শচীন ভৌমিক আমার প্রিয় লেখকদের একজন। খুব ছোটবেলায় অন্যরকম আগ্রহ থেকে পড়ে ফেলেছিলাম তাঁর “ফর অ্যাডাল্টস অনলি”। অসংখ্য বই কিনলেও এই জীবনে আমার আর বইয়ের সংগ্রহশালা হলো না; অন্যসব বইয়ের মতো সেই প্রিয় বইটি কেন জানি হারিয়ে গিয়েছিল। আজ এক সুহৃদ ভদ্রলোক আমাকে বইটি উপহার দিলেন। আমার মনে হলো, হারানো রত্ন ফিরে পাওয়ার এই আনন্দ একা উপভোগ না করে আপনাদের সাথে ভাগ করে নিই। আজ দিচ্ছি এই সংগ্রহের অন্যতম মর্মস্পর্শী ও ট্র্যাজিক একটি গল্প “একটি ডেড্ লেটারের ইতিহাস”।
শচীন ভৌমিকের ‘একটি ডেড্ লেটারের ইতিহাস’ গল্পটি মূলত এক ব্যর্থ চিঠির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দুটি জীবনের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনী। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ‘অলক’ নামক এক পিতৃ-মাতৃহীন যুবক, যে তার দূর সম্পর্কের দিদি ‘সুধাদি’র কাছে খুঁজে পেয়েছিল হারানো স্নেহের আশ্রয়। কিন্তু এই নির্মল ভাই-বোনের সম্পর্ককে বিকৃত মনস্তত্ত্ব দিয়ে বিষিয়ে তোলেন সুধাদির স্বামী, সাইকোলজি ও সেক্সোলজির অধ্যাপক গৌতম মিত্র। তাঁর সন্দেহ আর কুৎসিত মানসিকতার চাপে অলককে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে হয় এবং সুধাদিকেও বাধ্য হয়ে কঠোর হতে হয়। অনেক পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে গৌতম মিত্র অলককে ক্ষমা চেয়ে যে চিঠিটি লিখেছিলেন, তা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি—ঠিকানা হারিয়ে সেটি হয়ে যায় ‘ডেড্ লেটার’। সময়মতো চিঠিটি না পৌঁছানোর ফলে একদিকে সুধাদি বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারান, আর অন্যদিকে প্রিয় দিদির দেওয়া মিথ্যা কলঙ্ক সইতে না পেরে অলক হয়ে যায় উন্মাদ। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে একটি সাধারণ চিঠির ব্যর্থতা কীভাবে দুটি জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে, লেখক এখানে তার এক নিপুণ ও বেদনাবিধুর চিত্র এঁকেছেন।
চলুন পড়ে নিই…
একটি ডেড্ লেটারের ইতিহাস – শচীন ভৌমিক
চিঠিটা অনেক পোস্টঅফিসের ছাপ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ডেড্ লেটার অফিসে চলে এলো। না,চেষ্টা সত্ত্বেও উদ্দিষ্ট লোককে খুঁজে পাওয়া গেল না,চিঠিটার মধ্যে প্রেরকের ঠিকানাও ছিল না যে ফেরত যাবে। শেষ পর্যন্ত ওরা নষ্ট করেই ফেলল। বক্তব্যের করুণ আবেদনে ওদের বেদনাবোধ করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না।
বক্তব্যটা এই:
‘ভাই অলক, এই চিঠি পাওয়ামাত্র তুমি চলে এসো। তোমাকে ডাকবার মুখ আমার নেই, সে অধিকার আমি নিজেই হারিয়েছি। কিন্তু তোমার সুধাদির মুখ চেয়ে তুমি এসো। তুমি না এলে ও বাঁচবে না। সব অপরাধ মার্জনা করে তুমি চলে এসো ভাই। মনে রেখো,সুধাদি তোমাকে যে আঘাত দিয়েছে, সেটা আমার ওপর অভিমান করেই। যত আঘাত ও তোমাকে দিয়েছে, তার চেয়ে বেশী আঘাত পেয়েছে নিজে।
তোমার বোঝবার ক্ষমতা আছে তাই বিশ্বাস করি সব বুঝে তুমি আসবে। তোমার সুধাদি শয্যাশায়ী, ওষুধপথ্য কিছু খাচ্ছে না। খালি তোমার নাম করছে, তুমি না এলে কিছু মুখে তুলবে না। ‘অলককে ডেকে পাঠাও, ও ভুল বুঝেছে আমাকে। ওকে সব না বলে মরে আমি শান্তি পাব না। ওকে জানাতেই হবে কোনদিন ওকে ভুলবুঝি নি, ওকে জানাতেই হবে।–সব সময় ওর মুখে শুধু এই। পত্রপাঠ চলে এসো ভাই তোমার সুধাদিকে বাঁচাও।
– ইতি গৌতম মিত্র।’
চিঠিটার ওপর পুণা পোস্টাঅফিসের ছাপ দেখে শুধু এইটুকু অনুমান করা চলে পুণাতে পোস্ট হয়েছে এটা। পুণা হচ্ছে প্রেরকের আবাসস্থল্ কি ওই পর্যন্তই।
চিঠিটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হল। ডেড্ লেটারের শেষ স্বর্গ। ব্যর্থ প্রচেষ্টার অন্তিম সমাধি।
এই ডেড্ লেটারের ইতিহাস আমি লিখতে বসেছি। কি করে জানলাম? সদ্য আলাপ হয়েছে ডেড্ লেটার অফিসের ক্লার্ক সুধীন দত্তের সঙ্গে। গল্পচ্ছলে ওঁকে বলেছিলাম,–‘কত বিচিত্র চিঠি পান, কত হাসিকান্না অশ্রু হয়তো এই সব গরঠিকানার চিঠিতে কবরিত হয়ে যায়। বলুন না দু’তিনটে চিঠির বক্তব্য, আমার গল্পের খোরাপ হয়ে যাবে।’
সুধীনবাবু তিন চারটে চিঠির রহস্য বলেছিলেন আমাকে। এমনি বলতে বলতে তিন বছর আগে পাওয়া এই চিঠিটার কথা উল্লেখ করেন উনি। শুনে আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম। কেননা, অলকের পুরো কাহিনী আমি জানি। আমি জানি এ চিঠি যথা সময়ে পেলে অলক হয়তো হয়তো —
কিন্তু এখন আর ওকে জানিয়ে লাভ নেই, বড় দেরি হয়ে গেছে। অলক যে এখন,–
আচ্ছা, গোড়া থেকেই শুনুন–
পুণা স্টেশনে নেমে কেমন অসহায় মনে হল নিজেকে। হবে না? কোলকাতার বাইরে কি অলক পা দিয়েছে এর আগে? বাসে উঠে যাওয়া অসুবিধে। বাঃ, এগুলো তো বেশ। মোটর-সাইকেল রিকশা। এত চেপেই যাওয়া যাক, অলক ভাবল। তারপর ভাঙা হিন্দীতে কোনমতে বোঝালো ওকে ঠিকানা। লক্ষ্মী রোড দিয়ে গেলে কলেজ কি পড়ে একটা, তার পাশের গলি দিয়ে গিয়ে পৌছবে পার্বতী মন্দিরের নিচে। মাসিমা ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিলেন সুধাদির,মেসোমশাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন রাস্তাঘাট। নিজে যা বুঝেছে তাই যথাসাধ্য স্কুটার চালককে বুঝিয়ে দিল অলক।
তারপর ছোট্ট সুটকেসটা নিয়ে গিয়ে দুরুদুরু বুকে বসল ভেতরে। সুধাদি চিনতে পারবেন তো? আর সুধাদির বর গৌতমদা? নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন। পাড়ার সম্পর্কে দিদি হলে কি হবে, সুধাদির বিয়েতে কে এমন খেটে ছিল অলকের মতো? সুধাদির জামাই বাবু যে অত কর্মী লোক, তিনিও তারিফ করেছিলেন অলককে। বলেছিলেন,–কে বলেছে সুধার ভাই নেই, এই শালা রয়েছে জবরদস্ত। কি হে অলক, শালা বনতে এসেছো অ্যাঁ, হাঃ হাঃ। কিন্তু না, সুধাদির ঘাড়ে বেশীদিন থাকবে না অলক। পরিতোষ যে কাজ দেবে বলেছে, সে কাজ শুরু করেই পরিতোষ মারফত নিজে কোন মেস বোর্ডিং-এ উঠে যাবে। শুধু দশ পনেরো দিন।
শেষ পর্যন্ত ঠিক দরজায়ই টোকা মারল অলক। দরজা খুলে দিলেন সুধাদি স্বয়ং। এক মুহূর্ত, তারপর হাসিমুখে চেঁচিয়ে উঠলেন সুধাদি,–আরে অলক না?
ঢিপ করে প্রণাম করলে অলক,–হ্যাঁ সুধাদি, আমি।
–ভেতরে এসো,–সুধাদি ঘরে ডাকলেন অলককে। একটা ফুটফুটে ফ্রক পরা মেয়ে এসে সুধাদির গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
–আরে রুমি, অত লজ্জা কিসের, অলক মামা তোর।
গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করল অলক,–গৌতমদা কোথায়?
–ও বাজারে গেছে, এক্ষুনি ফিরবে। তুমি ততক্ষণে কাপড়জামা ছেড়ে নেয়ে নাও তো।
–আরে,–হঠাৎ অলকের মাথার দিকে নজর পড়ল সুধাদির,–মাথাটা ওরকম কাকের বাসা করে রেখেছো কেন? সময় মতো চুলও ছাঁটতে পারো না? ছেলেদের মাথায় চুলের ঝোপ আমি দু চোখ দেখতে পারি না। যাক, আজ অনেক ট্রেন জার্নি করে এসেছো আজ থাক। কাল সকালে উঠেই প্রথম কাজ চুল ছাঁটবে, বুঝেছো?
অলক দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো। তারপর মুখ তুলে কান্না ভেজা কণ্ঠে বলল,–সুধাদি। দু’চোখ বেয়ে ওর জল গড়িয়ে পড়ল সুধাদি অবাক। ওকি, ওকি অলক, কাঁদছ কেন অলক,–অপ্রস্তুত আর কাকে বলে।
–জানো সুধাদি, আমার দিদি, আমার দিদি ঠিক এমনি করেই বলত আমাকে। চুল বড় হলেই আমার জ্বর হয় তাই দিদি চুল বড় হতে না হতেই ধমকাতো। বলত চুল ছেঁটে না এলে খেতে পাবে না। দিদি মারা যাওয়ার পর একথা আর কেউ বলে নি কোনদিন। আর আজ তুমি—বলতে বলতে আবার টলটল করে উঠল অলকের চোখ।
সুধাদি সামনে এসে দু’হাতে হাত চেপে ধরল ওর,–তাতে কাঁদবার কি হয়েছে অলক। আমিও তো তোমার দিদি। তোমার হরানো দিদি মনে করো অলক। কেঁদো না, লক্ষ্মী ভাই আমার, যাও শীগগির আগে চান করে এসো। যাও—
ফিক করে হেসে ফেলল অলক,–যাই, যাই সুধাদি—বলল ও।
–বেচারা,–বলল সুধাদি, পাগল ছেলে। সুধাদির দু চোখে অজস্র স্নেহের জোনাকি।
সময়মতো অলক অবিশ্যি বলবার চেষ্টা করেছিল।
–সুধাদি, পরিতোষ বলেছে আমার থাকবার ব্যবস্থা করে দেব মেসে। এখন তো—কিন্তু আর এগোতে পারে নি ও।
–এরপর আর কোনদিন যদি তোমার মুখে যাবার কথা শুনি তবে জেনো আমি দেওয়ালে মাথা ঠুকব,–বলেছিল সুধাদি,–কি নিষ্ঠুর ছেলে বাবা, আমাকে ছেড়ে অমনি চলে যাবে তুমি? এই তোমার দিদি হয়েছি আমি। বলতে বলতে মুহূর্তে সুধাদির চোখও ছলছল করে উঠল।–সত্যিকারের দিদি নই বলেই আজ তুমি অমন কথা মুখে আনতে পারছ অলক।
–সুধাদি, সুধাদি,–আর বলব না আমি, তোমাকে ছেড়ে যাবো না সুধাদি।
–দিব্যি করে বলো।
–দিব্যি করছি।
–আমি যতদিন বেঁচে থাকবো তুমি আমার কাছে থাকবে।
–থাকব।
হাসলেন সুধাদি—লক্ষ্মী ছেলে। বোস, তরকারি চাপিয়ে এসেছি, ধরে গেল বোধ হয়।
আনন্দে অলকের কান্না পায়। অলকের কাছে এ যে কত বড় পাওয়া সে কথা তো কেউ বুঝবে না। মা মারা গেছেন অলক তখন শিশু, মায়ের স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছে দিদি যে অলকের চেয়ে ছ’বছরের বড়। সে দিদি যখন বিয়ের পর দু’বছরের মধ্যে মারা যায় অলকের সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল তখন। অলক হচ্ছে সে জগতের ছেলে যারা স্নেহের কোন ছায়া না পেলে যেমন বাঁচতে পারে না। স্নেহের কাঙাল হৃদয় তারপর থেকেই নিষ্ঠুর পৃথিবীর পদে পদে হোঁচট খেয়েছে। জীবনযুদ্ধে নেমে ও দেখল পৃথিবীটা কি নিদারুণ মরুভুমি।
বাড়ি ফিরতে দেরি কররে উদ্বিগ্ন না কেউ। অসুস্থ হলে তপ্ত কপাল পিপাসী হয়ে থাকে,তাতে নামে না শুশ্রূষার কোন নারীর কোমল হাতের স্পর্শসলিল, ভালোমন্দ খাবার জন্য কারুর মাথার দিব্যি নেই,শোকে দুঃখে হাসিতে খুশিতে অংশীদার নেই কেউ, বড় হয়ে উঠুক এই শুভাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কেউ প্রণাম জানায় না তুলসীমূলে, যাত্রা শুভ হোক কামনা করে ধানদূর্বা মাথায় ছোঁয়াবে এমন একটি কল্যাণীমূর্তি নেই ওর আশেপাশে।
এমনি একক তৃষ্ণার্ত জীবনে সুধাদি এসেছেন। রক্ষ মরুভূমির বুকে যেন নেমে এসেছ পুণ্যসলিলা ভাগীরথী। উঃ, অলকের মনে হচ্ছে আজ সে একা নয়। তার আকাশে আজ স্নেহের শুকতারা জ্বলে উঠেছে। সে সুধাদি। মনে হচ্ছে তার জীবনের মূল্য আছে, মানে আছে। মনে হচ্ছে তার ভালোমন্দ আজ তার একার নয়, সুধাদিও তার শরিক। আর সুধাদির জন্য জীবনে দাঁড়াতে হবে তাকে, প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে। সবল সুস্থ মানুষ হয়ে উঠতে হবে।
প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে অলক।
দু’দিন পর ওকে আর চেনবার জো থাকে না। এ অন্য অলক। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, চান খাওয়ার সময় অসময় নেই, পোশাক-আশাকের ধোয় কাচা নেই, সেই ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে অলক মরে গেছে। সারাদিন একমাথা চুল আর একমুখ দাড়ি নিয়ে যে ছেলে বিমর্ষ হয়ে থাকত সে ছেলের এ এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।
ঘষামাজা ঝকেঝকে চেহারা হয়েছে অলকের। আর সবসময়ই অনর্গল বকে বকে হেসে হুটোপুটি খাচ্ছে আজাকাল। এত হাসতে পারে অলক, আর হাসাতে।
সুধাদিও শেষ পর্যন্ত বললেন,–ব্যাস, এইবার যাও অলক, নইলে হাসতে হাসতে পেট ফেটে মরে যাব আমি।
কোথাও থেকে ঘুরে এসে, অলক সোজা রান্নাঘরে বসে। সুধাদি হয়তো তরকারি কুটছেন বা ফ্যান গালছেন ভাতের। তারপর শুরু হয় কথা।
কোনদিন অলক ছোটবেলার গল্প শোনায় সুধাদিকে।–জানো সুধাদি, একদিন চড়কের মেলায় গেছি কাঞ্চনপুরে। হঠাৎ সার্কাসের বাঘটা খাঁচা থেকে এক লাফে বাইরে—
–বাইরে?
সুধাদির সুরে ভয়ের কাঁটা। জমে বসে, কোন সময় মাছের তরকারিতে নুন হয়েছে কিনা চাখতে চাখতে বা গরম গরম ডিমভাজা খেতে খেতে গল্প বলে যায় অলক, মনোযোগী ছাত্রীর মতো কৌতুহলী হয়ে শুনে যান সুধাদি। কোনদিন আবার উল্টোটা হয়। গল্প বলেন সুধাদি আর শ্রোতা হয় অলক। নিজের শ্বশুরবাড়ির গল্প বলেন সুধাদি, বা ননদের শ্বশুরবাড়ির সেই ভূত দেখার গল্প।
–নন্দাকে তো তুমি একবার দেখেছিলে, আমার ননদ নন্দা। একবার আমার সঙ্গে কোলকাতায় গিয়েছিল ও। সেই নন্দার শ্বশুরবাড়ি খুলনায়। ওদের গ্রামের নাম ভূষণা। ওদের বাড়িটা খুব পুরনো আর বাড়ির পেছনেই মস্ত এক বাঁশঝাড়। সেদিন রাত্তিরবেলা নন্দা পুকুর ঘাটে গেছে বাসন ধুতে। একাই গেছে ও।
হঠাৎ এলোমেলো বাতাসে দপ করে কুপীটা নিভে গেল। আর চোখ তুলে তাকাতেই দেখল নন্দা, বাঁশ ঝাড়ের নিচে সাদা কাপড় পরা কি একটা দাঁড়িয়ে। আর যেই নন্দা উঠতে যাবে অমনি করল কি— গা ছমছম করে অলকের। সুধাদি এমন বর্ণনা করেন যে মনে হয় এতটুকু মিথ্যে নেই। গল্প করতে করতে কোনদিন তরকারি পুড়ে যায়, কোনদিন রুমি খিদের জন্য কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। সুধাদির হুঁশ নেই।
এমনি চলল। অলক সুধাদি বলতে অজ্ঞান আর সুধাদি অলকের জন্য পাগল। একদিন যদি অলক দেরি করে ফেরে তো সুধাদি চিন্তায় অস্থির হয়ে যান, আর একদিন যদি সামান্য মাথা ধরায় সুধাদি বিছানা নেন, অলকের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
সিনেমা থিয়েটার দেখা, কাপড়-জামা কেনাকাটার জন্য সুধাদি একা বা সুধাদি আর গৌতমদা বেরোন না, সঙ্গে অলক থাকবেই ।
সুধাদি যখন, বলেন,–দেখো তো অলক এই শাড়িটা কেমন? বা রুমির ফ্রকের জন্যে এই ছিটটা পছন্দ হয় কিনা?
তখন আনন্দে কান্না পায় অলকের। তার কথারও কেউ মূল্য দেবে, তার পছন্দ অপছন্দ শুধোবে এমন কথা ছ’মাস আগে ভাবতেও পারত না। কিন্তু আজ সে পূর্ণ, সে সুখী।
নিজেকে সুখীই ভেবেছিল অলক। জানতেও পারে নি ইতিমধ্যে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে আকাশ কখন ঘন অন্ধকার হয়ে গেছে। আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাবার অবকাশ পায়নি ও, তাই টের পেল তখন যখন বিদ্যুৎ চমকালো। কিন্তু তখন আর বজ্রকে এড়াবার উপায় ছিল না।
গৌতমদা— ইংরেজীর অধ্যাপক গৌতম মিত্র ইংরেজী যত পড়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশী পড়েছেন সাইকোলজী আর সাইকোলজী যত পড়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশী পড়েছেন সেক্সোলজী।
তাই যত পাণ্ডিত্য ছিল তার চেয়ে বেশী পাণ্ডিত্যের মুখোশ পরে থাকতেন, যত গাম্ভীর্য ছিল চারিত্রিক, তার চেয়ে বেশী গম্ভীর হয়ে থাকতেন। রাসভারী মানুষকে বড় ভয় অলকের। গৌতমদা যখন বাড়িতে থাকতেন কোন মোটাসোটা বইয়ে মুখ ঢেকে, অলক সে সময়টুকু নিঃশব্দে কাটাতো, ভয় পাছে বিরক্ত হন গৌতমদা, গম্ভীর মুখে আর এক পোঁচ গাম্ভীর্যের রঙ চড়ান।
সেটা ছিল রোববারের দুপুর।
অলক পরিতোষের সঙ্গে সিংহগড়ে শিবাজীর কেল্লা দেখতে যাবে বলে বেরিয়েছিল কিন্তু ফিরে আসতে হল। কি এক জরুরী কাজে পরিতোষ খাণ্ডালা গেছে। লিখে গেছে সিংহগড় যাওয়ার প্ল্যান আগামী রোববারের জন্য মুলতুবী রইল। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই শুনতে পেল গৌতমদার ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ও।
গৌতমদাকে কোনদিন উত্তেজিত হতে দেখেনি অলক। আর সুধাদির গলাটা কেমন কান্না-কান্না। কি হল? স্বামী স্ত্রীর কোন ভুল বোঝাবুঝি? দাম্পত্য কলহ? কিন্তু আজ দু’বছরের মধ্যে একদিনও তো তা দেখে নি অলক। দুরুদরু করে উঠল বুক। কান পাতে ও। কিন্তু না, বিশেষ কিছু শুনতে পেল না ও। শুধু প্রচণ্ড এক চপেটাঘাতের আওয়াজ শুনতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে সুধাদির আর্তনাদ, তুমি আমাকে মারলে?
সমস্ত রক্ত মাথায় উঠে গেল অলকের। ইচ্ছে হল দৌড়ে দিয়ে টু’টি টিপে ধরে গৌতমদার, প্রফেসর গৌতম মিত্রের, যে ইংরেজীর অধ্যাপক, আর ইংরেজীর চেয়ে বেশী পড়েছে সাইকোলজী আর সাইকোলজীর চেয়ে সেক্সোলজী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করল না অলক। চোরের মতো নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।
পেশোয়া পার্কের একটা নির্জন বেঞ্চে সারাক্ষণ বসে রইল অলক। ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরল সন্ধ্যাবেলা।
পার্বতী মন্দিরের সিঁড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে। ঘষা পয়সার মতো তামাটে আকাশ স্লেট-কালো ওড়ানায় ঢাকা পড়েছে। কয়েকটা তারা ইতিমধ্যে চোখ পিটপিট করছে। অলকের মনে হল যেন রুমির কয়েকটা চোখ চুরি করে কে আকাশের গায়ে বসিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আকাশের তারায় মন নেই অলকের। বিষণ্ণ মনে জেগে উঠল সুধাদির করূণ কণ্ঠস্বর,–তুমি আমাকে মারলে? কেন, কেন গৌতমদা গায়ে হাত তুললেন সুধাদির।
ভাবতে ভাবতে অবাক লাগে। গৌতমদার মতো শিক্ষিত লোক শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর গায়ে হাত তুললেন।
গেট খুলেই চোখ পড়ল সুধাদির ওপর। বারান্দার সিঁড়িতে মাথা নীচ করে পাষাণ প্রতিমার মতো বসে আছেন সুধাদি। নিঃশব্দে পাশে গিয়ে বসল অলক।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে মুখ তুললেন সুধাদি, আর মুখ তুলতেই চোখ পড়ল অলকের দিকে।
–আরে, কতক্ষণ এসেছো অলক?
–অনেকক্ষণ। কিন্তু তুমি এমন কি ভাবছিলে সুধাদি?
এক মুহূর্তের জন্য মুখটা বুঝি সাদা হয়ে গেল। কিন্তু সে শুধু এক মুহূর্তের জন্যেই। তারপরই করুণ মুখে জোর করে হাসি টেনে এনে বললেন,–কি আবার ভাবব। ভাবছিলাম তোমার কথাই। সেই কখন বেরিয়েছ, ফেরার নাম নেই।
–মিথ্যে কথা। কি হয়েছে বল না সুধাদি।
সুধাদি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন, তারপর মৃদুকণ্ঠে বললেন,–তোমার সুধাদি যদি মারা যায় তবে তোমার খুব কষ্ট হবে, না অলক?
–সুধাদি,–আর্দ্র কণ্ঠে নামটা একবার উচ্চারণ করল অলক।
–ঐ দেখো, বলতে না বলতে চোখ কেমন ছলছল করে উঠল। ঠাট্টা বোঝ না। চলো—হাত ধরে টানলেন সুধাদি—এসো ঘরে, মুখ শুকিয়ে তো আমসী হয়ে গেছে, কিছু খাবে চলো।
অলকের অবিশ্যি চোখ এড়াল না।
আজকাল গৌতমদা কেমন বদলে যাচ্ছেন। আগে যাও বা দু’চারটে কথা বলতেন অলকের সঙ্গে, এখন তাও বন্ধ। শুধু মাঝে মাঝে কেমন মর্মভেদী চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন অলককে। বিকেলে লাইব্রেরী যাওয়া বন্ধ। সময়ে অসময়ে বাড়িতে ফেরেন নিঃশব্দে। হয়তো রান্নাঘরে বসে গল্প করছে অলক আর সুধাদি, অনেকক্ষণ বাদে সুধাদি ঘরে ঢুকে দেখলেন, খাটে চুপ করে শুয়ে আছেন গৌতমদা। সুধাদি অবাক,–একি, কখন এলে?
গৌতমদা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিলেন,–অনেকক্ষণ—তা আমাকে ডকো নি কেন, মুখ শুকনো করে শুয়ে পড়লে যে?
–দেখলাম তুমি ব্যস্ত আছো—সাপ যদি কথা বলতে পারতো তবে বোধ হয় এই সুরেই বলতো।
–মানে?—সুধাদি পাথর।
–মানেটাই তো আমি খোঁজবার চেষ্টা করছি।
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকেন সুধাদি।
অলক শোনে আর বিমূঢ় হয়ে যায়। ও বুঝতেই পারে না কি ব্যাপার। কেন বাড়ির আবহাওয়া এমন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
দিন দিন গৌতমদার চেহারা পাল্টাতে লাগল।
যখন বাড়ি ফিরবার কথা ফেরেন না, যখন ফেরবার কথা নয় ফিরে আসেন। রুমিকে অনাবশ্যক মারেন, সুধাদিকে চোখ রাঙান, আর অলকের সঙ্গে নিজে তো কথা বলেনই না, অলক কিছু জিজ্ঞেস করলেও জবাব দেন না।
তারপর চূড়ান্ত হল একদিন।
অলকের হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছে। সামান্য জ্বর। এনাসিন খেয়ে শুয়েছিলও। যদিও সুধাদির ব্যস্ততার সীমা নেই।
বিকেলবেলা হঠাৎ দেখল অলক, গৌতমদা ছোট একটা সুটকেস নিয়ে কোথায় বেরিয়ে গেলেন। খানিকবাদে সুধাদি এক গ্লাস হরলিক্স নিয়ে আসতেই প্রশ্ন করল অলক,–গৌতমদা কোথায় গেলেন সুধাদি?
–ওর এক বন্ধুর বিয়েতে গেল বোম্বে। কাল সকালে আসবে। নাও ঢক ঢক করে হরলিক্সটা খেয়ে নাও তো লক্ষ্মী ছেলের মতো।
–অতোখানি,–মিনমিনে আপত্তি জানায় অলক।
–কোন কথা নয়। দশ গুনতে গুনতে ঢকঢক শেষ হওয়া চাই। নইলে কচি খোকার মতো ঝিনুক দিয়ে জিভ চেপে খাইয়ে দেবো বলছি।
একান্ত বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে নিল অলক।
রাত্তির তখন অনেক হবে।
আধঘুমে দুঃস্বপ্প দেখছিল অলক। ও দেখছিল ও আর সুধাদি গাড়ি করে বোম্বে যাচ্ছে। গাড়ি ড্রাইভ করছে গৌতমদা। গাড়ি তখন ঘাটস্-এর ওপরে। যেখানে অল্পদূর গিয়ে হেয়ার পিন টার্নিং হয়েছে সেই বিপদসঙ্কুল পথে হঠাৎ গৌতমদা গাড়ির স্পীড বাড়াতে শুরু করলে। ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ—
–ওকি করছ, ওকি করছ—চেঁচাচ্ছেন সুধাদি। কিন্ত গৌতমদার হুঁশ নেই। একবার স্কিড করলেই পনোরো শ’ ফুট নিচে।
হঠাৎ গাড়িটা ছিটকে বেরিয়ে গেল রাস্তা থেকে শুন্যে। নিচে সুগভীর খাদ। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল অলক,–সুধাদি।
পাশের ঘরে মেয়ে নিয়ে শুয়েছিলেন সুধাদি। অলকের আর্তকণ্ঠস্বর শুনে দরজা খুলে দৌড়ে চলে এলেন এ ঘরে,–কি হয়েছে অলক, চেঁচিয়ে উঠলে যে?
–তুমি কোথায় সুধাদি?—হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করে অলক। সুধাদি দৌড়ে যেতেই দু’হাত জড়িয়ে ধরে অলক।
–উঃ, আমি যেন দেখলাম তুমি মরে যাচ্ছো।
–পাগল ছেলে, স্বপ্ন দেখে কেমন করছে দেখো। এই তো আমি। তোমার মতো ভাইকে ফেলে আমি মরতে পারি কখনো?
আলগোছে পিঠে হাত বোলাতে থাকেন সুধাদি—ইস, এখনো ছেলেটা কেমন কাঁপছে দেখো।–আর ঠিক তক্ষুনি দরজায় ক্রুদ্ধ ঠকঠক শোনা গেল।
–কে?—উঠে দরজার কাছে এগিয়ে যান সুধাদি।
–দরজা খোল।–গৌতমদার বিষাক্ত কণ্ঠস্বর বেজে উঠল।
তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে দিয়ে সুধাদি অবাক কণ্ঠে শুধোলেন, তুমি?
–কেন,–চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন গৌতমদা, –খুব অসময়ে এসে পড়েছি বুঝি। sorry।
–ইতরের মতো কথা বলো না। হঠাৎ ক্ষিপ্তকণ্ঠে গর্জে উঠলেন সুধাদি।
–তবে কিসের মতো কথা বলব, ইয়ারের মতো?
–জানোয়ার বলে থপথপ পা ফেলে ঘরে চলে গেলেন সুধাদি।
–জানালা দিয়ে অন্ধকারে এমন জমাট লাগছিল সিনটা, আঃ, সো ড্রামটিক। কয়েক পা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন গৌতমদা, তারপর ফিরে এলেন অলকের সামনে। এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন, তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললে কি যেন, শুনতে পেল না অলক। ধীরে পায়ে নিজের ঘরে চরে গেলেন।
পরদিন সকালে উঠে অলক দেখলে জ্বর সেরে গেছে। মনে মনে একটু ভেবে নিল অলক। তারপর উঠে একটা ব্যাগে কয়েকটা জামাকাপড় ভরতে লাগল নিঃশব্দে।
জুতোটা পরতে গিয়ে নজরে পড়ল মাঝের পর্দাটা ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন সুধাদি।
–কোথায় চললে? সুধাদির কণ্ঠস্বরে কাল রাতের মেঘের এতটুকু বাষ্পও নেই।
–সুধাদি, পাঁচদিনের মতো আমাদের ল্যবরেটরী বন্ধ থাকবে। ভাবছি পাঁচদিন বোম্বে বেড়িয়ে আসি। মাথা নীচু করে বলল অলক। মাথা তুলে তাকাতে পারছিল না ও।
–কোথায় উঠবে?—শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন সুধাদি।
–পরিতোষের দাদা থাকে সান্টাক্রুজে, এরোডামে কাজ করে। ওর বাসায় উঠব।
খানিকক্ষণ চুপ করে কি ভাবলেন সুধাদি। তারপর বললেন,– সেই ভালো। ঘুরে এসো। মন ভালো হবে। কিন্তু পাঁচ দিনের জায়গায় ছ’দিন করে বোস না যেন।
–না সুধাদি।–একটু স্বচ্ছন্দ বোধ করে অলক। সুধাদি তো বেশ স্বাভাবিক কথাই বলছেন। আশ্চর্য।
–আরেকটা কথা।
–বলো।
–বোম্বে গিয়েই প্রথম কাজ কি করছ?
–প্রথম, প্রথম একটা বই কিনব, “মুলারুজ”।
–না, প্রথমে একটা সেলুনে গিয়ে চুল ছাটবে। মাথাটার অবস্থা একবার দেখেছো? এবার চুল তোমার বড় হয়েছে বলেই জ্বর হয়েছিল। মনে করে চুল ছাঁটবে।
–ছাঁটব।
–প্রথমেই।
হেসে বলল অলক,–প্রথমেই। মনে হল, কালকের সমস্ত ব্যাপারটাই দুঃস্বপ্ন। এই পাঁচদিন ঘুরে এলেই ও দেখবে সব যথাযথ হয়ে গেছে। গৌতমদা হেসে কথা বলবেন হয়তো, সুধাদি হয়তো গল্প করবেন আগেকার মতই।
কিন্তু ফিরে এসে—
এত বড় আঘাতের জন্য তৈরি ছিল না অলক। বাড়ি এসে ব্যাগটা নামিয়ে ও চুপি চুপি রান্না ঘরে এসে ঢুকল।
–সুধাদি,–বোঁ করে এক পাক ঘুরে নিল অলক।–ব্যাস, খুশী তো? চুল ছাঁটা। দেখেছো?
কিন্তু একি, সুধাদির মুখটা অমন গম্ভীর কেন? হঠাৎ সুধাদি বলে উঠলেন,–অলক, পরিতোষ তোমার থাকবার ব্যবস্থা করে দেবে বলেছিল না? দু’বছরের ওপর হয়ে গেল এখনো ও ব্যবস্থা করে উঠতে পারল না?
–সুধাদি,–চেঁচিয়ে উঠল অলক,–কি বলছ সুধাদি, আমি চলে যাবো এখান থেকে?
–পেছনে গমগম গলা বেজে উঠল গৌতমদার,–যাবে না? তুমি কি চিরদিন এখানে থাকতেই চাও নাকি?
–সুধাদি,–অলক দৌড়ে গিয়ে কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি লাগাল সুধাদির,–এ সব কি সুধাদি, বলো কথা বলো সুধাদি।
–হ্যাঁ অলক, তুমি নিজের থাকবার ব্যবস্থা করো। আমরা তো অনেকদিন দেখেছি, এবার নিজের পথ নিজে দেখো তুমি।
–কেন, কেন তুমি—কান্নায় রুদ্ধ হয়ে যায় অলকের গলা,– তুমি আমার দিদি, আর তুমি আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছ? কি করেছি আমি?
–তুমি যা করেছো তার চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না। ভালোবাসতে তুমি ঠিকই অলক, তবে দিদির মতো নয়। আমি আগে জানলে অত বাড়তে পারতে না। প্রথমে আমি বুঝতে পারি না। বুঝতে পারি নি তোমার চোখে কি ছিল, কি উদ্দেশ্য ছিল তোমার অমন অন্তরঙ্গতায়।
–থাক শুনতে চাই না আমি, শুনতে চাই না কিছু, আমি এখুনি যাচ্ছি। এক্ষুণি।–টসটস করে জল গড়িয়ে পড়ল অলকের চোখ দিয়ে। মাথা নীচু করে ও প্রণাম করতে এলো সুধাদিকে, কিন্তু সুধাদি পা সরিয়ে নিলেন, তারপর দ্রুতপায়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন?
পাথরের মতো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল অলক। তার চোখের সামনে সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল।
সুধাদি তাকে এত কুৎসিত ভাবতে পারলেন।
নিঃশব্দে এসে সুটকেস গুছোতে লাগল। গুছিয়ে বেডিংটা বগলে নিয়ে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। গেট খুলে একবার পেছন দিকে তাকালো ও। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন গৌতমদা। যিনি ইংরেজীর অধ্যাপক আর ইংরেজীর চেয়ে বেশী পড়েছেন সাইকোলজী। আর সাইকোলজীর চেয়ে সেক্সোলজী। গৌতমদার চোখে যেন পৈশাচিকে এক জয়ের উল্লাস নির্লিপ্তের চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস শুধু বেরিয়ে এল অলকের বুক থেকে। তারপর টলতে টলতে ও নেমে এল রাস্তায়।
এই আকস্মিক আঘাতে একেবারেই ভেঙে পড়ল অলক। প্রায় মাথাই খারাপ হয়ে গেল ওর। পরিতোষের ওখানে উঠেও রোজ একটা করে চিঠি লিখতে শুরু করল সুধাদিকে।–‘সুধাদি, একবার শুধু বলে দাও তুমি আমাকে ভুল বোঝ নি। আমি তোমাকে আর কোনদিন মুখ দেখাবো না, কোনদিন আসব না তোমার সামনে, একবার শুধু জানাও আমি খারাপ নই। আমাকে অত বড় মিথ্যা কলঙ্ক তুমি দিও না সুধাদি। লক্ষ্মী সুধাদি, জবাব দাও। নইলে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’
কিন্তু কোন জবাব এল না সুধাদির কাছ থেকে। শেষ পর্যন্ত পুণার চাকরি ছেড়ে কোলকাতায় চলে এলো অলক। সেখান থেকেও অনেক চিঠি লিখল ও। জবাবা পেল না। ক্রমে ওর চেহারা খারাপ হতে শুরু করল। মাথায় বোঝা বোঝা চুল হল, মুখ ভর্তি দাড়ি, জামাকাপড়ে অযত্ন। কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিল বলা যায়। সবসময়ই কেমন অনমনস্ক থাকে।পাগল হবার লক্ষণ সবই প্রকট হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত ওর এক বন্ধু চৈতন্য চৌধুরী ওকে পাটনা এক দৈনিক কাগজে প্রুফ রিডারের কাজে লাগিয়ে দিলে।
তারপর?—পাঁচ বছর পরে— একদিন কোলকাতায় ওর বাসার ঠিকানায় গৌতম মিত্রের এই চিঠিটা এলো। খুঁজে পেলো না ওকে। ব্যর্থ চেষ্টার পর চিঠিটা শেষ পর্যন্ত হাজির হল ডেড্ লেটার অফিসে।
তার বেশ কিছুদিন পর “পাটনা টাইমস” পত্রিকার প্রুফ দেখতে দেখতে হঠাৎ পাগলের মত অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল অলক। খবরটা এই—“পুণা প্রবাসী জে, ই, কলেজের ইংরেজী ভাষার অধ্যাপক শ্রীগৌতম মিত্রের স্ত্রী-বিয়োগ। মৃত্যুকালে তিনি একটিমাত্র কন্যা ও স্বামীকে রেখে গেছেন।”
সংক্ষিপ্ত সংবাদ। পাগলের মতো হেসে ওঠার কি আছে এতে সহকর্মীরা বুঝতে পারে নি। কিন্তু বুঝতে পারল খানিক বাদে। পাগলের মতো হাসে নি অলক, পাগলের হাসিই হেসেছে ও। পাগল হয়ে গেছে অলক। হিতৈষী বন্ধুরা সব চেষ্টাই করেছে, কোন ফল হয় নি। শেষ পর্যন্ত চিঠিপত্র লিখে রাঁচি পাঠিয়ে দিলে ওরা।
অলকের পাগলামীর মূল লক্ষণ নাকি কোন ছেলেকে দেখলেই দৌড়ে দিয়ে বলে,–তুমি সাবধান। ইমোশনাল এক্সেস তোমাকে মর্বিড করে ফেলেছে, পারভার্ট করে ফেলেছে। বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে।–রাঁচির ওয়ার্ডের ওয়াচম্যানিই হোক, ডাক্তারই হোক, সবাইকেই ও এই বলে তাড়া করে। আর কোন মেয়ে এলে নিঃশব্দে কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, ছলছল চোখে বলে,–চুলগুলো আমার খুব বড় হয়ে গেছে, না সুধাদি? যাই এক্ষুণি গিয়ে চুল ছাটব। রাগ করো না সুধাদি—
পাগলা গারদ দেখতে-আসা কোন মেয়ে ওর পাগলামী দেখে হেসে লুটোপুটি খায়, কেউ অনাবশ্যক করুণায়, সমবেদনার অশ্রুতে চোখ ভেজায়। কেউ বোঝে না কোথায় ঘা খেয়ে ওর এই চিত্তবিকলন, ওর স্মৃতিবিলুপ্তি।
ভাবতে বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে, যদি যথাসময়ে এই চিঠিটা হাতে পেতো অলক, তাহলে হয়তো বেঁচে যেতো সুধাদি। সুধাদি না বাঁচুক, হয়তো বেঁচে যেতো অলক। নির্মম চিত্তপীড়ায় ও উন্মাদ হয়ে যেতো না, ও পাগল হত না।
কিন্তু না, বড় দেরি হেয় গেছে। এখন কোন লাভ হত না এই চিঠি দেখিয়ে। এই চিঠিটা এখন মৃত আর অলক তার অনেক আগেই বুঝি মারে গেছে। রাঁচির পাগলা গারদে এখন যে আছে সে তো সুধাদির ভাই অলক রায় নয়, সে ওয়ার্ড নম্বর দশের, ন’শ বারো নম্বর পাগল, অলক রায়।
আরও দেখুন: