ্ঠ অস্ত্র।

সেই আমলে বাগদাদে ‘মুনাতারা’ (Munazara) বা শাস্ত্রীয় বিতর্ক অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, অনেক বিতর্কে এমন পণ্ডিতরাও অংশ নিতেন যাঁরা প্রকাশ্যেই ধর্মের অলৌকিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন (যাঁদের ‘দাহরিয়া’ বা বস্তুবাদী বলা হতো)। খলিফা আল-মামুন নিজে এসব বিতর্ক উপভোগ করতেন। একবার এক বিতর্কে এক নাস্তিক পণ্ডিতকে খলিফার সামনেই নিজের যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। খলিফা তাকে থামিয়ে দেননি, বরং তার যুক্তি খণ্ডন করার জন্য মুসলিম পণ্ডিতদের উৎসাহিত করেছিলেন।

সেই সময়ে ইবনে আল-রাওয়ান্দি নামক এক প্রখর মেধাবী চিন্তাবিদ ছিলেন, যাঁর দর্শন আজকের বিচারেও চরম বিতর্কিত। তিনি নবুওয়াত এবং ওহীর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর এই চরমপন্থী যুক্তিবাদী অবস্থান সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন সমাজে বিচরণ করতে পেরেছেন এবং তাঁর সমসাময়িকরা তাঁর যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করে বই লিখেছেন (যেমন আল-খাইয়াতের ‘কিতাব আল-ইন্তিসার’)। অর্থাৎ, ভিন্নমতাবলম্বীকে ‘কাফের’ বলে কতল করার বদলে তাঁকে ‘যুক্তি’ দিয়ে পরাজিত করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই সেখানে জারি ছিল।

বায়তুল হিকমার উদারতা এমন পর্যায়ে ছিল যে, তারা কেবল বৈজ্ঞানিক বই নয়, বরং অন্যান্য ধর্মের মূল দর্শন এবং বিতর্কিত সব বইও অনুবাদ করত। যেমন—প্রাচীন গ্রিসের এমন সব দর্শন যেখানে মহাবিশ্বকে ‘অনাদি’ (অর্থাৎ যা সৃষ্ট নয়) বলা হয়েছে, সেগুলোও হুবহু অনুবাদ করা হয়েছিল। খলিফারা ভয় পাননি যে এসব পড়লে মানুষের ঈমান নষ্ট হবে; বরং তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত সত্যই জয়ী হবে।

তৎকালীন বির্তকের মজলিসগুলোতে একটি অঘোষিত নিয়ম ছিল—সেখানে কোনো পণ্ডিত তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বা পবিত্র গ্রন্থের দোহাই দিয়ে যুক্তি দিতে পারবেন না। যুক্তি হতে হবে বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক। অর্থাৎ একজন খ্রিষ্টান, ইহুদি, অগ্নিপূজক এবং মুসলিম যখন তর্কে বসতেন, তখন তাঁদের সবার ‘বেসলাইন’ বা মানদণ্ড ছিল ‘যুক্তি’ (Logic)। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ‘সেকুলার’ জ্ঞানচর্চার অন্যতম আদি রূপ।

ভারতের অবদান ও ‘সিন্ধ-হিন্দ’:

“মুসলিম স্বর্ণযুগ” গড়ে ওঠার পেছনে ভারতের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। খলিফা আল-মনসুরের শাসনামলে (৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ) ভারতের সিন্ধু প্রদেশ থেকে পণ্ডিত “কানাকা” (Kanaka/Kankah) বাগদাদের রাজদরবারে পৌঁছান। তাঁর সাথে ছিল ভারতের ঋষিদের সংকলিত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের অমূল্য পাঁচটি পাণ্ডুলিপি, যার মধ্যে প্রধান ছিল মহর্ষি ব্রহ্মগুপ্তের ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ (যা আরবে ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ বা ‘সুরিয়া সিদ্ধান্ত’ হিসেবেও আলোচিত ছিল)।

খলিফা আল-মনসুর এই বইগুলোর সারমর্ম শুনে এতটাই অভিভূত হন যে, তিনি প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মুহাম্মদ আল-ফাজারিকে আদেশ দেন পণ্ডিত কানাকার তত্ত্বাবধানে বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করতে। এই অনুবাদ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় “সিন্ধ-হিন্দ” (Zij al-Sindhind)। এটি ছিল মুসলিম বিজ্ঞানের ইতিহাসের প্রথম বড় কোনো বৈজ্ঞানিক রূপান্তর।

এই বইটির মাধ্যমেই ভারতীয় ‘শূন্য’ (Sifr) এবং দশমিক পদ্ধতি প্রথম মুসলিম বিশ্বে প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে আল-খোয়ারিজমি এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তাঁর আধুনিক গণিত শাস্ত্র রচনা করেন।

‘সিন্ধ-হিন্দ’ বইটি বাগদাদ থেকে পরবর্তীকালে মুসলিম শাসিত স্পেনে (আন্দালুসিয়া) পৌঁছায়। সেখান থেকেই ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে এটি ইউরোপের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটায়।

বলা বাহুল্য, এই ‘সিন্ধ-হিন্দ’ বা ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্রগুলোই টলেমি-পরবর্তী বিশ্ব-মানচিত্র এবং আধুনিক ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিল।

এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, এটি ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রজ্ঞার এক মহান মিলনস্থল।

যোগ্যতার জয়গান (Meritocracy):

বায়তুল হিকমার প্রধান অনুবাদক ও অন্যতম আচার্য ছিলেন একজন খ্রিষ্টান—হুনাইন ইবনে ইশহাক (Hunayn ibn Ishaq)। আজকের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে দেখুন—একটি মুসলিম খিলাফতের সবচেয়ে বড় জ্ঞানকেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল একজন খ্রিষ্টানকে! খলিফা সেই আমলে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে কেবল যোগ্যতাকে (Meritocracy) প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এ নিয়ে সমালোচনা উঠলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, হুনাইনের চেয়ে বেশি যোগ্য কোনো মুসলিম থাকলে সে প্রতিযোগিতায় জিতে আসুক, আমি তাকেই নিয়োগ দেব; কিন্তু স্রেফ ধর্মের দোহাই দিয়ে আমি জ্ঞানের মানের সাথে কোনো আপস করব না। বায়তুল হিকমাহর এই উদারতা কেবল হুনাইন ইবনে ইশহাক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি।

তৎকালীন সময়ে উত্তর মেসোপটেমিয়ার হারান অঞ্চলে বাস করত ‘সাবিয়ান’ (Sabian) নামক একটি সম্প্রদায়, যারা ছিল নক্ষত্র উপাসক। এই সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন সাবিত ইবনে কুররা। তিনি মুসলিম ছিলেন না, তবুও খলিফা আল-মুতাদিদ তাঁর অসাধারণ গাণিতিক মেধা দেখে তাঁকে বাগদাদে আমন্ত্রণ জানান। সাবিত ইবনে কুররা বায়তুল হিকমাহর অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে ইউক্লিড ও আর্কিমিডিসের জটিল কাজগুলো অনুবাদ ও পরিমার্জন করেন। খলিফা তাকে রাজদরবারে যে সম্মান দিতেন, তা অনেক উচ্চপদস্থ মুসলিম আমলার ভাগ্যেও জুটত না।

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রশাসনিক ও বৌদ্ধিক সংস্কারের মূল কারিগর ছিল বারমাকি পরিবার। তাঁরা ছিলেন আফগানিস্তানের বালখ থেকে আসা নও-মুসলিম, যাঁদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন বৌদ্ধ মঠের প্রধান পুরোহিত। আরবের বাইরের লোক হওয়া সত্ত্বেও কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে তাঁরা খলিফা হারুন-অর-রশিদের প্রধানমন্ত্রী (উজির) পদ পর্যন্ত অলঙ্কৃত করেছিলেন। তাঁরাই বাগদাদে প্রথম কাগজের কারখানা তৈরি এবং বায়তুল হিকমাহর প্রাথমিক কাঠামো তৈরিতে অর্থায়ন করেন।

বনু মুসা ভাইদের বাবা ছিলেন একজন সাধারণ ডাকাত, যিনি পরে তওবা করে জ্যোতির্বিদ্যায় ঝুঁকেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর খলিফা আল-মামুন এই তিন ভাইকে কোনো অবজ্ঞা না করে নিজের সন্তানের মতো ‘বায়তুল হিকমাহ’-তে লালন-পালন করেন। খলিফা তাঁদের বংশমর্যাদা না দেখে তাঁদের ভেতরের অসীম কৌতূহলকে মূল্য দিয়েছিলেন। ফলাফলস্বরূপ, এই তিন ভাই পৃথিবীর ইতিহাসে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।

বায়তুল হিকমাহর অনুবাদ প্রকল্পের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল সিরীয় খ্রিষ্টান, নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান, ইহুদি এবং পারসিকদের। খলিফা মামুন বলতেন— “জ্ঞানের কোনো ধর্ম নেই, তা যেখান থেকেই আসুক তা গ্রহণ করো।” ইতিহাসবিদ জর্জি যাইদানের মতে, খলিফা আল-মামুনের দরবারে অমুসলিম পণ্ডিতদের যে গুরুত্ব ছিল, তা সমসাময়িক পৃথিবীর অন্য কোথাও কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল।

আজকের যুগে যখন আমরা ‘যোগ্যতা’র চেয়ে ‘পরিচয়’কে বেশি গুরুত্ব দিই, তখন ৮০০-৯০০ বছর আগের বাগদাদ আমাদের দেখিয়েছিল যে—একটি সভ্যতার স্বর্ণযুগ তখনই আসে, যখন রাষ্ট্রের কাছে মানুষের ‘বিশ্বাস’ বা ‘বংশ’-এর চেয়ে তার ‘মেধা’ বড় হয়ে দাঁড়ায়। বায়তুল হিকমাহ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের জয়গান গাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি; এটি তৈরি হয়েছিল মানবজাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার জন্য।

