কুররাতুল আইন হায়দার | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

যদি কখনো অলস বা নিস্তব্ধ কোনো রাতে তাঁর ‘আগ কা দরিয়া’ (River of Fire)-এর পাতা উল্টে ইতিহাসের আড়াই হাজার বছরের বহমান স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন, কিংবা ‘আখরী শব কে হামসফর’-এর বিপ্লবী তরুণের আদর্শভঙ্গের ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হন—তবে আপনি টের পাবেন সময় আর চেতনার প্রবাহকে সাহিত্যে রূপ দিতে তিনি কতটা অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিধাতা কুররাতুল আইন হায়দারকে আয়ু দিয়েছিলেন ৮০ বছর, ৭ মাস এবং ১ দিন (১৯২৭ – ২০০৭)। সেই আট দশকের দীর্ঘ জীবনে তিনি উর্দু কথাসাহিত্যকে কেবল আঞ্চলিক বা সাময়িক সীমারেখায় আটকে রাখেননি; বরং তাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন মহাকাল, দর্শন ও বিশ্বমানবের সর্বজনীন ইতিহাসের সাথে।

সাহিত্যপাড়ায় যিনি সবার ভালোবাসার ‘আইনী আপা’ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন আধুনিক উর্দু উপন্যাসের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একক সম্রাজ্ঞী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক পিতা সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরামের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বহন করে তিনি যখন উর্দু কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন, তখন তিনি স্রেফ একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেননি; তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক বিশ্বকোষ। স্ট্রিম অব কনশাসনেস বা চেতনার প্রবাহরীতিকে উর্দু সাহিত্যে তাঁর মতো গভীরতা ও প্রজ্ঞার সাথে আর কেউ ব্যবহার করতে পারেনি।

আজ উর্দু সাহিত্যের এই বিস্ময়কর নক্ষত্রের প্রয়াণতিথি ও স্মৃতিকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে আমাদের এই নিবেদন।

কুররাতুল আইন হায়দার

“Waqt ek aisi nadi hai jo kabhi peeche nahi mudti, lekin usme behte hue insani wajood ke aks hamesha zinda rehte hain… Tareekh sirf badshahon ki nahi, insani rooh ki aawaz hai.”

উর্দু সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাসিক কুররাতুল আইন হায়দারের এই দার্শনিক ভাবনার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়—

“সময় এমন এক বহমান নদী যা কখনো পেছনে ফিরে তাকায় না, কিন্তু সেই নদীর জলে ভেসে যাওয়া মানব সত্তার ছায়াগুলো চিরকাল জীবন্ত থেকে যায়… ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাদের জয়ের গল্প নয়, ইতিহাস হলো মানুষের অবিনাশী আত্মার খাঁটি কণ্ঠস্বর।”

আজ থেকে বহু দশক আগে সাহিত্যকে সময়ের এই মহাকাব্যিক দর্পণে রূপ দিয়েছিলেন কুররাতুল আইন হায়দার। যিনি সাময়িক রাজনীতি কিংবা ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্যকে পরম মমতায় ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজের সাহিত্যে ধারণ করেছিলেন।

সাহিত্যিক পরিবার ও ‘আইনী আপা’র সূচনার দিনগুলো

১৯২৭ সালের ২০ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে এক উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত সাহিত্যিক পরিবারে জন্ম নেন কুররাতুল আইন হায়দার। তাঁর বাবা সজ্জাদ হায়দার ইয়ালদরাম ছিলেন উর্দু ছোটগল্প ও গদ্যের পথিকৃৎ, আর মা নজর সাজ্জাদ হায়দার নিজেও ছিলেন উর্দু সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আদি নারী ঔপন্যাসিক। গৃহপরিবেশেই সাহিত্যের এই অবাধ আবহে বেড়ে ওঠা কুররাতুল আইনের মনে শৈশব থেকেই বৈশ্বিক সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি এক গভীর তৃষ্ণা তৈরি হয়।

লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সময়ই তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য, বিশেষ করে ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস এবং মার্সেল প্রুস্তের ‘চেতনাপ্রবাহ’ (Stream of Consciousness) রীতির সাথে পরিচিত হন। এই পশ্চিমা সাহিত্যরীতিকে তিনি ভারতীয় দর্শন, পুরাণ এবং ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে উর্দু সাহিত্যের নিজস্ব এক অতুলনীয় শৈলী গড়ে তোলেন।

‘আগ কা দরিয়া’: আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের মহাকাব্য

১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় কুররাতুল আইন হায়দারের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘আগ কা দরিয়া’ (River of Fire)। এটিকে কেবল উর্দু সাহিত্যের নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মর্যাদায় দেখা হয়।

এই উপন্যাসের ক্যানভাস কতখানি বিশাল, তা অনুধাবন করা যায় এর কাহিনী বিন্যাসে:

  • খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের যুগ থেকে গল্প শুরু হয়।
  • মধ্যযুগীয় ভারত, মোঘল শাসন, ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং সবশেষে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও উত্তর-স্বাধীন ভারতের পটভূমি পর্যন্ত বিস্তৃতি পায়।

গৌতম নীল অম্বর, চম্পা, হরি শঙ্কর এবং আবুল মনসুর কামালের মতো প্রধান চার-পাঁচটি চরিত্র আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। সময় বদলে যায়, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলায়—কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, একাকীত্ব, বেঁচে থাকার হাহাকার আর অস্তিত্বের সংকট চিরকাল একই থেকে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের সমন্বিত ঐতিহ্য (Ganga-Jamuni Tehzeeb) কীভাবে দেশভাগের মাধ্যমে চূর্ণভঙ্গ হলো, তা কুররাতুল আইন হায়দার এই উপন্যাসে এক বিষাদময় নন্দনতত্ত্বের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।

দেশভাগ, পাকিস্তান প্রবাস ও ভারতে প্রত্যাবর্তন

১৯৪৭ সালের রক্তক্ষয়ী দেশভাগ কুররাতুল আইন হায়দারকে মানসিকভাবে গভীর আঘাত হেনেছিল। পরিবারের সাথে তিনি প্রাথমিক অবস্থায় নবগঠিত পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি অনুভব করেন, তাঁর অখণ্ড চেতনা ও হাজার বছরের সম্মিলিত ঐতিহ্যচেতনা সেখানে সংকীর্ণ রাজনৈতিক কাঠামোর মুখোমুখি হচ্ছে। তাঁর ‘মেরে ভি সনম খানে’ এবং ‘আগ কা দরিয়া’ উপন্যাসে ব্যক্ত অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার জন্য তৎকালীন রক্ষণশীল মহল থেকে তাঁকে কটূক্তির মুখোমুখিও হতে হয়েছিল।

অস্থায়ীভাবে কিছুদিন লন্ডনে বিবিসি রেডিওতে কাজ করার পর তিনি উপলব্ধি করেন—তাঁর মূল শিকড় লুকিয়ে আছে ভারতের মাটিতেই। ১৯৬০-এর দশকে তিনি স্থায়ীভাবে ভারতে ফিরে আসেন এবং নতুন দিল্লিতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঐতিহ্যবাহী সাময়িকী ‘ইমপ্রিন্ট’ এবং ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া’র সম্পাদকীয় দায়িত্বও পালন করেন।

কালজয়ী উপন্যাস ও আফসানার ক্যানভাস

কুররাতুল আইন হায়দার ডজনখানেক উপন্যাস এবং বেশ কিছু কালজয়ী আফসানা সংকলন উপহার দিয়েছেন, যেখানে সময়, স্মৃতি ও ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের ইতিহাস ফুটে উঠেছে।
‘আখরী শব কে হামসফর’ (Aakhri Shab Ke Humsafar):
এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলন, সাম্যবাদী ভাবধারা এবং স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের আদর্শভিত্তিক রাজনীতির দেউলিয়াত্বের ওপর এটি এক অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক দলিল।
‘মেরে ভি সনম খানে’ (Mere Bhi Sanam Khane):
এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। লখনউয়ের অভিজাত সংস্কৃতি এবং দেশভাগের প্রাক্কালে কীভাবে এক একটি সুসংগঠিত পরিবার ও ঐতিহ্য ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, তরুণী কুররাতুল আইন অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় তা তুলে ধরেছেন।
‘রৌশনী কী রফতার’ ও ‘পতঝড় কী আওয়াজ’ (Roshni Ki Raftar & Patjhar Ki Aawaz):
‘পতঝড় কী আওয়াজ’ সংকলনের জন্য তিনি ১৯৬৭ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ অর্জন করেন। এই গল্পগুলোতে সময় যেন এক আলোর গতিতে (রৌশনী কী রফতার) ছুটে চলে, আর পেছনে পড়ে থাকে ক্ষয়িষ্ণু সমাজের শূন্যতা, অভিজাত লখনউ ও দিল্লির পুরোনো স্মৃতি এবং মানুষের তীব্র একাকীত্ব।

স্বীকৃতি, সম্মাননা ও জীবনাবসান

কুররাতুল আইন হায়দার ছিলেন ভারতীয় সাহিত্য জগতের এক সর্বোচ্চ সমাদৃত ব্যক্তিত্ব। তিনি একে একে লাভ করেছেন ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ (১৯৬৭), ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’ (১৯৮৯), এবং ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ (২০০৫)। এ ছাড়া তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে অতিথি অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন।

২০০৭ সালের ২১ আগস্ট, ৮০ বছর বয়সে এই মহীয়সী লেখক নোইডার এক হাসপাতালে চিরতরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে উর্দু সাহিত্যের এক আস্ত ইতিহাস ও স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে।

কুররাতুল আইন হায়দারের প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়

আজ যখন মানুষ নিজের অতীত ও ঐতিহ্যকে ভুলে সস্তা ও ক্ষণস্থায়ী মোহে মগ্ন, তখন কুররাতুল আইন হায়দারের সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বহু হাজার বছরের ইতিহাস। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সময়কে জয় করতে হলে কেবল বর্তমানকে নিয়ে ভাবলে চলে না, অতীত ও ভবিষ্যতের আত্মিক সেতুটি নির্মাণ করতে হয়।