কে ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ? উকিল না রাজনৈতিক নেতা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

পাকিস্তান তো বটেই, আজকাল বাংলাদেশেও দেখা যায় অনেক লোক মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে মহান নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। অনেক বড় বড় একাডেমিক ডিগ্রিধারীরাও কেউ কেউ এই লাইনে হাঁটেন। আমি বিশ্বাস করি না তারা বাস্তবতা জানেন না, বরং আমি মনে করি তারা ইচ্ছে করে বা পরিকল্পিতভাবেই এই প্রতারণা করেন।

এজন্যই আজ আপনাদের সামনে জিন্নার বাস্তবতা তুলে ধরতে এই লেখাটি লিখছি। তবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তাঁর যোগ্যতাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই লেখাটি লিখছি। তিনি বড় বা সফল উকিল ছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু তিনি একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করার মতো ভিশনারি নেতা ছিলেন না; এমনকি জননেতা বলতে আমরা যা বুঝি, তাও তিনি ছিলেন না। একজন জননেতা হওয়ার জন্য যে জনসম্পৃক্ততা দরকার হয়, তা তাঁর ছিল না। যে আদর্শিক বোঝাপড়া দরকার হয়, তা তাঁর ছিল না। যে ভিশন দরকার হয়, সেটাও তাঁর ছিল না। তাঁর কাছে পাকিস্তান ছিল একটি কেস—যে কেসটি তিনি জিতেছেন।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

Table of Contents

১. ইতিহাস পুনর্বাসনের রাজনীতি ও আধুনিক নব্য-জিন্নাহবাদের ব্যবচ্ছেদ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের কতিপয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের ঐতিহাসিক স্মৃতিকাতরতা বা ‘রিভিশনিজমে’র (Revisionism) পুনরুজ্জীবন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নানা একাডেমিক ডিগ্রির আড়ালে একশ্রেণির গবেষক ও চিন্তক জিন্নাকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার অগ্রদূত’, ‘সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষক’ কিংবা ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিবিদ’ হিসেবে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করার সুচতুর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এই ঐতিহাসিক জালিয়াতি কোনো অবোধ অজ্ঞতার ফসল নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বয়ান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ বা ‘রিলিজিয়াস ন্যাশনালিজম’-এর কবর রচিত হয়েছিল, সেই পরাজিত রাজনৈতিক আদর্শকে সমাজে ফের বৈধতা দেওয়ার জন্যই জিন্নাহকে ‘মহৎ স্টেটসম্যান’ বানানোর এই প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের প্রাথমিক দলিল (Primary Sources), জিন্নাহর নিজের চিঠিপত্র (Jinnah Papers), বোম্বাই হাইকোর্টের নথিপত্র, সমসাময়িক রাজনৈতিক সহকর্মীদের আত্মজীবনী এবং আধুনিক নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের দীর্ঘ গবেষণা থেকে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জিন্নাহ কোনো মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা আফতাব আহমদ ওসমানী, মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো লোকায়ত গণনেতা ছিলেন না।

জিন্নাহর পুরো জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি রাষ্ট্রচিন্তা বা সমাজবিপ্লবের রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত ১৯ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আইনি কাঠামোর ভেতর বেড়ে ওঠা বোম্বাই হাইকোর্ট ও প্রিভি কাউন্সিলের একজন অতি চতুর, চড়া ফি নেওয়া এবং নীতিহীন ‘আইনি সওদাগর’ (Legal Mercenary)। তিনি কোটি কোটি মানুষের জীবন, ঐতিহ্য, ভাষা ও ভবিষ্যৎকে স্রেফ একটি আইনি মামলা বা ‘কোর্ট কেস’ হিসেবে পরিচালনা করেছিলেন। তিনি মামলাটিতে জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু যে রাষ্ট্রটি তিনি বানিয়েছিলেন—তা শুরু থেকেই পরিণত হয়েছিল এক অন্যায্য, স্বৈরাচারী ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অকার্যকর রাষ্ট্রে।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

 

২. বোম্বাই হাইকোর্ট থেকে প্রিভি কাউন্সিল: আইনজীবী জিন্নার মনস্তত্ত্ব ও কৌশল

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বুঝতে হলে আগে তাঁর ব্যারিস্টারি ও বিচারিক মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। ১৮৯৬ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিনকনস ইন (Lincoln’s Inn) থেকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্যারিস্টারি পাস করে বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) ফিরে আসার পর তরুণ জিন্নাহ চরম আর্থিক টানাটানির মুখোমুখি হন। কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর অনন্য আইনি মেধা, ইংরেজদের মতো নিখুঁত উচ্চারণ, তীক্ষ্ণ জেরা করার ক্ষমতা এবং টেকনিক্যাল বিষয়গুলোকে নিজের পক্ষে আনার দক্ষতার গুণে বোম্বাই হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলের অন্যতম শীর্ষ আইনজীবীতে পরিণত হন।
তবে এই ব্যারিস্টারি দক্ষতাই তৈরি করেছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—তিনি রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎকে স্রেফ একটি ‘আদালতি মামলা’ (Legal Case) হিসেবে পরিচালনা করেছিলেন।

চড়া ফি, বিশাল সম্পত্তি ও প্রিভি কাউন্সিলের আইনি বাণিজ্য

স্ট্যানলি উলপার্ট (Stanley Wolpert) তাঁর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ ‘Jinnah of Pakistan’ এবং হেক্টর বলিথো (Hector Bolitho) তাঁর ‘Jinnah: Creator of Pakistan’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জিন্নাহ তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বাণিজ্যমুখী আইনজীবী ছিলেন।
  • বোম্বাই ও লন্ডনের রাজকীয় ফি: ১৯৩০-এর দশকে, যখন সাধারণ ভারতীয়দের গড় দৈনিক আয় ছিল কয়েক আনা, তখন জিন্নাহ বোম্বাই হাইকোর্টে প্রতি শুনানির (Per Appearance) জন্য ১,০০০ রুপি ফি দাবি করতেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে লন্ডনে সাময়িক নির্বাসনে থাকাকালে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত ‘জুডিশিয়াল কমিটি অব দ্য প্রিভি কাউন্সিল’ (Privy Council)-এ একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী আপিল আইনজীবী হিসেবে কোটি কোটি টাকার আইনি বাণিজ্য পরিচালনা করেন।
  • অভিজাত জীবন ও রাজকীয় প্রসাদ: আইনের বাণিজ্যিক সাফল্য জিন্নাহকে বিপুল অংকের অর্থ এনে দেয়। তিনি বোম্বাইয়ের মালেবার হিলে রাজকীয় ‘জিন্নাহ হাউস’ (Southlands) এবং দিল্লিতে ‘১০ ঔরঙ্গজেব রোড’-এ বিলাসবহুল প্রাসাদ গড়ে তোলেন।
  • অফিশিয়াল রেকর্ড: বোম্বাই হাইকোর্টের অফিশিয়াল আর্কাইভ ও ভার্চুয়াল মিউজিয়ামের রেকর্ডে (Bombay High Court Virtual Museum Record) জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে লেখা আছে:
“He was a tall, fashionable, exceptionally crafty and persuasive Advocate, who relied more on the vulnerabilities of the law and the weaknesses of the prosecution than on broad human principles.”

তিলকের মামলা (১৯০৮ ও ১৯১৬): নীতিহীন টেকনিক্যাল জয়

আইনজীবী হিসেবে জিন্নাহর কৌশল কেমন ছিল, তা স্পষ্ট বোঝা যায় বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজদ্রোহ (Sedition) মামলার বিচার প্রক্রিয়া থেকে। ১৯০৮ এবং ১৯১৬ সালে তিলকের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাজ যখন ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ (Section 124A) ধারায় রাজদ্রোহের মামলা করে, জিন্নাহ ছিলেন তিলকের প্রধান প্রতিরক্ষা আইনজীবী।
বোম্বাই হাইকোর্টের সংরক্ষিত নথি থেকে দেখা যায়, জিন্নাহ আদালতে তিলকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ঔপনিবেশিক শাসনের শোষণ কিংবা ভারতের স্বরাজের মতো কোনো মৌলিক বা নৈতিক অধিকার তুলে ধরে তর্ক করেননি। জিন্নাহর পুরো আইনি আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল:
  1. চার্জশিটে মারাঠি ভাষার সংবাদপত্র ‘কেসরি’র অনুবাদের টেকনিক্যাল ভুল ধরা।
  2. পুলিশি সাক্ষীদের জবানবন্দির বৈপরীত্য উন্মোচন করা।
  3. প্রসেস বার এবং সামন জারির আইনি ত্রুটি দেখানো।
অর্থাৎ, জিন্নাহর কাছে মক্কেলের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা আদর্শ মুখ্য ছিল না; তাঁর কাছে মুখ্য ছিল আইনের ফাঁকগলে ব্রিটিশ প্রসিকিউশনকে মাত করা। এই আইনি চতুরতা আইনজীবী হিসেবে তাঁকে বিপুল খ্যাতি ও অর্থ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তক হিসেবে তাঁর ভেতর এক চরম ‘টেকনিক্যাল সংকীর্ণতা’ তৈরি করে দিয়েছিল।

কালাত রাজ্যের কেস (১৯৪৬-১৯৪৮): মক্কেলের পিঠে আইনি বল্লম ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা

জিন্নাহর “আইনি সওদাগর” (Legal Mercenary) মানসিকতার সবচেয়ে নগ্ন ও জঘন্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় বালুচিস্তানের কালাত রাজ্য (Khanate of Kalat) এবং তার শাসক মীর আহমেদ ইয়ার খানের মামলার বিচার প্রক্রিয়ায়।
ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল এবং বালুচিস্তানের ঐতিহাসিক নথিপত্র (Kalat State Archives) থেকে এই কেসটির চাঞ্চল্যকর তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
  • আইনজীবী হিসেবে জিন্নাহর নিয়োগ (১৯৪৬): ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের আগে বালুচিস্তানের কালাত রাজ্যের মীর আহমেদ ইয়ার খান কালাতকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বহাল রাখতে চান। ব্রিটিশদের সাথে ১৮৭৬ সালের চুক্তির আইনি ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তিনি জিন্নাহকে তাঁর প্রধান আইনজীবী (Lead Legal Counsel) হিসেবে মোটা অংকের ফি দিয়ে নিয়োগ করেন।
  • জিন্নাহর আইনি যুক্তি: জিন্নাহ কালাতের মক্কেলের পক্ষে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের সামনে দাঁড়াইয়া অত্যন্ত শক্ত আইনি যুক্তি পেশ করে বলেন—১৮৭৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী কালাত কখনোই ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ রাজের সাথে চুক্তিবদ্ধ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য (ঠিক যেমন নেপাল বা ভুটান)। ১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট জিন্নাহর আইনি মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, কালাত ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Standstill Agreement) স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে কালাতকে এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করা হয়। জিন্নাহ এই কেস জিতার জন্য কালাতের খানের কাছ থেকে বিপুল অংকের ফি এবং উপহার গ্রহণ করেন।
  • রাষ্ট্রপ্রধান জিন্নাহর চরম উল্টো টান ও সামরিক হামলা (১৯৪৮): কিন্তু ঘটনার মোড় ঘোরে ঠিক ৭ মাস পর। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে, জিন্নাহ যখন আর কালাতের ‘আইনজীবী’ নন—বরং নিজেই পাকিস্তানের অল-পাওয়ারফুল গভর্নর জেনারেল, তখন তিনি তাঁর নিজস্ব আইনি যুক্তিকে এক মুহূর্তে পদদলিত করলেন!
  • যে কালাতকে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আইনি লড়াই করে জিতিয়ে এনেছিলেন, সেই কালাতের মক্কেলকেই জিন্নাহ আলটিমেটাম দেন পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার জন্য। মীর আহমেদ ইয়ার খান জিন্নাহর পুরোনো আইনি যুক্তি ও চুক্তির দোহাই দিলে জিন্নাহ তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ২৭শে মার্চ ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কালাত আক্রমণ করে এবং বন্দুকের মুখে কালাতকে জোরপূর্বক পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করে।
কালাতের এই কেসটি প্রমাণ করে—জিন্নাহর কাছে নীতি, চুক্তি বা মক্কেলের অধিকারের কোনো মূল্য ছিল না। যখন টাকা পেয়েছিলেন, তখন কালাতের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন; আর যখন ক্ষমতার চেয়ারে বসেছেন, তখন সেই পুরোনো মক্কেলের ওপরই সামরিক বুট চাপিয়ে দিয়েছেন।

১৯১৩ সালের ওয়াকফ আইন: সামন্তপ্রভুদের সম্পত্তি রক্ষার আইনি ঢাল

জিন্নাহর আইনি ক্যারিয়ারের অন্যতম উদাহৃত সাফল্য হলো ১৯১৩ সালের ‘Mussalman Wakf Validating Act’ পাস করানো। ভারতের কিছু ঐতিহাসিক একে জিন্নাহর “মুসলিমদের জন্য প্রথম আইনি অবদান” হিসেবে তুলে ধরেন।
কিন্তু এর পেছনের আসল অর্থনৈতিক সত্যটি হলো—১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ প্রিভি কাউন্সিল এক রায়ে বলেছিল যে, কেবল পরিবারের সম্পত্তি মহাজনের ঋণ বা বাজেয়াপ্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে ভুয়া ওয়াকফ করা বেআইনি। ভারতের তৎকালীন মুসলিম জমিদার, নওয়াব ও সামন্তপ্রভুরা ঋণগ্রস্ত হয়ে তাঁদের বিশাল জমিদারি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। জিন্নাহ আইনি চতুরতা দিয়ে ভাইসরয়ের কাউন্সিলে এই বিলটি পাস করান, যার মাধ্যমে জমিদারের সম্পত্তিকে ‘ওয়াকফ আলাল আওলাদ’ (পরিবারের জন্য ওয়াকফ) হিসেবে ঘোষণা করে মহাজন বা সরকারের বাজেয়াপ্তকরণের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
অর্থাৎ, এই আইনের মূল লাভ সাধারণ মুসলিমদের হয়নি; লাভ হয়েছিল জিন্নাহর আসল মক্কেল—সেই ঋণগ্রস্ত সামন্তপ্রভু ও জমিদারদের, যাদের জমিদারি টিকে গিয়েছিল।

বিচারক ও মক্কেলের প্রতি অহংকার: কাঠগড়ার ভেতরের মনস্তত্ত্ব

জিন্নাহর মনস্তত্ত্ব ছিল চরম আত্মকেন্দ্রিক ও অহংকারী। এইচ. এম. সিরভাই (H. M. Seervai) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Partition of India: Legend and Reality’-এ উল্লেখ করেছেন বোম্বাই হাইকোর্টের একটি সুপরিচিত ঘটনা।
একদা বোম্বাই হাইকোর্টের এক জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ বিচারপতি জিন্নাহর অতিরিক্ত ত্যক্ত-বিরক্ত ও উদ্ধত জেরা শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন:
“Mr. Jinnah, remember that you are not arguing in a third-class magistrate’s court.”
জিন্নাহ এক মুহূর্ত দেরি না করে, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সশব্দে উত্তর দিয়েছিলেন:
“My Lord, allow me to remind you that you are not speaking to a third-class lawyer either.”
এই ঘটনাটি জিন্নাহ সমর্থকরা তাঁর ‘সাহসিকতা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক অর্থ হলো: জিন্নাহর কাছে আইন আদালত ছিল স্রেফ তাঁর ব্যক্তিগত অহং প্রকাশ এবং যেকোনো মূল্যে কেস জেতার ক্ষেত্র। বিচারালয়ের বাইরে লাখ লাখ শোষিত মানুষের যে সামাজিক, মানবিক বা অর্থনৈতিক বেদনা ছিল—তার সঙ্গে এই অহংকারী আইনজীবীর কোনো আত্মিক সংযোগ বা সহানুভূতি কখনো ছিল না।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

৩. ‘ক্লায়েন্ট ব্রিফ’ হিসেবে ধর্ম: ধর্মাচরণহীন ব্যক্তিগত জীবন ও কৌশলগত ধর্মব্যবসা

জিন্নাহকে “মুসলিম জাতির কায়েদে আজম” বা “ইসলামি রাষ্ট্রের স্থপতি” হিসেবে উপস্থাপন করা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রহসন। জিন্নাহ নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মাচরণ থেকে কতটা দূরে ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনে ইসলামকে কীভাবে স্রেফ একটি ‘আইনি ব্রিফ’ (Legal Brief) বা কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, তা প্রাথমিক ঐতিহাসিক নথিতে শতভাগ প্রমাণিত।

এম. সি. চাগলার সাক্ষ্য: শূকরের মাংস, মদ ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিগত জীবন

বোম্বাই হাইকোর্টে জিন্নাহর অধীনে তরুণ জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এম. সি. চাগলা (M. C. Chagla), যিনি পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। চাগলা তাঁর বিশ্বখ্যাত আত্মজীবনী ‘Roses in December’-এ জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নগ্ন সত্য উন্মোচন করেছেন।
চাগলা লিখেছেন:
“জিন্নাহ ছিলেন আমার দেখা সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মাচরণহীন মানুষ। ধর্মীয় কোনো বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান বা উপাসনার প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আনুগত্য ছিল না। তিনি নিয়মিত শূকরের মাংস (Pork/Ham) খেতেন এবং স্কচ উইস্কি পান করতেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় প্রচারণায় বেরিয়ে বোম্বাইয়ের এক হোটেলে আমরা যখন বসেছিলাম, জিন্নাহ সেখানে সবার সামনে প্রকাশ্যে প্লেটে করে সসেজ (যা শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি) ও ওয়াইন অর্ডার করেছিলেন। সাধারণ মুসলিমদের আবেগ বা ধর্মীয় বিধিনিষেধের প্রতি তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত তোয়াক্কা ছিল না।”
জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে কখনো নামাজ পড়তেন না, রোজা রাখতেন না, কিংবা তিনি আরবি বা উর্দু ভাষাও পড়তে বা বলতে পারতেন না। এমনকি কোরআন, হাদিস বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের (Fiqh) ওপর তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ বা ন্যূনতম মৌলিক ধারণা ছিল না।

‘আইনি ব্রিফ’ হিসেবে ইসলামি শব্দচয়ন

প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ প্রফেসর ইসতিয়াক আহমেদ (Ishtiaq Ahmed) তাঁর কালজয়ী ও বহু পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ ‘Jinnah: His Successes, Failures and Role in History’ এবং ‘Pakistan: The Garrison State: Origins, Evolution, Consequences 1947–2011’-এ জিন্নাহর এই ছদ্মবেশ বিশদভাবে উন্মোচন করেছেন।

ইসতিয়াক আহমেদ দেখিয়েছেন, একজন ব্যারিস্টার যেমন আদালতে কোনো জটিল মেডিকেল পেটেন্ট বা কেমিক্যাল কোম্পানির মামলা লড়ার সময় রাতারাতি নির্দিষ্ট কিছু ডাক্তারি ও রাসায়নিক টার্মিনোলজি মুখস্থ করে বিচারকের সামনে অবলীলায় বলে যান, জিন্নাহর ইসলামি স্লোগান ব্যবহারের ধরনটি ছিল ঠিক একই রকম।

১৯৪০-এর দশকে যখন জিন্নাহ দেখলেন যে, কেবল রাজকীয় দরবার বা ড্রয়িংরুম পলিটিক্স দিয়ে ক্ষমতা দখল করা যাচ্ছে না, তখন তিনি হঠাৎ করেই তাঁর বক্তৃতায় ইসলামি শব্দমালা ব্যবহার করা শুরু করেন। তিনি বলতে শুরু করেন—”কোরআনিক সমতা”, “ইসলামি ভ্রাতৃত্ব” এবং “শরিয়াহ ভিত্তিক ন্যায়বিচার”। কিন্তু এই শব্দগুলোর কোনো দার্শনিক বা নীতিগত গভীরতা তাঁর কাছে ছিল না।

তারিক রহমানের ‘করপাস অ্যানালিসিস’ ও জিন্নাহর নিজস্ব স্বীকারোক্তি

ভাষাবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ প্রফেসর তারিক রহমান (Tariq Rahman) তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘Jinnah’s Use of Islam in his Speeches’-এ জিন্নাহর ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৮ সালের সমস্ত ইংরেজি ও অনূদিত উক্তি এবং ভাষণের ওপর একটি গানিতিক করপাস অ্যানালিসিস (Corpus Analysis) পরিচালনা করেন।

তাঁর গবেষণার ফল ছিল চমকপ্রদ:

১. জিন্নাহর হাজার হাজার ঘণ্টার ভাষণের ৯৮%-এর বেশি জুড়ে ছিল—ব্রিটিশ কন্সটিটিউশনাল সেফগার্ড, মুসলিমদের আসন সংখ্যা, কোটা, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের আইনি হিসেব।

২. যে ১-২% অংশে ‘ইসলাম’ বা ‘কোরআন’ শব্দটি এসেছে, সেখানে কোনো আায়াতের তাফসির, হাদিসের রেফারেন্স কিংবা ইসলামিক অর্থনৈতিক মডেলের কোনো রূপরেখা ছিল না। তা ছিল স্রেফ রাজনৈতিক জনসভায় আবেগ উসকে দেওয়ার অলঙ্কার।

এমনকি জিন্নাহ নিজে বহুবার তাঁর এই ধর্মীয় অজ্ঞতার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৪১ সালে হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যখন তাঁকে জিন্নাহর প্রস্তাবিত দেশের “ইসলামি শাসনতন্ত্র ও তাফসির” নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন জিন্নাহ সরাসরি উত্তর দিয়েছিলেন:

“I am neither a Maulvi nor a Mullah, nor do I claim knowledge of theology. I am a man of law, fighting a political case for the Muslims.”
এই একটি উক্তিই প্রমাণ করে—জিন্নাহর কাছে ‘ইসলাম’ কোনো জীবনদর্শন ছিল না; ইসলাম ছিল তাঁর আইনি মামলার ‘ব্রিফ ফাইল’ (Brief File), যা দিয়ে তিনি ব্রিটিশ রাজ ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দরকষাকষি করছিলেন।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

৪. ‘পাকিস্তান কেস’ ও সামন্তবাদী মক্কেল গোষ্ঠী: জমিদারি রক্ষা ও ভূস্বামীদের এজেন্ট

পাকিস্তান আন্দোলন কোনো দিনই ভারতের সাধারণ দরিদ্র মুসলিম কৃষক, খেতমজুর, তাঁতি বা শ্রমিকের মুক্তির আন্দোলন ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের অবিভক্ত মুসলিম সামন্তপ্রভু, জোতদার, পঞ্জাবের ল্যান্ডলর্ড, সিন্ধুর ওয়াদেড়া, বেঙ্গলের নবাব এবং ইউপি-র অভিজাত আমলাদের নিজের স্বার্থ ও সম্পত্তি বাঁচানোর এক অশুভ মাস্টারপ্ল্যান। আর জিন্নাহ ছিলেন এই ধনকুবের মক্কেলদের ভাড়াটে প্রধান আইনজীবী (Lead Defense Counsel)।

কংগ্রেসের ভূমি সংস্কার নীতি ও সামন্তপ্রভুদের আতঙ্ক

১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু এবং কংগ্রেসের সমাজতান্ত্রিক অংশের প্রভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যে—স্বাধীন ভারতে জমিদারি প্রথা (Permanent Settlement) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হবে এবং অতিরিক্ত জমি বাজেয়াপ্ত করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বন্টন করা হবে।

এই একটি ঘোষণা ভারতের মুসলিম ভূস্বামী ও সামন্তপ্রভুদের পেটে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তারা বুঝতে পারে, একটি গণতান্ত্রিক ও সেকুলার ভারতে—যেখানে এক ব্যক্তি এক ভোটের নীতি থাকবে এবং জমিদারি প্রথা উঠে যাবে—সেখানে এই পরজীবী সামন্তপ্রভুরা তাদের শত বছরের শোষণ ও অঢেল সম্পদের মালিকানা হারিয়ে ফেলবে।

জিন্নাহর প্রধান মক্কেলরা কারা ছিলেন?

আয়েশা জালাল (Ayesha Jalal) তাঁর যুগান্তকারী কালজয়ী গবেষণা গ্রন্থ ‘The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan’ এবং সামাজিক গবেষক হামজা আলাভী (Hamza Alavi) তাঁর ‘The State in Post-Colonial Societies: Pakistan and Bangladesh’ গ্রন্থে জিন্নাহর প্রধান ক্লায়েন্ট বা সমর্থকদের তালিকা উন্মোচিত করেছেন:

১. পঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট সামন্তপ্রভু: পঞ্জাবের বিশাল ভূস্বামী পরিবারসমূহ—যেমন নবাব অফ মামদোট, মিয়াঁ মুমতাজ দৌলতানা, স্যার সিকান্দার হায়াত খান এবং টিওয়ানা পরিবার। এই পরিবারগুলোর একেক জনের হাজার হাজার একর জমি ছিল, যেখানে লাখ লাখ পঞ্জাবি কৃষক মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসের মতো বাস করত।

২. সিন্ধুর ওয়াদেড়া ও পীরগণ: সিন্ধুর সুফি পীর, সৈয়দ পরিবার এবং ওয়াদেড়ারা (যাদের অন্যতম ছিল ভুট্টো, খুড়ো ও সৈয়দ পরিবার)।

৩. উত্তর প্রদেশের (UP) সামন্তবাদী মুসলিম এলিমেন্ট: ইউপি-র তালুকদার ও নবাবগণ, যাদের নিজেদের রাজ্যে বড় কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না, কিন্তু তারা কেন্দ্রীয় সরকারের সিভিল সার্ভিস ও রাজস্বে নিজেদের একচেটিয়া কোটা বজায় রাখতে চেয়েছিল।

৪. বেঙ্গলের সামন্ত ও বড় জোতদাররা: ঢাকার নবাব পরিবার, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং বেঙ্গলের অভিজাত আশরাফ মুসলিম শ্রেণী, যারা কৃষক প্রজা পার্টির শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষকবান্ধব রাজনীতিকে চরম ভয় পেত।

মক্কেলের টিওআর (Terms of Reference) এবং জিন্নাহর চুক্তি

হামজা আলাভী দেখিয়েছেন, এই সামন্তপ্রভুরা জিন্নাহকে তাঁদের রাজনৈতিক কেস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তাদের লিখিত ও অলিখিত টিওআর (Terms of Reference) ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট:
“কংগ্রেস যদি ভারতের ক্ষমতায় আসে, তবে আমাদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত হবে, আমাদের সামাজিক হেজিমনি ধ্বংস হবে। জিন্নাহ, আপনি একজন অত্যন্ত ক্ষুরধার উকিল। আপনি ব্রিটিশদের সাথে এবং কংগ্রেসের সাথে এমনভাবে দরকষাকষি করুন, যাতে আমাদের জন্য এমন একটি পৃথক রাজনৈতিক অঞ্চল বা রাষ্ট্র বের করে আনা যায়, যেখানে কোনো জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস হবে না, কোনো সামাজিক বিপ্লব ঘটবে না এবং আমাদের বংশানুক্রমিক শোষণ অক্ষুণ্ণ থাকবে।”
জিন্নাহ তাঁর ক্লায়েন্টদের সেই মামলা শতভাগ সফলতা দিয়ে জিতে দিয়েছিলেন। ইসতিয়াক আহমেদ তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জিন্নাহ কীভাবে পঞ্জাবের সুফি পীরদের দরবারে গিয়ে এবং সামন্তপ্রভুদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুসলিম লিগের পক্ষে ভোট এনেছিলেন। জিন্নাহ তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, মুসলিম লিগের রাজনীতিতে কোনো ‘নেহরুভিয়ান সোশ্যালিজম’ বা ভূমি সংস্কার ঠাঁই পাবে না।
এর প্রত্যক্ষ ফল হয়েছিল এই যে, ১৯৪৭ সালে যে ‘পাকিস্তান’ তৈরি হলো—তা শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র হলো না; তা পরিণত হলো জমিদার, জেনারেল এবং আমলাদের এক অভয়ারণ্যে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

৫. গণবিচ্ছিন্ন ড্রয়িংরুম এলিটিজম: রাজপথের রাজনৈতিক বিমুখতা ও জনতার প্রতি অবজ্ঞা

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনকে যদি কোনো একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে হয়, তবে তা হলো তাঁর চরম ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ (Mass Alienation)। তিনি কখনোই লোকায়ত গণনেতা (Mass Leader) ছিলেন না। তিনি ছিলেন বোম্বাই, দিল্লি ও লন্ডনের অভিজাত ক্লাবের সদস্য, যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুম, রাজকীয় গোলটেবিল বৈঠক, ভাইসরয়ের লাটভবন এবং আদালতের কাঠের কাঠগড়ায় বসে রাজনীতি করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক বা মেহনতি মানুষের কোলাহলময় জীবনকে তিনি দূর থেকে চরম অবজ্ঞা ও শীতল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন।

১৯২০ সালের নাগপুর কংগ্রেস অধিবেশন: গণআন্দোলনের প্রতি চরম ঘৃণা

জিন্নাহর গণবিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমান পাওয়া যায় ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক নাগপুর অধিবেশনে। এই অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী যখন অহিংস ‘অসহযোগ আন্দোলন’ (Non-Cooperation Movement)-এর প্রস্তাব পেশ করেন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান, তখন জিন্নাহ একমাত্র শীর্ষ নেতা যিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

স্ট্যানলি উলপার্ট তাঁর ‘Jinnah of Pakistan’ গ্রন্থে এই নাগপুর অধিবেশনের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা ঐতিহাসিক দলিলের অংশ। নাগপুরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ মহাত্মা গান্ধীর গণআন্দোলনের প্রস্তাবকে সরাসরি “Anarchical and dangerous tactic” (অরাজক ও বিপজ্জনক কৌশল) বলে অভিহিত করেন।

জিন্নাহর বিশ্বাস ছিল রাজনীতি হওয়া উচিত কেবল শিক্ষিত, পোশাক-আশাক পরিহিত এলিট শ্রেণি, ব্যারিস্টার ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের টেবিলে বসে করা একটি খেলা। সাধারণ মানুষ যদি রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তবে সমাজের এলিটদের রাজকীয় কর্তৃত্ব এবং আইনের শাসন ভেঙে পড়বে। নাগপুর অধিবেশনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের স্লোগান ও গণজোয়ার দেখে জিন্নাহ এতটাই ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেছিলেন যে, তিনি সভা ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং কিছুদিন পরেই কংগ্রেস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে পুরো রাজনৈতিক জীবনে জিন্নাহ কোনো দিন কোনো ধর্মঘট, কৃষক মিছিল বা গণসংগ্রাম পরিচালনা করেননি।

পোশাক, ভাষা ও সামাজিক দূরত্বের অহংকার

জিন্নাহর সাথে সাধারণ মুসলিম জনতার যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবধান ছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসের যেকোনো তথাকথিত ‘জননেতা’র ক্ষেত্রে বিরল।

  • পোশাক ও রুচি: জিন্নাহ পরতেন লন্ডনের বিখ্যাত সাভিল রো (Savile Row)-এর তৈরি দামী স্যুট, বুকে থাকত মনোকল (এক চোখের চশমা), আর পায়ে থাকত ইতালীয় চামড়ার বুট। যে দেশে কোটি কোটি মুসলিম কৃষক খালি পায়ে ও ছেঁড়া লুঙ্গি পরে দিনপাত করত, সেখানে জিন্নাহর এই অভিজাত ইউরোপীয় পোশাক ছিল সাধারণ মানুষের জীবন থেকে তাঁর যোজন যোজন দূরত্বের নগ্ন প্রমাণ।
  • ভাষার অহংকার: জিন্নাহ যখন পঞ্জাব, সিন্ধ, উত্তর প্রদেশ বা বেঙ্গলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের সামনে জনসভায় বক্তব্য দিতেন, তখন তিনি কথা বলতেন ভিক্টোরিয়ান যুগের নিখুঁত বোম্বাই-লন্ডন ধাঁচের ইংরেজিতে। যে জনতার উদ্দেশ্যে তিনি কথা বলছিলেন, তাদের ৯৯% মানুষ এক বর্ণ ইংরেজি বুঝত না। জসওয়ান্ত সিং (Jaswant Singh) তাঁর ‘Jinnah: India – Partition – Independence’ গ্রন্থে লিখেছেন, জিন্নাহ কখনো চেষ্টা করেননি স্থানীয় মানুষের মাতৃভাষা শিখতে কিংবা তাদের সাথে তাদের ভাষায় কথা বলতে।
  • স্পর্শকাতরতা ও অহংকার: সাধারণ মানুষের ভিড় বা ধুলোবালি জিন্নাহ চরম অপছন্দ করতেন। জনসভায় জনতার সাথে হাত মেলানো কিংবা সাধারণ মানুষের পাশে বসা তাঁর অভিজাত রুচিতে বাধত। তিনি বিশ্বাস করতেন, নেতা হিসেবে তাঁর স্থান হলো ক্ষমতার সর্বোচ্চ উঁচুতে—জনতার ঢল কেবল দূর থেকে তাঁকে দেখে হাত তালি দেবে, তাঁর কাছে ঘেষতে পারবে না।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

 

৬. তৃণমূলহীন রাজনৈতিক কাঠামো: ঢুলিপালা ও টালবটের গবেষণার নিরিখে সত্য উন্মোচন

মুসলিম লিগকে একটি “গণসংগঠন” হিসেবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব জিন্নাহকে দেওয়া আধুনিক ইতিহাস চর্চার অন্যতম বড় পৌরাণিক রূপকথা (Myth)। প্রাথমিক নথিপত্র এবং আধুনিক নিরপেক্ষ গবেষণা প্রমাণ করে যে, জিন্নাহ নিজে কোনোদিন গ্রামে গ্রামে গিয়ে কোনো তৃণমূল সংগঠন (Grassroots Organisation) গড়ে তোলেননি।

১৯৩৭ সালের লাখনৌ অধিবেশন: জিন্নাহর নিজের স্বীকারোক্তি

ঐতিহাসিক ফ্র্যান প্রিটচেট (Fran Pritchett) সংগৃহীত প্রাথমিক নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে মুসলিম লিগের লাখনৌ প্রেসিডেন্টশিয়াল এড্রেসে (Lucknow Presidential Address) জিন্নাহ নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ১৯৩৬ সালের আগে মুসলিম লিগের সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগের কোনো নীতি বা কর্মসূচিই ছিল না।

জিন্নাহর নিজের ভাষায়:

“The League had hitherto been a upper-middle class organisation… It is only since 1936 that we have taken up the policy and programme of mass contact.”

যদি একজন নেতা নিজেই ১৯৩৬ সালে এসে প্রথম স্বীকার করেন যে তাঁর দল একটি এলিট ক্লাব ছিল এবং কেবল নতুন একটি কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, তবে তার আগে তাঁকে “তৃণমূলের সফল গণসংগঠক” হিসেবে দাবি করা ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

ভেঙ্কট ঢুলিপালার কালজয়ী গবেষণা: লোকাল নেটওয়ার্ক বনাম জিন্নাহ

ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত কেমব্রিজ ইতিহাসবিদ ভেঙ্কট ঢুলিপালা (Venkat Dhulipala)-র আলোড়িত গবেষণা গ্রন্থ ‘Creating a New Medina: State Power, Islam, and the Quest for Pakistan in Late Colonial North India’-এ ঢুলিপালা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, মুসলিম লিগের রূপান্তর জিন্নাহর একক সাংগঠনিক ক্ষমতার ফল ছিল না।

ঢুলিপালা ইউপি (Uttar Pradesh) এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন জেলার প্রাথমিক আর্কাইভাল ডকুমেন্ট উন্মোচিত করে দেখিয়েছেন:

১. ১৯৩৭-এর পর উত্তর ভারতে মুসলিম লিগের যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার মূল কারিগর ছিলেন স্থানীয় মুসলিম লিগ নেতা, জেলা পর্যায়ের ছোট রাজনৈতিক কর্মী, উলামা এবং স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা।

২. জিন্নাহ গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে কোনো প্রাথমিক শাখা তৈরি করেননি, সদস্য সংগ্রহ করেননি কিংবা স্থানীয় কৃষি ও খাজনা সম্পর্কিত সংকট নিয়ে কোনোদিন কাজ করেননি।

৩. জিন্নাহর ভূমিকা ছিল কেবল একজন কেন্দ্রীয় আইনি কর্তৃত্ব (Central Bargaining Authority) হিসেবে। গ্রামের মানুষকে দলে ভেড়ানো এবং ব্রিটিশের বিরুদ্ধে মোবিলাইজ করার কাজটি করেছিল স্থানীয় তৃণমূল নেটওয়ার্ক।

আই. এ. টালবটের পঞ্জাব গবেষণা: সুফি দরবার, ল্যান্ডলর্ড ও ছাত্রদের ভূমিকা

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আই. এ. টালবট (I. A. Talbot) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘Punjab and the Raj’ এবং ‘Provincial Politics and the Pakistan Movement’-এ পঞ্জাবে মুসলিম লিগের উত্থানের একদম বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

টালবটের গবেষণা দেখায়:

  • ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত পঞ্জাবের গ্রামীণ সমাজে মুসলিম লিগের কোনো বাস্তব ভিত্তি বা উপস্থিতিই ছিল না। সেখানে পঞ্জাব ইউনিয়নিস্ট পার্টি এবং স্যার সিকান্দার হায়াত খানের প্রভাব ছিল একচ্ছত্র।
  • ১৯৪৫-৪৬ সালে গিয়ে পঞ্জাবে যে পরিবর্তন আসে, তা জিন্নাহর কোনো জাদুকরী সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে আসেনি। তা এসেছিল কারণ—পঞ্জাবের বড় বড় সামন্তপ্রভু (জমিদার), পীর, সাজ্জাদানশীন (সুফি দরবারের প্রধান) এবং পঞ্জাব মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের ছাত্ররা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ধর্মীয় বার্তা ছড়িয়েছিল।
  • জিন্নাহ নিজে পঞ্জাবের জমিদার ও পীরদের কাছে গিয়ে তাদের নিজেদের সম্পত্তি ও ধর্মীয় ক্ষমতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সুতরাং, ইতিহাস স্পষ্ট করে—পাকিস্তানের গণভিত্তি জিন্নাহ সরাসরি তৈরি করেননি। সংগঠন তৈরির চেইনটি ছিল এমন:

জিন্নাহ / কেন্দ্রীয় লিগ ➔ প্রাদেশিক সামন্তপ্রভু ➔ সুফি পীর / উলামা / ছাত্র ➔ গ্রামীণ জনগণ

জিন্নাহ ছিলেন এই নেটওয়ার্কের চূড়ায় বসে থাকা এক চতুর কেন্দ্রীয় ম্যানেজার, কিন্তু তিনি নিজে কখনোই তৃণমূলের রূপকার বা গণসংগঠক ছিলেন না।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

 

৭. ‘ভিশনহীন স্টেটসম্যান’: ১১ই আগস্ট ১৯৪৭-এর ভাষণ, অস্পষ্টতা ও দায়িত্ব এড়ানোর নথিপত্র

একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের (Statesman) সবচেয়ে বড় চেনার উপায় হলো—একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের মুহূর্তে তাঁর কাছে দেশের মৌলিক সংবিধান, অর্থনৈতিক পথ এবং সামাজিক কাঠামোর একটি স্পষ্ট এবং সুসংহত ব্লুপ্রিন্ট (Coherent Blueprint) থাকে। কিন্তু জিন্নাহর ক্ষেত্রে এই মৌলিক রাষ্ট্রচিন্তার চরম অভাব দৃশ্যমান ছিল।

১১ই আগস্ট ১৯৪৭: জিন্নাহর চরম দায়িত্ব এড়ানো

১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট, পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে, জিন্নাহ নবগঠিত পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে (Constituent Assembly) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তথাকথিত উদারপন্থীরা প্রায়ই এই ভাষণকে উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে জিন্নাহ পাকিস্তানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু সেই ভাষণের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অফ পাকিস্তানের অফিসিয়াল রেকর্ড (National Assembly of Pakistan Official Records) গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে জিন্নাহর ভিশনহীনতা ও দায়িত্ব এড়ানোর নগ্ন চরিত্রটি বেরিয়ে আসে।

উক্ত ভাষণে জিন্নাহ গণপরিষদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেন:

“I cannot make any well-considered pronouncement at this moment, but I shall say a few things as they occur to me… The Constituent Assembly has got two main duties to perform. The first is the very onerous and responsible task of framing the future Constitution of Pakistan.”

এটি খেয়াল করুন—যে দেশটি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তিন দিন পর, সেই দেশটির প্রধান রূপকার গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলছেন যে, তিনি দেশের সংবিধান নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো “Well-considered pronouncement” (চিন্তাভাবনাযুক্ত সুনির্দিষ্ট বক্তব্য) দিতে পারছেন না! এটি কোনো রাজনৈতিক উদারতা ছিল না; এটি ছিল একজন মামলা শেষ করা ব্যারিস্টারের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। কেস জেতার পর মক্কেলের বাড়ি কীভাবে পরিচালিত হবে—তা যেমন আইনজীবীর মাথাব্যথা থাকে না, জিন্নাহর আচরণ ছিল ঠিক তেমনই।

বি. আর. আম্বেদকরের ব্যবচ্ছেদ: চরম পরস্পরবিরোধী আশ্বাস

ভারতের সংবিধানের স্থপতি এবং প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ড. বি. আর. আম্বেদকর ১৯৪৭ সালের আগেই তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘Pakistan or the Partition of India’-তে জিন্নাহর এই ছদ্ম-কৌশল নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছিলেন।

আম্বেদকর দেখান, জিন্নাহ ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী এবং মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করেছিলেন:

গোষ্ঠী / অডিয়েন্সজিন্নাহর দেওয়া আশ্বাস ও ছদ্ম-প্রতিশ্রুতিবাস্তব পরিণতি ও স্ববিরোধ
১. সেকুলার ও পশ্চিমা বিশ্ব১১ আগস্ট ১৯৪৭-এর ভাষণে বললেন: “পাকিস্তান হবে এমন এক দেশ যেখানে ধর্মে ধর্মে বিভেদ থাকবে না, হিন্দু হিন্দু থাকবে না, মুসলিম মুসলিম থাকবে না।”এটি ছিল পশ্চিমা বিশ্বকে দেখানোর জন্য একটি আইনি ফাসাদ (Legal Façade)।
২. পঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের উলামা ও পীরনির্বাচনের প্রচারণায় লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেন: “পাকিস্তান হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক রাষ্ট্র, যেখানে শাসনতন্ত্র পরিচালিত হবে কোরআন ও শরিয়াহ অনুযায়ী।”ধর্মীয় উগ্রবাদকে উসকে দিয়ে ভোটব্যাংক তৈরি করেছিলেন।
৩. সামন্তপ্রভু ও ওয়াদেড়াগোপনে আশ্বাস দিলেন: “স্বাধীন পাকিস্তানে ভূস্বামীদের জমিদারি প্রথা বা সম্পত্তিতে কোনো হাত দেওয়া হবে না।”সামন্তবাদকে চিরস্থায়ী করে দরিদ্র কৃষকদের শোষণের মুখে ঠেলে দেওয়া।
৪. পূর্ব বেঙ্গলের বাঙালি মুসলিম১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের দোহাই দিয়ে বোঝালেন: “পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন-স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রগুলোর কনফেডারেশন।”১৯৪৭-এর পর সমস্ত স্বায়ত্তশাসন অস্বীকার করে করাচির একনায়কত্ব চাপিয়ে দেওয়া।

ড. আম্বেদকর যথার্থই মন্তব্য করেছিলেন যে, জিন্নাহর এই পরস্পরবিরোধী কথাগুলো প্রমাণ করে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট শাসনতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না; তিনি কেবল একেক পক্ষকে একেক কথা বলে নিজের আইনি কেসটি জিততে চেয়েছিলেন।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

 

৮. বহুজাতি-বহুভাষিক বাস্তবতায় অন্ধত্ব: ১৯৪৮ সালে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা উর্দুর একনায়কত্ব

জিন্নাহর রাষ্ট্রচিন্তাহীনতা এবং জাতিগত-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অবমূল্যায়ন করার সবচেয়ে মারাত্মক ও বিষাদময় ঐতিহাসিক খেসারত দিতে হয়েছিল পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) ৫৬% বাঙালি জনগোষ্ঠীকে।

১৯৪৮ সালের মার্চ: কার্জন হল ও রেসকোর্স ময়দানের স্বৈরাচারী ডিক্রি

১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর জীবনে প্রথম এবং শেষবারের মতো পূর্ব বাংলা সফরে ঢাকায় আসেন। ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এবং ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে তিনি যে ভাষণ দেন, তা ছিল একটি নবগঠিত বহুভাষিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের চরম ঔদ্ধত্য ও প্রশাসনিক অন্ধত্বের প্রমান।

কার্জন হলে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় ছাত্র সমাজের মুখের ওপর দাঁড়িয়ে জিন্নাহ অত্যন্ত শীতল ও স্বৈরাচারী কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:

“The State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language. Anyone who tries to mislead you is really the enemy of Pakistan.”
কার্জন হলে সাথে সাথে গর্জে উঠেছিল বাঙালি ছাত্রদের প্রতিবাদের আওয়াজ—“No! No! No!”

জিন্নাহর আইনি স্বৈরাচারের ব্যবচ্ছেদ

জিন্নাহর এই একটি সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তিনি কতটা একনায়কত্বকামী এবং বহুজাতি বাস্তবতার প্রতি অন্ধ ছিলেন:

১. গণতান্ত্রিক নীতি লঙ্ঘন: তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে উর্দু ছিল মাত্র ৭% মানুষের ভাষা (যাদের সিংহভাগই ছিল ভারত থেকে আসা মোহাজির)। ৫৬% মানুষের ভাষাকে অস্বীকার করে ৭% মানুষের ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের সিদ্ধান্ত হতে পারে না; তা ছিল এক স্বৈরাচারী বিচারকের জোরপূর্বক জারি করা ডিক্রি।

২. সংস্কৃতিক অন্ধত্ব: জিন্নাহ নিজে উর্দু বলতে পারতেন না। তিনি নিজে ভিক্টোরিয়ান ইংরেজিতে কথা বলতেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে জোর করে একটি ধর্ম এবং একটি ভাষা চাপিয়ে দিতে হবে—যা ছিল ১৯ শতকের ফ্যাসিবাদের পুরনো মডেল।

৩. বাঙালিকে ‘শত্রু’ তকমা দেওয়া: যারা নিজেদের ভাষার অধিকার চেয়েছিল, তাদের জিন্নাহ সরাসরি “ভারতের এজেন্ট” ও “পাকিস্তানের শত্রু” বলে অভিহিত করেছিলেন। জিন্নাহর এই চরম অহংকার ও ঘৃণার বাণীই বাঙালি জাতীয়তাবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

 

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

 

৯. ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী পরিণতির অমোঘ ইতিহাস: একটি ভিশনহীন রাষ্ট্রের পতন

জিন্নাহ যে বালুর ওপর ‘পাকিস্তান’ নামক প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন, তা মাত্র ২৪ বছরের মাথায় ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। জিন্নাহর অনুসারীরা এবং আধুনিক নব্য-জিন্নাহবাদীরা যতই চেষ্টা করুক না কেন, ইতিহাস এই নির্মম সত্যকে মুছে ফেলতে পারবে না যে—১৯৭১ সালের বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানের বিভক্তি ছিল জিন্নাহর নিজস্ব ভিশনহীনতা, সামন্তবাদী তোষণ ও ঔদ্ধত্যের সরাসরি ও অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিণতি।

ইতিহাসবিদদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন

১. প্রফেসর ইসতিয়াক আহমেদ (Ishtiaq Ahmed):
“Jinnah was brilliant at winning an argument, but terrible at foreseeing the logical consequences of his actions. He built a state on religious division without an economic or constitutional soul, making its militarisation and eventual dismemberment in 1971 inevitable.”
২. আয়েশা জালাল (Ayesha Jalal):
“Jinnah’s failure to define the internal constitutional dynamics of Pakistan left the new state at the mercy of its civil-military bureaucracy and feudal elites, leading to the alienation of East Bengal.”
৩. হামজা আলাভী (Hamza Alavi):
“Pakistan was created not as a homeland for all Muslims, but as an ‘Overdeveloped State Structure’ to protect the interests of the Muslim Salariat class and West Pakistani feudal lords, which naturally exploded in 1971.”
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ [ Muhammad Ali Jinnah ]
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ

অতএব, ঐতিহাসিক তথ্যাবলি, প্রাথমিক নথি ও গভীর গবেষণার আলোকেই এটি শতভাগ প্রমাণিত সত্য যে: মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কোনো কালজয়ী জননেতা, মহৎ রাষ্ট্রনায়ক কিংবা দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সমাজসংস্কারক ছিলেন না।

তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন অত্যন্ত সুচতুর, চড়া ফি নেওয়া এবং নীতিহীন আইনি সওদাগর (Legal Mercenary)। তিনি ভারতের মুসলিম জমিদার, জোতদার ও আমলাদের সম্পত্তি এবং সামাজিক কর্তৃত্ব বাঁচানোর জন্য ‘পাকিস্তান’ নামক আইনি কেসটি হাতে নিয়েছিলেন। তিনি বোম্বাই হাইকোর্টের একজন আইনজীবীর মতোই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে, ব্রিটিশ রাজ ও কংগ্রেসের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এবং একেক পক্ষকে একেক মিথ্যা ও ছদ্ম-প্রতিশ্রুতি দিয়ে মামলাটি জিতেছিলেন।

কিন্তু আদালতে আইনি মামলা জেতা আর একটি বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জিন্নাহর কোনো সুসংহত সংবিধানচিন্তা ছিল না, সাধারণ মেহনতি মানুষের প্রতি তাঁর কোনো ভালোবাসা বা সম্পর্ক ছিল না, এবং বহুজাতি বাস্তবতার প্রতি তাঁর ছিল চরম অন্ধত্ব।

আর এই ভিশনহীন আইনি খেলার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষকে। জিন্নাহর তৈরি করা কৃত্রিম রাষ্ট্রটি জন্ম থেকেই একটি সামরিক-আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচারে পরিণত হয়, যা ১৯৪৮ সালে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালে ৩ লাখ শহীদের রক্ত ও হাজার হাজার সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের মাধ্যমে দ্বিজাতিতত্ত্ব ও জিন্নাহর আইনি প্রকল্পের চূড়ান্ত কবর রচিত হয়।