১৩ শতকে মেটেরিয়া মেডিকার আরবি অনুবাদ
১৩ শতকে মেটেরিয়া মেডিকার আরবি অনুবাদ

 

উদারতাবাদ বনাম কট্টরপন্থা:

আব্বাসীয় খিলাফতের সেই সোনালি সময়ে উদারতা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল না, বরং তা ছিল একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন। তবে এই পথটি সহজ ছিল না; প্রতিটি পদে তাঁদের কট্টরপন্থীদের মোকাবিলা করতে হয়েছে।

আগেই বলেছি, বারমাকি পরিবার ছিল আব্বাসীয় প্রশাসনের মেরুদণ্ড। তাঁরা আফগানিস্তানের বিখ্যাত ‘নও-বিহার’ বৌদ্ধ মঠের প্রধান পুরোহিতের বংশধর ছিলেন। খলিফা হারুন-অর-রশিদ যখন ইয়াহইয়া ইবনে খালিদ বারমাকিকে প্রধানমন্ত্রী বা উজির নিযুক্ত করেন, তখন আরব কট্টরপন্থীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, তাঁরা ইসলামি সংস্কৃতির ভেতরে ‘পারসিক ও বৌদ্ধ’ সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু খলিফা জানতেন, সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্নয়নের জন্য বারমাকিদের বিকল্প নেই। তাঁদের হাত ধরেই বাগদাদে প্রথম হাসপাতাল এবং কাগজ কারখানা তৈরি হয়।

খলিফা আল-মামুন প্রতি মঙ্গলবার তাঁর দরবারে একটি বিশেষ মজলিশ বসাতেন। সেখানে বিভিন্ন ধর্মের (ইহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নিপূজক, এমনকি নাস্তিক) পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। একটি শর্ত ছিল—সেখানে কেউ নিজ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারবেন না; বিতর্ক হতে হবে কেবল ‘আকল’ বা যুক্তির ভিত্তিতে। কট্টরপন্থীরা একে ‘ধর্মের অবমাননা’ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু আল-মামুন বিশ্বাস করতেন, যদি ইসলাম সত্য হয়, তবে তা যুক্তির লড়াইয়ে এমনিতেই টিকে থাকবে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাসই ছিল স্বর্ণযুগের মূল চালিকাশক্তি।

সেই সময়ে অনেক স্বাধীনচেতা দার্শনিককে (যেমন ইবনে আল-মুকাফ্ফা) কট্টরপন্থীরা ‘জিন্দিক’ বা ধর্মদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করতেন। কিন্তু খলিফারা অনেক ক্ষেত্রে এসব দার্শনিকদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিতেন। এমনকি বায়তুল হিকমাহর অনেক বড় স্কলারও সরাসরি মুতাজিলা বা যুক্তিবাদী দর্শনের অনুসারী ছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল—সৃষ্টিকর্তা মানুষকে যে ‘বিবেক’ দিয়েছেন, সেই বিবেক ব্যবহার করে প্রকৃতিকে জানাই হলো বড় ইবাদত। কট্টরপন্থীরা একে ‘বিদাআত’ বা কুসংস্কার বললেও খলিফারা বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার স্বার্থে এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দেননি।

খলিফা আল-মামুন যখন গ্রিক দর্শনের বইগুলো অনুবাদের ধুম লাগিয়ে দিলেন, তখন রক্ষণশীল দলগুলো অভিযোগ তুলেছিল যে—’মৃত কাফেরদের’ (গ্রিক দার্শনিক) আজেবাজে চিন্তা দিয়ে মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করা হচ্ছে। এর উত্তরে খলিফা একটি বিখ্যাত স্বপ্নের কথা বলতেন। তিনি দাবি করতেন, স্বপ্নে তাঁর সাথে এরিস্টটলের দেখা হয়েছে এবং এরিস্টটল তাকে বলেছেন যে, “যুক্তি এবং ওহীর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।” এটি ছিল মূলত কট্টরপন্থীদের শান্ত করার এবং বিজ্ঞান চর্চাকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার একটি রাজনৈতিক কৌশল।

মিনাহ:

আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ে (বিশেষ করে খলিফা আল-মামুনের আমলে) ‘মুতাজিলা’ বা যুক্তিবাদীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। মুতাজিলাদের অন্যতম প্রধান একটি দাবি ছিল—‘কুরআন সৃষ্টি’ (Createdness of the Quran)। তারা মনে করত, কুরআন আল্লাহর কালাম হলেও তা একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবতীর্ণ বা সৃষ্ট; এটি আল্লাহর সত্তার মতো অনাদি বা ‘নিত্য’ নয়।

অন্যদিকে, তৎকালীন কট্টরপন্থী বা ঐতিহ্যবাদী আলেমরা (যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল) মনে করতেন—কুরআন আল্লাহর অনাদি বাণী এবং এটি ‘অসৃষ্ট’।

