কীর্তন। উপশাস্ত্রীয় গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

কীর্তন বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম আদি এবং সমৃদ্ধতম ধারা। শৈলীর মান ও পরিমাণের বিচারে একে আদি বাংলা সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ শৈলী হিসেবে গণ্য করা হয়। গানের মাধ্যমে ধর্মচর্চার এই ধারাটি মূলত সাধারণ মানুষের জন্য ঈশ্বর সাধনার একটি অতি সহজ উপায় হিসেবে উদ্ভূত হয়েছিল। বাংলার বৈষ্ণবধর্মজাত সঙ্গীতধারার এই বিকশিত রূপটি মূলত ঈশ্বরের গুণ ও লীলা বর্ণনায় নিবেদিত।

 

Table of Contents

কীর্তন। উপশাস্ত্রীয় গীত ধারা । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

১. কীর্তনের প্রকারভেদ

কীর্তন কেবল একটি গীতরীতি নয়, এটি একটি সাধন পদ্ধতি। বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপনার ভঙ্গি অনুযায়ী কীর্তনকে প্রধান দুটি ধারায় বিভক্ত করা হয়। এই বিভাজন মূলত উপাসনার ধরন এবং রসের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।

নামকীর্তন বা নামসংকীর্তন

নামকীর্তন হলো কীর্তন সাহিত্যের প্রাথমিক ও মৌলিক রূপ। এতে কোনো সুনির্দিষ্ট কাহিনী বর্ণিত হয় না, বরং পরমেশ্বরের নামের মহিমা প্রচার করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

স্বরূপ: ভগবান হরি বা বিষ্ণুর নাম জপ এবং সমবেত কণ্ঠে তা গাওয়াই নামকীর্তন। শ্রীচৈতন্যদেব একেই কলিযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে প্রচার করেছিলেন।

মূল মন্ত্র: ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’—এই ষোল নাম ও বত্রিশ অক্ষরের মহামন্ত্রটি নামকীর্তনের প্রধান ভিত্তি।

বৈচিত্র্য: এই মূল বোলের বাইরেও ‘হরি ওম’, ‘গোবিন্দ জয় জয়’ কিংবা কৃষ্ণের বিভিন্ন নাম ও গুণের সম্বোধন নিয়ে অসংখ্য নামকীর্তন প্রচলিত। এটি সাধারণত খোল-করতালের দ্রুত লয়ে এবং নৃত্যসহকারে পরিবেশিত হয়। নামকীর্তনের মাধ্যমেই মূলত ‘নগর সংকীর্তন’-এর উদ্ভব হয়েছে।

 

লীলাকীর্তন বা রসকীর্তন

লীলাকীর্তন হলো কীর্তনের একটি উচ্চতর এবং নাটকীয় রূপ। এখানে কেবল নাম জপ নয়, বরং ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার লীলা বা কাহিনী বর্ণনা করা হয়।

স্বরূপ: রাধাকৃষ্ণ এবং গোপী-কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলার বিভিন্ন কাহিনীকে অবলম্বন করে যখন কোনো পালা বা সঙ্গীত রচিত হয়, তখন তাকে লীলাকীর্তন বা পদাবলি কীর্তন বলা হয়। এতে আখ্যানভাগ থাকে বলে একে ‘কাহিনী কীর্তন’-ও বলা যেতে পারে।

চৈতন্য-পরবর্তী প্রভাব: পরবর্তীতে শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনী এবং তাঁর ভক্তির প্রগাঢ়তা নিয়ে ‘গৌরাঙ্গ লীলা’ বা ‘নিমাই সন্ন্যাস’ পালার প্রচলন ঘটে। লীলাকীর্তনের আসরে মূল কাহিনী শুরুর আগে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ (চৈতন্যদেবের বন্দনা) গাওয়ার অলঙ্ঘনীয় রীতি রয়েছে।

প্রধান পর্যায়সমূহ: লীলাকীর্তন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রসাত্মক পর্যায়ে বিভক্ত:

  • গোষ্ঠ: কৃষ্ণের সখাদের নিয়ে গোচারণে যাওয়ার কাহিনী।
  • মান: রাধার অভিমান এবং কৃষ্ণের অনুনয়-বিনয়।
  • মাথুর: কৃষ্ণের মথুরা গমনের পর রাধার বিরহ ও শোক। এটি কীর্তনের করুণ রসের শ্রেষ্ঠ পর্যায়।
  • নৌকাবিলাস: যমুনা পারাপারের ছলে রাধা-কৃষ্ণের বাকযুদ্ধ ও প্রেমলীলা।
  • দানলীলা: কর আদায়ের ছলে কৃষ্ণের চাতুর্য।

 

২. ঐতিহাসিক বিবর্তন ও উৎস

কীর্তনের ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনের সমান্তরাল। এটি কোনো আকস্মিক সৃষ্টি নয়, বরং কয়েক শতাব্দীর সাহিত্যিক ও সাঙ্গীতিক বিবর্তনের এক পরিণত ফসল।

আদি উৎস: জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ (দ্বাদশ শতাব্দী)

কীর্তনের আদি ও ধ্রুপদী উৎস হিসেবে কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’-কে বিবেচনা করা হয়। এই কাব্যটি কেবল সাহিত্যিক বিচারে নয়, বরং সাঙ্গীতিক কাঠামোতেও বৈপ্লবিক ছিল। জয়দেবই প্রথম তাঁর পদগুলোতে নির্দিষ্ট রাগ ও তালের (অষ্টপদী) ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে যান। এই সাঙ্গীতিক কাঠামোটিই পরবর্তীকালের পদাবলি কীর্তনের আদি ভিত্তি বা ‘প্রোটোটাইপ’ হিসেবে কাজ করেছে। গীতগোবিন্দের ‘কোমল কান্ত পদাবলী’র সেই ছন্দ ও সুরের মাধুর্য কীর্তনকে একটি শাস্ত্রীয় আভিজাত্য দান করেছিল।

বিকাশকাল: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বিদ্যাপতি (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দী)

কীর্তনের ধারাটি জয়দেব-পরবর্তী সময়ে দুটি সমান্তরাল পথে বিকশিত হয়:

বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন:

এই কাব্যের মাধ্যমেই কীর্তন নামের এই বিশেষ সঙ্গীতধারাটির লৌকিক ও নাট্টগীত রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে রাধা ও কৃষ্ণের সংলাপের মাধ্যমে যে নাট্যগুণসম্পন্ন গীতরীতি তৈরি হয়েছিল, তা কীর্তনকে কেবল গান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ পালাগানের রূপ দান করে।

বিদ্যাপতির পদাবলী:

মিথিলার কবি বিদ্যাপতি যখন ‘ব্রজবুলি’ ভাষায় রাধা-কৃষ্ণের পদ রচনা করেন, তখন তাতে এক অনন্য লালিত্য যোগ হয়। তাঁর পদগুলো সুরের বিচারে এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে, বাংলার কীর্তনীয়াদের কাছে তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের লৌকিকতা এবং বিদ্যাপতির কারুময় পদের মেলবন্ধনেই পদাবলি কীর্তনের পরিপুষ্ট রূপটি গড়ে ওঠে।

চৈতন্য যুগ: কীর্তনের স্বর্ণযুগ ও সামাজিক আন্দোলন (ষোড়শ শতাব্দী)

পনেরো শতকের শেষে এবং ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব কীর্তন গানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড়। তিনি কেবল একজন ধর্মগুরু ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন কীর্তনের এক মহান সংস্কারক ও প্রচারক।

চৈতন্যদেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, শাস্ত্রীয় জটিলতা বা কঠিন দর্শনের চেয়ে সঙ্গীতের আবেদন জনসাধারণের কাছে অনেক বেশি প্রখর। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একই তলে সমবেত করার জন্য কীর্তনকে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।

তিনি ‘নামসংকীর্তন’-কে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘নগর সংকীর্তন’ বাংলার পথে-ঘাটে সঙ্গীতের মাধ্যমে ভক্তি ও সাম্যের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিল।

চৈতন্যদেবের প্রভাবে কীর্তন কেবল লৌকিক প্রেমগীতি থেকে এক উচ্চাঙ্গ আধ্যাত্মিক সাধনায় (Preme-Bhakti) উন্নীত হয়। তিনি কীর্তনকে বাঙালির মরমী সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন, যার ফলে এই ধারাটি শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্য ও লৌকিক সহজিয়া ভাব—উভয় গুণের অধিকারী হয়।

 

পাঁচটি ঘরানা ও আঙ্গিক (চৈতন্যোত্তর যুগ)

শ্রীচৈতন্যদেবের তিরোভাবের পরবর্তী সময়ে কীর্তন গান কেবল ভক্তির মাধ্যম থাকেনি, বরং এটি অত্যন্ত উচ্চমার্গের এবং ব্যাকরণগতভাবে সমৃদ্ধ পাঁচটি পৃথক ঘরানায় বা ‘রীতি’তে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই ঘরানাগুলো মূলত প্রবর্তকগণের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিক্ষা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে খেতুরির ঐতিহাসিক মহোৎসবে নরোত্তম দাস ঠাকুরের হাত ধরে একটি সুসংবদ্ধ রূপরেখা পায়। এই ধারার মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও ধ্রুপদী হলো গড়ানহাটি ধারা

রাজশাহী জেলার গড়ানহাটি পরগনার নামানুসারে নামাঙ্কিত এই ধারার প্রবর্তক ছিলেন নরোত্তম দাস ঠাকুর। তিনি বৃন্দাবনে ধ্রুপদ সঙ্গীতে উচ্চশিক্ষা লাভ করায় এই ধারাটি ছিল মূলত ধ্রুপদাঙ্গের—যা অত্যন্ত গম্ভীর এবং তাল-লয়ের কঠিন ব্যাকরণে আবদ্ধ। তিনিই কীর্তন শুরুর আগে শ্রীচৈতন্যদেবের বন্দনা বা ‘গৌরচন্দ্রিকা’ গাওয়ার আবশ্যিক রীতি প্রবর্তন করেন, যা আজও কীর্তন পরিবেশনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

এর সমান্তরালে বীরভূমের মনোহরশাহী পরগনা থেকে উদ্ভূত হয় মনোহরশাহী ধারা, যার প্রবর্তক ছিলেন জ্ঞানদাস মনোহর। এই ধারায় হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খেয়াল আঙ্গিকের প্রভাব স্পষ্ট; এটি গড়ানহাটির চেয়ে কিছুটা দ্রুত লয়ের এবং অলংকারবহুল হওয়ায় এতে সুরের বৈচিত্র্য ও তান-কর্তবের প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, বর্ধমানের রেনেটি পরগনা থেকে উদিত রেনেটি ধারার প্রবর্তক বিপ্রদাস ঘোষ এতে টপ্পা শৈলীর সূক্ষ্ম কাজ ও হিল্লোল যুক্ত করেন, যা গায়কিতে এক ধরণের চপলতা ও মিড়-এর আধিক্য তৈরি করে।

দক্ষিণবঙ্গের সরকার মন্দারণ অঞ্চল থেকে জনৈক মন্দারণ সরকার যে মন্দারিণী ধারা প্রবর্তন করেন, তাতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঠুংরি ঢঙের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট। এটি মূলত লঘু তালের ওপর ভিত্তি করে ভাবের কারুকার্য ফুটিয়ে তোলার এক আবেগপ্রধান ও কোমল ঘরানা। পরিশেষে, ঝাড়খণ্ডী অঞ্চলে উদ্ভূত ঝাড়খণ্ডী ধারাটি অন্যান্য ঘরানার মতো ধ্রুপদী রাগের কড়াকড়িতে না গিয়ে লোকজ সুরের বলিষ্ঠতা ও মাটির ঘ্রাণ ধরে রেখেছিল। এই পাঁচটি ঘরানাই প্রমাণ করে যে, কীর্তন কেবল গ্রামীণ লোকসঙ্গীত নয়, বরং এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক বিশাল উপ-শাখা। পরবর্তীকালে কলকাতায় টপ্পার প্রভাবে এই ধারাগুলো থেকে বিবর্তিত হয়ে ঢপকীর্তন নামক এক নতুন নাগরিক রূপ তৈরি হয়, যা শাস্ত্রীয় কড়াকড়ি কমিয়ে সহজবোধ্য গায়কিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

কীর্তনের শাস্ত্রীয় কাঠামো, রাগ-তাল ও সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য

কীর্তন মূলত একটি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ধারার গান, যার গঠনশৈলী অত্যন্ত জটিল, গাণিতিক এবং শাস্ত্রীয় বিধি-নিষেধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর সাঙ্গীতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বন্ধন রীতি, যা প্রাচীন ধ্রুপদ সঙ্গীতের অনুকরণে নির্মিত। ধ্রুপদের মতো কীর্তনেও উদ্গ্রাহ, মেলাপক, ধ্রুব ও আভোগ—এই চারটি ধাতুর গঠনরীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। এই কাঠামোগত শৃঙ্খলার পাশাপাশি কীর্তনের আধ্যাত্মিক গভীরতা নির্ধারিত হয় এর রসের বিন্যাস দ্বারা। বৈষ্ণব পণ্ডিতদের মতে, কীর্তনের পদাবলিতে মোট ৬৪ প্রকার রসের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা শ্রোতার হৃদয়ে ভক্তির আবেশ তৈরি করে। কীর্তনের পরিবেশনা ভঙ্গিও অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, যা মূলত কথা, দোহা, ছুট ও তুক্-এর সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদান হলো ‘আখর’; গায়ক যখন মূল পদের ভাবকে বিস্তৃত করতে নিজের পক্ষ থেকে নতুন পংক্তি বা ব্যাখ্যা যোগ করেন, তখন তাকে আখর বলা হয়। এই আখরই সাধারণ একটি পদকে অসামান্য ভাব ও রসে সিক্ত করে তোলে।

সঙ্গীততত্ত্বের বিচারে কীর্তন রাগসঙ্গীতের অন্তর্ভুক্ত হলেও এটি হিন্দুস্থানি ধ্রুপদী সঙ্গীতের কঠোর ব্যাকরণের চেয়ে ভাব ও রসের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকে বেশি প্রাধান্য দেয়। কীর্তনের পদগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ জাতিতে অর্থাৎ সাত স্বরে গীত হয়; তবে রাগের ব্যবহারে কিছুটা শিথিলতা লক্ষ্য করা যায় যাতে ভক্তিরস ব্যাহত না হয়। তোড়ী, কামোদ, শ্রীরাগ, পাহাড়ী এবং পটমঞ্জরীর মতো রাগগুলো কীর্তনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। তালের ক্ষেত্রে কীর্তন ভারতীয় প্রাচীন তালের এক বিশাল বৈচিত্র্য রক্ষা করে চলেছে। এতে ছোট ও বড় লোফা, রূপক, যতি, তেওট, দোঠুকী, মধ্যম ও বড় দশকোশী, দাশপেড়ে, শশীশেখর এবং বীর বিক্রমের মতো অসংখ্য তালের প্রয়োগ দেখা যায়। তালের এই ছন্দোময় বৈচিত্র্য প্রদর্শিত হয় তাল, ফাঁক, কাল, কোশী (কুশী) ও অর্ধতালীর মতো জটিল ক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে। এই সমগ্র সাঙ্গীতিক যজ্ঞে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে শ্রীখোল (আনদ্ধ বাদ্য) এবং করতাল (ঘন বাদ্য) অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে, যা কীর্তনকে একটি স্বকীয় ও শক্তিশালী গীতধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

কীর্তন কেবল একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের উপাসনা পদ্ধতি নয়, বরং এটি দীর্ঘকাল ধরে গ্রামবাংলার জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক অংশ হিসেবে বিদ্যমান ছিল। ঐতিহাসিকভাবে কীর্তন ছিল বাঙালির এক উদার মিলনক্ষেত্র। ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে জীবিকার প্রয়োজনে গ্রামত্যাগী মানুষ যখন শহরমুখী হতে শুরু করে, তখন তাদের হাত ধরেই কীর্তন গ্রাম থেকে কলকাতার নাগরিক সমাজে প্রবেশ করে এবং এক নতুন নাগরিক রুচি লাভ করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত কীর্তন ছিল হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল বাঙালির এক সাধারণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে কীর্তনের মরমী সুর গ্রামীণ মানুষের হৃদয়ে এক গভীর সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বোধ তৈরি করত। পাকিস্তান আমলেও এই ধারাটি ম্লান হয়ে যায়নি; বরং পূর্ব বাংলার গ্রামীণ জনপদে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল, যা বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছিল।

বর্তমানে নগরায়ণ ও সংস্কৃতির বিশ্বায়নের ফলে কীর্তনের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা কিছুটা সংকুচিত মনে হলেও এর মরমী ও চিরন্তন আবেদন এতটুকু কমেনি। আধুনিক বাংলা গানের বিবর্তনেও কীর্তনের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতির এক বিশাল অংশ জুড়ে কীর্তনের সুর ও তালের সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়। এমনকি সমসাময়িক আধুনিক গান বা লোকসঙ্গীতেও কীর্তনের সেই সহজ ও ভক্তিভাবপূর্ণ গায়কী আজও শ্রোতাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এটি আজও বাঙালির স্বকীয় সাংস্কৃতিক সত্তার এক উজ্জ্বল দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কীর্তনের পরিবেশন শৈলী ও শৈল্পিক উপাদান

কীর্তন মূলত একটি অত্যন্ত শৃঙ্খলিত দলগত পরিবেশনা, যার পরিবেশন রীতিতে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকরণ ও অলঙ্কার অনুসরণ করা হয় যা একে সাধারণ লোকজ গান থেকে স্বতন্ত্র ও শাস্ত্রীয় মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। কীর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী অলঙ্কার হলো ‘আখর’। আসরে গান গাওয়ার সময় মূল পদের অন্তর্নিহিত ভাবকে যখন গায়ক বা কীর্তনীয়া নিজের প্রজ্ঞা থেকে সহজ গদ্যে বা পদ্যে ব্যাখ্যা করে গেয়ে ওঠেন, তখন তাকেই আখর বলা হয়। এই সৃজনশীল ব্যাখ্যা শ্রোতার মনে রসের গভীরতা তৈরি করে এবং গানের মূল দর্শনকে সহজবোধ্য করে তোলে।

গানের কাঠামোগত বিন্যাসে দোহা ও তুক্-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল গানের যে অংশটি বারবার ঘুরে আসে অর্থাৎ ‘স্থায়ী’ বা ‘ধুয়ো’ অংশ, তাকে কীর্তনের পরিভাষায় বলা হয় দোহা। অন্যদিকে, গানের পরবর্তী অংশগুলো যা মূলত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্তরা বা সঞ্চারীর সমতুল্য, তাকে বলা হয় তুক্। পরিবেশনার এক পর্যায়ে যখন গানের গতির পরিবর্তন ঘটিয়ে ধীর লয় থেকে অত্যন্ত দ্রুত লয়ে যাওয়া হয়, সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ছুট’। এই ছুট আসরে এক ধরণের অনন্য আধ্যাত্মিক উন্মাদনা ও গতির সঞ্চার করে, যা গায়ক ও শ্রোতা উভয়কেই ভাবের চরম শিখরে নিয়ে যায়। এই ব্যাকরণগত নিখুঁত বিন্যাসই কীর্তনকে বাঙালির এক অনন্য শৈল্পিক সম্পদে পরিণত করেছে।

 

রসতত্ত্ব: ৬৪ প্রকার রসের বিন্যাস

বৈষ্ণব অলঙ্কার শাস্ত্র ও নন্দনতত্ত্ব অনুযায়ী কীর্তনের প্রকৃত প্রাণ হলো ‘রস’। কীর্তনীয়াদের মতে, সুর ও তালের নিখুঁত প্রয়োগের চেয়েও বড় লক্ষ্য হলো শ্রোতার হৃদয়ে সঠিক রসের সঞ্চার করা। বৈষ্ণব পণ্ডিত ও কবিরা কীর্তনে মূলত পাঁচটি মুখ্য রসের (শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর) এবং সাতটি গৌণ রসের (হাস্য, অদ্ভুত, বীর, করুণ, রৌদ্র, ভয়ানক ও বীভৎস) কথা উল্লেখ করেছেন। এই মুখ্য ও গৌণ রসগুলোর বিভিন্ন উপ-বিভাগ এবং সংমিশ্রণে কীর্তনে মোট ৬৪ প্রকার রসের এক বিস্ময়কর ও চমৎকার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। এই রস-বিন্যাসই কীর্তনকে কেবল গান থেকে এক উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক কাব্যে রূপান্তরিত করেছে।

এই সুবিশাল রস-সমুদ্রের মধ্যে ‘মধুর রস’ বা শৃঙ্গার রসই পদাবলি কীর্তনের প্রধান উপজীব্য হিসেবে স্বীকৃত। মধুর রসকে কেন্দ্র করেই রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার আখ্যান আবর্তিত হয়। এই রসের আবার দুটি প্রধান ধারা কীর্তনে অত্যন্ত নিপুণভাবে গীত হয়: বিপ্রলম্ভ (বিরহ) এবং সম্ভোগ (মিলন)। রাধার মান, অভিমান ও বিচ্ছেদের যন্ত্রণাময় অনুভূতিগুলো যেমন বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গারে ফুটে ওঠে, তেমনি বিরহান্তের পরম আনন্দ ও অভিসার বর্ণিত হয় সম্ভোগ শৃঙ্গারে। এই দুই অবস্থার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আবেগীয় পর্যায়গুলো কীর্তনের একেকটি পদে এমনভাবে চিত্রিত হয়, যা ভক্ত ও সাধারণ শ্রোতার মনে এক অতিন্দ্রীয় অনুভূতির জন্ম দেয়।

শ্রীখোল ও তালের গাণিতিক বৈচিত্র্য

কীর্তন গানের প্রাণস্পন্দন এবং এর সবচেয়ে অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র হলো শ্রীখোল। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাখোয়াজ বা তবলার যে মর্যাদা ও গুরুত্ব, বাংলার কীর্তন ধারায় শ্রীখোলের ভূমিকা তার সমতুল্য, বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি নিবিড়। এই বাদ্যযন্ত্রটির ধ্বনি এবং বাদনশৈলী কীর্তনের আধ্যাত্মিক আবহ তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কীর্তনে ব্যবহৃত তালের গঠন ও প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল এবং গাণিতিক সূক্ষ্মতায় পরিপূর্ণ। বিশেষ করে ‘লোফা’ কিংবা ‘দশকোশী’র মতো তালগুলোর তালি ও ফাঁকের হিসাব এতটাই নিপুণ যে, সামান্য ত্রুটি গানের সম্পূর্ণ ছন্দকে বিঘ্নিত করতে পারে।

কীর্তন পরিবেশনার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর তালের জটিলতা এবং বৈচিত্র্যময় চলন। অনেক সময় আসরে একটি নির্দিষ্ট তাল বাজাতে বাজাতে বিশেষ শৈল্পিক দক্ষতায় লয় পরিবর্তন করে অন্য একটি তালে প্রবেশ করা হয়, যাকে শাস্ত্রীয় পরিভাষায় বলা হয় ‘তাল-ফেরতা’। তালের এই পরিবর্তন শ্রোতার মনে এক ধরণের নতুনত্বের স্বাদ দেয়। এছাড়া কীর্তনের লয়ের বিস্তারও অত্যন্ত ব্যাপক; গায়কীর শুরু হয় ধীর গতির অত্যন্ত ভাবগম্ভীর বিলম্বিত লয় দিয়ে, যা ক্রমান্বয়ে মধ্য লয় অতিক্রম করে এক সময় চরম দ্রুত লয়ে গিয়ে পৌঁছায়। লয়ের এই গাণিতিক আরোহণ ও অবরোহণ শ্রীখোলের জাদুকরী তালের সাথে মিলে কীর্তনকে এক অনন্য শাস্ত্রীয় উচ্চতা দান করেছে।

 

আধুনিক বাংলা গানে কীর্তনের প্রভাব

কীর্তন কেবল মধ্যযুগের ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি আধুনিক বাংলা গানের এক মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাংলার শ্রেষ্ঠ দুই সংগীতস্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গানে কীর্তনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অজস্র গানে কীর্তনের সুর, তাল ও কাঠামো অত্যন্ত নিপুণভাবে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে তাঁর তরুণ বয়সের অমর সৃষ্টি ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ জয়দেব ও বিদ্যাপতির ধারার এক সার্থক উত্তরাধিকার। এছাড়াও তাঁর অনেক ‘ভাঙা গান’ এবং ঝুমুর মিশ্রিত কীর্তনাঙ্গ সুর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এক অনন্য গীতলতা ও আধ্যাত্মিক ভাবুকতা প্রদান করেছে। একইভাবে, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর শ্যামাসঙ্গীত, ভজন এবং ইসলামী গানেও কীর্তনের মেজাজ ও তালের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। নজরুলের গানে কীর্তনের সেই প্রগাঢ় ভক্তিভাব ও লৈকিক আকুলতা বাঙালির আধুনিক গানকে এক বিশাল বৈচিত্র্য দান করেছে।

আধুনিক নাগরিক গানের পাশাপাশি বাংলার লোকসঙ্গীতেও কীর্তনের এক সাবলীল ও লৌকিক সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায়। বাউল ও ভাটিয়ালি গানের অনেক ক্ষেত্রেই কীর্তনের সুরবিন্যাস পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মরমী সাধক রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান এবং তাঁর বিরহ পর্যায়ের পদাবলিতে কীর্তনের সুর ও অলংকারের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এটিই প্রমাণ করে যে কীর্তন কেবল মন্দির বা আসরের গান নয়, বরং এটি বাংলার জল-মাটির সংগীতে মিশে থাকা এক চিরন্তন সুরধারা।

পরিশেষে বলা যায়, কীর্তন বাঙালির প্রাণের সঙ্গীত এবং এক শক্তিশালী জীবনদর্শন। এটি এমন এক উদার মাধ্যম যা মানুষকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সারিতে দাঁড় করাতে শিখিয়েছে। এর রাগ-তালের আভিজাত্য এবং আধ্যাত্মিক আর্তি আজও বিশ্বসঙ্গীতের দরবারে এক বিস্ময়কর সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। কীর্তনের এই সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক আলোচনা আমাদের শিকড়কে চিনতে এবং বাঙালির নিজস্ব সুরের ঐশ্বর্যকে বুঝতে নতুন করে সহায়তা করে।

 

আমার পছন্দের তালিকার কিছু গান:

১. হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ –

২. জয় সীতাপতি সুন্দর তনু প্রজারঞ্জনকারী – কৃষ্ণচন্দ্র দে (কথা- হেমেন্দ্রকুমার রায়, সুর ও শিল্পী – কৃষ্ণচন্দ্র দে)। একই গান মান্নাদে’র গাওয়া

আরও দেখুুন: