একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রাম, ৪ নং জানিপুর ইউনিয়ন, খোকসা, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার ৪ নং জানিপুর ইউনিয়নের একটি বর্ধিষ্ণু এবং গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হলো একতারপুর পূর্বপাড়া। খোকসা উপজেলা সদর এবং খোকসা-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের নিকটবর্তী হওয়ায় ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই গ্রামটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান

একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৪ নং জানিপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এটি একতারপুর মৌজার পূর্ব অংশ নিয়ে গঠিত। গ্রামটির উত্তর দিকে গড়াই নদী ও জানিপুর গ্রামের সীমানা, দক্ষিণে গোপগ্রাম ইউনিয়ন, পূর্বে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা এবং পশ্চিমে একতারপুর পশ্চিম পাড়া অবস্থিত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং অনুযায়ী, এই এলাকার ভূমি অত্যন্ত উর্বর এবং বসতিগুলো মূলত কৃষি জমি ও গ্রামীণ সড়কের পাশে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে।

জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯০০ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪৬০ জন এবং নারীর সংখ্যা ৪৪০ জন। জনসংখ্যার নারী-পুরুষ অনুপাত প্রায় ১০০:৯৬। গ্রামে মোট পরিবারের (Household) সংখ্যা প্রায় ২১০টি। ভোটার তালিকার তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬৫০ জন। আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গ্রামটিতে প্রায় ২৫% বাড়ি পাকা ও আধা-পাকা ভবন এবং বাকি ৭৫% বাড়ি উন্নত মানের মজবুত টিনশেড ঘর।

শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র

যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং ব্যানবেইস (BANBEIS)-এর তথ্যমতে, একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৬৪%। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা প্রধানত একতারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা ১৯৭৩ খ্রি.) এর ওপর নির্ভরশীল। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা খোকসা জানিপুর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং খোকসা সরকারি কলেজের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য গ্রামে মসজিদ ভিত্তিক মক্তব ও নূরানী শিক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। গ্রামটিতে শিক্ষিত যুবকদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান, যারা বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।

কৃষি, ভূমি ব্যবহার ও অর্থনীতি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মৌজা ও প্লটভিত্তিক ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামের জমি অত্যন্ত উর্বর এবং মূলত তিন-ফসলী। গড়াই নদীর অববাহিকায় হওয়ায় এখানকার পলি-সমৃদ্ধ মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ এবং তামাক উৎপাদিত হয়। গ্রামে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৩০টি। পেশাভিত্তিক বিন্যাসে কৃষিজীবী ৬০%, ব্যবসায়ী ১০%, এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও প্রবাসী ৩০%। পাংশা ও খোকসা বাজারের মধ্যবর্তী অবস্থান হওয়ায় এখানকার মানুষ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও বেশ সক্রিয়।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের রোড নেটওয়ার্ক ডাটাবেইস অনুযায়ী, একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। গ্রামটি খোকসা-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের সাথে সরাসরি পাকা সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত। গ্রামে পাকা (বিসি) ও এইচবিবি রাস্তার পরিমাণ প্রায় ২ কিলোমিটার এবং সলিং ও কাঁচা রাস্তা রয়েছে আরও ২.৫ কিলোমিটার। যাতায়াত ও পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে ৩টি কালভার্ট ও প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে। হাট-বাজারের জন্য গ্রামবাসী মূলত খোকসা পৌর বাজার ও পার্শ্ববর্তী পাংশা উপজেলার স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা

একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামটি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, গ্রামে ১টি জামে মসজিদ রয়েছে। গ্রামের মানুষ বড় ধর্মীয় উৎসব ও ঈদ উদযাপনের জন্য একতারপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান ব্যবহার করে থাকে। এখানে প্রধানত মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বাস থাকলেও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য বিদ্যমান। গ্রামের মানুষের শেষ বিদায়ের জন্য ১টি সামাজিক কবরস্থান সংরক্ষিত রয়েছে।

স্থানীয় নেতৃত্ব ও জননিরাপত্তা

প্রশাসনিকভাবে ৪ নং জানিপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করেন। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন মোঃ আবু বক্কার সিদ্দিক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় সাধনে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা এখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিবাদ নিরসনে স্থানীয় মুরুব্বি ও শিক্ষিত সমাজসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা

একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামটি অনেক পরিশ্রমী ও সচেতন মানুষের জন্মস্থান। এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীরা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে এই গ্রামের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। প্রধান সামাজিক সমস্যা হিসেবে বর্ষা মৌসুমে গড়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকে, যা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ করছে। বর্তমানে ডিজিটাল সেন্টার ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ দ্রুত ই-সেবা গ্রহণ করছেন।

কৃষি সমৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান শিক্ষার হার এবং উন্নত যোগাযোগের সমন্বয়ে একতারপুর পূর্বপাড়া গ্রামটি ৪ নং জানিপুর ইউনিয়নের একটি আদর্শ ও সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।