এই তাত্ত্বিক বিতর্ক যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আল-মামুন একটি রাজকীয় ফরমান জারি করেন। তিনি আদেশ দেন যে, রাষ্ট্রের সকল আলেম, কাজী এবং কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে যে ‘কুরআন সৃষ্টি’। এই  প্রক্রিয়াটিকেই ইতিহাসে ‘মিহনা’ বলা হয়। তবে আমার দৃষ্টিতে এই কাজটি ছিল একটি প্রশাসনিক ভূল। ধর্ম বা আদর্শকে চেপে রাখতে চাইলে সেটা আরও বেগবান হয় এবং জনসমর্থন পায়।

আব্বাসীয় আমলে লিখিত বৈজ্ঞানিক পান্ডুলিপি
আব্বাসীয় আমলে লিখিত বৈজ্ঞানিক পান্ডুলিপি

 

বায়তুল হিকমায় যারা যুক্ত ছিলেণ:

প্রাথমিক যুগ: ভিত্তি স্থাপন ও অনুবাদ (৭৫০ – ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দ)

এই সময়ের পণ্ডিতরা মূলত গ্রিক, সংস্কৃত এবং পাহলভি (প্রাচীন ফারসি) ভাষা থেকে জ্ঞান আহরণ করে তা আরবিতে রূপান্তরের কাজ করতেন।

আল-ফাজারি (Ibrahim al-Fazari):

আল-ফাজারি খলিফা আল-মনসুরের দরবারের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি একজন সফল উদ্ভাবকও ছিলেণ। তাঁর কাজগুলো মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

গ্রিকরা অ্যাস্ট্রোলেব (Astrolabe) সম্পর্কে জানলেও, আল-ফাজারিই প্রথম মুসলিম বিজ্ঞানী যিনি একে অনেক বেশি উন্নত ও কার্যকর করে গড়ে তোলেন। এটি ছিল সে সময়ের ‘জিপিএস’ বা ‘কম্পিউটার’। এর মাধ্যমে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়, সমুদ্রপথে দিক নির্ণয় এবং নামাজের সময় ও কিবলা নির্ধারণ করা সহজ হয়ে যায়।

ভারতীয় পণ্ডিত কানাকার সাথে মিলে তিনি যখন ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত (সিন্ধ-হিন্দ (Zij al-Sindhind))’ অনুবাদ করেন, তখন তিনি কেবল আক্ষরিক অনুবাদ করেননি। তিনি ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার জটিল গাণিতিক সারণিগুলোকে (Tables) আরবি সংস্কৃতির উপযোগী করে সাজান। এর মাধ্যমেই আরবরা প্রথম ‘সাইক্লিক্যাল টাইম’ এবং গ্রহের গতির সূক্ষ্ম হিসাব শিখতে পারে। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে ছন্দে বা কবিতার আকারে লিখেছিলেন, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থান মুখস্থ রাখতে পারে।

ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াহ (Yuhanna ibn Masawayh):

খলিফা হারুন-অর-রশিদ যখন তাকে বায়তুল হিকমাহর প্রথম দিকের পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তখন ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াহ মূলত প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে কাজ করতেন। ইউরোপে তিনি ‘মেসু’ (Mesue) নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান, কিন্তু তাঁর যোগ্যতা তাঁকে রাজদরবারের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকে পরিণত করেছিল।

ইবনে মাসাওয়াহ বিশ্বাস করতেন কিতাব পড়ার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি জরুরি। তিনি বানর এবং অন্যান্য প্রাণীর দেহ ব্যবচ্ছেদ বা ডিসেকশন (Dissection) করে মানুষের শরীরের গঠন বা অ্যানাটমি বোঝার চেষ্টা করতেন। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ পরবর্তীকালে ইবনে সিনা বা আল-রাজির মতো চিকিৎসকদের পথ প্রশস্ত করে।

চক্ষুবিজ্ঞান (Ophthalmology) তার বড় কাজ আছে। তিনি চোখের রোগ নিয়ে আরবি ভাষায় প্রথম পদ্ধতিগত বই ‘দাগাল আল-আইন’ (Disorder of the Eye) লিখেছিলেন। মধ্যযুগের প্রায় প্রতিটি চক্ষু বিশেষজ্ঞ তাঁর এই বইটিকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতেন।

ফার্মাকোলজি বা ওষুধবিদ্যা নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তিনি উদ্ভিদ ও খনিজ দ্রব্য থেকে ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। বায়তুল হিকমাহর পরিচালক হিসেবে তিনি গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন ও হিপোক্রেটসের চিকিৎসাবিষয়ক প্রায় সকল কাজ অনুবাদ নিশ্চিত করেছিলেন।

সাহাল ইবনে হারুন (Sahl ibn Harun):

হারুন ছিলেন বায়তুল হিকমাহর প্রধান গ্রন্থাগারিক। পারস্যের পাহলভি ভাষা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও নৈতিক দর্শনের বই তিনি আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন জাতিগত পারসিক। প্রাচীন পারস্যের রাজাদের প্রশাসনিক কৌশল, নৈতিক গল্প (যেমন: কলিলা ওয়া দিমনা-র প্রভাব) এবং জীবনদর্শনকে তিনি আরবি ভাষায় নিয়ে আসেন। এর ফলে আরবরা কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়, বরং ‘রাষ্ট্র পরিচালনা’র কৌশল শিখতে শুরু করে।

