উৎসব নিয়ে ইসলামিক বিতর্ক – মরীচিকা ধরতে – একই রাস্তায়, একই পদ্ধতিতে অবাস্তব যুদ্ধ | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

সভ্যতা মানেই উৎসবের পরম্পরা, আর ধর্ম মানেই আত্মার প্রশান্তি। কিন্তু আমাদের দক্ষিণ এশীয় মুসলিম মানসে এই দুইয়ের মিলনস্থলটি প্রায়শই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রতি বছর যখনই কোনো জাতীয় বা ঋতুভিত্তিক উৎসব (যেমন: পহেলা বৈশাখ) আসে, অমনি শুরু হয় ফতোয়া আর পাল্টা ফতোয়ার লড়াই। অদ্ভুত বিষয় হলো, যে ইসলাম মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এনেছিল, সেই ইসলামের রক্ষক দাবিদারদের একাংশ আজ আলোকসজ্জা কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আলঙ্কারিক বিষয়গুলো নিয়ে যতটা বিচলিত, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অনাচার নিয়ে ততটাই নিস্পৃহ। আমরা যেন এক অন্তহীন মরীচিকার পেছনে ছুটছি, যেখানে গন্তব্য নেই, আছে কেবল একই ভুল পথের বারবার পুনরাবৃত্তি।

উৎসব নিয়ে ইসলামিক বিতর্ক - মরীচিকা ধরতে - একই রাস্তায়, একই পদ্ধতিতে অবাস্তব যুদ্ধ ..

এসব হলে একটা উর্দু কবিতা আমার বারবার মনে পড়ে:

কাশতি ভি নেহি বাদলি, দারিয়া ভি নেহি বাদলা
হাম ডুবনেয়ালোকা জাজওয়া ভি নেহি বাদলা ।
হ্যায় শওখ-এ-সাফর এয়সা, ইক উমর সে ইয়ারোনে
মনজিল ভি নেহি পায়ী, রাস্তা ভি নেহি বাদলা ।
খাবো কি জাজিরে কা, নাকশা ভি নেহি বাদলা ।

 

অর্থাৎ, নৌকা বদলায়নি, নদীও নয়; এমনকি আমাদের ডুবে যাওয়ার জেদও বদলায়নি। সফরের শখ এমন যে, যুগের পর যুগ কেটে গেল—না পেলাম গন্তব্য, না বদলালাম পথ। স্বপ্নের সেই মানচিত্রটা আজও একই রয়ে গেছে।

অনেকদিন আগে এক “ধর্ম ও রাজনীতি” নিয়ে আলোচনায়, এক মুসলিম বন্ধু, আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে এই উর্দু কবিতা শুনিয়েছিলেন। কবি সম্ভবত গোলাম কাসির। পরে এক বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের একটি অনুষ্ঠানে আরেফ খান সাহেবের মুখেও একবার শুনলাম।

হজরত মুসা (আ:) মহান আল্লাহকে বলেছিলেন- হে আল্লাহ আপনি যদি আমার উম্মতের উপরে অসন্তুষ্ট হন, তবে যে সাজাই দেন, তাদের বিবেক-বুদ্ধি কেড়ে নেবেন না। উত্তরে মহান আল্লাহ বলেছিলেন – মুসা, আমি নাখোশ হলে তু শুধু বুদ্ধিটাই ফিরিয়ে নেই। বাকি তো সব এমনিতেই চলে যায়।

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 উৎসব নিয়ে ইসলামিক বিতর্ক - মরীচিকা ধরতে - একই রাস্তায়, একই পদ্ধতিতে অবাস্তব যুদ্ধ | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

 

আজকের ধর্মীয় বাহাসগুলোর দিকে তাকালে এই কথাটিই ধ্রুব সত্য মনে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে যা ‘ফান্ডামেন্টাল’ বা মৌলিক—যেমন ন্যায়বিচার, সততা এবং মানবিকতা—তা আজ গৌণ হয়ে পড়েছে। অথচ যা ‘ট্রিভিয়াল’ বা লৌকিক আচার, তা নিয়ে চলছে অবাস্তব যুদ্ধ।

তথ্য ও প্রামাণিক প্রেক্ষাপট

কেন এই যুদ্ধকে ‘অবাস্তব’ বলছি? নিচের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে তা স্পষ্ট হবে:

১. শরিয়তের মানদণ্ড বনাম অগ্রাধিকার (Fiqh of Priorities):

ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো ‘ফিকহুল আওলাউইয়াত’ বা অগ্রাধিকারের জ্ঞান। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এবং আধুনিক স্কলার ড. ইউসুফ আল-কারজাভি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, বড় পাপ (যেমন: জুলুম, দুর্নীতি, মিথ্যাচার) দমনের চেয়ে ছোটখাটো লৌকিক বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বছর বৈশাখ বা নবান্ন এলে যে পরিমাণ ফতোয়া বর্ষিত হয়, ব্যাংক লুট বা বাজার সিন্ডিকেটের মতো ‘হারাম’ কাজগুলো নিয়ে তার কিয়দংশও দেখা যায় না।

২. সংস্কৃতি ও ধর্মের সীমানা:

ইসলামি ইতিহাসে পারস্যের ‘নওরোজ’ (নববর্ষ) উৎসব নিয়ে বড় বড় ফকীহদের অবস্থান ছিল নমনীয়, যদি তাতে ঈমানবিরোধী শিরক না থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে উৎসবের আড়ালের ‘সংস্কৃতি’ আর ‘ধর্মকে’ গুলিয়ে ফেলে এমন এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যা কেবল বিভেদই বাড়ায়।

৩. সামাজিক সূচক বনাম ধর্মীয় প্রচার:

বর্তমানে বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যার হার বাড়লেও সামাজিক অপরাধের হার (যেমন: নারী নির্যাতন ও ঘুষ) কমেনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর তথ্যমতে, সেবা খাতে দুর্নীতির হার এখনও উদ্বেগজনক। অথচ জুমার খুতবা কিংবা ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় উৎসব পালন হারাম কি না, সেই বিতর্কে।

আমরা একই নৌকায় চড়ে একই ভুল পথে বছরের পর বছর পাড়ি দিচ্ছি। উৎসবের রং নিয়ে বিতর্ক করতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি সেই মহান সত্য—ধর্ম কেবল কিছু আচারের নাম নয়, ধর্ম হলো উন্নত চরিত্রের প্রতিফলন। বিবেকহীন এই সমাজ যদি উৎসবের মঙ্গল প্রদীপ নেভানোর চেয়ে দুর্নীতির অন্ধকার তাড়াতে বেশি সচেষ্ট হতো, তবেই মুসা (আ.)-এর সেই প্রার্থিত ‘বুদ্ধি’র সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যেত।

মরীচিকার পেছনে এই অবাস্তব যুদ্ধ বন্ধ না হলে, আমাদের নৌকা ডুববে ঠিকই, কিন্তু আমরা গন্তব্যের দেখা কোনোদিনই পাব না।

 

আরও দেখুন: