২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষ হঠাৎ করেই অদ্ভুত এক নাটক শুরু করেছিল—“এ কাদের, সে কাদের নয়” বলে পানি ঘোলা করার চেষ্টা। যেন পুরো জাতি, আদালত, সাক্ষ্য-প্রমাণ—সবই ভুল, আর তারাই একমাত্র সত্যের অধিকারী!
প্রথমে দুটো ছবির প্রমাণ দেই। তারপর অন্য আলাপে আগাই।
ছবি নম্বর ১: ১৯৭১ সালে নিয়াজির পেছনে দাঁড়িয়ে কাদের মোল্লা

ছবি নম্বর ২: যে ছবি কাদের মোল্লা নিজে ৬৮ থেকে ৭০ পর্যন্ত বিভিন্ন অফিশিয়াল কাজে ব্যবহার করেছে

এখন ছবি দুটো মিলিয়ে নেন। এরপর কি বলবেন – উনি নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের অফিশিয়াল কাজ অন্য লোকের ছবি দিয়ে করতেন?
প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা দরকার—কাদের মোল্লা কোনো “ভুল বোঝাবুঝির শিকার” ব্যক্তি ছিলেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনা একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। পল্লব নামের এক ছাত্রকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করে গুলি করে হত্যা, কবি মেহেরুন্নেসা ও তার পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা, সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে জবাই করে হত্যা, এবং আলুব্দী গ্রামে গণহত্যার মতো অপরাধ—এসব কোনো গুজব নয়, এগুলো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এই সব অপরাধের পরও কারা এবং কেন “এ কাদের, সে কাদের নয়” বলে বিভ্রান্তি ছড়াতে চেয়েছিল?
এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল খুবই স্পষ্ট—একজন প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধীকে নির্দোষ প্রমাণ করা এবং ইতিহাসকে বিকৃত করা। তারা কখনো বলেছে, কাদের মোল্লা নাকি ১৯৭১ সালে মিরপুরেই ছিলেন না! আবার কখনো দাবি করেছে, তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন! অথচ একই সময়ে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা তার মৃত্যুকে “পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ততার শাস্তি” বলে আখ্যা দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—যে ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা, তাকে পাকিস্তান কেন তাদের “বিশ্বস্ত সহচর” হিসেবে স্বীকার করবে?
আরও মজার বিষয় হলো, যারা “এ কাদের, সে কাদের নয়” তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, তারা কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। বরং আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, নির্যাতিতদের বর্ণনা, এবং ঐতিহাসিক দলিল। ফজর আলী, ফিরোজ আলী, মোমেনা বেগমের মতো সাক্ষীরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরেছেন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে কাদের মোল্লার নৃশংসতা—মানুষকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন, আঙুল কেটে ফেলা, জবাই করা, এমনকি মৃতদেহ ঝুলিয়ে রেখে আতঙ্ক ছড়ানো।
মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজের চোখের সামনে তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা হতে দেখেছেন, নিজেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার বর্ণনা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটি এক নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ, যা আদালত গ্রহণ করেছে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাহলে যারা এই সব সাক্ষ্যকে অস্বীকার করে, তারা আসলে কাদের পক্ষ নিচ্ছে?
এখন আসা যাক “ভুল মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে” এই হাস্যকর দাবির প্রসঙ্গে। যদি সত্যিই কাদের মোল্লা সেই ‘কসাই কাদের’ না হতেন, তাহলে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা কেন তার মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করল? কেন তাকে “পাকিস্তানের প্রতি বিশ্বস্ত” বলে উল্লেখ করা হলো? কেন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান তাকে তাদের “সহচর” হিসেবে আখ্যায়িত করল? এসব প্রশ্নের উত্তর যারা “এ কাদের, সে কাদের নয়” বলে চিৎকার করে, তারা কখনো দেয় না।
এখানেই তাদের ভণ্ডামি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে তারা বলে কাদের মোল্লা নির্দোষ, অন্যদিকে তার পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কান্নাকাটি করে ঠিক সেই শক্তিগুলো, যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। অর্থাৎ, সত্যটা খুবই পরিষ্কার—কাদের মোল্লা কে ছিলেন, সেটা তার শত্রু-মিত্র উভয় পক্ষই জানত; শুধু কিছু লোক ইচ্ছাকৃতভাবে সেটা অস্বীকার করার ভান করেছে।
বাস্তবতা হলো, কাদের মোল্লা ছিলেন একজন প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী, একজন ঘৃণিত রাজাকার, যিনি ১৯৭১ সালে নিরীহ বাঙালিদের ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন। তার ফাঁসি কোনো অন্যায় নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের বাস্তবায়ন। আর যারা এই সত্যকে অস্বীকার করে “এ কাদের, সে কাদের নয়” বলে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তারা মূলত ইতিহাসের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়।
অতএব, ইতিহাসকে বিকৃত করার এই অপচেষ্টা যতই করা হোক না কেন, সত্য একটাই—কাদের মোল্লা সেই কসাই কাদেরই, যার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এবং যার শাস্তি নিশ্চিত করেছে এই দেশের বিচারব্যবস্থা। তার পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা আসলে অপরাধ ঢাকার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