হারুন মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে রসিকতা ও প্রজ্ঞার মিশেলে অনেক বই লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত একটি বই ছিল ‘কৃপণদের বই’, যেখানে তিনি মানুষের আচরণের অদ্ভুত সব দিক তুলে ধরেছেন।

খলিফা মামুনের প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসেবে তিনি পাণ্ডুলিপিগুলোকে বিভাগ অনুযায়ী সাজানো, ক্যাটালগ তৈরি করা এবং পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের উন্নত পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তাঁর অধীনেই বায়তুল হিকমাহর সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা লাখে পৌঁছেছিল।

আল খোয়ারিজমির কিতাবুল জাবর গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা
আল খোয়ারিজমির কিতাবুল জাবর গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা

 

স্বর্ণযুগ: মৌলিক উদ্ভাবন ও উৎকর্ষ (৮৩০ – ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ)

খলিফা আল-মামুনের সময় থেকে বায়তুল হিকমাহ লাইব্রেরি খেকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগারে পরিণত হয়।

মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি (Al-Khwarizmi):

তিনি গণিতশাস্ত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে ‘অ্যালগরিদম’‘অ্যালজেব্রা’-র ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘কিতাব আল-জাবর’ আধুনিক সমীকরণ সমাধানের পথ দেখায়। তিনি ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতি ও শূন্যের (০) ধারণা আরবে জনপ্রিয় করেন এবং টলেমির মানচিত্র সংশোধন করে আধুনিক ভূগোলের ভিত্তি গড়েন। তাঁর উদ্ভাবিত গাণিতিক নিয়মাবলি আজও আধুনিক কম্পিউটিং ও কোডিংয়ের প্রাণশক্তি।

হুনাইন ইবনে ইশহাক (Hunayn ibn Ishaq):

‘অনুবাদকদের সম্রাট’ হুনাইন কেবল অনুবাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন গবেষক। তিনি গ্রিক চিকিৎসা ও দর্শনের পাণ্ডুলিপিগুলো সরাসরি মূল উৎস থেকে সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আরবিতে রূপান্তর করেন। বিশেষ করে চক্ষুবিজ্ঞানে তাঁর গবেষণা ছিল অতুলনীয়। তাঁর শ্রমের ফলেই এরিস্টটল ও গ্যালেনের প্রাচীন জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং পরবর্তী মুসলিম বিজ্ঞানীদের শিক্ষার মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়।

আল-কিন্দি (Al-Kindi):

‘আরবীয় দার্শনিক’ আল-কিন্দি গ্রিক দর্শনের সাথে ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের যৌক্তিক মেলবন্ধন ঘটান। তিনি একাধারে সংগীত, আলোকবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখেন। তবে ক্রিপ্টোগ্রাফি বা গুপ্ত সংকেত উন্মোচনে তাঁর কাজ ছিল বিস্ময়কর। তিনি ‘ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা আজও সাইবার সিকিউরিটির প্রাথমিক পাঠ হিসেবে বিবেচিত হয়। দর্শনে তাঁর প্রভাব মধ্যযুগীয় ইউরোপেও সমানভাবে সমাদৃত ছিল।

বনু মুসা ভাইত্রয় (Banū Mūsā brothers):

তিন ভাই—আহমদ, মুহাম্মদ ও হাসান—ছিলেন যন্ত্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জাদুকর। তাঁদের বিখ্যাত ‘কিতাব আল-হিয়াল’ (Book of Ingenious Devices) গ্রন্থে ১০০-এর বেশি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নকশা ছিল। তাঁদের উদ্ভাবিত স্বয়ংক্রিয় বাঁশি, পানির ঘড়ি ও হাইড্রোলিক পদ্ধতি আধুনিক রোবোটিক্স ও অটোমেশনের আদি রূপ। তাঁরা প্রথম প্রমাণ করেন যে যন্ত্রের মাধ্যমে কায়িক শ্রমকে বুদ্ধিবৃত্তিক যান্ত্রিকতায় রূপান্তর করা সম্ভব।

সাবিত ইবনে কুররা (Thabit ibn Qurra):

সাবিয়ান পণ্ডিত সাবিত ইবনে কুররা জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যায় গাণিতিক নির্ভুলতা এনেছিলেন। তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতি এবং আর্কিমিডিসের গণিতকে আরও আধুনিক রূপ দেন। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ছিল স্থির নক্ষত্রের গতি এবং সূর্যগ্রহণের সময়কাল সঠিকভাবে নির্ণয়। তিনি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন এবং তাঁর উদ্ভাবিত ত্রিকোণমিতিক সূত্রগুলো পরবর্তীকালে ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য অপরিহার্য রেফারেন্সে পরিণত হয়েছিল।

পরবর্তী প্রভাব ও রূপান্তর (৯৫০ – ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ)

এই সময়ে বায়তুল হিকমাহর প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমলেও সেখানে তৈরি হওয়া জ্ঞানভাণ্ডার পরবর্তী বিজ্ঞানীদের পথ দেখিয়েছে।

আল-বাত্তানি (Al-Battani):

