কুমারখালী এম.এন. সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

কুষ্টিয়া জেলার প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে কুমারখালী এম.এন. (মথুরানাথ) সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় অন্যতম। ১৮৫৬ সালে যখন সমগ্র বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার সবেমাত্র শুরু হয়েছে, তখন কুমারখালীর দানবীর ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মথুরানাথ কুণ্ডু এই প্রদীপটি জ্বালিয়েছিলেন। বিদ্যালয়টি গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত নীলকুঠিতে যাত্রা শুরু করে। তৎকালীন সমাজে নীলকুঠিগুলো ছিল নির্যাতনের প্রতীক, কিন্তু মথুরানাথ বাবু সেই অন্ধকার কুঠিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

নামকরণ ও রূপান্তর

শুরুতে বিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘কুমারখালী মথুরানাথ ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়’। পরবর্তীতে এটি ‘কুমারখালী এম.এন. পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ এবং সবশেষে সরকারি করণের পর এর বর্তমান নাম হয় ‘কুমারখালী এম.এন. সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়টি ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করেছিল।

স্থাপত্য ও ভৌগোলিক বিবর্তন

বিদ্যালয়টির আদি ভবনটি গড়াই নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীতে বর্তমান স্থানে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে বিশাল খেলার মাঠ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো রয়েছে। বিদ্যালয়টি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি কুমারখালীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক চেতনার একটি ধারক।

শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফল

বর্তমানে বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরের অধীনে পরিচালিত হয়। নবম-দশম শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই তিনটি বিভাগই চালু রয়েছে। বিদ্যালয়টি বরাবরই পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া জেলায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টি ‘মডেল স্কুল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং পরবর্তীতে সরকারিকরণ করা হয়।

কিংবদন্তি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক

এই বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকেই তৈরি হয়েছেন বিশ্বখ্যাত অনেক মনীষী।

  • জলধর সেন: প্রখ্যাত সাহিত্যিক, হিমালয় ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা এবং ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক।
  • কাঙাল হরিনাথ মজুমদার: যদিও তিনি সরাসরি শিক্ষক ছিলেন কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ ও সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বিদ্যালয়ের পরিমণ্ডল।
  • এছাড়াও দেশবরেণ্য বহু প্রকৌশলী, চিকিৎসক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়টি স্কাউটিং, রেড ক্রিসেন্ট, খেলাধুলা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে অনেক গৌরব অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ের স্কাউট দল কুষ্টিয়া জেলার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দল হিসেবে পরিচিত।

১৮৫৬ থেকে আজকের আধুনিক যুগ—কুমারখালী এম.এন. সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় তার ঐতিহ্যের গরিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল একটি স্কুল নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষা বিপ্লবের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

আরও দেখুন:

Leave a Comment