ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ: সুরের সন্ধানে এক চির যাযাবর

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি ও অকৃত্রিম ইতিহাস ঘাটলে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের জীবন কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। সুরের জন্য ঘর ছাড়ার গল্প আমরা অনেকেরই জানি, কিন্তু সুরের সন্ধানে আক্ষরিক অর্থেই ‘যাযাবর’ হয়ে যাওয়ার একক ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কীভাবে বিশ্বসঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত মহীরুহ হয়ে উঠলেন, সেই গল্প হার মানায় যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও।

সুরের টানে প্রথম গৃহত্যাগ

ছোটবেলা থেকেই আলাউদ্দিনের রক্তে মিশে ছিল সুর। বড় ভাই আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষার হাতেখড়ি হলেও তাতে মন ভরেনি কিশোর আলাউদ্দিনের। সুরের এক অমোঘ টান তাঁকে তাড়া করে বেড়াত। মাত্র দশ বছর বয়সে, যখন অন্য ছেলেরা খেলাধুলায় মত্ত, তখন সুরের সন্ধানে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি চলে আসেন কলকাতায়। উদ্দেশ্য একটাই—সঙ্গীতের মহাসাগরে ডুব দেওয়া।

কলকাতায় এসে শুরু হয় তাঁর যাযাবর জীবনের এক কঠিন অধ্যায়। চেনা নেই, জানা নেই; খাবেন কোথায়, থাকবেন কোথায়—তার কোনো ঠিক ছিল না। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকেছেন, রাস্তার ধারে কিংবা মন্দিরের বারান্দায় রাত কাটিয়েছেন। কিন্তু সুরের তৃষ্ণা তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও দমিয়ে রাখতে পারেনি। কলকাতায় তিনি বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের (নুলো গোপাল) সান্নিধ্যে আসেন। গুরু শর্ত দিলেন—১২ বছর কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে এবং কণ্ঠসাধনা করতে হবে। আলাউদ্দিন সানন্দে রাজি হলেন। শুরু হলো হাড়ভাঙা খাটুনি আর সাধনা।

যন্ত্রসঙ্গীতের প্রেমে পড়া ও যাযাবর যাত্রা

নুলো গোপালের আকস্মিক মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি যন্ত্রসঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। অমৃতলাল দত্তের (হাবুদত্ত) কাছে বাঁশি, ক্ল্যারিনেট, করনেট ও সানাই শেখেন। এমনকি গোয়া থেকে আসা এক ইউরোপীয় শিক্ষকের কাছে পাশ্চাত্য বেহালা চালনাও রপ্ত করেন। কিন্তু তাঁর মনের গভীরে লুকিয়ে ছিল অন্য এক সুরের তৃষ্ণা—যা কেবল ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কোনো মহান গুরুই মেটাতে পারতেন।

এই সুরের খোঁজেই তিনি পাড়ি জমান রামপুরে। রামপুর তখন ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের এক মক্কা। সেখানে ছিলেন বিখ্যাত সেনী ঘরানার ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ—যিনি ছিলেন স্বয়ং তানসেনের বংশধর। রামপুরে পৌঁছেও ওস্তাদের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না। দিনের পর দিন ওস্তাদের বাড়ির সামনে অপেক্ষা করেছেন, শেষে মরিয়া হয়ে নবাবের গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শুধু ওস্তাদের শিষ্যত্ব পাওয়ার জন্য। নবাবের হস্তক্ষেপে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

ওয়াজির খাঁর অধীনে শুরু হয় আলাউদ্দিন খাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং সোনালী অধ্যায়। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর অনুশাসনে তিনি আয়ত্ত করেন সেতার, সুরবাহার এবং রবাবের মতো দুর্লভ সব যন্ত্রের বাদনশৈলী।

মাইহার ঘরানা ও সুরের অমরত্ব

রামপুরের সাধনা শেষ করে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ থিতু হন মধ্যপ্রদেশের মাইহার রাজ্যে। মহারাজা ব্রিজনাথ সিং তাঁকে রাজদরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত করেন। মাইহারেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্ববিখ্যাত ‘মাইহার ঘরানা’। যাযাবর জীবনের ক্লান্তি ভুলে এখানেই তিনি সুরের চাষ শুরু করেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় জন্ম নেয় ‘মদনমঞ্জরী’র মতো নতুন নতুন রাগ। প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র সরোদকে সংস্কার করে তিনি একে দান করেন এক অনন্য উচ্চতা।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শুধু নিজে সুরের জাদুকর ছিলেন না, তিনি তৈরি করেছিলেন একঝাঁক সুরের নক্ষত্র। তাঁর সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী এবং বিশ্ববিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর—সবাই তাঁরই কড়া শাসনে তৈরি হওয়া রত্ন। সুরের জন্য যে মানুষটি একসময় না খেয়ে রাস্তায় ঘুরেছেন, তিনিই উত্তরসূরিদের দিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে পৌঁছে দিয়েছেন বৈশ্বিক দরবারে।