ইউরোপে ‘আলবাটেগনিয়াস’ নামে পরিচিত এই বিজ্ঞানী আধুনিক ত্রিকোণমিতির (Trigonometry) প্রকৃত স্থপতি। তিনি গ্রিকদের জ্যামিতিক পদ্ধতির বদলে সাইন, কোসাইন এবং ট্যানজেন্টের গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করেন। তাঁর অত্যন্ত নির্ভুল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণিগুলো ইউরোপের রেনেসাঁ যুগে কোপার্নিকাস ও টাইকো ব্রাহেকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সৌরবছরের দৈর্ঘ্য যে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড—এই নিখুঁত হিসাবটি তিনিই প্রথম প্রদান করেন।

আল-সুফি (Abd al-Rahman al-Sufi):

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে আল-সুফি একজন প্রবাদপ্রতিম পর্যবেক্ষক। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘কিতাব আল-কাওয়াকিব’ (Book of Fixed Stars), যেখানে তিনি ১,০১৭টি নক্ষত্রের অবস্থান ও উজ্জ্বলতা ম্যাপ করেছিলেন। তিনিই প্রথম মানব ইতিহাসের নথিপত্রে ‘অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি’-কে একটি ‘ছোট মেঘ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। নক্ষত্রপুঞ্জের নামকরণে তাঁর দেওয়া আরবি নামগুলো আজও আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে (যেমন: আলতাঈর, রিগেল) অপরিবর্তিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বনু শাকির (Banu Shakir):

বনু মুসা ভাইদের উত্তরসূরি হিসেবে বনু শাকির পরিবার বায়তুল হিকমাহর জ্ঞানভাণ্ডারকে ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণায় কাজে লাগিয়েছিলেন। তাঁরা মূলত ভূ-মিতি (Geodesy) এবং গণিতে অসামান্য পারদর্শী ছিলেন। খলিফার নির্দেশে তাঁরা সিন্ধু ও মেসোপটেমিয়ার মরুভূমিতে নক্ষত্রের উচ্চতা মেপে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে পৃথিবীর পরিধি (Circumference) নির্ণয় করেন। তাঁদের সেই হিসাব আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তির মানের খুব কাছাকাছি ছিল, যা সে সময়ের যন্ত্রপাতির সাপেক্ষে একটি বিস্ময়কর অর্জন।

ইবনে সিনা বা আল-বিরুনির মতো বিখ্যাত পণ্ডিতরা সরাসরি বায়তুল হিকমাহর বেতনভুক্ত কর্মী ছিলেন না, কারণ তাঁরা বাগদাদের বাইরের বিভিন্ন রাজদরবারে কাজ করতেন। তবে তাঁরা প্রত্যেকেই বায়তুল হিকমাহ থেকে অনূদিত ও সংরক্ষিত বইগুলোর মাধ্যমেই নিজেদের শিক্ষিত করে তুলেছিলেন।

 

ইসলামের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ; উপর থেকে ঘরির কাটার দিকে: আল-জাহরাবী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আল-বেরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনুন নাফিস, আল-খারেজমি, ইবনুল হায়সাম, ইবনে খালদুন
ইসলামের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ; উপর থেকে ঘরির কাটার দিকে: আল-জাহরাবী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আল-বেরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনুন নাফিস, আল-খারেজমি, ইবনুল হায়সাম, ইবনে খালদুন

 

 

বায়তুল হিকমাহর পতন

আমি চিন্তা করেছিলাম এটা নিয়ে আলাদা একটা লেখা লিখব; তবে কিছু পাঠকের সুবিধার্থে এখানে কিছু বিষয় উল্লেখ করে যাই। অনেকে মনে করেন ১২৫৮ সালে মঙ্গোল আক্রমণে দজলা নদীর পানি রক্ত আর বইয়ের কালিতে কালো হয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই বুঝি মুসলিম স্বর্ণযুগের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, আব্বাসীয় খিলাফতের সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত তার অনেক আগেই ধসে গিয়েছিল।

মুতাজিলা বনাম আশারি দ্বন্দ্ব এবং বৌদ্ধিক স্থবিরতা:

আব্বাসীয় খিলাফতের শুরুতে খলিফা আল-মামুনদের হাত ধরে যে ‘মুতাজিলা’ (Rationalism) দর্শনের উত্থান হয়েছিল, তা ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু দশম শতকের পর থেকে আশারি (Ash’ari) দর্শনের প্রভাবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইমাম আবুল হাসান আল-আশারি এই মতবাদের প্রবক্তা। তাঁর অনুসারীরা মনে করতেন গ্রিক দর্শন ইসলামকে কলুষিত করছে। আশারিরা যুক্তি ও দর্শনের চেয়ে কিতাব এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যার ওপর বেশি জোর দেয়। তারা মুতাজিলাদের ‘বিপথগামী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। এর ফলে বায়তুল হিকমাহর সেই মুক্তবুদ্ধির বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত চাপের মুখে পড়েন। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত গবেষণা ও আলোচনার পরিবেশ হারিয়ে যায়। অনেক ইতিহাসবিদ (যেমন নিল ডিগ্রাস টাইসন) মনে করেন গাজ্জালির দর্শনের জয়ই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানের পতনের প্রধান কারণ।

ইমাম গাজ্জালির ভূমিকা ও দর্শনের পরাজয়:

স্বর্ণযুগের পতনের আলোচনায় ইমাম গাজ্জালির ‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’ (The Incoherence of the Philosophers) গ্রন্থটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। তিনি এই বইতে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল এবং তাঁদের অনুসারী ইবনে সিনা বা আল-ফারাবিদের মতো দার্শনিকদের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি যুক্তি ও কার্যকরণ সম্পর্ককে (Causality) খণ্ডন করে বলেন, সবকিছুই সরাসরি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় ঘটে, এখানে বিজ্ঞানের কোনো স্থায়ী নিয়ম নেই। তাঁর এই প্রভাবশালী চিন্তাধারা মুসলিম মানসকে বিজ্ঞান ও দর্শনের পথ থেকে সরিয়ে কেবল ধর্মতত্ত্বের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা তখন ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘ক্ষতিকর’ মনে করা হতে থাকে।

আহমেদ ইবনে মুসা ইবনে শাকিরের যন্ত্রবিষয়ক বইয়ে স্বয়ংক্রিয় বাতির চিত্র
আহমেদ ইবনে মুসা ইবনে শাকিরের যন্ত্রবিষয়ক বইয়ে স্বয়ংক্রিয় বাতির চিত্র
ইতিহাস থেকে মুতাজিলাদের মুছে দেওয়া:

একটি করুণ সত্য হলো, আজ আমরা মুতাজিলাদের প্রকৃত চিন্তাগুলো তাঁদের নিজেদের বই থেকে জানতে পারি না। কারণ, পরবর্তী কট্টরপন্থী শাসনামলে তাঁদের অধিকাংশ গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা বা ধ্বংস করা হয়েছিল। আজ মুতাজিলাদের সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তার সিংহভাগই তাদের বিরোধী পক্ষ ‘আশারি’দের লেখা সমালোচনা থেকে নেওয়া। অর্থাৎ, কোনো এক সময়ের প্রভাবশালী এক প্রগতিশীল গোষ্ঠীকে ইতিহাস থেকে প্রায় মুছেই দেওয়া হয়েছে।

রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব:

খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের সময় থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে মুতাজিলাদের ওপর চাপ শুরু হয়। যখন বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তা ও আর্থিক বৃত্তি বন্ধ হয়ে গেল, তখন বায়তুল হিকমাহ একটি জীবন্ত জ্ঞানকেন্দ্র থেকে স্রেফ একটি সাধারণ লাইব্রেরিতে পরিণত হলো। বিজ্ঞানের পরিবর্তে মাদ্রাসাগুলোতে তখন কেবল ফিকাহ ও কালামশাস্ত্রের প্রাধান্য বাড়তে থাকে।

শেষ আঘাত: মঙ্গোল আক্রমণ (১২৫৮):

হালাকু খাঁ যখন বাগদাদে প্রবেশ করেন, তখন বায়তুল হিকমাহ ছিল একটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান। মঙ্গোলরা যখন এর বইগুলো দজলা নদীতে ফেলে দিল, তখন তারা আসলে একটি দীর্ঘমেয়াদী বৌদ্ধিক আত্মহত্যার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল। দজলার পানি কালিতে কালো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই কালির ম্লান হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে থেকেই।

হুলাগু খান (হালাকু) কর্তৃক বাগদাদ অবরোধ
হুলাগু খান (হালাকু) কর্তৃক বাগদাদ অবরোধ

 

কেন আর সেরকম সময় একবারও আসেনি মুসলিমদের ইতিহাসে?

এবার একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন। কেন আর সেরকম সময় একবারও আসেনি মুসলিমদের ইতিহাসে? আমি জানি, জবাব আপনি ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন।

আজ আমরা আরব-পারস্যের মুসলিমদের সেই স্বর্ণযুগ নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত; গর্ব করার বিষয়ই বটে। আমরা নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে সেটির অংশ না হলেও ‘ফেলো মুসলিম’ হিসেবে তা আমাদের ভালো লাগা জোগায়।

কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এমন কোনো বিষয় নয় যে, একবার আবিষ্কার করে ফেললেই তা দিয়ে যুগের পর যুগ চলে যাবে। সেই সময়ে আমাদের অনেক অবদান থাকলেও, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের অবদান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অতীত ইতিহাস বাদে আমাদের বর্তমানে গর্ব করার মতো আর কিছুই নেই।

তাই আসুন, আজ অতীত ইতিহাসের গর্বকে পুঁজি করে আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরির প্রতিজ্ঞা করি, যেখানে আবার ‘বায়তুল হিকমাহ’-র মতো জ্ঞানকেন্দ্র গড়ে উঠবে; মনসুর-হারুন-মামুনের খিলাফতের মতো মুক্ত জ্ঞানচর্চার একটি সোনালি সময় আবারও ফিরিয়ে আনা যাবে।

*** এছাড়া জের, জবর, নুুুুুুুুক্তার ভুলের মতো কিছু ‘ট্রিভিয়াল ইস্যু’ (Trivial issues) আলোচনায় এসেছে। সেগুলোর ব্যাখ্যা ওখানেই হয়ে গেছে বলে আমি আর সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখলাম না।”

আল ইদ্রিসি কর্তৃক অঙ্কিত পৃথিবীর মানচিত্র (১২ শতক), এতে উপরের দিকে দক্ষিণ দিক নির্দেশিত হয়েছে
আল ইদ্রিসি কর্তৃক অঙ্কিত পৃথিবীর মানচিত্র (১২ শতক), এতে উপরের দিকে দক্ষিণ দিক নির্দেশিত হয়েছে

 

এই লেখায় উল্লেখিত ঘটনাগুলোর রেফারেন্স সহ বিস্তারিত জানতে আরও দেখুন:

১. সাধারণ ইতিহাস ও ‘ইসলামি স্বর্ণযুগ’ (The Islamic Golden Age)

  • Al-Khalili, Jim. (2010). The House of Wisdom: How Arabic Science Saved Ancient Knowledge and Gave Us the Renaissance. (বিজ্ঞান ও দর্শনের বিকাশের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ)।
  • Morgan, Michael Hamilton. (2007). Lost History: The Enduring Legacy of Muslim Scientists, Thinkers, and Artists. (স্বর্ণযুগের অর্জন নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ)।
  • Starr, S. Frederick. (2013). Lost Enlightenment: Central Asia’s Golden Age from the Arab Conquest to Tamerlane. (পারস্য ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিতদের অবদান নিয়ে)।

২. বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) ও আব্বাসীয় খিলাফত

  • Gutlas, Dimitri. (1998). Greek Thought, Arabic Culture: The Graeco-Arabic Translation Movement in Baghdad and Early ‘Abbasid Society. (অনুবাদ আন্দোলন এবং খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতা বোঝার জন্য প্রধান রেফারেন্স)।
  • Kennedy, Hugh. (2004). When Baghdad Ruled the Muslim World: The Rise and Fall of Islam’s Greatest Dynasty. (আব্বাসীয় খিলাফতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস)।
  • Lyons, Jonathan. (2009). The House of Wisdom: How the Arabs Transformed Western Civilization.

৩. বিশেষ পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের অবদান

  • Saliba, George. (2007). Islamic Science and the Making of the European Renaissance. (জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত স্পেনে হয়ে ইউরোপে যাওয়ার তথ্য)।
  • Rashed, Roshdi. (1994). The Development of Arabic Mathematics: Between Arithmetic and Algebra. (আল-খোয়ারিজমি ও বীজগণিতের ইতিহাস)।
  • Pormann, Peter E. & Savage-Smith, Emilie. (2007). Medieval Islamic Medicine. (হুনাইন ইবনে ইশহাক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশ)।

৪. ভারতের অবদান ও ‘সিন্ধ-হিন্দ’ (Indian Influence)

  • Pingree, David. (1970). The Fragments of the Works of Al-Fazari. (ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যার আরবিতে অনুবাদ ও আল-ফাজারির ভূমিকা)।
  • Al-Biruni. Kitab fi Tahqiq ma l-Hind (Alberuni’s India). (প্রাচীন ভারতে জ্ঞানের আদান-প্রদান নিয়ে আল-বিরুনির ক্লাসিক রেফারেন্স)।

৫. মিহনা, মুতাজিলা বনাম আশারি দ্বন্দ্ব এবং ইমাম গাজ্জালি

  • Cooperson, Michael. (2005). Al-Ma’mun. (মিহনা বা ইনকুইজিশন নিয়ে বিস্তারিত জীবনী)।
  • Zaman, Muhammad Qasim. (1997). Religion and Politics Under the Early ‘Abbasids.
  • Al-Ghazali. Tahafut al-Falasifa (The Incoherence of the Philosophers). (মৌলিক টেক্সট হিসেবে ইমাম গাজ্জালির দর্শনের জন্য)।
  • Adamson, Peter. (2016). Philosophy in the Islamic World. (আশারি ও মুতাজিলা বিতর্কের নিরপেক্ষ একাডেমিক বিশ্লেষণ)।

৬. মঙ্গোল আক্রমণ

  • Tyson, Neil deGrasse. (তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা ও পডকাস্টে ইমাম গাজ্জালি ও স্বর্ণযুগের পতন নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন)।
  • Saunders, J. J. (1971). The History of the Mongol Conquests. (বাগদাদ পতন ও পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ)।

 

৭. বারমাকি পরিবার ও বৌদ্ধ প্রভাব

  • Van Bladel, Kevin. (2011). The Arabic Hermes. (বারমাকি পরিবারের পারস্য ও বৌদ্ধ প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা)।

অতিরিক্ত অনলাইন ডাটাবেস:

  • The UNESCO Courier: “The Islamic Golden Age” সংখ্যাগুলো।
  • Muslim Heritage (muslimheritage.com): বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম অবদানের একটি বিশাল অনলাইন রিসোর্স।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment