কুমারখালী উপজেলার দর্শনীয় স্থান – কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভাণ্ডার বহন করে চলেছে কুমারখালী উপজেলা। জেলার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানই অবস্থিত এই অঞ্চলে। সাহিত্য, সঙ্গীত, আধ্যাত্মিকতা ও স্থাপত্যকলা—সবকিছু মিলেই কুমারখালী একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। নিচে কুমারখালীর প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনা তুলে ধরা হলো—

কুমারখালী উপজেলার দর্শনীয় স্থান

 

লালন শাহের মাজার ও আখড়াবাড়ি:

আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহ কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং মৃত্যুর পর এখানেই সমাহিত হন। তার সমাধিস্থল ঘিরেই গড়ে ওঠে লালনের আখড়া, যা আজ লক্ষ বাউল, সাধক ও গবেষকের তীর্থক্ষেত্র। প্রতিবছর লালন স্মরণোৎসব ও দোলপূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের অসংখ্য বাউল সমবেত হন এখানে।

১৯৬৩ সালে নির্মিত হয় বর্তমান মাজার ভবন, যার উদ্বোধন করেন তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খান। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে এখানে আধুনিক অডিটোরিয়াম ও একাডেমি ভবন স্থাপন করা হয়। লালনের গান, বাউল দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তাধারা এখন শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী অনুপ্রেরণার উৎস।

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের প্রেস (এম.এন. প্রেস জাদুঘর):

বাংলাদেশের সংবাদপত্র আন্দোলনের অগ্রদূত কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার ১৮৬৩ সালে প্রকাশ করেন গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। ব্রিটিশবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই পত্রিকা ও তার প্রেস আজও ইতিহাসের সাক্ষী।

বর্তমানে এম.এন. প্রেস জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে সেই সময়কার ঐতিহাসিক ছাপাখানা, বাংলা টাইপের অক্ষর, প্রেসের যন্ত্রাংশ, ছবি ও বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি। সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তার ইতিহাস জানতে এই স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর:

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরেশদপুর গ্রামে অবস্থিত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
৩৩ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই তিনতলা কুঠিবাড়িতে রয়েছে ১৮টি কক্ষ। তৃতীয় তলায় ছিল কবির লেখার ঘর, যেখানে বসেই তিনি রচনা করেন গীতাঞ্জলিসহ বহু কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। এখান থেকেই গঙ্গার জ্যোৎস্না, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করতেন কবিগুরু। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে কবির ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ও নানা প্রদর্শনী দেখা যায়। এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত দেখুন …

ঐতিহাসিক মসজিদসমূহ:

কুমারখালীতে মুঘল আমল থেকে শুরু করে উনিশ শতক পর্যন্ত নির্মিত বেশ কিছু স্থাপত্য এখনও টিকে আছে, যা ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন—

  • বালিয়াকান্দি শাহী মসজিদ (মুঘল আমল)

  • কুশলিবাসা শাহী মসজিদ (মুঘল আমল)

  • মিয়াজান কাজীর মসজিদ (১৮৪০ খ্রি.)

  • তেবাড়িয়া তিন গম্বুজ মসজিদ (১৮৮৯ খ্রি.)

  • কুমারখালী বড় জামে মসজিদ (১৮৯০ খ্রি.)

  • শেরকান্দি হাজীর মসজিদ (১৮৮৭ খ্রি.)

  • বাটিকামারা জামে মসজিদ

 

হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা:

  • খোরশেদপুর গোপীনাথ মন্দির (১৭৩৫ খ্রি.) – দৃষ্টিনন্দন প্রাচীন স্থাপনা, যা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র।

  • রাজা সীতারামের মঠ – বাংলার প্রাচীন জমিদার ঐতিহ্যের নিদর্শন, যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

 

কুমারখালীর দর্শনীয় স্থানগুলো কেবল পর্যটন নয়, বরং ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার ধারক ও বাহক। রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি, লালনের আখড়া কিংবা কাঙ্গাল হরিনাথের প্রেস—প্রতিটি স্থানই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। তাই কুমারখালীকে বলা হয় বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল ভাণ্ডার